Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
Read & Learn
 

মজার গল্প

Bengali Story

All Pages   ◍    13    14    15    16    (17)     18    19    ...


রসিকের কথা

-হরপ্রসাদ সরকার


An offer to make a Website for you.

hostgator




শহরের স্কুল। একদিন পঞ্চম শ্রেণীর কিছু ছেলে মাঠের এক কোনে মারামারি খেলতে লাগল। তাদেরই দুই বন্ধু বিজয় আর রমেশ পাশে দাঁড়িয়ে তাদের মারামারি দেখে আনন্দ উপভোগ করছিল। এমন সময় স্কুলের এক শিক্ষক, প্রণব বর্ধনের নজরে তা পড়ল। তিনি দৌড়ে সেখানে গেলেন, ছেলেদের মারামারি খেলা থেকে বিরত করলেন আর সবাইকে মাঠের মাঝেই কঠিন শাস্তি দিলেন। বিজয় আর রমেশ যদিও মারামারি করেনি, পাশ থেকে মারামারি উপভোগ করছিল তবু তিনি তাদেরকে শাস্তি দিলেন।

পরের দিনের ঘটনা। বিজয়ে বাবা বিমলেন্দ্র হম্বিতম্বি করে স্কুলে এলেন। পেশায় তিনি একজন ডাক্তার। তিনি তারস্বরে হৈ-চৈ সুরু করে দিলেন আর প্রণব বর্ধনের কাছে জবাব চাইতে লাগলেন “কেন তিনি বিজয়কে শাস্তি দিলেন? বিজয় তো কোন মারামারি করেনি! তবু তিনি কেন বিজয়কে শাস্তি দিলেন?” তার হৈ-চৈ শুনে আরো অনেক ছাত্র শিক্ষক জমা হয়ে গেল। বিমলেন্দ্রের হৈ-চৈ আর থামে না। এমন সময় রমেশের বাবা রসিক ও স্কুলে এসে উপস্থিত। পেশায় তিনি রিক্সা চালক। অক্ষর জ্ঞান কিছুই নেই। তিনি ভিড় ঠেলে সবার সামনে এগিয়ে এসে প্রণব বর্ধনের পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন। খুব বিনীত ভাবে বলতে লাগলেন “স্যার, আপনি গতকালকে আমার ছেলে রমেশকে জীবনের একটা খুব বড় শিক্ষা দিয়েছেন। আমি খুব খুশি। সে যদি এই শিক্ষার কথাটা মনে রাখে তবে জীবনে অনেক বিপদ থেকে মুক্তি পাবে।”

একটা অক্ষর জ্ঞান হীন, দরিদ্র মানুষের মুখে এমন কথা শুনে সবাই অবাক। বিজয়ের বাবা বিমলেন্দ্র ও অবাক। তিনি দুই পা এগিয়ে, দাঁত চিবিয়ে বললেন “সেই তখন থেকে পাগলের মত বক-বক করে যাচ্ছে কেন? আপনার আর আমার ছেলেকে বিনা কারণে শাস্তি দেওয়া হয়েছে! কোন শিক্ষা দেওয়া হয়নি! এই কথাটা কি মাথায় ঢুকছে না?”

রমেশের বাবা রসিক, বিমলেন্দ্রের চোখে চোখ রেখে বললেন “না! আমি আপনার সাথে সহমত নই। মনে করুন আপনার খালি বাড়িতে এক চোর চুরি করতে ঢুকল। আমি একজন ভাল মানুষ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ তা দেখতে পেয়ে আপনার বাড়ির ফটকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকে চুরি করতে দেখতে লাগলাম। এমন সময় পুলিশ এলো। সেই পুলিশ আমাকে কি আদর করবে না কি সেই চোরের সাথে বেঁধে নিয়ে যাবে?”

তার এই কথা শুনে হঠাৎ ধপ করে চারিদিক শান্ত হয়ে গেল। রসিকের এই কথা বহু ছাত্র ছাত্রী এবং শিক্ষকের হৃদয়-মগজ ভেদ করে চলে গেল। রসিক আবার বলতে লাগল “খারাপ লোক এবং খারাপ কাজ থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই মঙ্গল। আর আমি মনে করি এই কথাটা আমার ছেলে যত দিন মনে রাখবে ততদিন সে উন্নতিই করে যাবে। প্রণব স্যারের গতকালের শাস্তি আমার ছেলের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ। এই জন্য আমি স্যারকে ধন্যবাদ জানাই।”

