Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
Read & Learn
 

Bengali Story

বাংলা গল্প

All Pages   ◍    7    8    9    10    (11)     12    13    14    ...


শিলা বৈষ্ণব

- হরপ্রসাদ সরকার


An offer to make a Website for you.

hostgator




আমাদের পাড়ায় শিলা নামে একটি মহিলা ছিল। দেখতে হেংলা-পাতলা, মস্ত কালো। স্বামী আর দুইটি ছোট ছেলে এই নিয়েই তার সংসার। শিলার স্বামী দিন মজুরের কাজ করত। গরীব সংসার তাই শিলাও লোকের বাড়িতে ঝি এর কাজ করত। সে কাজ কর্মে আর কথায় খুব পটু ছিল। তাই লোকে তাকে কাজের জন্য ডাকত।

তার কাছে টাকা পয়সা এত বড় ছিল না যত বড় ছিল তার স্বভীমান। সে সব খানেই হেসে খেলে কাজ করত। বাড়ি মহিলারাও তার কথায় আনন্দ পেত আবার তার কাজে খুশি হত।

পাড়ার এক কোনে থাকত এক বৈষ্ণবী। তার নাম ছিল বিধিলা। যতটুকু ছিল তার ভক্তি তার হাজার গুন ছিল তার অভিমান, ছুঁয়া-ছুত। সে ঠাকুরের নাম করত কম আর নিয়ম করত বেশী। আর নিয়ম সে কিছু কিছু নিজেই বানিয়ে ফেলত।

কিছুদিন হল পাড়াতে খবর রটেছে বিধিলা বৈষ্ণব নাকি শিব ঠাকুর পেয়েছে। বিধিলা বৈষ্ণব যখন ধ্যানে বসে তখন নাকি শিব ঠাকুর তার উপরে ভর করে আর বিধিলা বৈষ্ণব অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। বেহুশ অবস্থাতেই সে লোকের প্রশ্নের জবাব দেয়, লোকের সমস্যার সমাধান করে।

বিধিলা বৈষ্ণবের বেশ দাম বেড়ে গেল। তার কুঠিরে পাড়ার মহিলাদের খুব ভিড়। সবাই তাকে নিমন্ত্রণ করে সেবা করে। যেখানেই বিধিলা বৈষ্ণবের ডাক পড়ে সেখানে কাজের জন্য শিলার ও ডাক পড়ে। এটা বিধিলা বৈষ্ণবের এত ভাল লাগল না। সে শিলাকে সব সময়ই যা-তা বলত, গালি-গালাজ করত। শিলাও এমনি ছেড়ে দেবার পাত্রী নয়। সেও সময়ের অপেক্ষায় রইল।

একদিন সময় এসে গেল। রায় বাড়িতে অনুষ্ঠান। বিধিলা বৈষ্ণব এলো, শিলাও গেল। অন্ন ভোগের জন্য সব কাজ-কর্ম চলছে। রান্না বান্না চলছে। অন্ন ভোগের রান্নার জন্য শিলা সব্জী কেটে দিল, চাল-ডাল ধোয়ে দিল, পাটাতে হলুদ বেটে দিল, জিরা বেটে দিল। ততক্ষণে বিধিলা বৈষ্ণব পূজা করতে বসে শিব ঠাকুর পেয়ে বসেছে। অজ্ঞান হয়ে লোকের সমস্যা সমাধান করছে। অনেক্ষন হল শিব ঠাকুর আর যায় না, বিধিলা বৈষ্ণবের অজ্ঞানতা ও আর কাটে না। মহিলারা ভেবে পাচ্ছে না এখন কি হবে? হৈ-চৈ পড়ে গেল। কে যেন বলল "পূজার শঙ্খের জল তাড়াতাড়ি চোখে মুখে ছিটিয়ে দাও।" ব্যাস। শিলা তখন পাটাতে মরিচ পিষছিল। ও কথা শোনা মাত্রই সে এক দৌড়ে সেই শঙ্খ হাতে নিয়ে তার জল বিধিলা বৈষ্ণবের চোখে মুখে ছিটিয়ে দিল। বিধিলা বৈষ্ণবে কি অবস্থা হল তা সহজেই অনুমেয়। নকল শিব ঠাকুর পালানোর আগেই, এক লাফে বিধিলা বৈষ্ণব উঠে বসল আর মরিচের জ্বালায় চীৎকার করতে লাগল। কেউ কিছু বুঝতে পারছে না, কি হয়েছে, কি লাগবে?

