Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
Read & Learn
 

মজার গল্প

Bengali Story

All Pages   ◍    16    17    18    19    (20)     21    22    23    ...


ঘাটের অতিথি

-হরপ্রসাদ সরকার


An offer to make a Website for you.

hostgator




বকুল দেশের রাজা প্রায়ই রাজমহল ছেড়ে ছদ্মবেশে নিজ দেশের আনাচে কোনাচে ঘুরে বেড়ান। একদিন রাজা বকুল দেশের নিজল নদীর পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন ঘাটে খুব সুন্দর একটি নৌকা বাঁধা আছে। নৌকাটি তাজা ফুলে ফুলে সাজানো। তাজা ফুলের সুভাষ চারিদিক ম-ম করছে। রাজার মনে কৌতূহল হল। তিনি এগিয়ে গিয়ে সেই নৌকাটিতে বসলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক সুন্দরী-রূপসী যুবতী এসে সেই নৌকায় হাজির হল। সে নিজের নৌকায় এক পরপুরুষকে দেখে অবাক হয়ে রাজার পরিচয় জানতে চাইলেন। রাজা নিজের পরিচয় গোপন করে তাকে বললেন, “আমি এমন সুন্দর নৌকা আর এমন সুন্দর ফুল আগে কখনো দেখিনি। তুমি কোথা থেকে এমন সুন্দর ফুল সংগ্রহ কর? আর কেনই বা তুমি তোমার নৌকাকে এত সুন্দর করে সাজাও?”

রাজার কথা সেই যুবতীর খুব ভাল লাগল। সে রাজাকে বলল “চলুন আজ আপনি আমার সাথে ঘুরে বেড়াবেন। তাহলেই সব জানতে পারবেন!” নৌকা গিয়ে ভিড়ল এমন এক ঘাটে যে ঘাটের চারিদিকে শুধু ফুল আর ফুলের বাগান। অসংখ্য রঙ্গিন প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে সেখানে। নিজের দেশে এমন সুন্দর ফুলের বাগান আছে, রাজা তা জানেনই না। রাজা সারাদিন সেই যুবতীর সাথে ফুল বাগানে-বাগানে ঘুরে বাড়ালেন। এমন দিব্য আনন্দ রাজা আর আগে কখনো পাননি। যুবতীটি বলল “হে অতিথি, এই ফুলবাগান গুলি আমারই ফুলবাগান। এটা আমার এক সখ। আমি ফুল, প্রজাপতি, পাখী এগুলিকে নিয়ে থাকতেই ভালবাসি। সারাদিন আমার এদের সাথেই কাটে। এই ফুলগুলি দিয়েই আমি আমার ঘর সাজাই, নৌকা সাজাই। আমার খুব ভাল-লাগে।”

সন্ধ্যার আগেই তারা আবার সেই নৌকা দিয়ে নিজল নদীর এপারে চলে এলেন। বিদায় নেবার আগে রাজা সেই যুবতীকে বললেন “কাল আমি আবার আসতে চাই। তুমি কি আমাকে আবার সেই ফুল বাগানে নিয়ে যাবে?”
যুবতীটি হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না। শুধু একটু হাসি হেসে বিদায় নিলো।

