Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
RiyaButu
A platform for writers

নয়নবুধী


ত্রিপুরার ইতিহাসের পটভূমিতে রচিত একটি উপন্যাস


All Bengali Stories    44    (45)    46    47    48    49    50    51    52   

হরপ্রসাদ সরকার, ধলেশ্বর-১৩, আগরতলা







নয়নবুধী
( এক পাঁজালীর প্রেমিকা )
পর্ব ১৪
ত্রিপুরার ইতিহাসের পটভূমিতে রচিত একটি উপন্যাস
হরপ্রসাদ সরকার, ধলেশ্বর-১৩, আগরতলা
১৪-০৮-২০১৯ ইং


আগের পর্ব গুলি: পর্ব ১    পর্ব ২    পর্ব ৩    পর্ব ৪    পর্ব ৫    পর্ব ৬    পর্ব ৭    পর্ব ৮    পর্ব ৯    পর্ব ১০    পর্ব ১১    পর্ব ১২   
পর্ব ১৩   


◕ নয়নবুধী
পর্ব ১8


◕ Your Story ₹ 500/- Details..
◕ Bengali Story writing competition. Details..




তখন ঠিক মাঝ রাত। চম্পকের চোখে ঘুম নাই। পাশেই ইন্দ্র অঘোরে ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ চম্পকের কানে কিছু শব্দ ভেসে এল। কান খাড়া হয়ে গেল তার। বুকের ধুক-ধুঁকনি অনেকগুণ বেড়ে গেল। সে বিছানা ছেড়ে ঝট করে বসে পড়ল আর তড়িৎ ধাক্কা মারতে লাগল ইন্দ্রকে। চম্পকের ধাক্কায় ঘুম ভাঙ্গল ইন্দ্রের। ফিস-ফিস করে চম্পক ইন্দ্রের কানে বলতে লাগল,"ইন্দ্র, আমার মনে হচ্ছে বাইরে কিছু একটা হচ্ছে। লক্ষণটা খুব খারাপ। শোন তো, ওটা কিসের ডাক?"

মুহূর্তে ঘুমের ঘোর কেটে গেল ইন্দ্রের। সে একাগ্র চিত্তে কান পেতে বাইরে কিছু একটা শুনার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু সেই মাঝ রাতে, সেই আধারে চারিদিকে শ্মশানের নীরবতা; কোথাও কোনও শব্দ নেই। অতি নীরব, অশুভ শক্তির লক্ষণ। ইন্দ্রের সন্দেহ হল। সে গভীর মনোযোগে কান পেতে রইল বাইরের দিকে। হঠাৎ আধারের বুক চিরে জঙ্গলের ভীতর থেকে একটি তীক্ষ্ণ শিষের শব্দ ভেসে এল। আর তার পর-পরেই 'কুক-কুক' শব্দ করে কিছু একটা ডেকে উঠল। অমনি ধুপ-ধুপ করে কেউ দৌড়ে যেতে লাগল। পরক্ষণেই আস্ত একটি মানুষ যেন খাড়া অবস্থা থেকে ধরাম করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। মুণ্ডহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে এমন শব্দ হয়। দুই বন্ধু ঠিক অনুমান করল, পাহারাদারদের মধ্যে একজন মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। চোয়াল শক্ত হয়ে এল ওদের। ওরা একে-অপরের চোখের দিকে একবার চেয়ে শক্ত হাতে টাক্কাল ধরে বসে রইল। ঘটনাটি বুঝার চেষ্টা করতে লাগল। ঠিক এমন সময় টং ঘরের নীচে রাখা শূয়র আর কুকুরগুলি বিকট চীৎকার শুরু করে দিল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই নারী কণ্ঠের তীব্র আর্তনাদ ভেসে এল। আর দেরী না করে টাক্কাল হাতে বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠল ওরা। ততক্ষণে চারিদিকে নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধের প্রচণ্ড আর্তনাদ, প্রচণ্ড চীৎকার। এসবের সাথে ক্রমাগত চলতে লাগল গুপ-গুপ শব্দে দা'য়ের কোপে মানুষ কাটার শব্দ। এক-একটা বিকট চীৎকার হঠাৎ-হঠাৎ মাঝ পথে থেমে যাচ্ছে। দুই বন্ধু ঠিক বুঝতে পারছে, কে থেমে গেল। তুলারাম পাড়ায় সেই নিষ্ঠুর কুকি দস্যুরা আক্রমণ করেছে। টাক্কাল হাতে দুই বন্ধু ঝট করে টং ঘর ছেড়ে বাইরে বেড়িয়ে এল। দেখল, দাউ-দাউ করে জ্বলছে একের পর-এক টং ঘর। গ্রামবাসীদের লাস ফুলের মত বিছিয়ে পড়ে আছে চারিদিকে। কুকি দস্যুদের নিষ্ঠুর দা'য়ের কোপ নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, শিশু কিছুই মানছে না। সেই সর্দার, যে খুব অবহেলায় চম্পক আর ইন্দ্রকে ফিরিয়ে দিয়েছিল, তার ছিন্ন মাথা একটি টং ঘরের সামনে দড়িতে ঝুলছে।

