Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
RiyaButu
A platform for writers

লুকানো চিঠির রহস্য


ত্রিপুরার বাংলা গোয়েন্দা গল্প


All Bengali Stories    32    33    34    35    (36)     37    38    39    40    41    42   

হরপ্রসাদ সরকার







লুকানো চিঠির রহস্য
পর্ব ১৯
( ত্রিপুরার বাংলা গোয়েন্দা গল্প )
রাজবংশী সিরিজের চতুর্থ গোয়েন্দা গল্প
- হরপ্রসাদ সরকার, ধলেশ্বর-১৩, আগরতলা
২৭-০২-২০১৯ ইং


আগের পর্ব গুলি: পর্ব ১    পর্ব ২    পর্ব ৩    পর্ব ৪    পর্ব ৫    পর্ব ৬    পর্ব ৭    পর্ব ৮    পর্ব ৯    পর্ব ১০   
পর্ব ১১    পর্ব ১২    পর্ব ১৩    পর্ব ১৪    পর্ব ১৫    পর্ব ১৬    পর্ব ১৭    পর্ব ১৮   


◕ লুকানো চিঠির রহস্য
পর্ব ১৯


◕ Your Story ₹ 500/- Details..
◕ Bengali Story writing competition. Details..


মিঠুন, "তুমি কী জানতে, ক্লরোফর্ম আর ছোরা দিয়েই আক্রমণটা হবে? পিস্তলও তো থাকতে পারত?"

"না পিস্তল দিয়ে আক্রমণ হতো না। ক্লরোফর্ম আর ছোরা, আমি প্রায় নিশ্চিত ছিলাম। তার কারণ, আগের প্রতিটি খুনের ঘটনায় প্রতিবারই একই কায়দায় ক্লরোফর্ম আর ছোরা ব্যবহার করা হয়েছে। খুনিদের কাছে এই কায়দাটা ছিল পরিক্ষিত, সফল অভিজ্ঞতা। স্বাভাবিক কারণেই এবারও ওরা তাই করত যা নিয়ে ওরা আত্মবিশ্বাসী ছিল এবং যা দিয়ে ওরা বারবারই সফল হয়েছিল। হ্যাঁ, পিস্তলও ব্যাবহার করতে পারত, তবে আমার অনুমানে পিস্তল ব্যাবহারের সম্ভাবনা খুবই নগণ্য ছিল। রিস্ক তো কিছু নিতেই হয়!"

"কিন্তু আততায়ী এসে গেছে, বাইরে হাতিয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তুমি কীভাবে বুঝলে?"

"দেখ মিঠুন, সেই ধুতি পড়া লোকটি যখন তার হাতের ঘড়ি দেখে বলল, 'এখন তো প্রায় সাড়ে আটটা বাজে' তখনই আমি বুঝলাম সাপ ফণা তুলেছে, ছোবল মারতে প্রস্তুত এবং অতি শীঘ্রই ছোবল মারবে। কারণ, লোকটি হাতের ঘড়ির এত ছোট কাটা স্পষ্ট দেখতে পেল অথচ বাড়ির সামনের এত বড় নামটি স্পষ্ট দেখতে পেল না, তা কী হয়? তার মানে, ও সম্পূর্ণ মিথ্যা বলছে। আসলে সে আমাকে মাপতে এসেছিল। দেখতে এসেছিল কে দরজা খুলছে, ঘরে ক'জন লোক আছে ইত্যাদি-ইত্যাদি। যখন সে দেখল, আমিই দরজা খুলেছি এবং এই মুহূর্তে ঘরে কেউ নেই, তখন পরিস্থিতি অত্যন্ত নিজের অনুকূলে পেয়ে সে দ্রুত তার সিপাহীকে আক্রমণে লেলিয়ে দেয়। তাই, পরের বার যখন দরজায় কলিং-বেল বাজল তখন সেখানে আক্রমণকারী ছাড়া অন্য কারোর থাকা সম্ভাবনা ছিল না। তাছাড়া, ফতুর আলির বর্ণনা অনুযায়ী ধুতি পড়া টাক মাথার একটি লোক আগেই তো আমার টার্গেটের মধ্যে ছিল। তবে আমরা কিন্তু অনেক আগেই খুনিকে ধরতে পারতাম যদি একটা প্রশ্ন তখন আমার মাথায় আসত। প্রশ্নটি অনেক পরে আমার মাথায় এসেছে এবং খেলা তখন প্রায় শেষ। প্রশ্নটি হল, বাহাদুরের মৃত্যুর খবর হেডমাস্টারকে কে জানাল? পুলিশের কেউ, না কি চন্দ্রবালা দেবীর প্রতিবেশী কেউ? চন্দ্রবালা দেবীকে হেডমাস্টার বলেছিল, পুলিশ ফোন করে বাহাদুরের মৃত্যুর খবর তাকে জানিয়েছে। আচ্ছা বলতো মিঠুন, পুলিশ কী স্কুলে ফোন করে মৃত্যুর খবর জানিয়েছিল?"



