Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
RiyaButu
Read & Learn

মাণিক্য


বাংলা গোয়েন্দা গল্প


All Bengali Stories    22    23    24    25    26    27    28    29    (30)       

হরপ্রসাদ সরকার


An offer to make a Website for you.

hostgator




মাণিক্য
( বাংলা গোয়েন্দা গল্প )
- হরপ্রসাদ সরকার, আগরতলা, ত্রিপুরা
০৫-১০-২০১৭



Previous Parts: 1st Part   


◕ মাণিক্য
২য় পর্ব

মিনিট দশের মধ্যেই গাড়ি এসে থামলে রণধীর ভবনের সামনে। প্রতি সপ্তাহেই এই পথ দিয়ে বহু বার আসা যাওয়া করে রাজবংশী আর সাধু। এই বাড়িটি প্রায়ই চোখে পড়ে। তবে এই বাড়ির ভেতর যে এমন গুপ্তধন লুকিয়ে আছে সেটা জানত না। গাড়ি থামিয়ে দরজা খুলে দিল হারু। তারপর দৌড়ে গিয়ে বাড়ির দরজাটাও খুলে দিল। গাড়ি থেকে নেমে এক এক করে সবাই বাড়ির ভেতরে ঢুকল।

শহরের মাঝে এমন বড় বাড়ি খুব কমই পাওয়া যায়। দুই তলা বাড়ি। আশে পাশে কিছু খালি জায়গা থাকলেও বাড়ির প্রায় সবটা জায়গা জুড়েই বিল্ডিং। আর এই বিল্ডিং এর ঠিক মাঝখান দিয়ে একটি বারান্দা। বারান্দার দুপাশে সাড়ি দিয়ে ঘর। এক তলাতে রণধীরবাবু ও উনার বড় ছেলে কমল থাকেন। উপর তলাতে ছোট ছেলে তমালের সংসার। খুব সুন্দর সাজানো গোছানো। গ্রাউন্ড ফ্লোরে লন ধরে এগোলে প্রথমেই দুদিকে দুটি বৈঠক খানা। তারপর দু পাশে দুটি রোগী দেখার ঘর। রোগী দেখার ঘরের পরে দুটি খালি ঘর, তালা দেওয়া। এই ঘরে কেউ থাকে না, অতিথি এলে তখন এই ঘর খুলে দেওয়া হয়। লন ধরে আরও এগোলে এক পাশে রণধীরবাবুর বেড রুম আর অপর পাশে বড় ছেলে কমলের রুম। কমলের ছেলে এখন ক্লাস থ্রি-তে পড়ে। লনের শেষ প্রান্ত থেকে একটি সিঁড়ি সোজা ওপরে উঠে গেছে দোতলায়। দোতলাতে যাওয়ার এটাই একমাত্র রাস্তা। আরও একটি রাস্তা আছে, একেবারে সামনের বৈঠক খানার পাশ দিয়ে। কিন্তু জরুরী কাজ ছাড়া সামনের সিঁড়ি কেউ ব্যবহার করে না। সেই সিঁড়িতে মোটা গ্রিলের দরজাও আছে। তাতে এই বড় বড় দুই তালা ঝুলছে। সেই তালা বছরে কদাচিৎ কখনো খোলা হয়।

রণধীরবাবুকে সাথে নিয়ে বাড়ি নীচতলা আর উপর তলা বেশ ভাল করে ঘুরে ফিরে দেখল রাজবংশী ও সাধু। দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে রাজবংশী বলল, "আশে পাশে বেশ কিছু খালি জায়গা আছে। ঘরের জানালা খুলে দিলে বেশ আলো বাতাস খেলে মনে হচ্ছে।"

রণধীরবাবু হেসে বললেন, "ঠিক বলেছেন। জানালাগুলি খুলে দিলে খুব আলো বাতাস আসে। বেশ আরাম লাগে।"

-"তবে যা দেখলাম তাতে মনে হল, যদি কেউ আপনার বেড রুমে আসতে চায় তবে তাকে বেশ খানিকটা পথ পেরিয়ে আসতে হবে। ফিরে যাবার সময়ও তাকে অনেকটা পথ পেরিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে চোর কারোর না কারোর চোখে পড়ে যেতে পারে!"

রণধীরবাবু মাথা নেড়ে বললেন, "একদম ঠিক। "

- "আচ্ছা আপনার কিচেনটা তো দেখলাম না। আপনাদের কিচেন কোথায়?"

