Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
RiyaButu
Read & Learn

মাণিক্য


বাংলা গোয়েন্দা গল্প


All Bengali Stories    22    23    24    25    26    27    28    29    (30)       

হরপ্রসাদ সরকার


An offer to make a Website for you.

hostgator




মাণিক্য
( বাংলা গোয়েন্দা গল্প )
- হরপ্রসাদ সরকার, আগরতলা, ত্রিপুরা
০৩-১০-২০১৭

◕ মাণিক্য
১ম পর্ব

ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা। উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি ছোট্ট সুন্দর শহর। শহরটির ঠিক মাঝখানে ধবধবে সাদা রাজবাড়িটি ঠিক পূর্ণিমা চাঁদের মতই সদা ঝলমল করছে। ১৮৯৬-৯৭ সালে ত্রিপুরাতে এক বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়। চারিদিকে প্রচুর ক্ষয় ক্ষতি হয়, প্রচুর বাড়িঘর ভেঙ্গে পরে, রাজবাড়িও রেহায় পায়নি। সেই ভূমিকম্পের পরেই মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্যে বাহাদুর বর্তমানের উজ্জ্বয়ন্ত প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। ১৯০১ থেকেই এই প্রাসাদটি উজ্জ্বয়ন্ত প্রাসাদ নামে ইতিহাসের পাতায় বিদ্যমান।

এই প্রাসাদ থেকে প্রায় ৫২০ ইতিহাস বছর দূরে পরে আছে ত্রিপুরার আরেক ইতিহাস। ঐ সময়ে ত্রিপুরার পরম পরাক্রমী রাজা গোপীপ্রসাদ প্রতিষ্ঠা করেন ত্রিপুরার বিখ্যাত কসবা কালীবাড়ি। যেই কালীবাড়িতে আজও সেই প্রায় ৫০০ বছর আগেকার নিয়ম মেনেই প্রথামত পূজো হয়। মহারাজ গোপীপ্রসাদের মত এমন বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান, পরাক্রমী আর প্রভাবশালী রাজা ত্রিপুরার ইতিহাসে আর দুটি পাওয়া যায় না। মহারাজ গোপীপ্রসাদকে আমরা সবাই মহারাজ ধন্যমাণিক্য নামেই জানি। হ্যাঁ, মহারাজ ধন্যমাণিক্যের আসল নাম ছিল গোপীপ্রসাদ। তবে প্রথম জীবনে উনাকেও বিভিন্ন রাজ-চক্রান্তের মধ্যে পড়তে হয়েছিল। আসলে ঘটনাটি ছিল এই রকম, রাজা হওয়ার পর তিনি প্রধান সেনাপতির মেয়ে কমলাদেবীকে বিয়ে করেন। অন্যভাবে বলতে গেলে, চতুর এবং দুষ্ট সেনাপতি চালাকি করে নিজের মেয়ের সাথে মহারাজের বিয়ে দেন। ফলে মহারাজ, রাজা হয়েও সেনাপতির হাতে কাঠপুতলি থেকে গেলেন। সেনাপতির কথাই শেষ কথা হয়ে গেল। শেষ যখন মহারাজের বিবেক চেতনা জাগল, তখন তিনি অতি কৌশলে নিজের চাল চালতে শুরু করলেন। ব্যাস, সব ঠিক হয়ে গেল। আর সেই চালেই দেখতে দেখতে অতি প্রভাবশালী সেই দুষ্ট সেনাপতির সকল প্রভাব চলে গেল, এমনকি খুব দ্রুত ওর মাথাও কাটা গেল। এর পর থেকেই পরম প্রতাপী মহারাজ ধন্যমাণিক্যে, নিজ মহিমায় ত্রিপুরার ইতিহাসে জ্বলজ্বল করে উঠলেন। উনি অনেক জনহিতকর কাজ করতে লাগলেন, অনেক অমর কীর্তি স্থাপন করেতে লাগলেন। ঐ সবের মধ্যে অন্যতম হল ত্রিপুরার ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির প্রতিষ্ঠা। ১৫০১ খ্রীঃ তিনি এটি স্থাপন করেছিলেন। উনার অপর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি হল বর্তমানের কসবা কালীবাড়ি। আজ থেকে প্রায় ৫২০ বছর আগে তিনি নিজের মহিষী কমলাদেবীর নামে একটি সুদীর্ঘ দীঘি নির্মাণ করেন। দীঘির নাম হয় কমলা দীঘি বা কমলা সাগর। এই কমলা সাগরের পারেই তিনি কসবা মন্দির ও মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে কথিত আছে যে, মহারাজ কল্যাণমাণিক্য স্বপ্নাদেশে এই মূর্তির খোঁজ পেয়েছিলেন। তিনি স্বপ্নাদেশ মত তৎকালীন শ্রীহট্ট জেলার হবিগঞ্জের এক ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে অতি সম্মানের সাথে এই প্রতিমা কৈলারগড়ে নিয়ে আসেন। পরবর্তী সময় মহারাজ ধন্যমাণিক্য কসবাতে মন্দির তৈরী করে সেই প্রতিমাটি প্রতিষ্ঠিত করেন। এখনো এই মন্দিরে পূজার সময় রাজবংশের নামেই সংকল্প করা হয়।