বিধিলা বৈষ্ণব জল জল বলে কান্না জুড়ে দিল। সবাই ছুটাছুটি করে জলের পর জল নিয়ে গেল। সামান্য জলে সেই জ্বালা মিটল না। আর ওদিকে শিলাকে আর বেশ কিছুদিন খোঁজেই পাওয়া গেল না। সে সোজা বাপের বাড়ি।

তার পর থেকে বিধিলাকে আর শিব ঠাকুর ভর করে না। পাড়ার দুষ্ট ছেলেরা বিধিলা বৈষ্ণবের নতুন নাম দিল শিলা বৈষ্ণব। তার পেছনের কারণ হল কেউ বিধিলা বৈষ্ণবের সামনে শিলার নাম উচ্চারণ করলেই বিধিলা বৈষ্ণব প্রচণ্ড রেগে যেত। পাড়ার দুষ্ট ছেলেরা একটা ছড়াও বানাল “শিলা তুমি কি করিলা? বিধিলার ধ্যান ভাঙ্গিলা?” পাড়ার ছেলে-বুড়ো সবার মাঝেই ছড়াটা বেশ জনপ্রিয় ছিল।

Top of the page

কাঞ্চিলালের কথা

- হরপ্রসাদ সরকার

এক গ্রামে কাঞ্চিলাল নামে একটা লোক ছিল। সে চাষবাস করেই জীবন কাটাত। অনেকে তাকে খুব পছন্দ করত আবার অনেকে তাকে খুব এড়িয়ে চলত। এর একটা কারণ ছিল। কাঞ্চিলালের মুখে কখনো মিষ্টি কথা থাকত না। কেউ কোন কাজ করলে সে সব সময় সে কাজে একটা না একটা খুঁত ধরতই আর ধুম ধাম করে মুখের উপর নিন্দা করে দিত। অনেকেই সেই নিন্দা সহ্য করতে পারত না। তারা তার সাথে হয় ঝগড়া করত নয় সেখান থেকে দূরে সরে যেত। তবে পক্ষ-বিপক্ষ, ভাল-খারাপ সবাই মানত যে কাঞ্চিলাল যা বলেছে সে কথাটা একেবারে ফেলে দেওয়া যায় না। আর এই কারণেই অনেকে তাকে পছন্দ করত নিজেদের ভুল ত্রুটি ধরার জন্য।

একবার গ্রামের কয়েকজন মিলে ভাবল যে কাঞ্চিলালের মুখ থেকে তারা প্রশংসা বের করেই ছাড়বে। তাই তারা ঐ গ্রামেরই ভানুকে দিয়ে গোপনে একটি খুব সুন্দর মূর্তি বানাতে লাগল। গ্রামের আট-দশ জন লোক কাম কাজ ছেড়ে সব সময় ভানুর সাথে থাকল যাতে কোথাও কোন ত্রুটি না হয়। তারা সব ব্যাপারে তীক্ষ্ণ নজর রাখে, দিন রাত খেটে, প্রায় এক মাসে একটা খুব সুন্দর মূর্তি বানাল। যেইই সেই মূর্তিটি দেখল বাহঃ বাহঃ করে উঠল।

কাঞ্চিলালকে ডাকা হল মূর্তিটি দেখতে। গ্রামের অনেক লোক সেখানে উপস্থিত। কাঞ্চিলাল ভাল করে মূর্তিটি দেখল। তার পর বলল “এমন মূর্তি তো একদিনে তৈরী হতে পারে না। মনে হচ্ছে মূর্তিটি তৈরী করতে বেশ সময় লেগেছে। কে তৈরী করেছে এটা?”

গ্রামের যারা দিন রাত খেটে ঐ মূর্তি তৈরীর কাজে লেগেছিল তারা বলল “আপনি ঠিকই ধরেছেন কাঞ্চিলাল। আমরা প্রায় ১০/১২ জন মিলে প্রায় এক মাসে এটি তৈরী করেছি। মূর্তিটি কেমন সুন্দর হল বলুন?”