- " ঐ যে সামনে তালা দেওয়া দুটি ঘর দেখলেন, তার একটির ভিতরে আছে একটি বড় কিচেন। বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান হলে তখন সেটি খোলে দেওয়া হয়। তাছাড়া এই সিঁড়িটির নীচে আছে আমাদের পারিবারিক কিচেন ও ডাইনিং হল। বাইরে থেকে দেখলে বোঝা যায় না। তবে সিঁড়িটি এমন ভাবেই ডিজাইন করা হয়েছে যে এর নীচে বেশ জায়গা আছে। প্রতিদিনের রান্নাবান্না ও খাওয়া দাওয়া ওখানেই হয়। বুঝলেন মশায়, ছোট-খাট মন-মোটাব থাকলেও এখনো আমরা একান্ন ভুক্ত পরিবার। খাওয়া দাওয়ার পর বাসন কুশন রেখে দেওয়া হয়। দুজন কাজের মেয়ে আছে। তারা রোজ সকালে এসে কাজ কর্ম করে দশটা-এগারোটার মধ্যে চলে যায়। ওদের ছাড়া বাড়িতে আর কোন চাকর নেই।"

- "তার মানেটা দাঁড়াল, বাইরের লোক বলতে ঐ দুজন কাজের মেয়ে। আর ওরা সমান ভাবে আপনাদের বেড রুম ও কিচেনে বিনা বাঁধায় যাওয়া আসা করতে পারে?"

- "হ্যাঁ, সেটা অবশ্য ঠিক। তবে ওদেরকেও প্রায় সপ্তাহ খানেক আগে ছুটি দেওয়া হয়েছে। ছেলেরা বাইরে বেড়াতে গেছে। বাড়িতে শুধু আমরা দুজন। তার উপর আবার আমার বউয়ের একটু ছুত-ছুমাত আছে। তাই ভেজাল না বাড়িয়ে কাজের মেয়েদের সবেতন ছুটি দেওয়া হল। ছেলেরা ফিরে এলেই আবার খবর দেওয়া হবে। তবে একটা কথা, তাদের মধ্য একজন কিন্তু গতকালকে এসেছিল শ পাঁচেক টাকা ধার চাইতে। এমন ওরা প্রায়ই করে, কিছু টাকা ধার দেনা চায়। সে নিয়ে আমরা বেশী মাথা ঘামাই না, সেই টাকা ফেরতও চাইনা। ভগবানের ইচ্ছায় আমাদের তো আর কোন অভাব নেই। তাই ওটা ওদের বকশিস হিসাবেই ধরে রাখি। এতে কাজও হয়, ওরা আমাদের ছেড়ে যায়না আর, একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে কাজ করে।"

- "কদিন হল ওরা এ বাড়িতে কাজ করে?"

-"প্রায় দুই বছর।"

- "আর ঐ ড্রাইভার হিরো!"

হারুকে হিরো বলাতে হেসে ফেললেন রণধীরবাবু। বললেন "ও হারুর কথা বলছেন বুঝি? ওর নাম হারাধন দও। বাড়ি বিলোনীয়াতে। বৌ বাচ্চা বিলোনীয়াতেই থাকে। তবে হারু অভয়নগরে একটি বাড়ি ভাড়া করে একা একা থাকে। আজ প্রায় সাত বছর ধরে এখানে আছে। এখানে সে ভাল মাইনে পায়। বকশিসও পায়। তাছাড়া পরিশ্রম কম। উপরন্তু বিনা পয়সায় নিজের বৌ বাচ্চা আত্মীয় স্বজনের চিকিৎসা করাতে পারে। আর কী চাই?"

- "ওর এমন সুন্দর সাজ গোঁজ?"

রণধীরবাবু একটু দাম্ভিক ভাবে বললেন, "আমার পয়সায়। বলতে পারেন ওটা আমারই একটু বাড়াবাড়ি! আমার ড্রাইভার মের-মেড়ে হয়ে থাকবে, নোংরা পোশাক পড়ে থাকবে, সে আমার পছন্দ নয়। কত বড় বড় জায়গায় যাই আমি, কত লোকের সাথে উঠা বসা হয়। তাই হারুকে কাজে রাখার সময়ই সকল সর্ত বলে দেই। অবশ্য এই সাজগোজের জন্য প্রতি মাসে পাঁচশ টাকা বেশী দেওয়া হয় ওকে। বলতে পারেন ওটা আমার নিজের আভিজাত্যের প্রকাশ, অনেকটা লোক দেখানোর ব্যাপার আর কী! তবে এটাই আমার পছন্দ। ছেলেদের সাথেও এ নিয়ে দু-এক-কথা হয় মাঝে মধ্যে। তবে আমার কথা হল, এটা আমার সখ। আমার ড্রাইভার সেজে গুজে থাকবে - এতে কারও ক্ষতি তো করছি না। তাতে কী? ওর বেতন তো আমিই দিচ্ছি।"

- "ঠিক কথা। আচ্ছা, কত বেতন পায় হারু?"