ঐ সময় এই কসবা কালী মন্দিরে পূজা দেবার জন্য মহারাজ ধন্যমাণিক্য, তৎকালীন কসবার জাজিশার থেকে কয়েকটি ব্রাহ্মণ পরিবারকে মন্দিরে নিয়ে আসেন। আজও তাদের বংশধরেরাই কসবা কালীবাড়িতে সেই নিয়ম, সেই প্রথা মেনেই মায়ের পূজা দিয়ে আসছেন। তাদেরই অনেক আগে ছুটে যাওয়া এক বংশধর হলেন আমাদের রণধীর চক্রবর্তী। তবে রণধীর চক্রবর্তীরা তিন চার পুরুষ আগে থেকেই যজমানী ছেড়ে দিয়েছেন, মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পূজা করা ছেড়ে দিয়েছেন।

রণধীর চক্রবর্তী পেশায় একজন ডাক্তার। বছর পাঁচেক হল চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। এখন নিজের সময়টা নিজের মত করেই কাটাতে চান। সকাল বেলাতে রুগী দেখেন, বিকেল বেলায় আর রুগী দেখেন না। কোন সিরিয়াস কিছু না হলে বিকেল বেলাটা শিল্প-সাহিত্যের আসর আড্ডায় কাটিয়ে দেন। সংসার বলতে এখন নিজের বউ, দুই ছেলে - ছেলের বউ আর দুই নাতি। দুই ছেলেই ডাক্তার আর দুই বউ ব্যাঙ্কে চাকরি করে। মোট কথা, প্রতি মাসের শেষ বস্তা ভরে টাকা আসে ঘরে।

আগরতলা শহরের ধলেশ্বরের ৫ নম্বর রোডে বেশ বড় বাড়ি রণধীরবাবুর। বাড়ির নাম রণধীর ভবন। বাড়িতে উনার কর্ম জীবনের সেই পুরানো গাড়ি এখনো আছে। এটিতে রণধীরবাবু আর উনার বৌ সজলাদেবীই শুধু চড়েন। রণধীরবাবু নিজে ড্রাইভ করা ছেড়ে দিয়েছেন অনেক আগে। তাই প্রায় সাত বছর ধরে একই ড্রাইভার রাখা আছে, হারু। এখানে ওখানে যেতে হারুই ড্রাইভ করে নিয়ে যায়। রণধীরবাবুর ছেলেরা এই গাড়িতে খুব একটা উঠে না। ওরা, বৌ বাচ্চা সমেত বাইকে চলা ফেরা করতেই বেশী পছন্দ করে।