আত্মরক্ষার কোনও প্রস্তুতি না থাকায় তুলারাম পাড়ার বাসিন্দারা এই আক্রমণের কোনও প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারে নি। ওরা প্রাণ বাঁচাতে জঙ্গলের দিকে পালাতে শুরু করল। যে-যেভাবে পারছে জঙ্গল অভিমুখে ছুটছে, কিন্তু সেদিকেও কেউ রক্ষা পাচ্ছে না। দস্যুরা দা, বল্লব, তলোয়ার, টাক্কাল আর তীর-ধনুক হাতে গ্রামবাসীদের পিছু ধাওয়া করে জঙ্গলের মধ্যেই একের পর-এক লাস ফেলে দিচ্ছে। চারিদিকে আর্তনাদ, চীৎকার, আগুনের উদ্দাম শিখা আর রক্তের বন্যা। এক মুহূর্ত দেরী না করে চম্পক আর ইন্দ্র, দুই হাতে দুই টাক্কাল নিয়ে তুফানের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই অগ্নিকুণ্ডে। আজ বীরত্বের নয়, জীবনের পরীক্ষা; প্রাণের নয়, মরণের পরীক্ষা। বেঁচে থাকতে হলে আজ শুধুই মারতে হবে; একজনও যেন বাকী না থাকে। যতক্ষণ যুদ্ধ ততক্ষণ প্রাণ। কোথায় শেষ হবে আজকের এই হত্যা-লীলার, কে জানে? যতক্ষণ পর্যন্ত কোনও পক্ষের একটিও প্রাণ বেঁচে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শেষ নেই এই লড়াইয়ের।

অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়তেই দুই বন্ধুর হাতের টাক্কাল ঝড়ের মত চলতে লাগল। যারাই সামনে পড়ল কচুকাটা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কুকি দস্যুরা তাদের ঠিক বিজয় মুহূর্তে, ঐ জায়গা থেকে এমন কিছু আশা করেনি। আচমকা এমনটা ওদের চমকে দিল, ওরা থমকে গেল। চম্পক আর ইন্দ্রের সামনে কেউ টিকতে পারছে না। না শক্তিতে, না বীরত্বে। যে-ই তাদের সামনে দাঁড়াল, প্রাণ হারাল। নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে, শত্রু নিধনে দুই বন্ধু কুকি দস্যুদের নিষ্ঠুরতাকেও ছাপিয়ে গেল। এই দুই বীরের দাপটে ক্ষণকালের মধ্যে দস্যুরা দিশাহারা, ছন্নছাড়া হয়ে পড়ল। তারা ভেবে পেল না কী করতে হবে। তাদের মধ্যে ত্রাহি-ত্রাহি পড়ে গেল। এক তুফান মুহূর্তের মধ্যে আরেক তুফানকে থামিয়ে দিল, মোড় ঘুড়িয়ে দিল। দস্যুরা নিজেদের এত বড় হানি এর আগে আর কখনো দেখেনি। ক্ষণিকের মধ্যে ভেঙ্গে গেল দস্যুদের সকল প্রতিরোধ। দস্যুদের কেউ-কেউ প্রাণ নিয়ে পালাতে লাগল। অনেক দস্যু নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে ছুটে গিয়ে টং ঘরের নীচে শূয়রগুলির মাঝে লুকিয়ে পড়ল। দুই বন্ধুর হাতিয়ার চলছে তো চলছেই। হঠাৎ শত্রুর ছোড়া একটি বড় পাথর ইন্দ্রের বুকে খুব জোরে আঘাত করল। কক্ করে একটি শব্দ হল আর ওর মুখ দিয়ে কল-কল করে রক্ত বের হতে লাগল, ওর দেহটি মাটিতে লুটিয়ে পরল। ঠিক ঐ মুহূর্তে এত বড় একটি সাফল্য পেয়ে দু'জন দস্যু ইন্দ্রের মৃত্যুকে নিশ্চিত করতে রক্ত ভেজা দা হাতে ওর দিকে ছুটে যেতেই চম্পক হিংস্র বাঘের মত ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আর চোখের পলকে তাদের ছিন্ন-ভিন্ন করে দিল। চম্পককে এবার একলা পেয়ে দস্যুরা আত্মবিশ্বাসের সাথে সবাই মিলে এক যোগে চম্পককে আক্রমণ করে বসল। ওরা সবাই ওকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরল। মরণ ফাঁদে পড়ে গেল চম্পক; মৃত্যু এবার নিশ্চিত। সে ঠিক বুঝতে পারল, আজ এখান থেকে বাঁচার আর কোনও রাস্তা নেই। জীবন এখানেই শেষ। সে শেষবারের মত তার অতি প্রিয় তুলারাম পাড়ার দিকে তাকিয়ে দেখল, চারিদিকে শুধু লাস আর-লাস। বুঝতে পারল, একজন গ্রামবাসীও আর বেঁচে নেই। মরণের পাড়ের সেই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে বীর চম্পক নিজের মনকে বলল, "একলা আছি তো কী হয়েছে! নিজের প্রাণ বাঁচাতে আজ সবগুলিকে শিয়াল-কুকুরের মত মারব। ওরা তো শিয়াল-কুকুরই। একটাকেও বাদ রাখব না। একটার জন্য দু'টা কোপ যেন না লাগে। এই তো সুযোগ সফলতার পথ তৈরি করার। বীর রায়-কাছাগ আর বীর রায়-কছমও তো অতি কঠিন সময়ে নিজেদের প্রমাণ করেছেন। আমিও করব, আমিও আমার প্রমাণ দেব। জয় আমার দেশ! জয় আমার ত্রিপুরা!"