কাঞ্চিলাল তীক্ষ্ণ আর তীব্র স্বরে বলে উঠল “ছিঃ ছিঃ ছিঃ। এতগুলি লোক জীবনের এত সময় এই কাজে নষ্ট করলে। ছিঃ ছিঃ। ও গ্রামের ভজনলাল তো এমন মূর্তে একাই সাতদিনে তৈরী করে ফেলে। তাকে এমন মূর্তি বানাতে আমি কতবারই দেখেছি। আমি তো ভেবেছিলাম না জানি কত সুন্দর মূর্তি? এখন তো দেখছি সময়ের হিসাবে এর থেকে খারাপ মূর্তে আর আমি কখনো দেখিনি।” ছিঃ ছিঃ করতে করতে কাঞ্চিলাল বেড়িয়ে গেল। বাকীদের কি চাইতে কি হয়ে গেল। অনেকেই বলল কাঞ্চিলাল ঠিকই কথা বলেছে।

তার কিছুদিন পরে ঐ লোক গুলি আবার এক পরিকল্পনা করল। তারা সুখেনের বাড়িতে কাঞ্চিলালকে খাবার নিমন্ত্রণ করল। আর রান্না করার জন্য অনেক দূর থেকে একজন লোককে আনল। সে খুবই ভাল রান্না করে, যে খায় সেইই তার রান্নার খুব তারিফ করে। নির্দিষ্ট দিনে সুখেনের বাড়ি-ঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে একেবারে ঝকঝকে করে দেওয়া হল। রান্না ও শুরু হয়েগেল। নির্দিষ্ট সময়ে কাঞ্চিলাল সুখেনের বাড়িতে এলো। ঘরে ঢুকেই তিনি সুখেনকে বলল “সুখেন সব সময় যদি নিজের বাড়ি-ঘর এমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে তবে আর এত রোগ-শোক হত না। আগের বার যখন এসেছিলাম তখন তো দেখেছি বাড়ি-ঘরকে একেবারে গোয়াল ঘর বানিয়ে রেখেছিলে। আর শোনো, বাড়ি ঘর তো চকচক করে দিলে কিন্তু ফটকের বাইরের জায়গাটা কে পরিষ্কার করবে? ফটকের বাইরের অবস্থা দেখেই ভিতরের মানুষ গুলির সম্পর্কে ধারনা করা যায়। বুঝলে?” কাঞ্চিলালের এই কথা শুনে সবাই এমনিই চুপসে গেল।

যাক শেষে সবাই একসাথে খেতে বসল। খাওয়া দাওয়া খুবই ভাল হল। খাওয়া দাওয়ার শেষে কাঞ্চিলালকে বাকীরা জিজ্ঞাস করল রান্না কেমন হয়েছে? কাঞ্চিলাল বলল “কে রান্না করেছে এত খাবার?” ঠাকুর সামনেই ছিল। হাত জোড় করে বলল “আজ্ঞে আমি।”
কাঞ্চিলালঃ “কাউকে কি তোমার রান্নাটা শিখিয়েছ?”
ঠাকুরঃ আজ্ঞে না।
কাঞ্চিলালঃ তুমি তো দেখছি একটা মহা স্বার্থপর। তোমাকে দেখে তো এত স্বার্থপর মনে হয়না। দশ-পাঁচ জনকে তোমার রান্নাটা শেখালে অনেক লোক ভাল কিছু খেতে পারত। এতে তোমার ও নাম হত। এগুলি নিজের পুটলীতে বেঁধে কি আমের আচার বানাবে?

একথা বলেই কাঞ্চিলাল বাড়ির পথে পা দিল। সবাই একে অন্যের মুখ দেখছে। ঠাকুর দৌড়ে কাঞ্চিলালের পিছনে ছুটল। সে কাঞ্চিলালকে বলল “আপনি ঠিক কথা বলেছেন বাবু। আমি এখন থেকেই কিছু কিছু লোককে আমার রান্না শিখাতে থাকব।”

কাঞ্চিলাল তার কথার কোন জবাব না দিয়ে কাঞ্চিলালের মতই আবার হাটতে শুরু করল।

Top of the page

অপরাধী

- হরপ্রসাদ সরকার

রাজ দরবারে একদিন এক যুবক রাজার কাছে বিচার চাইতে এলো। তার নাম বীরেনন্দ। তার নালিশ ছিল, এক রাজ কর্মচারী তাকে ঠকিয়েছে। রাজা তাকে জিজ্ঞাস করলেন “কি করেছে সেই রাজ কর্মচারী?”