ধলেশ্বরের অপর প্রান্তে ১৩ নম্বর রোডে সুদামা কুঠিরে নিজের বৈঠক খানায় বসে তখন সকালের তাজা খবরের কাগজটি উল্টে পাল্টে দেখছিল প্রাইভেট ডিটেকটিভ অনুব্রত রাজবংশী। এমন সময় চাকর ভবচরণ এসে খবর দিল "ভাই, একজন লোক এসেছেন। আপনার সাথে দেখা করতে চান।" ভবচরণ রাজবংশীকে ভাই বলেই ডাকে। বয়স দুজনের এক, জন্ম তারিখও এক। দুজনেরই জন্ম তারিখ পাঁচই মে ১৯৭৮।

মুখ তুলে রাজবংশী দেওয়ালের ঘড়ি দেখল। সাড়ে সাতটা বাজে। তারপর ধীরে ভবচরণকে উত্তর দিল, "ভিতরে নিয়ে আসো।" বাইরে যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি বোধ হয় কান পেতেই ছিলেন ঘরের ভিতরে। রাজবংশীর কথা শুনেই তিনি ভবচরণের অপেক্ষা না করে, নিজেই হন্ত দন্ত হয়ে সোজা ঘরের ভিতরে - "আজ্ঞে, আমি এসে গেছি।" এমন কাণ্ড দেখে রাজবংশী আর ভব দুজনেই থ মেরে গেছে। মনে হচ্ছে লোকটি সারা রাত ঘুমাননি। আধ পাকা চুল গুলি সব এলো মেলো হয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে। গায়ের রং, মুখমণ্ডলের মেজাজ আর জামা কাপড় দেখে মনে হল বেশ ধনী, পয়সাওয়ালা খানদানী লোক। লোকটি হাত জোড় করে বললেন, "নমস্কার! এমন ভাবে চলে আসাতে খারাপ ভাববেন না। আসলে আমার আর কিছু করার ছিল না, তাই -। আমার নাম রণধীর চক্রবর্তী। ধলেশ্বরেই ৫ নম্বরে আমার বাড়ি। আপনি কী মিঃ রাজবংশী?"

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে রাজবংশী প্রতি-নমস্কার জানিয়ে বলল, "হ্যাঁ, আমার নাম অনুব্রত রাজবংশী। আসুন আসুন। বসুন।"

-"ধন্যবাদ। আমি মিস্টার খুব বিপদে পড়েছি। আমাকে আপনি বাঁচান।"

-"নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই। আমার যতটুকু করার আমি নিশ্চয়ই করব। কিন্তু তার আগে আপনি একটু শান্ত হওন, আপনি খুব উত্তেজিত হয়ে আছেন। উত্তেজনাতেই আমরা সবচেয়ে বেশী ভুল নির্ণয় নিয়ে বসি। তাই আপনি শান্ত হওন। আমি আপনার সকল কথাই শুনব, নিশ্চিন্ত থাকুন।" এই বলে সে ভবকে বলল, "ভব, দুই কাপ কড়া চা নিয়ে আসো তো, সাথে কিছু চানাচুর।" ভব চলে যেতেই বাড়ির ভিতরের ছোট্ট পার্কিং প্লেসটিতে একটি বাই-সাইকেল রাখার শব্দ পাওয়া গেল। সেই শব্দ শুনেই রাজবংশী আবার ভবকে হাঁক দিল "ভবচরণ, সাধুবাবা এসেছে। দুই কাপের বদলে তিন কাপ চা পাঠিয়ে দিও।" নাম নিতে না নিতেই ঘরের পর্দা ঠেলে ঘরে ঢুকল সদানন্দ বসাক, অনুব্রত রাজবংশীর অ্যাসিস্ট্যান্ট। ঘরে ঢুকেই সাধু হেসে বলল, "তাহলে বল, ঠিক অনুমানই করতে পেরেছিলাম। আমার অনুমান এবারও মিলে গেল। নতুন কাজ এসে গেল তো। সকাল থেকেই মনে হচ্ছিল কাজ আসছে, কাজ আসছে। তাই প্রাইভেট টিউশনটা বন্ধ করেই চলে এলাম। এসে তো দেখি কিছুই ভুল করিনি। কাজ তো এসে হাজির।"