দুই টাক্কাল উঁচু করে সিংহের মত গর্জন করে উঠল চম্পক, "জয় আমার দেশ! জয় আমার ত্রিপুরা!"

দস্যুরা চম্পককে ঘিরে ধরে ক্রমে তাদের বৃত্ত ছোট থেকে-ছোট করতে লাগল। নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে চম্পকও চরম আত্মবিশ্বাস আর সাহসিকতায় দুই হাতে দুই টাক্কাল শক্ত হাতে ধরে বজ্রের মত চীৎকার করে উঠল, "কাছে যে আসবি, সে-ই শেষ। একটার জন্য দু,টা কোপ আমি দেব না। ভেবেছিস আমি একলা? এক যমদূত শতেক প্রাণের জন্য যথেষ্ট। তোদের ভাগ্য খারাপ, তোরা আজ এক যমদূতের সামনে পড়েছিস। তোদের সবার গলায় মরণ ফাঁস পড়ে গেছে। তাই পেছনে যাবার রাস্তা নেই আমার, না আছে তোদের। তাই আয়, তোদের যেমন খুশি তেমন ভাবে আয়। মুক্তি তোদের হবেই।"

সে এক চরম মুহূর্ত, ঠিক এমন সময় অভাবিত ভাবে অন্ধকার জঙ্গলের ভিতর থেকে শাঁ-শাঁ করে একটি তীর উড়ে এল আর সোজা একটি দস্যুর গলায় বিঁধে গেল। তীরটি বিঁধতে না-বিঁধতেই দস্যুটি এক হিচকি তুলে ঝরা পাতার মত মাটিতে লুটিয়ে পড়ল; টু-টা শব্দ করার সময়ও পেল না। এতই বিষাক্ত ছিল তীরটি। কেউ কিছু বুঝার আগেই, দেখতে না-দেখতে ঝাঁকে-ঝাঁকে তীর অন্ধকার জঙ্গল থেকে উড়ে আসতে লাগল আর দস্যুদের উপর বৃষ্টির মত ঝরে পড়তে লাগল। দস্যুদের লাস টপা-টপ লুটিয়ে পড়তে লাগল ধুলার মাঝে। হঠাৎ এসব কী হচ্ছে? কারা করছে এসব? কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারল না; না চম্পক, না দস্যুরা। এমন সময় দূরে একটি টিলার উপর কিছু মশাল দেখা গেল, সাথে একটি বিজয় পতাকা। আর তা দেখে দস্যুদের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। ডরে-ভয়ে ওরা চীৎকার করতে লাগল, "পালাও! পালাও! অমরমাণিক্যের সেনা! অমরমাণিক্যের সেনা!"