- "প্রায় আট হাজার। বাড়তি বকশিস তো আছেই। যদিও ছয় হাজার টাকায় এই সময়ে ভাল ড্রাইভার অনায়াসেই রাখা যায়।"

- "আর কাজের মেয়ে দুটি কত পায়?"

-"প্রত্যেকে দুই দুই করে।"

-"তার মানে হল, প্রতি মাসে আপনার বার হাজার টাকা খরচ হয় ওদের পেছনে।"

-"না মশায়। আরও বেশী। অনেক বেশী। তবে সবটা আমি একা দেই না। হারুর বেতন আমি দেই। কাজের লোকদের বেতন দেয় ছোট ছেলে। আর গাড়ির খরচ বহন করে বড় ছেলে। এই মডেলের গাড়ির খরচ ও প্রতি মাসে ভালই থাকে। প্রায় পাঁচ ছয় হাজার টাকা।"

- "আচ্ছা, সে মুদ্রা গুলি কোথায় রাখা থাকত?"

- "আমার বেড রুমে। আসুন দেখবেন।"

রণধীরবাবুর পিছন পিছন ওরা বেড রুমে গিয়ে উঠল। দেখল, টি টেবিলে চা রেডি করে রেখেছেন সজলাদেবী। দেখেই বুঝা যাচ্ছে সারা রাত ঘুমাননি। একদিনেই চোখের কোনে কালি পড়ে গেছে। বয়সে সজলাদেবী থেকে রাজবংশী আর সাধু যদিও অনেক অনেক ছোট তবু সজলাদেবী অতি ভদ্র ভাবে হাত জোর করে অভিবাদন জানালেন অতিথিদের, "নমস্কার। আসুন। বেশী কিছু না একটু চা আর কয়েকটি নারকেলের নাড়ু।" এই আভিজাত্য, এমন ভাবে অপরকে সম্মান দেওয়া, এটাও একটা শেখার জিনিস। সবাই পারে না। সজলাদেবীর এমন অমায়িক অভিবাদনে খুব লজ্জা পেয়ে গেল রাজবংশী। অতি দ্রুত প্রতি নমস্কার জানিয়ে বলল, "আমরা কিন্তু আপনার ছেলের মতই। আমাদের আপনি-আপনি না বলে তুই-তুই বললেও আমি বিন্দু মাত্র খারাপ ভাবব না। আপনার এমন সমাদরে আমি সত্যি খুব লজ্জা পাচ্ছি।"

রাজবংশীর এমন সহজ সরল আর সরাসরি পরিষ্কার কথায় এবার উল্টা লজ্জা পেয়ে গেলেন সজলাদেবী। খুব হেসে বললেন, "আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। তোমাদের কথাই রাখব। এবার এসো, বস। আসলে কি জানো তো। মাথাটা এক্কেবারে ঠিক নেই। গত কাল থেকেই বারে বারে মাথাতে একটাই কথা ঘুরছে, এই কলঙ্কের কালি আম রাখবো কই? তা আমার ভাই হরি যখন তোমার কথা বলল, তখন ঘোর আধারেও যেন একটু আলো দেখতে পেলাম। আর তোমাকে দেখে হরির কথায় খুব বিশ্বাস হচ্ছে। কেন জানি না, তোমাকে দেখার পর থেকেই আমার মন বলছে, তুমি পারবে। তুমিই পারবে এই বিপদ থেকে আমাদের উদ্ধার করতে।"

বুঝা গেল সজলাদেবী সহজ সরল স্পষ্ট কথার মানুষ, এক কথার মানুষ। উনার কথা শুনে সলাজ হাসি হেসে রাজবংশী বলল, "নিশ্চয়, আমি আপ্রাণ চেষ্টা করব মাসিমা। আপনি কিছুই ভাববেন না। খুব দ্রুতই সব কিছু দিনের মত পরিষ্কার হয়ে যাবে। আপনার সব দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাবে। ততক্ষণ আপনি আপনার সকল দুশ্চিন্তা আমাকে দিয়ে দিন। বৃথায় একটুও টেনশন নেবেন না। কাজ তো শুরু হয়ে গেছে।"

এই কথার উত্তরে কোন জবাব না নিয়ে সজলাদেবী শুধু হাসলেন।

একটু থেমে মনে মনে কী সব হিসাব নিকাশ করে রাজবংশী বলল, "আচ্ছা, আমি কি আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারি?"