অবাক চোখে সদানন্দকে দেখতে লাগলেন রণধীরবাবু। তা দেখে রাজবংশী হেসে উঠল। বলল, "উনি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট, সদানন্দ বসাক। খুব কাজের লোক। পেশায় বিজ্ঞান বিষয়ের প্রাইভেট টিউটার। জুডো ক্যারাটে আমরা এক সাথেই শিখেছি। তখন থেকেই পরিচয় আর বন্ধুত্ব। যদিও তিনি আমার থেকে বয়সে কিছু বড় তবু আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বেরই সম্পর্ক। বয়সের হের-ফেরটা বন্ধুত্বের সম্পর্কের মধ্যে কোন প্রভাব ফেলেনি। উনার ডাক নাম সাধু। তাই আমি উনাকে সাধুদা বলেই ডাকি। উনার একটি বিশেষ গুন আছে, বলতে পারেন ভগবান প্রদত্ত গুন। সেটি হল, আমাদের কাজ নিয়ে উনি মাঝে মাঝে কিছু অনুমান করে বসেন। আর আশ্চর্যের ব্যাপার হল সেই অনুমানগুলি প্রায় নব্বই শতাংশ ঠিক হয়। আজ পর্যন্ত উনার অনুমানের উপর ভিত্তি করে এগিয়ে আমাকে পরাজিত হতে হয়নি।"

রাজবংশীর মুখে এমন কথা শুনে রণধীরবাবু আগের থেকে আরও বেশী অবাক হয়ে গেলেন। শুধু বললেন - "ও"।

বড় বুকপকেট থেকে নোটবুকটা নিয়ে চটপট আরেকটি চেয়ারে বসে গেল সাধু। "তাহলে শুরু করা যাক!"

এক ফালি হেসে রাজবংশী বলল, "আমরা তৈরী মিস্টার চক্রবর্তী। আপনি শুরু করতে পারেন।"

সংক্ষেপে নিজের পরিচয় দিয়ে শুরু করলেন রণধীরবাবু, " সেই মহারাজ ধন্যমাণিক্যের আমল থেকেই মহারাজের দেওয়া কিছু রৌপ্যমুদ্রা আমাদের কাছে আছে। বংশ পরস্পরাই সেই গুলি আমরা অতি সর্তকতায় সামলে আসছি। এগুলি আমাদের বংশের মুকুট, বংশের গৌরব। এগুলিকে আমাদের বংশের কেহই নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করে না, এ গুলি আমাদের বংশের সকলের। তাই অন্য ধন সম্পদ নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ হলেও এগুলি নিয়ে কখনোই কোন বিবাদ হয়নি। এই রৌপ্যমুদ্রার ব্যাপারে বংশের সকলের মনোভাব মোটামুটি একই রকমের। বংশের মুরব্বিরাই মিলে ঠিক করে দেন কার কাছে এই গুলি রাখা থাকবে, নিরাপদ থাকবে। বংশের ছোট বড় মোটামুটি সবাই জানে কার কার কাছে কয়টি মুদ্রা আছে। এমনটাই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। তাদের মধ্যে আমিও একজন। আমার কাছেও স্বয়ং মহারাজ ধন্যমাণিক্যের দুটি রৌপ্যমুদ্রা এতদিন ছিল। কিন্তু আজ আর নেই। চুরি গেছে।"

চমকে উঠে রাজবংশী বলল, "ছিল! নেই! চুরি গেছে! মানে- ! বলেন কী মশাই! এমন অমূল্য সম্পদ চুরি গেছে?"