বীরেনন্দঃ মহারাজ সেই রাজ কর্মচারীর নাম আদিকুমার। সে আমাদেরই গ্রামের লোক। সে আমাকে বলেছিল যে আমি তাকে পাঁচশত রৌপ্যমুদ্রা দিলে সে আমাকে রাজ কর্মচারী হিসাবে কাজ পাইয়ে দেবে। আমি গরীব মানুষ, আমার কাছে এত ধন ছিল না। সেই ধন সংগ্রহ করতে আমি আমার জমিন বিক্রি করে দিয়েছি। আমার চারটি গরু ছিল সেগুলি বিক্রি করে দিয়েছি। লোকের কাছে ঋণ নিয়ে আমে আদিকুমারকে সে পাঁচশত রৌপ্যমুদ্রা দিয়েছি। আমি কত কষ্ট করে সেই ধন জমা করেছিলাম, এই খবর আদিকুমার ও জানে। আজ আট বছর হয়ে গেল সে আমাকে কোন কাজ দেয়নি। আমার ধন ও আমাকে ফিরিয়ে দেয়নি। এখন তার কাছে আমার ধন ফিরত চাইতে গেলে সে আমাকে নানা কথা বলে ধমকায়। মহারাজ আপনি আমার বিচার করুন।

আদিকুমার ছিল রাজার এক ক্ষুদ্র কর্মচারী। তার বেতন ও কম ছিল আর তার ক্ষমতাও ছিল না কাউকে কাজ দেবার। সে বীরেনন্দের ধনে বেশ আরাম আয়েশ করে দিন কাটিয়ে সেই ধন খরচ করে ফেল।

রাজার আদেশে সেই আদিকুমারকে রাজ সভায় ডাকা হল। সবার সামনে রাজা তাকে প্রশ্ন করলেন “তুমি কি বীরেনন্দের কাছ থেকে ধন নিয়েছ?”

আমতা-আমতা করে আদিকুমার বলল “হ্যাঁ মহারাজ।”
রাজাঃ কত দিন হল সে কথার?
আদিকুমারঃ প্রায় সাত আট বছর।
রাজাঃ সেই ধন কেন নিয়েছিলে?
আদিকুমার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল “বীরেনন্দকে রাজ কাজ পাইয়ে দেব, এই কথায়।”
রাজাঃ তুমি কি পার তাকে রাজ কাজ পাইয়ে দিতে?
আদিকুমারঃ না। মহারাজ।
রাজাঃ তবে কেন তার কাছ থেকে মিথ্যা বলে ধন নিয়েছিলে?

আদিকুমার এই কথার কোন সঠিক জবাব দিতে পারেনি। রাজা আবার তাকে প্রশ্ন করলেন “তুমি পারবে এখন তাকে তার ধন ফিরিয়ে দিতে?”
আদিকুমারঃ না মহারাজ।
রাজাঃ তোমার বেতন কত?
আদিকুমারঃ আজ্ঞে, আমার বেতন ষাট রৌপ্যমুদ্রা।
রাজাঃ হুঁম।

রাজা কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন “দেখ এখানে দোষ তোমরা দুজনই করেছো। লোভে পড়ে অনৈতিক পথে রাজ কাজে নিযুক্ত হবার চেষ্টা করেছে বীরেনন্দ। আর তাকে অনৈতিক পথে নিয়ে যাবার জন্য মগজ ধোলাই করেছে আদিকুমার। ফলে দুজনেরই সাজা পাওয়া উচিত। বীরেনন্দের সাজা হল সে লোভে বা মোহে, অপরের কথায় একটা অনৈতিক পথে চলতে দ্বিধা করেনি। তাই সে তার মোট পাঁচশত মুদ্রা থেকে অর্ধেক মুদ্রা হারাবে। তাকে রাজ কোষ থেকে শুধু আড়াইশ মুদ্রাই দেওয়া হবে। আর আদিকুমার? সে একটা মানুষকে ভুল পথে চালনা করেছে। সে তার পদের ভুল ব্যবহার করেছে। তাই তার বেতন থেকে প্রতি মাসে, মোট ছয় বছরে, দুই হাজার রৌপ্য মুদ্রা ধীরে ধীরে কেটে নেওয়া হবে। আর ভবিষ্যতে যদি তার বিরুদ্ধ এমন কোন অভিযোগ আসে তবে সাথে সাথেই তাকে রাজ কার্য থেকে বরখাস্ত করে তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হবে।”