-"নিশ্চয়ই, একশ বার।"

-"মুদ্রাগুলি কোথায় রাখা থাকে?"

-"ঐ যে, ঐ স্টিলের আলমারিটাতে।" ঘরের এক কোনে একটি খুব শক্ত পোক্ত স্টিলের আলমারি দেখিয়ে দিলেন সজলাদেবী। রাজবংশী উঠে গেল আলমারির পাশে। বেশ খুঁটিয়ে দেখতে লাগল আলমারিটাকে। বলল, "এটা কী সব সময় লক করাই থাকে?"

-"সব সময়।"

-"তবে এই লকের পাশে এই শক্ত দাগ গুলি কিসের?"

-"সে অনেক পুরানো দাগ। যখন এটি কিনে আনা হয়েছিল তখন ঘরে ঢুকবার সময় কোথাও ঘষা লেগে থাকবে। তবে এই দাগগুলি কিন্তু প্রথম থেকেই ছিল।

-"এই আলমারির চাবি থাকে কার কাছে?"

-"আমার কাছে একটি আর দুই বউয়ের কাছে বাকি দুটি।"

"হুঁ"একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল রাজবংশী। সোফাতে বসতে বসতে বলল, "এই এক দুই দিনের মধ্যে আপনারা কী কোথাও বাইরে বেরিয়েছিলেন?"

জবাবটা এল সজলাদেবী থেকেই। তিনি বললেন, "ছেলেরা, বউরা কেউ বাড়িতে নেই। তাই আমি বাড়ি খালি ফেলে এক কদমও বাইরে কোথাও বের হইনি। তবে উনি প্রায়ই সন্ধ্যায় শিল্প-সাহিত্যের আসরে যান। এই দুর্ঘটনার পর, গতকালকে অবশ্য কোথাও বের হননি।"

-"আপনাদের বাড়িতেও কি শিল্প-সাহিত্যের আসর বসে?"

জবাব দিলেন রণধীরবাবু। বললেন, "হ্যাঁ, পালা করে মাসে একবার হয়। সবার বাড়িতেই পালা করে হয়। যখন আমার বাড়িতে সাহিত্যের আসর বসে তখন ঐ বৈঠকখানাতেই সবার বসার ব্যবস্থা করা হয়। জনা তিরিশেক লোক হয়। তবে সবাই গণ্য মান্য। কর্মজীবনে, যার যার ফিল্ডে সবাই রথী মহারথী।"

-"আসরে যারা আসে তাদের গড় বয়স কেমন হবে?"

হেসে ফেললেন রণধীরবাবু। বললেন ,"আমাদের আসরের নাম, প্রবীণ সঙ্গম। সবাই রিটায়ার্ড পারসন। যদিও এই আসরে যুবক যুবতীরাও আমন্ত্রিত, তবে কী জানেন, এত গুলি বৃদ্ধের সাথে ওরা ঠিক মানিয়ে নিতে পারে না। চিন্তা ভাবনার একটা বিস্তর তফাত থেকেই যায়। আর সেটাই তো স্বাভাবিক। তাই কেউ কেউ মাঝে মাঝে এলেও সংখ্যা মাত্র এক দু-জন।"

- "আপনার বাড়িতে শেষ কবে আসর বসেছিল?"

-"প্রায় কুড়ি দিন হয়ে গেছে।"

- "আপনি কতদিন যাবত এই আসরের সাথে যুক্ত?"

-"প্রায় সতের বছর হল আমি এই আসরের সঙ্গে যুক্ত। যদিও আমি রিটায়ার করেছি মাত্র কিছু দিন হল। তবে আমি অনেক আগে থেকেই এর সাথে নিয়মিত যুক্ত। ওসব শিল্প সাহিত্য, গান-বাজনা আমার খুব ভাল লাগে। ছোট বেলা থেকেই এই হবিটা আমার ছিল।"

-"এই আসরে শেষ কবে এই মুদ্রাগুলি আপনি দেখিয়ে ছিলেন?"