মাথা নিচু করে মাথা নাড়লেন রণধীরবাবু, "হ্যাঁ, সেগুলি চুরি গেছে। ওগুলি আজ আর আমার কাছে নেই। তবে পরশু পর্যন্ত ছিল।"

বিরক্তির সুরে রাজবংশী বলল, "এ কী শুরু হল আগরতলায়? গত কয়েকদিনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক মূর্তি, মুদ্রা একের পর এক চুরি যাচ্ছে। আজকের খবরের কাগজেও বেরিয়েছে মিউজিয়াম থেকে নাকি একটি ঐতিহাসিক ছোরা চুরি হয়ে গেছে। কী ভয়ানক ব্যাপার বলুন তো! পুলিশও হয়রান। এই গতকালকেই পুলিশের এক বড় অফিসার আমার সাথে দীর্ঘক্ষণ এই নিয়ে কথা বললেন। আমাদের এমন শান্ত-শিষ্ট শহরে এ কী চলছে মশায়? আমার তো মনে হচ্ছে খুব বড় একটা চোরাকারবারির গ্যাং এখানে কাজ করছে। এটা তো খুব মারাত্মক ব্যাপার। আপনি কী পুলিশকে এই ঘটনাটি জানিয়েছেন?"

- "জানাতে গিয়েছিলাম। দারোগাবাবু আমারই দূর সম্পর্কের শ্যালক। তিনি আমাকে বললেন, 'জামাইবাবু, পুলিশের সাহায্য নিলে কিন্তু ব্যাপারটা মিডিয়াতে জানাজানি হয়ে যাবে। এতে আপনার সমস্যা কিছু বেড়ে যাতে পারে। সরকার কিংবা বিভিন্ন সংস্থা চাপ দিতে পারে এমন অমূল্য সম্পদগুলি সরকারের হাতে হস্তান্তর করার জন্য। তাছাড়াও চোরাকারবারিরা তো আছেই। এ সবের জ্বালা যন্ত্রণায় জীবন তখন অতিষ্ঠ হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং আপনি প্রাইভেট ডিটেকটিভ রাজবংশীর কাছে যান। তার সাথে আমার খুব ভাল পরিচয়। আমি তার নাম ঠিকানা সব দিয়ে দিচ্ছি। ওকে আমার কথা বলবেন। সে নিশ্চয়ই আপনার সমস্যা সমাধান করে দেবে। আমিও ঘটনাটির উপর নজর রাখব, তবে আন-অফিশিয়ালি।' দারোগাবাবুর পরামর্শ পেয়েই ত মশায় আপনার কাছে ছুটে এসেছি। বাঁচান। আমাকে বাঁচান।"

-"আপনার শ্যালকের নাম কী?"

-"হরিকৃপণ চক্রবর্তী।"

- "দেখো কাণ্ড! আপনি হরিবাবুর কথা বলছেন। আরে মশায় আগে বলবেন তো। হরিবাবুর সাথে যে আমার গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক। সে কথায় পড়ে আসছি আগে বলুন, আসল ঘটনাটা কী ঘটেছিল?"

বলতে শুরু করলেন রণধীরবাবু, "দিন দশেক আগে আমার কাছে একটি ফোন আসে। ও প্রান্ত থেকে কেউ একজন ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় বলল, 'শুনেছি আপনার কাছে কিছু ঐতিহাসিক রৌপ্যমুদ্রা আছে। আপনার কাছে ওগুলি শুধু শুধু কেন পড়ে থাকবে, ওগুলি আমাকে দিয়ে দিন, আমার দরকার আছে। ওগুলি যে কত দামী সে হিসাব আপনি লাগাতে পারবেন না। যদি আমার কাছে বিক্রি করতে চান, তবে ভাল দাম পাবেন। আর যদি আমাকে না দিতে চান তবে, - তবে জানবেন আমি সেগুলি জোর করেই নিয়ে নেব, তাও বিনা পয়সায়। একবার যখন নাম ঠিকানা পেয়েছি, তবে তো আর আপনাকে ছাড়ছি না। পুলিশকে জানিয়ে রাখলে ভাল। তবে কোন লাভ হবে না। এমন কয়েক দেশের পুলিশকে সাথে নিয়েই আমরা চলি। সুতরাং আজ গভীর রাতে একবার ভেবে দেখবেন। আমি কাল আবার ফোন করব।' এই বলে লোকটা লাইনটা কেটে দিল।"