গর্বে, আনন্দে সব শিক্ষক আর ছাত্রী হাততালি দিয়ে বাঃ বাঃ করতে লাগল। শুধু ডাক্তারবাবু নিজের শিক্ষার গর্ব করতে না পেরে মূর্খের মত লজ্জায় মাথা নিচু করে রাখলেন।
Top of the page

রাজা জয়রাজ

-হরপ্রসাদ সরকার

রজতপুরের রাজা অভয়েন্দ্র বীর পরাক্রমী রাজা। উনার শাসনে দেশের সীমা চারিদিক থেকে সুরক্ষিত। রাজ্যের কোনায় কোনায় প্রজাদের মধ্যে সুখ, সমৃদ্ধির হাওয়া।

রাজা অভয়েন্দ্রের এক বাল্যবন্ধু ছিল জয়রাজ। বাল্যকাল থেকেই রাজা অভয়েন্দ্র আর জয়রাজ সাথে সাথে আছে। রাজা অভয়েন্দ্র জয়রাজকে খুব ভালবাসতেন, সব সময় তাকে সাথে রাখতেন, কোন কাজে তার পরামর্শ নিতেন। এই কারণে অনেক সভাসদ জয়রাজকে হিংসা করত, জয়রাজের নিন্দা করত।

রাজা অভয়েন্দ্র রোজ দুপুরে আহারাদি সেরে একটু ঘুমিয়ে নিতেন। এটাই ছিল উনা রোজকার নিয়ম। রাজা যখন ঘুমিয়ে পড়তেন তখন তার বন্ধু জয়রাজ চুপিচুপি রাজার শয়নকক্ষের পাশের ফুলবাগানে ঘুরে বেড়াতেন। বিড় বিড় করে কি সব বলতেন।

জয়রাজের নিন্দুকেরা একদিন রাজার কানে জয়রাজের বিরুদ্ধে খুব বিষ ঢেলে দিল। তারা রাজার কাছে জয়রাজের খুব নিন্দা করতে করতে বললেন যে জয়রাজ এখন রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। কারণ রাজা যখন দুপুরে ঘুমিয়ে পড়েন তখন সে রোজ লুকিয়ে রাজ-ফুলবাগানে যায় আর কাদের সাথে যেন কি পরিকল্পনা করে! জয়রাজকে এখুনি রাজদ্রোহের অপরাধে বন্দী করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক।

রাজা মনে মনে হাসলেন। তিনি তাদের কথা এক বিন্দুও বিশ্বাস করলেন না। তিনি খুব ভাল জানতেন যে জয়রাজের মত এমন ভাল বন্ধু হয় না। জয়রাজের উপর রাজার সম্পূর্ণ ভরসা ছিল। তবু তিনি নিন্দুকদের একটা সুযোগ দিতে চাইলেন। তিনি তাদের বললেন যদি তাদের কথা সত্যি হয় তবে জয়রাজের মৃত্যুদণ্ড হবে আর যদি তাদের কথা মিথ্যা হয় তবে প্রতারণার অপরাধে তাদের সবার মৃত্যুদণ্ড হবে।

পরদিন কয়েকজন গুপ্তচর ফুল বাগানের আড়ালে আড়ালে লুকিয়ে রইল। দুপুরে আহারাদি সেরে রাজা ঘুমের অভিনয় করতে লাগলেন। রাজা ঘুমিয়ে গেছেন ভেবে জয়রাজ রোজকার মতই ফুল বাগানে চলে গেলেন। ফুল বাগানে গিয়ে তিনি মহানন্দে ফুল, কলি, লতা-পাতা, পাখী ইত্যাদিদের উদ্দেশ্যে নানান কথা বলতে লাগলেন। তিনি বলতে লাগলেন “হে ফুল, কলি! তোমরা রোজ আরো সুন্দর হয়ে ফোটো। তোমাদের দেখে যেন রাজার মন ভরে যায়। তোমাদের সৌরভে যেন রাজার মনে প্রফুল্ল হয়ে উঠে। হে পাখীরা! তোমরা আরো মধুর সুরে গান গাও। যেন তোমাদের মধুর কলতান শুনে রাজা আনন্দিত হয়ে উঠে।” জয়রাজ অনেক্ষন ফুলবাগানে সময় কাটিয়ে রাজার কাছে ফিরে গেলেন। গুপ্তচর মারফত রাজা সব কথা শুনলেন।

পরদিন সকালে রাজ দরবারে জয়রাজ এবং তার নিন্দুকে এসে হাজির হল। রাজা সবার সামনে সব কথা খুলে বললেন। কথার শেষে রাজা নিন্দুকদের দেশ নিকালা দিলেন। শেষে রাজা জয়রাজকে বললেন কেন জয়রাজ ফুল বাগানে গিয়ে ফুল পাখীদের সাথে এমন কথা বলে?