রাজবংশীর এই কথায় রণধীরবাবু বেশ হচকচিয়ে গেল। রাজবংশী কিভাবে জানলো রণধীরবাবু এই মুদ্রাগুলি আসরে দেখিয়েছিলেন? সাধু সহ সবাই অবাক চোখে তাকাল রাজবংশীর দিকে। রণধীরবাবু অতি বিস্ময়ে বললেন, "তুমি কী ভাবে জানলে আমি ঐ আসরে মুদ্রাগুলি দেখিয়েছিলাম। তাও প্রায় চৌদ্দ-পনের বছর আগে।"

হেসে ফলল রাজবংশী। বলল, "তার মানে আপনি মাত্র একবারই এই মুদ্রাগুলি ঐ আসরে বের করেছিলেন।"

- "হ্যাঁ, একদম ঠিক। তবে একটা কথা আছে। গত বার যখন আমার বাড়িতে আসর বসেছিল, মানে ঐ কুড়ি দিন আগে, তখন এই মুদ্রা নিয়ে কিন্তু দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল।"

-"তারপর কে কে আপনাকে এই মুদ্রা নিয়ে ফোন করেছিল?"

"কী অবাক কাণ্ড!" আকাশ থেকে পড়লেন রণধীরবাবু, "আপনি কী করে জানলেন, ঐ আসরের পরে তিন চার জন এই মুদ্রার নিয়ে আমাকে ফোন করেছিল?"

- "তার মানে তিন চার জন আপনাকে ফোন করেছিল? কে কে ফোন করেছিল? কী কী কথা হল তাদের সাথে?"

-"প্রথমেই ফোন করেছিল যতীনবাবু। ছিলেন এক আমলে পুলিশের লোক। ফোন করে বলেছিলেন, 'জানেন রণধীরবাবু, কাল রাতে আর আমি ঘুমাতে পারিনি। বারে বারে সেই মুদ্রাগুলি যেন আমার স্বপ্নে ভেসে ভসে আসছিল। একবার তো আমি খুব ঘাবড়ে গেলাম। স্বপ্নে দেখলাম সেই মুদ্রাগুলি আপনি আমার কাছ থেকে চুরি করে পালাচ্ছেন। আর আমি এক পায়ে জুতা পড়েই আপনার পিছনে ছুটছি, হুঁচট খাচ্ছি। ছুটছি, হুঁচট খাচ্ছি। খুব ছুটছি তবু আপনাকে ধরতে পারছি না। এমন সময় ঘুম ভেঙ্গে গেল।' "

কথা শেষ করে হাসতে হাসতে রণধীরবাবু বললেন, "বুঝুন কাণ্ড, আমারই মুদ্রা ,আর আমিই নাকি ওনার কাছ থেকে চুরি করে পালাচ্ছি। আসলে সারা জীবন চোর ডাকাতের পিছা করেছিলেন তো তাই স্বপ্নেও তাই দেখেন। স্বভাবটা বুঝি স্বপ্ন থেকেও আর মুছে যায়নি। হা-হা-হা।"

- "এ তো গেল প্রথম ফোন, দ্বিতীয় ফোনটা?"

-"সেটা এসেছিল রাখালবাবুর কাছ থেকে। রাখালবাবু ইতিহাসের প্রফেসর ছিলেন। কিছুদিন কোন এক মিউজিয়ামে কাজ ও করেছিলেন। তাই হয়তো জিনিসগুলির গুরুত্ব বেশ অনুভব করতে পেরেছিলেন। তিনি ফোন করে বললেন,'রণধীরবাবু, ঐ জিনিসগুলি কিন্তু খুব দামী। বিশাল ইতিহাসের এক ধরোহর। এগুলি নিজেই যেন ইতিহাসের এক একটা অধ্যায়, এক একটা স্বর্ণযুগ। পাশাপাশি এটাও ঠিক যে, ওগুলি এক একটা কালসাপ। বিশ্ব এসবের জন্য পাগল হয়ে আছে। প্রচুর মাথাখারাপ লোক আছে ,যারা ওগুলির জন্য যা খুশি তাইই করতে পারে। খুন পর্যন্ত করতে পিছুপা হয় না। সেই অর্থে কিন্তু আপনি আপনার ঘরে দুটি কালসাপ পুষছেন। আমার কথা যদি বলেন তবে, আমার মতে ওগুলি কোন মিউজিয়ামে দিয়ে দিন অথবা কোন ব্যাঙ্কের লকারে রেখে দিন। ওগুলি নিরাপদে থাকবে, আপনিও নিরাপদে থাকবেন। আজ কালকের দিনে তো মানুষ মানুষ না, তাই অনিচ্ছা স্বত্বেও কথা গুলি বললাম।'"