রাজার এই বিচারে সভাসদ সবাই ধন্য ধন্য করে উঠল।

Top of the page

সহজ সরল কিন্তু সস্তা না

- হরপ্রসাদ সরকার

এক গ্রামে দুই দিনমজুর ছিল ছিদাম আর হরি। দুজনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। দুজনই কাজে কর্মে খুব ভাল ছিল। গ্রামের অনেকেই তাদের দিয়ে নিজের বাড়ি ঘরে কিংবা ক্ষেতে খামারে কাজ করাত।

ছিদাম ছিল একটু সহজ সরল। সে কাউকে 'না' বলতে পারত না। আর হরি ছিল ঠিক উল্টা। সে মুখের উপর দুই কথা শুনিয়ে দিত। তাই অনেকে প্রথমে ছিদামকেই খুঁজত। ছিদামকে না পাওয়া গেলে তবে কেউ কেউ হরির খোঁজ করত। আবার অনেকে তখন হরির কথা না ভেবে অন্যে রাস্তা নিত।

স্বাভাবিক ভাবেই ছিদাম হরির চেয়ে বেশী কাজ পেত আর সে কাজ করতো ও। কিন্তু তবু ছিদামের সব সময় একটা আর্থিক অনটন লেগে থাকত। কম কাজ করেও হরি ছিদামের চেয়ে সচ্ছল ছিল।

ছিদাম প্রায়ই হরির কাছে টাকা চাইত। এমন নয় যে ছিদাম বাজে খরচ করত, কিংবা তার সংসার বড়। ছিদাম আর হরি কেউই বাজে খরচ করত না আবার দুজনের ছেলেপিলে ও প্রায় একই। তবে আসল কথা অন্য জায়গায়। সবাই ছিদামকে দিয়ে কাজ তো করিয়ে নিত কিন্তু ঠিক ঠাক পয়সা দিত না। ছিদাম ও কাউকে মুখ ফুটে কিছু বলত না। অনেকের কাছেই অনেক টাকা পাওনা তবু তারা ছিদামকে দিয়ে কাজ করায় কিন্তু পয়সা দেবার সময় এটা ওটা বাহানা করে অল্প কিছু পয়সা দিয়েই ছিদাম করে বিদায় করে। ক্রমে ছিদামের অবস্থা খুব করুন হয়ে দাঁড়াল।

আর হরি একদিন কাজ করে টাকা না পেলে, দ্বিতীয় দিন কাজে যেত কিন্তু সে দিন ও যদি টাকা না পেত তবে তৃতীয় দিন আর ওখানে যেত না। তখন তাকে কাজের জন্য ডাকলে বলে দিত “দুদিনের টাকা বাকী। সেই টাকা পেলেই আমি কাজ করব।” তার এই নিয়ম থেকে সে সরে আসত না। ফলে যাদের খুব জরুরী কাজ থাকত তারা তাদের আগের টাকা শোধ করে দিত আর যাদের কাজ জরুরী থাকত না তারা ছিদামের জন্য অপেক্ষা করত। যেহেতু হরি ভাল কাজ করত আর মন প্রাণ ঢেলে কাজ করত তাই পাশের এক দুই গ্রাম থেকেও হরির ডাক পড়ত।