জয়রাজ বললেন “মহারাজ, রাজা হলেন সমগ্র প্রজা এবং দেশের ভাগ্য নির্মাতা। সুন্দর রং, সুমিষ্ট গন্ধ, মধুর গান মানুষের মনকে তাজা, তরুণ আর সতেজ রাখতে সাহায্য করে। ফলে মানুষের মন উৎসাহ-উদ্দীপনায় ভরে থাকে। তার মন তখন গঠনমূলক কাজে জড়িয়ে পড়তে চায়। আর কোন দেশের রাজা যখন একের পর এক গঠনমূলক কাজ করতে থাকে তখন প্রজা আর দেশ দুই এর উপকার হয়।” জয়রাজের কথা শুনে দরবারের সবাই ধন্য ধন্য করে উঠল।
Top of the page

শালিক পাখী

-হরপ্রসাদ সরকার

একটি নারকেল গাছে একটি শালিক পাখী বাস করত। অনেক দিন সে একা একা সেই গাছেই ছিল। এক সাথে ওরা অনেক ঝড় বৃষ্টির সাথী থেকেছে। এই গাছেই একদিন এই শালিক পাখীর বিয়ে ঠিক হয়। নারকেল গাছটি সেদিন নতুন কনেকে স্বাগত জানাতে নতুন পাতায়, নতুন ফুলে নিজেকে সুন্দর করে সাজিয়েছিল। শালিক পাখী তার বৌকে নিয়ে সেই নারকেল গাছে সুখের সংসার গড়ে তুলে। ক্রমে তাদের দুইটি ছেলে হল। এরাও যখন বড় হল তখন তাদের বিয়ে সাদি হল। শালিক পাখীর সেই বাসাটি সবার থাকার জন্য ছোট হয়ে গেল। ছেলেরা তখন অনেক দূরে এক তরুণ তাজা নারকেল গাছে একটি সুন্দর এবং বড় একটি বাসা বানাল। এই বাসাতে সবার এক সাথে থাকতে কোন অসুবিধা হবে না। ছেলেরা বৃদ্ধ শালিক আর শালিকের বৌকে সেই নতুন বাসাতে নিয়ে এলো। কিন্তু নিজের বাসা ছেড়ে আসতে শালিক পাখীর কখনোই মন চায়নি। সে সময়-সময় কাঁপা-কাঁপা ডানা মেলে উড়ে গিয়ে সেই নারকেল গাছের ছায়ায় বসে থাকত। তার সেই ভাঙ্গা বাসাতে গিয়ে বিশ্রাম নিত। এতে তার খুব আনন্দ লাগত। তার মন প্রফুল্লতায় ভরে উঠত।

ক্রমে সে আরো বৃদ্ধ হয়ে গেল। তার আর উড়ে যাবার ক্ষমতা রইল না। তবু তার মন তার সেই বন্ধু নারকেল গাছটির কাছে যেতে চাইত, তার সেই পুরানো বাসাতে কিছু সময় বিশ্রাম নিতে চাইত। নারকেল গাছটিও ততদিনে বৃদ্ধ হয়ে গেছে।

একদিন শালিকের ছেলেরা তাকে সেই নারকেল গাছটিতে নিয়ে গেল। তারা তাকে সেখানে রেখে নিজের নিজের কাজে বেড়িয়ে পড়ল। শালিক পাখী আর গাছটি মিলে অনেক গল্প করল। পুরানো দিনের অনেক কথা নিয়ে হাসিঠাট্টা করল। শেষে শালিক পাখীটি নারকেল গাছটির ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিতে লাগল। হঠাৎ আকাশে মেঘ জমে তুফান শুরু হল। আজ নারকেল গাছটি আর টিকে থাকতে পারেনি। বন্ধুকে বাঁচাতে সে অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। হাল্কা এক বাতাসেই সে ভেঙ্গে পড়ল সেই শালিক পাখীটির উপর। দুই বন্ধু একে অপরকে জড়িয়ে ধরে চিরদিনের জন্য পরে রইল।
Top of the page