কথা শেষ করে একটু থেমে রণধীরবাবু বললেন, "আমি উনাকে বললাম, রাখালবাবু আপনার প্রস্তাবটা আমি অবশ্যই ভেবে দেখব। পরে এ ব্যাপারে আপনার সাথে আমার কথা হবে।"

-"তৃতীয় ফোনটা?"

-"ওটা করেছিল সুদীপ মিত্র। আমার ক্লাস মেট। ছোট বেলার বন্ধু। একসাথেই পড়াশুনা, এক সাথেই ডাক্তারি। সে ফোন করে বলল, 'রণধীর, ত্রিপুরার স্বনামধন্য ইতিহাসের প্রফেসর ডঃ কালীপ্রসন্ন ধর মহাশয়ের সাথে কিছুক্ষণ আগে আমার কথা হচ্ছিল। উনি তোর ঐ দুটি মুদ্রা একটু দেখতে চান। সম্ভব হবে কী?' আমি জবাবে 'না' বলে দিলাম। সুদীপ আর কথা বাড়ায়নি। তারপর ঘণ্টা চারেক পরে স্বয়ং ডঃ কালীপ্রসন্ন ধর আমাকে ফোন করে বসলেন। আমাকে বিনীত অনুরোধ করলেন। এবার আর ওনাকে মানা করতে পারলাম না। কালীপ্রসন্ন স্যারের সাথে কথা বলার ঘণ্টা পাঁচেক পরে এসেছিল সেই ফোনটা।"

-"মানে ও সাউথ আফ্রিকার চোরাকারবারির ফোন?"

-"হ্যাঁ।"

মনে মনে রাজবংশী কী যেন ভাবল, কী যেন বিড়বিড় করে হিসাব মেলাল। তারপর বলল, " আপনি আমাকে ঐ লোকগুলির নাম, ঠিকানা দিতে পারবেন?"

-"কেন পারব না! এই নিন।"

-"সাধুদা নাম ধাম গুলি লিখে নাও তো।"

সাধু ওর নোটবুকে সব কিছু লিখে নিল। এবার রণধীরবাবুকে রাজবংশী আবার প্রশ্ন করল, " আচ্ছা রণধীরবাবু, ঠিক কী কারণে ডঃ কালীপ্রসন্ন স্যার ঐ মুদ্রাগুলি দেখতে চেয়েছিলেন? তিনি যা দেখতে চেয়েছিলেন তা কী উনি পেলেন?"

একটু দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে ঠোট বাঁকিয়ে রণধীরবাবু বললেন, "না মশায়, সে কথা তো আমি উনাকে জিজ্ঞেস করিনি। সত্যি কথা বলতে, এই প্রশ্নটি আমার মাথাতেও আসেনি। আমি তো ভেবেছিলাম উনি ইতিহাস নিয়েই ঘাটাঘাটি করেন তাই এমনিতেই সেই মুদ্রাগুলি দেখতে চেয়েছেন। এখন তো বুঝতে পারছি, ওনার কোন একটা উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। সত্যিই এটি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নটা উনাকে করা উচিত ছিল আমার। দাঁড়ান, এখুনি ফোন করে জেনে নিই।"