পরদিন রাজা আবার যথা সময়ে যথা স্থানে এসে হাজির। আজো নিজল নদীর ঘাটে সেই নৌকাটি বাধা আছে। তবে তাতে আজ আর গতকালের মত রূপ নাই। আজ সেই নৌকাটিতে তাজা রক্ত আর রক্ত। রাজা খুব অবাক হলেন। তিনি ধীর পায়ে নৌকাটিতে বসলেন। এমন সময় এক ডাকাত, হাতে উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে সেই নৌকায় এসে হাজির হল। তার সারা শরীরে রক্ত। তার তরবারি রক্ত রঞ্জিত। সে নিজের নৌকায় ঘাটের অতিথিকে দেখে অট্টহাসি হেসে বলল “খুব ভাল হয়েছে। তুমি আমার নৌকাতে এসেছ। আমি মনে মনে একজনকে খুঁজছিলাম। মা ভবানী আমার প্রার্থনা শুনলেন। দেখ অতিথি, আমি একজন ডাকাত। অন্য একটি ডাকাত দলের সাথে আমার দলের লড়াই চলছে। আমার এক সাথী মারা গেছে। তাকেই নিয়ে আমি ফিরে এসেছিলাম। তাই নৌকাতে এত রক্ত। জানি আজ হয়তো আমারও মরণ হবে। যদি আমার মরণ হয় তবে তুমি আমাকে এই নৌকায় করে এই ঘাটে নিয়ে এসো, আর এখানেই আমার মৃতদেহ রেখে আপন পথে চলে যেও। হয়তো তোমার কাছে এটাই আমি আমার জীবনের শেষ অনুরোধ করলাম।”

নৌকা নিজল নদীর যে ঘাটে ভিড়ল সে ঘাটে সত্যি দুই ডাকাত দলের মাঝে তুমুল লড়াই চলছে। রক্তে সেই ঘাটের মাটি লাল হয়ে আছে। “রে রে” করে অতিথির সাথী ও উদ্ধত তরবারি নিয়ে সমরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মরণ হল। রাজা কোন ভাবে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে, সেই ডাকাতের মৃতদেহকে নৌকায় নিয়ে নিজল নদীর এ পারে ফিরে এলেন। আর সেই ডাকাতের কথামত তার দেহকে সেই নৌকায় রেখেই নিজের পথে পা বাড়ালেন। রাতে রাজার ঘুম এলো না। সেই ডাকাতের কি পরিণত হল তা জানতে তিনি অতি ভোরেই সেই ঘাটে, সেই নৌকার কাছে এসে হাজির হলেন। কিন্তু কি অবাক কাণ্ড সেই নৌকাতে গতকালের কোন চিহ্ন মাত্র নাই। তার পরিবর্তে সেখানে বসে একজন এই কাকভোরে তানপুরা হাতে অতি নিমগ্ন চিত্তে ভোরের গানের রেওয়াজ করছেন। অতিথিকে নিজের নৌকায় দেখে তিনি অবাক হয়ে রাজার পরিচয় জানতে চাইলেন। রাজা তার নকল পরিচয় দিলেন। দুজনাতে খুব ভাব হল। সেই গায়ক রাজাকে নিজের গানের জলসাতে নিয়ে গেলেন। সারাদিন সেথায় শ্রুতিমধুর গান হল। রাজা খুব উপভোগ করলেন। দিনের শেষে আবার তারা ফিরে এলেন নিজল নদীর এপারে। রাজার কথার কোন জবাব না দিয়ে গায়ক তেমনি মুচকি হেসে নীরবে বিদায় নিয়ে দুরের অন্ধকারে হারিয়ে গেল। রাজাও ফিরে এলেন তার ঠিকানায়।

নিজল নদীর সেই ঘাট, সেই নৌকা রাজাকে ভাবিয়ে তুলতে লাগল। পরদিন ভোরে রাজা আবার সেই ঘাটে গিয়ে হাজির হলেন। আজ সেই নৌকা ধন-দৌলতে পূর্ণ। অনেক হীরা, মনি, মুক্তা চকচক করছে। এই নির্জন স্থানে, একটি নৌকা এত অমূল্য সম্পদে পূর্ণ। রাজা আজ আর নৌকাতে উঠলেন না। একটু দূরে দাঁড়িয়ে রইলেন। এমন সময় সেই নৌকাতে এসে উঠলেন এক সওদাগর। তিনি রাজাকে দেখে বললেন “আরে অতিথি এসো, এসো। আমার নৌকাতে এসো। আজ তোমাকে সাথে নিয়েই আমি আমার ব্যাপার করি। তুমি এর যথাযথ পারিশ্রমিক ও পাবে। চলে এসো।” তারা নিজল নদীর এক ঘাটে গিয়ে উঠলেন। সেখানে আজ যেন মূল্যবান পাথর কেনা বেচার হাট বসেছে। এমন হাট রাজা আগে কখনো চোখেই দেখেননি। নিজের রাজ্যেই এমন হাট আছে রাজা তা ও জানতেন না। সেই সওদাগর অনেক ধন-সম্পদ কেনা বেচা করল। অনেক লাভ হল তার। দিনের শেষে তারা আবার ফিরে এলো নিজল নদীর এ পারে। সওদাগর রাজাকে বললেন তোমার যা দরকার তুমি এই নৌকা থেকে নিয়ে নাও। এই বলে তিনি নৌকা আর ধন-রত্ন তেমনি ফেলে রেখে মুচকি হেসে নিজের পথে হেটে চললেন আর আধারে মিলিয়ে গেলেন। নৌকা ভরা ধন দৌলত এমনি পরে রইল ঘাটে। রাজা কিছুই ভেবে পাচ্ছিলেন না। তিনি ও হতভম্বের মত খালি হাতেই ফিরে গেলেন নিজের আবাসে।