মা’র কথা

-হরপ্রসাদ সরকার

তনু নামে এক বনে একটি টিয়া পাখী ছিল। সে কখনো কারো কথা শুনত না। তার মা-বাবা তাকে অনেক বারণ করত দিনে রাতে বনে বনে না ঘুরতে। কিন্তু সে কারো কথাই কানে তুলত না।

একদিন তার মা তাকে আদর করে ডেকে বলল “বাবা তনু, শুনেছি ঐ বনে খুব দুষ্ট এক শিকারি এসেছে। সে পাখীদের ধরে নিয়ে গিয়ে প্রাণে মেরে ফেলে। আর পাখীদের ধরার জন্য সে নানা রকমের ফাঁদ পেতে রাখে। পাখীরা তার ছলনা বুঝতে না পেরে তার ফাঁদে পা দেয় আর নিজের প্রাণ হারায়। তুই তো দিনে রাতে বনে বনে ঘুরে বেড়াস। কয়েকটি দিন একটু ঘুরাঘুরি বন্ধ রাখ বাবা। একটু সাবধানে থাক। মা’র এই কথাটা একটু শোন বাবা।”

কে শুনে কার কথা? উল্টা তনু ভাবল মা তনুকে শান্ত রাখার জন্য বাজে ভয় দেখাচ্ছে। তনু মা’র কথার কোন পাত্তাই দিল না। মা’র সাবধান বানী না শুনে সে আগের মতই হৈ-হৈ করে বনে বনে ছুটাছুটি করতে লাগল।

একদিন সে যখন এক বনের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে তখন সে দেখল বনের মাঝে আলো করে একটি সোনার গাছ দাঁড়িয়ে আছে। তাতে রূপার পাতা হীরার ফল। চারিদিকে সোনা, রূপার প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে। তনু খুব অবাক হয়ে তা দেখতে লাগল, এমনটা সে আগে কখনো দেখেনি। সে সোজা নেমে এলো সেই সোনার গাছের ডালে। মহানন্দে সে রূপার পাতা আর হীরার ফলে ঠোকর মারতে লাগল। সে সেই সোনার গাছে আপন মনে খেলতে লাগল কি আচানক শূন্য থেকে একটি জাল উড়ে এলো। তনু সেই জালে বাঁধা পড়ে গেল। সে অনেক চেষ্টা করতে লাগল নিজেকে মুক্ত করতে, কিন্তু পারল না।

চোখের পলকে গাছের আড়াল থেকে সেই দুষ্ট শিকারি বিকট হাসি হাসতে হাসতে বেড়িয়ে এলো। হাতে তার ধারালো এক ছোড়া। তনু ঠিক বুঝতে পারল আজ তার জীবনের শেষ দিন। জীবনের শেষ ক্ষণে মা’র কথা খুব মনে পড়ল তার। মা’র কথা ভেবে ভেবে তার দু-চোখ জলে ভরে গেল। সে বুঝল, মা সেদিন মিথ্যা বলেননি। মা’র কথা শুনলে আজ তার আর এই করুন পরিণতি হত না। তনু উচ্চস্বরে “মা! মা!” বলে খুব কাঁদতে লাগল। কিন্তু আজ তার সেই কান্নার কোন দাম রইল না।
Top of the page

কাদামাটির সাধু

-হরপ্রসাদ সরকার

সে অনেক দিন আগের কথা। এক রাজ্যের রাজধানী থেকে অনেক দুরের এক গ্রামের কথা। সেই গ্রামের পাশে ছিল একটি সুন্দর নদী আর সেই নদীর পাশেই ছিল একটি ঘন জঙ্গল। সেই জঙ্গলে ছিল চোর ডাকাতের বাস। নদীর ওপারে ছিল একটি বেশ বড় শহর। সেই শহর থেকে ব্যবসায়ীরা গ্রামে এসে মালপত্র বিক্রি করত। আবার গ্রামের কৃষকরাও শহরে গিয়ে তাদের ফসল-সব্জী বিক্রি করে আসত। প্রায়ই পথ মধ্যে চোর ডাকাত সেই জঙ্গল থেকে বের হয়ে তাদের লুটপাট করত। রাজার কাছে অনেক নালিশ করা হল কিন্তু কোন কাজ হল না।