ছিদামের সব কথাই হরি জানত। তাই একদিন ছিদাম যখন আবার টাকা চাইতে এলো সে ছিদামকে টাকা তো দিলই না উল্টা বেশ ধমকাতে লাগল। সে ছিদামকে বলতে লাগল “তোর এই দীন দশার জন্য শুধু তুইই দায়ী। কেন এমন ভাবে নিজে কষ্ট পাচ্ছিস আবার নিজের সংসারটাকেও কষ্ট দিচ্ছিস?”
ছিদাম মাথা হেট করে বলল “কি করব বল? অনেকের কাছেই এত এত টাকা বাকী, টাকা চাইতে গেলেই শ অজুহাত দেখায়। আমিও তো কিছু বলতে পারিনা।”
হরি তেমনি চড়া সুরে বলল “দেখ, সহজ সরল থাকা ভাল কিন্তু সস্তা থাকা ভাল না। সস্তা থাকা খুব খারাপ। তুই এতই সস্তা হয়ে গেছিস যে আজ তার সাজা ভোগ করছিস। তুই পরিশ্রম করবি আর লোকে তোকে টাকা দেবেনা!! তবু তুই তাদের বাড়িতে যাবি কাজ করতে? এর থেকে সস্তা আর কি হতে পারে ভাই।”
ছিদাম কোন কথা বলল না। সে তেমনি বসে রইল। হরি একটু ভেবে বলল “আমি এত কিছু জানি না। তুই কাল থেকে আমার সাথে কাজ করবি। আমি যেখানে বলব সেখানেই কাজ করবি। আমাকে না বলে তুই কোথাও কাজ করতে যাতে পারবি না। কেউ কিছু বললে শুধু একটা কথাই বার বার বলবি ‘হরির সাথে কথা বলুন।’ বাকী সব আমি দেখে নেব। আর যদি তুই তেমনটা না করতে পারিস তবে আর কোন দিন আমার বাড়িতে আসবি না। তোর আমার বন্ধুত্ব চিরদিনের জন্য শেষ। কি পারবি তো আমার কথা শুনতে? আমার কথাতে রাজি আছিস কিনা এখুনি তোকে বলতে হবে? এখুনি জবাব দিতে হবে।”

ছিদাম ধীর সুরে বলল “ ঠিক আছে। তুই যেমন বলবি তাই করব।” হরি গলার সুর একটু কঠিন করে বলল “দেখিস যেন আবার কথার খেলাফ না হয়। নে, এই ধর তোর টাকা।”

শুরু হল দুই বন্ধুর নতুন কথা। লোকজনকে জবাব দেওয়া থেকে বাঁচতে ছিদাম সকাল সকালই হাজির হয়ে যেত হরির বাড়ি। আর হরি তাকে গ্রামেই রাখত না। গ্রামের বাইরে ভিন গ্রামে পাঠিয়ে দিত কাজের জন্য। সন্ধ্যায় ছিদাম ফিরে এলে ঠিক খোঁজ নিত পয়সা ঠিক ঠাক পাওয়া গেছে কি না? ভিন গ্রামে ছিদামের পয়সা কোথাও আর কোন বাকী থাকত না। ক্রমে তার আর্থিক অনটন আর রইল না।

গ্রামের যারা ছিদামের সহজ সরলতার সুযোগ নিত তার অনেকে সেই ভোর বেলাতেই এসে ছিদামের বাড়িতে হাজির হত, আবার কেউ কেউ রাতের বেলা এসে হাজির হত। ছিদাম সবাইকে বিনতি করে বলত যে, সে ভিন গ্রামে একটা বড় কাজ পেয়েছে। সেখান থেকে তো সে ছাড়া পাবে না। ওখানে টাকাও একটু বেশী পাওয়া যায়। অনেকেই ছিদামের জন্য অপেক্ষা করতে করতে শেষে হেরে গিয়ে হরিকেই কাজে ডাকল। কেউ কেউ আবার ভিন গ্রাম থেকে দিনমজুর আনল।

আজ ছিদাম সহজ সরলই থাকল কিন্তু আর সস্তা রইল না। আর তাতে তার অভাব ও রইল না। গ্রামের যাদের লেন-দেন ভাল ছিল, ছিদাম তাদের বাড়িতেই কাজ করতে যেত। আর যারা তার সরলতার খুব সুযোগ নিয়েছিল তারা কাজের জন্য এলে সে সোজা হরির দোহায় দিয়ে দিত।



Top of the page
All Pages     7    8    9    10    (11)     12    13    14    ...

Amazon & Flipkart Special Products

   


Top of the page