পরদিন তিনি আবার এলেন নিজল নদীর সেই ঘাটে। কিন্তু আজ আর ঘাটে সেই নৌকা নাই। রাজা বেশ অবাক হলেন। তিনি অনেক খোঁজাখুঁজি করলেন, কিন্তু কোন লাভ হল না। তিন দিন এমনি কাটল। শেষ রাজা গুপ্ত পথে রাজপ্রাসাদে ফিরে এলেন। রাজপ্রাসাদে এসেই তিনি জরুরী সভা ডাকলেন। সভায় তিনি সবাইকে সব কথা খুলে বললেন। মন্ত্রী-সন্ত্রী সবাই রাজার কথা শুনে খুব অবাক হলেন। শুধু রাজগুরু অবাক হলেন না। তিনি মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন। তিনি বললেন “হে রাজন, আপনারা কেউ জানেন না, কয়েকশত বছর আগে দূর দূর পর্যন্ত জন মানব হীন সেই ঘাটে এক মহান তপস্বী থাকতেন। পাশেই উনার তপোবন ছিল। আজ সেই তপস্বী নেই কিন্তু তার পবিত্র তপ আজো সেই জায়গাকে পবিত্র রেখেছে। আজো সেই তপস্বীর সূক্ষ্ম শরীর মানুষকে জীবনের নানান শিক্ষা দিয়ে চলেন। হে রাজন, আপনার সাথেও তেমনটাই হয়েছে। সেই তপস্বীর মায়া রচনা আপনাকে এই শিক্ষা দিতে চেয়েছিল যে, জীবনে আপনি যেমন নৌকায় বসবেন তেমন ঘাটেই গিয়ে উঠবেন। যেমন সঙ্গী চয়ন করবেন তেমন পরিবেশেই গিয়ে পড়বেন।”
Top of the page

হাতের মাঝে ঝড়

-হরপ্রসাদ সরকার

সে অনেক আগের কথা। এক গ্রামে এক দুখী মার এক জোয়ান ছেলে ছিল শ্যামলাল। সে খুব মেহনতি আর সৎ ছিল। কিন্তু এক সময় সে কুসঙ্গে পরে কাম-কাজ ছেড়ে মদের নেশায় ডুবে গেল। দিন রাত সে মদের মধ্যেই ডুবে থাকতে লাগল। দুখী মার দুঃখ আরো বেড়ে গেল। তিনি ছেলেকে অনেক বোঝালেন কিন্তু কোন লাভ হল না। ধীরে ধীরে শ্যামলাল কাজ-কর্ম ও ছেড়ে দিল।শেষে এক সময় মদের টাকা জোগাড় করতে না পেরে সে ঘরের জিনিস পর্যন্ত বিক্রি করতে লাগল। কিছুদিন পরে ছেলের দুঃখ বুকে নিয়েই দুখী মা খুব অভাব অনটনে, মারা গেলেন।