-"না না থাক, থাক। সে পরে জেনে নেওয়া যাবে।" কথা শেষ করেই সাধুর কাছ থেকে টান মেরে নোটবুক আর কলমটা নিয়ে নিল রাজবংশী। এমনটা সে মাঝে মধ্যে করে থাকে। যখন গভীর চিন্তায় ডুবে যায় তখন মুখের বদলে হাতটা চলে বেশী। আসলে তখন সে কথা বলে চিন্তার লিংকটা নষ্ট করতে চায় না। চিন্তার ফ্লো-টাকে বয়ে দিতে চায়। এই কথা সাধু জানে। তাই আগের থেকেও এবার বেশী চুপ করে বসে রইল সাধু। নীরবের নীরবতা। রাজবংশী দুই তিন টানে একটি রেখাচিত্র এঁকে নিল। সেই রেখাচিত্রে পর পর সাজিয়ে দিল সকল পাত্র-পাত্রী, ঘটনা আর সময়। খুব সুন্দর ফুটে উঠল এক ইতিহাস। এই চিত্রটা দেখে সহজেই বুঝা যাচ্ছে কে কার পরে কবে ফোন করেছিল! কোন ঘটনাটা কখন ঘটেছিল! এই রেখাচিত্রে কাজের মেয়েটি যেমন স্থান পেল, তেমনি বাদ যায়নি এই বাড়িতে অনুষ্ঠিত হওয়া সাহিত্যের আসর। রেখাচিত্রটি তৈরী করে, বেশ কিছুক্ষণ এই রেখা চিত্রটির দিকে তাকিয়ে রইল রাজবংশী। মনে মনে বলল, "নিশ্চয়ই এই আসরে কোন ভেজাল আছে।" দীর্ঘক্ষণ নীরবে নিজের মন-বুদ্ধির সাথে কথা বলে রণধীরবাবুকে বলল, "সেই কাজের মেয়েটির সাথে কথা বলা যাবে? যদি এখন ওকে খবর দেওয়া যায় তবে কি সে বিকেল বেলাতে আসতে পারবে?"

সজলাদেবী বললেন, "খবর দিলে বিন্দু নিশ্চয়ই আসবে। বিন্দু হল ঐ কাজের মেয়েটির নাম। ওগো তুমি শুনছ, হারুকে বলে দাও। ও গিয়ে বিন্দুকে বলে আসুক। আচ্ছা, কয়টায় আসতে বলব ওকে?"

রাজবংশী বলল, "সাড়ে চারটার দিকে আসতে বললে আপনাদের কোন অসুবিধা নাই তো?"

-"না না, কোন অসুবিধা নেই। আমি হারুকে এখুনি বলে দিচ্ছি।" রণধীরবাবু হারুকে ডাকতে ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন, কিন্তু দ্রুত সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল সাধু। বলল, "আপনি বসুন আমি ওকে ডেকে নিয়ে আসছি।" দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সাধু। কিছুক্ষণের মধ্যেই সাধুর পিছন পিছন ঘরে ঢুকল হারু।

সজলাদেবী কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, ওনাকে থামিয়ে দিয়ে রাজবংশী বলে উঠল, "এই তো আমাদের হিরো এসে গেছে। হারু তোমার ভাল নাম কী?"

এই প্রশ্ন শুনে হারু প্রথমে থত-মত খেয়ে গেল। এমন প্রশ্ন এই বাড়িতে বহুদিন হল কেউ করেনি। সবাই ওকে জানে চিনে। তবু কেউ নাম জিজ্ঞেস করলে ভদ্রতার খাতিরে নাম বলতে হয়, তাই অনিচ্ছা স্বত্বেও হারু বলল, "হারাধন দও।"

হারুর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে রাজবংশী বলল, "আমি তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি হারু। এ বাড়ির সাথে তোমার সম্পর্ক অনেক দিনের। তাছাড়া এখানে এসে তোমার সম্পর্ক অনেক কথা আমি শুনেছি এবং জানি। তবু সব জেনে শুনেই তোমাকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে হচ্ছে। আশা করছি খারাপ ভাববে না। আসলে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেছে যে, কিছু কথা তোমাকে জিজ্ঞেস না করে পারছি না। উত্তর আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই।"

হারু এক ফালি হেসে বলল, "আপনারা কী পুলিশের লোক?"

হারুর এই প্রশ্ন শুনে হা-হা করে হেসে উঠল রাজবংশী। বলল, "সরাসরি পুলিস নই! হ্যাঁ, তবে পুলিশের সাথে আমাদের রোজকার উঠা-বসা। পুলিশের সহযোগী, বন্ধু অথবা সাথিও বলতে পার।"

হারু আবার এক ফালি হেসে বলল, "ও! বলুন কী জানতে চান?"

-"এই বাড়ি থেকে গত কয়েকদিনের মধ্যে দুটি অতি মূল্যবান রৌপ্যমুদ্রা চুরি গেছে। সে খবর তুমি জান?"

-"হ্যাঁ, জানি। সেই নিয়েই তো সবাই খুব পরেশান।"

-"তুমি কী সেই রৌপ্যমুদ্রাগুলি কখনো দেখেছো?"