"না, আমাদের কেউ তো স্কুলে ফোন করেনি! চন্দ্রবালা দেবী যে বাহাদুরের স্ত্রী, আর তিনি যে স্কুলে চাকরি করেন, সে কথাই তো ঐ মুহূর্তে আমরা জানতামই না।"

"কিন্তু হেডমাস্টার চন্দ্রবালা দেবীকে বলেছিল, পুলিশ তার কাছে ফোন করে বাহাদুরের মৃত্যুর খবর দিয়েছে, যা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। আচ্ছা চন্দ্রবালা দেবী, আপনার পাড়া-প্রতিবেশীর কেউ কী জানেন, আপনি কথায় চাকরি করেন?"

"না, জানার কথা নয়। কারণ, স্কুলের চাকরির ব্যাপারটা আমরা বরাবরই গোপন রেখেছি। তাছাড়া আমাদের সাথেতে পাড়া-প্রতিবেশীদের যাতায়াত যে প্রায় ছিলই না, সে কথা ত আপনাকে আগেই বলেছি।"

"ঠিক! ঠিক! তাহলে, হেডমাস্টার দক্ষিণ কুমার চন্দ, সে কীভাবে জানল যে বাহাদুর খুন হয়েছে? কে তাকে এই খবরটি দিল? আসলে সত্য হল, কেউ তাকে খবর দেয়নি। সে নিজেই বাহাদুরের উপরে আক্রমণ করেছিল। পার্থক্য হল, আমরা প্রস্তুত ছিলাম, বাহাদুর প্রস্তুত ছিলেন না; এমনকি হেডমাস্টার কর্তৃক আক্রমণটা আন্দাজই করতে পারেন নি বাহাদুর। খুনি বন্ধুর বেশে নিজের সাগরেদকে সাথে নিয়ে সকল প্রস্তুতি সহ বাহাদুরের ঘরে ডুকে যায়, আর সুযোগ বুঝে ক্লরোফর্ম দিয়ে বাহাদুরকে অজ্ঞান করে ছোরা চালিয়ে দেয়। ব্যাস, মুহূর্তে সব শেষ। বাহাদুরের মৃত্যুর পর ঘরের অভিপ্রেত বস্তুটি খুঁজে নিয়ে ওরা পালিয়ে যায়। এবার কথা হল, সেই অভিপ্রেত বস্তুটি কী, যার জন্য ওরা একের-পর এক এতগুলি খুন করে গেল?

মিঠুন,"কী রকম? বুঝা যাচ্ছে না, একটু খুলে বলবে রাজুদা!"