কিন্তু বললেই কী আর পালানো যায়? দস্যুরা তখন নিজেরাই অমরমাণিক্যের সেনার মরণ ফাঁদে পড়ে গেছে। অন্ধকার জঙ্গলের ভিতর থেকে ঝাঁকে-ঝাঁকে তীর ছুটে আসতে লাগল আর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দস্যুরা চিরদিনের জন্য ইতিহাস হয়ে গেল; একজনও বেঁচে রইল না। সমূলে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল সব। চম্পক অবাক চোখে টাক্কাল হাতে দাঁড়িয়ে রইল। অন্ধকারে চারিদিক থেকে মহা জয়ধ্বনি উঠল, "জয় মহারাজ অমরমাণিক্যের জয়! জয় মহারাজ অমরমাণিক্যের জয়!" বিজয়ী চম্পক শক্ত হাতে দুই টাক্কাল উঁচু করে ধরে নিজের সকল আবেগ, সকল শক্তি দিয়ে গগন ভেদী চীৎকার করে উঠল, "জয় মহারাজ অমরমাণিক্যের জয়! জয় মহারাজ অমরমাণিক্যের জয়! জয় আমার দেশ! জয় আমার ত্রিপুরা!"

কিছুক্ষণের মধ্যেই জঙ্গলের চারিদিক থেকে অসংখ্য সিপাহী বেড়িয়ে এল। তাদের কয়েকজন এগিয়ে এল চম্পকের দিকে। এক-একজনকে দেখতে ঠিক যেন ব্রহ্মদৈত্য। সেই উত্তেজনাপূর্ণ রাতে তাদের খুব ভয়ানক লাগছিলে আবার দেবদূতও মনে হচ্ছিল। একজন এগিয়ে এসে চম্পকের পিঠে শাবাশি দিয়ে বলল, "শাবাশ বীর, শাবাশ। ধন্য তোমার বীরত্ব। ধন্য তোমার সাহস। মহারাজ অমরমাণিক্য তোমার মত বীরদেরই খুঁজে বেড়ান। মহারাজ অমরমাণিক্যের সেনাবাহিনীতে তোমার স্বাগতম। কিন্তু আমরা খুব দুঃখিত যে, আমরা আরও আগে এসে তোমাদের সহায়তা করতে পারিনি, গ্রামবাসীদের বাঁচাতে পারিনি। তবে আমরা খুব খুশি, সকল দস্যুদের এখানেই শেষ করতে পেরেছি, একজনও রেহাই পায় নি। বহুদিন ধরেই আমরা শুধু একটা সুযোগ খুঁজছিলাম, আজ তা পূর্ণ হল। যাই হোক, চল বীর, মহারাজের কাছে চল। মহারাজ অমরমাণিক্যের তোমার মত বীরের খুব প্রয়োজন। চল।"

হাতের দুটি টাক্কাল ফেলে, অশ্রু ভরা চোখে, ধুলায় পড়ে থাকা রক্তমাখা-নিথর প্রাণের বন্ধু ইন্দ্রের মাথায় কয়েকটি চুমু দিল চম্পক, তারপর তুলারাম পাড়া ছেড়ে অমরমাণিক্যের সেনাদের সাথে অন্ধকার জঙ্গলে ডুকে গেল। পিছনে পড়ে রইল জন-মানবহীন তুলারাম পাড়া, এক রাতেই যার সকল মানুষ শেষ। কিন্তু কেউ জানল না, তখনো অজ্ঞান অবস্থায় বেঁচে রইল দু'টি প্রাণ। ইন্দ্র, আর তকিরায়।
( চলবে)

পরবর্তী পর্ব আগামী বুধবার প্রকাশিত হবে।


◕ Your Story ₹ 500/- Details..
◕ Bengali Story writing competition. Details..




◕ This page has been viewed 141 times.


আগের পর্ব গুলি: পর্ব ১    পর্ব ২    পর্ব ৩    পর্ব ৪    পর্ব ৫    পর্ব ৬    পর্ব ৭    পর্ব ৮    পর্ব ৯    পর্ব ১০    পর্ব ১১    পর্ব ১২   
পর্ব ১৩   


গোয়েন্দা গল্প:
মাণিক্য   
সর্দার বাড়ির গুপ্তধন রহস্য   
প্রেমিকার অন্তর্ধান রহস্য   
লুকানো চিঠির রহস্য   


All Bengali Stories    44    (45)    46    47    48    49    50    51    52