ঘুরতে ঘুরতে সেই গ্রামে একদিন এক তেজস্বী সাধু এলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি গ্রামের এই সমস্যাটির কথা হাড়ে-হাড়ে টের পেলেন। সাধু মনে মনে ভাবলেন তিনি এর একটা বিহিত করবেন। তিনি রোজ ভোরে, সেই অন্ধকার থাকতেই নদীর জলে স্নান করতে যেতেন। আসার সময় তিনি এক তাল কাদামাটি সাথে করে নিয়ে আসতেন। চোর ডাকাত বেশ কয়েকবার উনার পথ আটকাল কিন্তু উনার কাছে কাদামাটি ছাড়া আর কিছুই পেল না। ওরা সাধু উপহাস করে বলত “আমরা ধন রত্নের পাগল আর এই পাগল কাদামাটির পাগল।” চোর ডাকাতরা সাধুর নাম দিল কাদামাটির সাধু।

এই কাদামাটির খবর গ্রামবাসীরা জানত না। সাধু দুপুর বেলা কয়েক ঘর ভিক্ষা করে সেই যে কুঠিরে ঢুকতেন তিনি আর তার কুঠির থেকে বের হতেন না। সাধু তার কুঠিরে বসে গোপনে বানিয়ে চললেন একের পর এক সুন্দর সুন্দর ঠাকুরের মূর্তি। তাতে তিনি এমন সুন্দর রং ভরতে লাগলেন যেন মনে হত এখুনি মূর্তি কথা বলে উঠবে। শেষে একদিন এক গভীর রাতে সেই সাধু মূর্তি গুলিকে নিয়ে সেই জঙ্গলের পাশে রেখে এলেন। আর ভোর হতে না হতেই নিজেই সেখানে গিয়ে অবিরাম শঙ্খ, কাঁসি, ঘণ্টা বাজিয়ে সেই মূর্তি গুলির পূজা করতে লাগলেন। এত ভোরে এমন অবিরাম শঙ্খ, কাঁসি, ঘণ্টার ধ্বনি শুনে গ্রামের লোক বেশ অবাক হয়ে দল বেঁধে ছুটে গেল নদীর পারে। তারা দেখল দেব দেবীর অনেক গুলি মন মোহক মূর্তি আর সেই সাধু মূর্তি গুলির পূজা করে যাচ্ছেন। লক লকে শিখায় জ্বলছে যজ্ঞে আগুন। ধূপ-ধূনার সুগন্ধে চারিদিকে এক দিব্য পরিবেশের আবেশ ছড়িয়ে পড়েছে। মূর্তি আবির্ভাবের এই খবর দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়তে লাগল। খবর পেয়ে দলে দলে লোক আসতে লাগল। রাজার কানে ও এ খবর গিয়ে পৌঁছল। রাজা লোক-লস্কর নিয়ে সেই মূর্তি দর্শনে এলেন। তিনি সেখানে সব মূর্তির জন্য একটি সুবিশাল মন্দির তৈরীর আদেশ দিলেন। আর সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেল মন্দির তৈরীর কাজ। অনেক সিপাহী সেই মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিযুক্ত করা হল। ক্রমে সেই মন্দির সেই রাজ্যের একটি দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠল। চোর ডাকাতের নাম গন্ধ ও আর সেই অঞ্চলে পাওয়া গেল না।
Top of the page

কোকিল পাখীর গান

-হরপ্রসাদ সরকার

এক বনে নন্দু নামে এক কোকিল পাখী ছিল। সে খুব মধুর গান করতে পারত। সে যখন গান করত তখন বনের হরিণরা চুপ করে তার গান শুনত। বনের পশু পাখী সবাই তার গানের খুব প্রশংসা করত। নিজের গানের এত প্রশংসা শুনে শুনে নন্দু কোকিলের মনে খুন অহংকার জন্ম নিলো। আগের নন্দু কোকিল আর আগের মত রইল না। সে বাকীদের সাথে যেমন-তেমন ব্যবহার করতে লাগল। তার মনের সেই কোমলতা আর রইল না।

একদিন নন্দু কোকিল ভাবল সে রাজাকে গান শোনাবে। রাজা তো তার গানের প্রশংসা করবেনই। আর তার রাজা যদি একবার প্রশংসা করেন তাহলে সারা দেশে তার খুব নাম হবে, যশ হবে। রাজার কাছ থেকে অনেক উপহার ও পাওয়া যাবে। এই ভেবে সে একদিন রাজ দরবারে হাজির হল। রাজ দরবারে হাজির হয়ে সে নিজেই নিজের খুব খুব প্রশংসা করতে লাগল। রাজা মনে মনে হাসলেন আর তাকে তার গান শুনানোর অনুমতি দিলেন।