তখুনি ঘরে ঢুকল কাবেরী আর পটভবেশ। পুলিশ তাদের আগরতলার আস্তাবল মাঠের পাশের নিজ বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে, রাজবংশীর কথায়। রাজবংশী সবাইকে পটভবেশের পরিচয় দিয়ে বলল, "এই হল আমার কলেজের পরম বন্ধু মিস্টার পটভবেশ ঘোষ। সে ত্রিপুরার ইতিহাস নিয়েই নানাবিধ গবেষণা করছে এবং ত্রিপুরার-ইতিহাসের একজন বিশেষজ্ঞ। আজ বহুক্ষণ আমি মোবাইল ফোনে তার সাথেই যোগাযোগ রেখে যাই। সে বহু বিষয়ে অনেক-অনেক তথ্য দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছে। তার সাহায্য ছাড়া আজকের এই রহস্যের আসল উদ্দেশ্য জানা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব ছিল না। এই কারণে আমি তাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই, কৃতজ্ঞতা জানাই। দেখুন, বাহাদুরের মৃত্যুর রহস্য জানতে হলে আমাদেরকে ত্রিপুরার একটি বিশেষ নদী, হাওড়া নদীর ইতিহাস জানতে হবে। আমরা সবাই জানি, এই হাওড়া নদীর তীরেই গড়ে উঠেছে আগরতলা শহর। আর এই নদীর ইতিহাসের পাড়েই ছড়িয়ে আছে বাহাদুরের মৃত্যুর রহস্য। পটভবেশ, ভাই, আমি যদি কিছু ভুল বলে ফেলি তাহলে আমাকে শুধরে দিস," এই বলে রাজবংশী তার কথা বলতে শুরু করল, "আমরা জানি, মহারাজ কৃষ্ণমণিক্য ত্রিপুরার রাজধানী উদয়পুর থেকে পুরাতন আগরতলায় স্থানান্তরিত করেছিলেন। তার বহু বছর পরে মহারাজ কৃষ্ণকিশোর মাণিক্য পুরাতন আগরতলা থেকে ত্রিপুরার রাজধানী বর্তমান আগরতলাতে স্থানান্তরিত করেন। এই নতুন রাজধানীর পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে 'সাইদ্রা' নদী। এই সাইদ্রাকেই বর্তমানে বলা হয় হাওড়া নদী। গোমতী নদীর তীর থেকে রাজধানী চলে এল হাওড়ার তীরে। ধরা হয় যে, মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্যের আমলেই হাওড়া নামটি প্রচলিত হতে শুরু করে। ঐ সময় হাওড়া নদীটি প্রবাহিত হচ্ছিল বর্তমান মঠ চৌমুহনী ও বর্তমান মোটর স্ট্যান্ডের উপর দিয়ে। মোটর স্ট্যান্ডের পাশে, এই হাওড়া নদীর তীরে ততকালে মহারাজ বীরচন্দ্রের রানী একটি মন্দির স্থাপন করেছিলেন, যা আজো পাগলা দেবতার বাড়ি নামে পরিচিত। মহারাজ বীরচন্দ্রের অপর রানী, মনমোহিনী দেবী হাওড়া নদীর তীরে উনার পিতার শ্মশানের উপর এক বিশাল মঠ তৈরি করেছিলেন, এই মঠ থেকেই বর্তমান মঠ চৌমুহনী নাম হয়। পরবর্তী কালে সময়ের সাথে-সাথে আগরতলা শহরের আয়তন বাড়াবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে মহারাজ বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্য শহরের আয়তন বাড়াবার জন্য এই হাওড়া নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন এবং হাওড়ার গতিপথ পরিবর্তন করে দেন। এই গতিপথের পরিবর্তনের ফলে বর্তমান কলেজটিলা ও জগহরি মুড়া নদীর এপারে চলে আসে এবং শহরের মুল সীমানায় যুক্ত হয়ে যায়। কলেজটিলাকে তখন কেউ-কেউ রসমন টিলা বলত, কেউ-কেউ বলত বিদ্যাপত্তন টিলা। মহারাজ বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্যের আগে মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্যের আমলে আগরতলা থেকে আখাউড়া স্টেশন পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়। কিন্তু তবুও বহির্বিশ্বের সাথে ত্রিপুরার যোগাযোগের একটি মুখ্য মাধ্যম ছিল এই হাওড়া নদী। হাওড়া নদীর জলপথে আগরতলা থেকে বর্তমান বাংলাদেশের মোগরা স্টেশন পর্যন্ত অনায়াসেই যাতায়াত করা যেত। এই জলপথেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহারাজ রাধাকিশোরের রাজত্বকালে প্রথমবার আগরতলায় এসেছিলেন। তখন আগরতলায় হাওড়ার নদীর ঘাটটি ছিল বর্তমান শান্তিপাড়ায়। হাওড়া নদীর শান্তিপাড়ার এই ঘাট থেকে মহা ধুমধাম সমারোহে শোভাযাত্রা করে রাজকীয় সম্মানের সাথে বিশ্বকবিকে বর্তমান কর্নেল চৌমুহনীতে অবস্থিত তৎকালীন কর্নেল মহিম ঠাকুরের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এই সমগ্র শোভাযাত্রার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যুবরাজ বীরেন্দ্র কিশোর। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে মহারাজ বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্য হাওড়া নদীর গতিপথকে খাল কেটে আরও দক্ষিণে সরিয়ে দেন। ফলে প্রতাপগড়ের একটি বড় অংশ শহরের সাথে যুক্ত হয়ে যায়, যা আজকের টাউন প্রতাপগড়। হাওড়া নদী আরও দক্ষিণ দিকে সরে যাওয়ায় তার পুরানো নদী খাতটি দীর্ঘদিন মরাগাঙ নামে পরিচিত ছিল। এই মরাগাঙেই ১৯৪৮ সালে গান্ধীজীর কিছু চিতা ভস্ম বিসর্জন দেওয়া হয়। স্থানটির নতুন নাম হয় গান্ধিঘাট, যা আজো বর্তমান। আর হাওড়ার সেই মরাগাঙকে ভরাট করে যে রাস্তা তৈরি করা হয় তার নাম দেওয়া হয় নেতাজী সুভাষ রোড, যা সেই নামে এখনো আছে। যে হাওড়া নদীর এত বিচিত্র ইতিকথা, ইতিহাস, সেই হাওড়া নদীর তীরেই অবস্থিত ছিল খোসবাগান নামে একটি জায়গা। যা আছে আগরতলার সূর্য চৌমুহনীতে। এখানে ত্রিপুরার মহারাজের একটি বাগানবাড়ি ছিল। তাতে যুবরাজ বীরেন্দ্র কিশোর একটি ছোট্ট চিড়িয়াখানা তৈরি করেছিলেন। এর নাম তিনি রেখেছিলেন খাসবাগান। এই খাসবাগান, লোকমুখে খোসবাগানে পরিণত হয়। এই খোসবাগানের ইতিহাস সরাসর জড়িয়ে আছে বাহাদুরের মৃত্যুর সাথে। আমরা জানি যুবরাজ বীরেন্দ্র কিশোর, এলাহাবাদের অতি সম্ভ্রান্ত নেপালি বংশীয় রানা পদ্মজং-এর মেয়ে প্রভাবতী দেবীকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের সব কিছু ঠিক-ঠাক করেছিলেন স্বয়ং মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্য। উভয় পক্ষ মিলে স্থির হল, আগরতলাতেই বিয়ের সব অনুষ্ঠান সম্পন্ন হবে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়াল কনে পক্ষের একটি প্রথা। সেই প্রথা অনুযায়ী, রানা পদ্মজং নিজের জমি ছাড়া অন্যের জমি থেকে কন্যাদান করতে পারবেন না, আর রাজধানী আগরতলাতে উনার কোনও নিজস্ব জমি নেই, তাহলে কন্যাদান হবে কী ভাবে? এখন উপায়? উপায় একটা বের করা হল, ত্রিপুরার মহারাজের পক্ষ থেকে এই খোসবাগানকেই মাত্র এক টাকা মূল্যে রানা পদ্মজং-এর কাছে বিক্রি করা হল। নিজের জমিতে রানা পদ্মজং একটি বিশাল অস্থায়ী প্রাসাদ নির্মাণ করলেন। নিজের জমির এই প্রাসাদ থেকে রানা পদ্মজং মহা-ধুমধামের সাথে নিজ কন্যাকে যুবরাজ বীরেন্দ্র কিশোরের সাথে বিয়ে দেন। সকল অনুষ্ঠানাদি শেষ হবার পরে রানা পদ্মজং যখন ত্রিপুরা থেকে বিদায় নেন তখন তিনি এই খোসবাগানকে আবার নিজের জামাতাকে দান করে যান। সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে বাহাদুরের এক পূর্ব পুরুষ, কনে পক্ষের হয়ে উপস্থিত ছিলেন। উনি ছিলেন একজন উত্তম চিত্রকর। তিনি অনুষ্ঠানের বেশ কয়েকটি দুর্লভ ছবি এঁকেছিলেন। কিন্তু সামান্য একটু ভুল বুঝাবুঝির কারণে সেই চিত্রকর অতি ভগ্ন হৃদয়ে এখান থেকে বিদায় নিয়েছিলেন। কী ছিল সেই ভুল বুঝাবুঝি? সুপ্রাচীন কাল থেকেই ত্রিপুরাতে একটি প্রথা চলে আসছে, তা হল, পুরস্কার স্বরূপ, উপহার স্বরূপ অথবা সম্মান জানাতে 'রিয়া' প্রদান করা। নিজ হাতে বোনা এই 'রিয়া' দেখতে যেমন ছিল অতি সুন্দর আর চমকদার, ঠিক তেমনি ছিল তার বাহারি রূপ আর চাকচিক্য। তাও আবার রাজা-মহারাজার কাছ থেকে এই রিয়া উপহার পাওয়া ছিল অত্যন্ত ভাগ্যের এবং সম্মানের ব্যাপার। এই 'রিয়া' কিন্তু আসলে মেয়েদের বক্ষ বন্ধনী। সেই চিত্রকরকেও উনার কাজের সম্মান স্বরূপ রিয়া উপহার দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি আসল ঘটনাটি বুঝতে না পেরে মনে-মনে খুব অপমানিত বোধ করেছিলেন, আর সেই কারণে তিনি ঐ রিয়া সমেত নিজের দুর্লভ চিত্রগুলিকে নানা স্থানে লুকিয়ে ফেলেন। রাজবন্দী হবার ভয়ে তিনি অতি গোপনে ত্রিপুরা থেকে পালিয়ে যান। তিনি তার মনের সকল কথা একটি খাতায় লিখে রাখেন। বহু বছর পর, কোনও ভাবে সেই লেখাটি বাহাদুরের হাতে এসে পড়ে। সেই লেখার উপর ভিত্তি করেই অতি গোপনে বাহাদুর সেই লুকানো জিনিসগুলির খোঁজ শুরু করেন। পাশাপাশি, পূর্বপুরুষের সেই বর্ণনা অনুযায়ী বিভিন্ন বই-পুস্তক ঘেঁটে ত্রিপুরার ইতিহাসের কিছু অত্যন্ত বিস্ময়কর এবং রহস্যময় তথ্য নিজের ডায়রিতে লিখতে শুরু করেন, পরিকল্পনা ছিল একটি বই প্রকাশ করার। কিন্তু তা আর হল না, খুনিরা তাকে সেই সময়টা দিল না। তবে আমার অনুমান, বাহাদুর নিশ্চয়ই সেই ছবিগুলির কয়েকটির খুঁজে পেয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এত কিছু জেনে, এত কিছু পেয়েও আজ আমরা নিঃস্ব। কারণ, মৃত্যুর আগে সব কিছু আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় হেডমাস্টার। তা না হলে, রোমাঞ্চকর অনেক তথ্য আমারা পেতাম বাহাদুরের সেই ডাইরিগুলি থেকে, চিত্রকরের সেই লেখা থেকে।"

একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে খুব ম্রিয়মাণ হয়ে রাজবংশী আবার বলতে শুরু করল, "বাহাদুর সেই হেডমাস্টার এবং আরও কয়েকজন বন্ধুর সাথে প্রায়ই রামনগরে এক চায়ের দোকানে চা খেতে যেতেন। সেই সাথীরা কে-কে ছিল, নামগুলি আমি একে-একে বলছি,
১ ম খুন: বলাকা সাহা, বয়স ৫৪ বছর, কলেজের অধ্যাপিকা, বাড়ি ভট্টপুকুর।
২ য় খুন: শান্তনু আঢ্য, বয়স ৪৫ বছর, ব্যবসায়ী। আগরতলার হকার্স কর্নারে উনার এক দোকান আছে, বাড়ি ধলেশ্বর, কল্যাণী।
৩ য় খুন: বাহাদুর প্রসাদ।
৪র্থ খুন: সজল বৈদ্য। রামনগর ৪ নম্বরের চা-স্টলের মালিক। খুব গরীব মানুষ। ওর দোকানেই সবাই চা খেতে যেতেন।
এদের সবাই বাহাদুরের এই গোপন কাজটির কথা জানত, হয়তো বাহাদুর নিজেই তাদের বিশ্বাস করে, আপন ভেবে কথাগুলি বলেছিলেন। কিন্তু অতি-উচ্চাকাঙ্ক্ষী হেডমাস্টার সব কিছু একা খেতে চেয়ে একে-একে নিজের সকল সাথিদের শেষ করে দেয়। ভাবলে অবাক লাগে, রাজপ্রাসাদে হত্যার রাজনীতি তখনো ছিল, এখনো ঘটল। তবে ঠিক শেষ মুহূর্তে হেডমাস্টারের আসল রূপটি ধরে ফেলেছিলেন বাহাদুর, কিন্তু ততক্ষণে আর কিছু করার ছিল না।"