মা’র মৃত্যু ছেলের চেতনাকে একটু আঘাত করল। ধীরে ধীরে তার বিবেক তাকে দংশন করতে শুরু করল। দিনে দিনে সে অনুধাবন করতে লাগল যে সে কি ভুল করছে। এত বুঝেও, নিজের ঘোর অনিচ্ছা স্বত্বেও সে নিজেকে মদের নেশা থেকে দূরে রাখতে পারল না। যেন কেউ তাকে জোর করে সকাল বিকাল মদের নেশার মধ্যে ধাক্কা দিয়ে ফেলে রেখে চলে যায়।

বিবেক দংশন আর নেশার যন্ত্রণায় সে পাগলের মত হয়ে শেষে কংকালসার দেহ নিয়ে একদিন আত্মহত্যা করতে নদীর পারে চলে গেল। সে নদীর অথৈ জলে ডুবে যাওয়ার প্রস্তুতি করছিল। তখন হঠাৎ এক সাধু পুরুষ তার পথ আটকে দাঁড়ালেন। তিনি তার দুঃখের কারণ জানতে চাইলেন। শ্যামলাল তার সব কথা সেই মহাত্মাকে খুলে বলল। তার কথা শুনে সেই সাধু হা-হা-হা করে খুব হাসলেন। তিনি বলতে লাগলেন “হরেক মানুষের হরেক নেশা, আবার সকল নেশার একই দশা।” তিনি বললেন “ তুমি যদি সত্যি তোমার নেশা থেকে মুক্তি পেতে চাও তবে কাল এখানে এই সময়েই আবার এসো, আমি তোমাকে নেশা ছাড়ানোর উপায় বলে দেব।” শ্যামলাল খুশি মনে বাড়ী ফিরে গেল।

এদিকে সাধু নিজের কুঠিরে ফিরে গিয়ে একটা মরিচ গাছ থেকে কতক খুব ঝাল মরিচ আনলেন। তারপর তাদেরকে টগবগে গরম তেলের মধ্যে সিদ্ধ করে নিলেন। সেই গরম তেলটাকে ঠাণ্ডা করে তিনি একটা সুন্দর কৌটাতে ভরে পরদিন যথা সময়ে যথা স্থানে হাজির হলেন। শ্যামলাল আগে থেকেই সেখানে হাজির ছিল। তিনি শ্যামলালকে বললেন “হে বৎস, এই তোমাকে আমি নেশা ছাড়াবার ঔষধ দিলাম। তবে মনে রাখবে মনকে বেশ শক্ত রাখতে হবে। যখনই তোমার নেশা করার মন হবে তখন এই এক কণা তেল হাতের তর্জনীতে নেবে। মন্ত্র বলবে
‘ঝড় নিলাম হাতের মাঝে
কোন নেশা আসবে কাছে?’
এই বলে হাতের এক কণা তেলকে দুই চোখে মালিশ করে দেবে। যতবারই নেশা পিপাসা জাগবে ততবারই শক্ত মনে এমনটা করবে। কোন নেশাই আর তোমার কাছে আসবে না।”

সেই সাধু আর শ্যামলাল দুজনেই অতি খুশি-মনে যে যার ঘরে ফিরে গেল। রাতে শ্যামলালের মদের খুব পিপাসা জাগল। সে উঠে গিয়ে সাধুর সেই ঔষধ হাতে নিয়ে খুব ভক্তি সহকারে মন্ত্র পড়ল
‘ঝড় নিলাম হাতের মাঝে
কোন নেশা আসবে কাছে?’
মন্ত্র পড়ার শেষে যেই না তার দুই চোখে তেল মালিশ করল অমনি মরিচের এমন ঝাল লাগল যে, সে পাগলের মত লাফাতে লাগল, মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগল। শেষে কোন উপায় না পেয়ে দীর্ঘসময় ধরে ঘড়া ঘড়া জল নিজের চোখে ডালতে লাগল। অনেক পরে তার চোখের ঝাল কম হল। ততোক্ষণে তার নেশার পিপাসা চলে গেছে। শ্যামলাল তার নেশা আর ঝাল তুই থেকে হাফ ছেড়ে বাঁচল।