-"কোথায় থেকে ফোনটা এসেছিল? নম্বর দেখলেই তো বুঝা যায়।"

-"হ্যাঁ, নম্বরটা দেখলাম বিদেশের। কোর্ডটা দেখে জানলাম ওটা সাউথ আফ্রিকা থেকে এসেছে।"

-"সে কী! সাউথ আফ্রিকা থেকে একটি লোক আপনার কাছে ফোন করল! অবাক কাণ্ড! সে আপনার নাম, ধাম, ফোন নম্বর পেল কোথায়? এ যে দেখছি আগরতলাতে ইন্টারন্যাশানেল গ্যাং!"

-"আমিও তো তাই ভাবছি মশায়। আমি কী ইন্টারন্যাশানেলের জালে আটকে গেলাম নাকি?"

-"আচ্ছা, সেই লোকটি কী পরে আবার ফোন করেছিল?"

-"হ্যাঁ, করেছিল। বহুবারই করেছিল। কিন্তু আমি একবারও ফোন রিসিভ করিনি।"

-"তারপর!"

-"তারপর গত দিন চারেক আগে ত্রিপুরার স্বনামধন্য ইতিহাসের প্রফেসর ডঃ কালীপ্রসন্ন ধর মহাশয় আমাকে ফোন করলেন। বললেন উনার একটি গবেষণার কাজে আমার সাহায্য চান। ঐ দুটি রৌপ্যমুদ্রা অল্প কিছুক্ষণের জন্য উনি দেখতে চান। সাথে সাথেই আবার ফিরিয়ে দেবেন। ডঃ কালীপ্রসন্ন ধরের নাম কে না জানে! উনি আমার কাছে সাহায্য চেয়েছেন সে তো আমার গর্বের ব্যাপার। আমি উনাকে মানা করতে পারিনি।"

-"আপনি কী ঐ রৌপ্যমুদ্রা দুটি উনার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন? নাকি উনি এসেছিলেন আপনার বাড়িতে?"

-"আমিই সেদিন সকালে উনার রামনগরের বাড়িতে গিয়েছিলাম রৌপ্যমুদ্রাগুলি নিয়ে। উনি দশ পনের মিনিট পর্যন্ত ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দিয়ে কি সব খুঁটিয়ে-খাটিয়ে দেখলেন। তারপর সেগুলি আবার আমার হাতে দিয়ে দিলেন। আমিও নির্দিষ্ট ব্যাগে পুরে রেখে দিলাম। প্রায় ঘণ্টা খানেক উনার বাড়িতে ছিলাম। তারপর গাড়িতে উঠে ফিরে আসি। উনার বাড়ি থেকে বেরিয়ে, গাড়িতে ওঠার সময়ও আমি একবার চেক করেছিলাম, তখনও সব ঠিক ছিল। বাড়িতে ফিরে এসে ব্যাগটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দিলাম। তারপর কালকে দুপুরে যখন ব্যাগটি খুললাম, তখন সব শেষ। দেখি সব হাওয়া। ব্যাগ কিছুই নেই।"

- "মানে সেদিনের পর আপনি আর এই ব্যাগ খুলে দেখেননি। গত কালকে খুলে দেখলেন - সব হাওয়া।"

- "হ্যাঁ, একদম ঠিক কথা।"

- "বাড়ির লোকজনদের জিজ্ঞেস করেছেন?"