ঠিক মাঝ রাত। পাশের বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে সদানন্দ জিজ্ঞেস করল, "হেডমাস্টার কী সত্যি-সত্যি সব কিছু পুড়িয়ে দিয়েছিল? তখন তোর কথা শুনে কিন্তু ঠিক সন্দেহ হয়েছিল আমার। সত্যি কথাটা এবার বলবি?"

সদানন্দের দিকে চেয়ে হেসে ফেলল রাজবংশী, "না, তোমাকে আর ফাকি দিতে পারলাম না সাধুদা! তুমি ঠিক ধরেছ! হেডমাস্টার, বাহাদুরের ডাইরি আর সেই লেখাখানি সত্যিই পুড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু, ছবিগুলি আর সেই রিয়াটি পোড়াতে পারেনি। জিনিসগুলির সঠিক ঠিকানা সে জানত, তবে বের করে আনতে পারেনি। কারণ, বাহাদুরই ছিল সবচেয়ে বড় বাধা। তাই তো সে বাহাদুরকে সরিয়ে দেয়। বাহাদুরের মৃত্যুর পরে চন্দ্রবালা দেবী এত দ্রুত আমাকে মাঠে নামিয়ে দেবেন তা হেডমাস্টার বুঝতে পারে নি। তাই আমার বিশ্বাস, জিনিসগুলি এখনো অক্ষত অবস্থায় যথাস্থানে ঐ ভাবেই রয়ে গেছে। তবে আমাকে ভাবাচ্ছে অন্য আরেকটি কথা। তা হল, সেই চিত্রকরের অতি সুন্দর কারুকার্য মণ্ডিত সেই সোনার তুলিটি; সেটি কোথায়? খুঁজতে গিয়ে সবার আগে বাহাদুর কিন্তু ওটাই পেয়েছিলেন এবং সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন। এই বস্তুটিই তিনি সবার আগে তার বন্ধুদের দেখিয়েছিলেন। তা দেখেই তো হেডমাস্টারের হেড খারাপ হয়ে যায়। মোবাইল ফোনে তোলা সেই তুলির একটি প্রিন্ট কিন্তু এই ডাইরিটাতে ছিল এবং আমার চোখে সেটাই প্রথম পড়েছে। অল্প ভাষায় তুলির কথাগুলি ওখানেই লেখা ছিল। ছবিটি কিন্তু এখনো আমার কাছেই আছে।"

( সমাপ্ত) পরবর্তী নতুন গোয়েন্দা গল্প ০৬-০৩-২০১৯, বুধবার প্রকাশিত হবে।


◕ Your Story ₹ 500/- Details..
◕ Bengali Story writing competition. Details..




◕ This page has been viewed 386 times.


লুকানো চিঠির রহস্যের আগের পর্ব গুলি: পর্ব ১    পর্ব ২    পর্ব ৩    পর্ব ৪    পর্ব ৫    পর্ব ৬    পর্ব ৭    পর্ব ৮    পর্ব ৯    পর্ব ১০   
পর্ব ১১    পর্ব ১২    পর্ব ১৩    পর্ব ১৪    পর্ব ১৫    পর্ব ১৬    পর্ব ১৭    পর্ব ১৮   


রাজবংশী সিরিজের অন্য গোয়েন্দা গল্প:
মাণিক্য   
সর্দার বাড়ির গুপ্তধন রহস্য   
প্রেমিকার অন্তর্ধান রহস্য   


All Bengali Stories    33    34    35    (36)     37    38    39    40    41    42