-"না দেখিনি। তবে ওগুলির কথা শুনেছি। স্যার সেদিন সাহিত্যের আসরে সে নিয়ে কথা বলছিলেন।"

- "আচ্ছা, বলতো আজকের বাজারে এই গুলি বিক্রি করলে কত টাকা পাওয়া যাবে?"

একটু ভেবে হারু বলল, "কম সে কম বিশ কোটি টাকা, কিংবা তারও বেশী।"

বেশ অবাক হল রাজবংশী। বলল, "বল কী! এত টাকা! তুমি কী করে জানলে?"

-"স্যারই ফোনে কাকে যেন বলছিলেন, তখন শুনতে পেয়েছিলাম। কী করব বলুন, গাড়িতে বসে স্যার এই কথা গুলি ফোনে বলছিলেন। আমিও তো মানুষ। মুনি ঋষির মত কানকে তো আর বন্ধ রাখতে পারি না। তাই যা কানে এসেছিল মনে থেকে গেল, এখন আপনার সামনে সব সত্যি সত্যি বলে দিলাম।"

সাবাসির সুরে রাজবংশী বলল "খুব ভাল করেছ। সত্য কথা বল বলেই তো এ বাড়ির সবাই তোমাকে বিশ্বাস করে। আর এত দিন যাবত তুমি এ বাড়িতে কাজ করতে পারছ। আচ্ছা, আমরা এখন একটু বের হব। রামনগরে ডঃ কালীপ্রসন্ন স্যারের বাড়িতে যাব। তবে একটা কথা, যেই যেই পথ ধরে গতদিন তুমি গাড়ি চালিয়ে উনার বাড়িতে গিয়েছিলে সেই সেই পথ ধরেই যাবে আবার যেই যেই পথ ধরে ফিরে এসেছিলে সেই সেই পথ ধরেই ফিরে আসবে। পারবে তো?"

মাথা নেড়ে হারু বলল, "খুব পারব।"

-"আচ্ছা ঠিক আছে। আর একটা কথা, কাজের মেয়ে বিন্দুকে একটা ফোন করে দেবে তো, বলবে বিকেল সাড়ে চারটায় মালকিন আসতে বলেছেন। কী মাসিমা, বিকেল সাড়ে চারটায় তো?"

সজলাদেবী ভাবতে লাগলেন বিন্দুর ফোন নম্বর আমাদের কাছে নেই, অথচ হারুর কাছে আছে। সে খবর আমরা জানিনা, অথচ এই রাজবংশী জানে! কী অবাক কাণ্ড! ভ্যাবাচেকা খেয়ে তিনি বলে দিলেন, "হ্যাঁ, হ্যাঁ, বিকেল সাড়ে চারটায় আসতে বলবে ওকে। খুব জরুরী দরকার পড়েছে।"

মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে হারু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রাজবংশী কখন কী করে বসে, বুঝা খুব মুস্কিল। তবে কেউ ওর কাজে বাধা দিল না। শুধু রণধীরবাবু মিনি-মিনি করে বললেন, " আমরা যে উনার কাছে আসছি, এই কথাটি কী একবার ডঃ কালীপ্রসন্ন স্যারকে ফোন করে জানিয়ে দেব?"

রাজবংশী হাত নেড়ে বলল, "না না, কোন দরকার নেই। উনি আজ এখন বাড়িতেই থাকবেন। চলুন বেরিয়ে পড়ি। যত দেরী করব ততই অসুবিধা হবে আমাদের। আপনি শুধু একটি কথা লক্ষ্য রাখবেন, গতদিনের আসা যাওয়ার পথ আর আজকের আসা যাওয়ার পথ এক কিনা, সেটা খেয়াল রাখবেন। যদি হারু ভুল করে বসে তবে তাকে ভুলটা ধরিয়ে দেবেন। বেচারা এত জায়গায় নানান পথে ঘুরাঘুরি করে যে, নির্দিষ্ট একটা পথ মনে রাখা খুব কঠিন। তাই আপনাকেই কাজটা করতে হবে।"

মাথা নাড়লেন রণধীরবাবু। কিন্তু সাধু বুঝে গেল, রাজবংশী হয়তো রহস্যের একটা গন্ধ পেয়ে গেছে। এই বার সে পাগলা কুকুরের মত সেই মাংসের টুকরোর পিছে ধাওয়া করবেই করবে।

Next Part   


◕ This page has been viewed 25 times.


Previous Parts: 1st Part   


Top of the page



All Bengali Stories    22    23    24    25    26    27    28    29    (30)