নন্দু কোকিল তার গান শুনাতে শুরু করল। সে চোখ বন্ধ করে গান শুর করল। কিন্তু তার কণ্ঠ হতে মধুর গান আর বের হল না। খুব ফেস-ফেস সুরে, তালে বেতালে, সুরে বেসুরে সে তার গান শুরু করল। সকল সভাসদ তার গান শুনে হা হা হাসতে লাগল। কেউ দুর-দার করতে লাগল। কেউ উপহাস করতে লাগল।

ঘটনাটা এমন হবে নন্দু কোকিল তা স্বপ্নেও ভাবেনি। অপমানে, লজ্জায় সে রাজসভাতেই কান্না জুড়ে দিল। রাজা তখন তাকে বললেন “মধুর স্বর আর অহংকারের স্বর এক সাথে একই কণ্ঠ দিয়ে বের হতে পারে না। তাই নন্দু কোকিলের গলায় আজ আর মধুর স্বর নেই। অহংকারের স্বর, তার মধুর স্বরকে বের হতে দেয়নি।” অপমানে অভিমানে কাঁদতে কাঁদতে নন্দু কোকিল রাজসভা থেকে বেড়িয়ে গেল।
Top of the page

পরিবর্তন মানিয়ে

-হরপ্রসাদ সরকার

উজ্বয়ন্ত নগরে একবার এক প্রবল ভূকম্প এলো। গ্রামের পর গ্রাম বিধ্বস্ত হয়ে গেল। প্রচুর লোক মারা গেল। জন বসতী বলতে আর কিছুই রইল না। যে কয়েকজন ভাগ্যবান সেই প্রলয়ঙ্করী ভূকম্পে জীবিত ছিল তাদের মধ্যে দুই ব্যবসায়ী ছিল রাজেন্দ্র আর বিনোদ। তারা দুইজন সেই উজ্বয়ন্ত নগর ছেড়ে দুরের এক শহরে চলে গেল। সেখানে তারা আবার নতুন করে তাদের ব্যবসা শুরু করল।

রাজেন্দ্র নতুন ব্যবসা শুরু করলেও সব সময় মন মরা থাকত। সে তার পুরানো সাজানো ব্যবসাকে ভুলতে পারেনি। সে ভগবানকে, ভাগ্যকে তার জন্য সব সময় দোষারোপ করতে লাগল। তার মন সেই পুরানো সুন্দর দিন গুলির মধ্যেই আটকা পড়ে রইল। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, এই পরিবর্তনকে সে মানিয়ে নিতে পারেনি। ফলে সে মরার মতই বেঁচে যেতে লাগল। তার না রইল মনের শান্তি, না রইল মুখের হাসি, না রইল টাকা পয়সা।

অপর দিকে বিনোদ সময়ের এই পরিবর্তনকে মেনে নিলো। সে পুরানো দিনকে ভুলে আবার সব কিছু নতুন করে শুরু করল। নতুন জায়গা, নতুন মানুষের সাথে সে একাত্মা হয়ে গেল। তার ব্যবসা দিনে দিনে বাড়তে থাকল। হাসি আনন্দের মধ্য দিয়েই বিনোদের দিন কাটতে লাগল।

বহু বছর পরে একদিন রাজেন্দ্র বিনোদের সাথে মন মরা হয়ে দেখা করতে এলো। সে ভেবেছিল বিনোদ ও তার মতই হীন-দরিদ্র থাকবে। কিন্তু বিনোদের অপার বৈভব দেখে তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। বিনোদ রাজেন্দ্রকে দুই তিন দিন তার বাড়ীতেই রেখে দিল। দুই বন্ধুতে অনেক কথা হল। বিনোদ রাজেন্দ্রের সব সমস্যা বুঝতে পারল। সে তাকে বলল পাতা ঝড়ে বলেই নতুন পাতা আসে। আকাশে মেঘ কখনো এক জায়গায় থাকে না। আবার সূর্য ও সময়ের সাথে সাথে নিজের জায়গা বদলায় আর এটাই স্বাভাবিক। সে সময়ের এই পরিবর্তনকে মানিয়ে নিতে রাজেন্দ্রকে সে পরামর্শ দিল। পরদিন যখন রাজেন্দ্র ফিরে যেতে লাগল তখন তার মুখে আশার এক আলো ঝলমল করতে লাগল।


Top of the page
All Pages     13    14    15    16    (17)     18    19    ...

Amazon & Flipkart Special Products

   


Top of the page