- "বাড়িতে লোকজন আর কই! বাড়িতে তো শুধু আমি আর আমার বউ। বাকি যারা আছে, মানে ছেলে, ছেলের বউ আর নাতিরা, সবাই তো দিন পনের হল মুম্বাই আর গোয়াতে ঘুরতে গেছে। ওরা ওখানেই আছে। ফোনে তাদের সব জানিয়েছি। ওরা টুর বন্ধ করে আগামী কালকেই বিকেলের ফ্লাইট চলে আসছে। আর বাকী রইল আমার বউ! এই ঘটনা পর থেকে তার ব্লাড প্রেশার খুব হাই হয়ে আছে। বার বার তার একই প্রশ্ন? 'কী জবাব দেব বংশের লোকজনদের কাছে? এই কলঙ্ক আমি কোথায় রাখব?' আসলে আমার বউকে আমাদের বংশের সবাই খুব আদর করে, সম্মান করে, মান দেয়। এই চুরির ঘটনার কথা জানা জানি হলে যে কী হবে - তাইই ভেবে ভেবে সে কাহিল হয়ে পড়েছে।"

- "ব্যাগটা কোথায় থাকে?"

- "আমার বেড রুমে। একটি স্টিলের আলমারি মাঝে।"

একটু ভেবে রাজবংশী বলল, "একবার আপনার বাড়িতে গিয়ে ব্যাপারটা দেখে আসতে পারলে ভাল হত। যাওয়া যাবেই কী?

অতি শশব্যস্ত হয়ে রণধীরবাবু বললেন, "সে তো অতি উত্তম কথা মশায়। আমিও তো তাইই চাইছিলাম। চলুন না, এখুনি চলুন। কাছেই তো বাড়ি, ধলেশ্বর ৫ নম্বর। আমার গাড়িও বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।"

- "ঠিক আছে, চলুন। যাওয়া যাক। তবে আপনার চা কিন্তু ভবচরণ এখনো দিয়ে গেল না। চা-টা খেয়েই না হয় বেরুনো যাক।"

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রণধীরবাবু বললেন, "ধুর মশায়। থাক না পরে চা-টা। আপনি চলুন, সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে না হয় আপনার বাড়িতে এসে ভাত খেয়ে যাব।" এই কথা শুনে হা হা করে হেসে উঠল সবাই। রাজবংশী ভবচরণকে ডেকে বলল, "ভবচরণ আমরা একটু বেরুচ্ছি। লক্ষ্য রাখবে।"

ভর কিচেন থেকে তাড়াতাড়ি মুখ বের করে বলল, "আর চা!"

ঘরের পর্দাটা একটু টেনে সাধু বলল "বাবা ভব! কাজে বেরুচ্ছি, পরে এসে চা খাবো।"

তিন জন এক এক করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। সুদামা কুটিরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে নীল রঙের একটি গাড়ি। মালিককে দেখে ঝটপট মুখের সিগারেটটা ফেলে দৌড়ে এল ড্রাইভার, হারু। খুব সুন্দর ঝাঁ চকচক ইস্তিরি করা ধব ধবে সাদা পোশাক। পোশাকটা রণধীরবাবুরই দেওয়া। বছরে দুবার এ রকম পোশাক পায় হারু। চুল দাড়ি একদম ফিট-ফাট, টিপ টপ। পায়ের জুতাটা পর্যন্ত খুব সুন্দর পলিস করা। দৌড়ে এসে অতি বিনীত ভাবে গাড়ির দরজা খুলে দিল সে। সবাই উঠে পড়ল গাড়িতে। মনিব বললেন, "হারু বাড়িতে চল।" কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ল হারু। মুখ খুলে মুখের সিগারেটের গন্ধটা গাড়িতে আর বাড়াতে চায়নি সে।

ড্রাইভারকে দেখে রাজবংশী আর সাধু একে অপরের চোখ চাওয়া চাওয়ি করল। "ড্রাইভারকে খুব মেইন্টেইন করেছেন রণধীরবাবু!"

Next Part   


◕ This page has been viewed 75 times.

Top of the page



All Bengali Stories    22    23    24    25    26    27    28    29    (30)