সে সাধুকে মনে মনে খুব গালি দিল, কিন্তু মনে মনে খুব খুশি ও হল যে আজ আর তার নেশার মধ্যে ডুবতে হল না। সে নিজের মনকে পাথরের মত শক্ত করে, যখনই নেশার ইচ্ছা হত কয়েক কলসি জল কাছে রেখে সাধুর সেই ঔষধ চোখের কোনে লাগিয়ে দিত। ঝাল ঝড়ে, নেশার কলসির জলে ধুয়ে যেত। ধীরে ধীরে সে তার কুসঙ্গ থেকে সরে এলো আর কিছুদিনের মধ্যেই আগের শ্যামলাল হয়ে গেল।
Top of the page

দাদার লন্ঠন

-হরপ্রসাদ সরকার

সুজন আর নন্দু দুই ভাই। কৃষিকাজ করেই তাদের সংসার চলে। সুজন খুব সৎ আর মেহনতি। দিন রাত সে কাজ করে সংসারের ভরন পোষণ যোগায়। কিন্তু তার বিমাতা ভাই নন্দু সারাদিন বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর গল্প গুজব করেই দিন কাটায়। সংসারের দেনা পাওনার তার কোন চিন্তা নেই। তার উপর আবার সে যার-তার সাথে ঝগড়া করে ঘাটের ঝগড়া বাড়িতে ঢুকায়। সুজন, নন্দুকে অনেক বলল, অনেক বোঝাল কিন্তু সে কোন কথাই কানে তুলে না। তবে সে সুজনকে খুব ভালবাসত। সুজন ও তাকে খুব ভালবাসত। সুজন কোন ভাবেই তার ভাইকে পথে ফিরাতে পারল না।

শেষে একদিন, এক রাতে দুই ভাই এক সাথে খেতে বসল। ভাল খাওয়া দাওয়া হল। খাওয়া দাওয়ার শেষে নান্টু দেখল তার ভাই সুজন হাতে লন্ঠন আর কোদাল নিয়ে এই রাতে সোজা ক্ষেতের দিকে চলছে। নান্টু বেশ অবাক হল। সে ভাইয়ের পিছন পিছন গিয়ে ভাইকে এর কারণ জিজ্ঞাস করল। সুজন হাসিমুখে বলল “ভাই, বৌ-বাচ্চা নিয়ে আমাদের এত বড় সংসার, আমরা দুজনে কাজ না করলে আমাদের সংসারের উন্নতি হবে না। সারাদিন আজ আমি আমার ভাগের কাজ করলাম। এখন আমি তোর ভাগের কাজ করতে যাচ্ছি। তুই সারাদিন যেই যেই ভুল করেছিস, সুদাসল সহ তাদের দাম দিতে যাচ্ছি।”

সুজনের এই কথা শুনে নান্টু বেশ হাসল। সে মনে মনে ভাবল ভাই আজ পাগল হয়ে গেছে। সে ঘরে এসে সোজা ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু সুজনের যেই কথা সেই কাজ। সে সারারাত কাজ করে সকালে ঘরে ফিরে এলো। হাত মুখ ধুয়ে, সামান্য কিছু খেয়ে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে, স্নান খাওয়া সেরে সে আবার ক্ষেতে কাজ করতে বেড়িয়ে পড়ল। সারাদিন কাজ করে বিকালে ফিরে এলো। সেই দিন রাতের বেলায় আবার দুই ভাই এক সাথে খাওয়া দাওয়া করল। খাওয়া শেষে আজও সুজন লন্ঠন আর কোদাল হাতে ছোট ভাইয়ের ভাগের কাজ করতে ক্ষেতে বেড়িয়ে পড়ল। নন্টু কিছু বলল না, কিন্তু মন খারাপ করে ঘরে শুয়ে রইল। তবে তার চোখে ঘুম এলো না। গভীর রাতে সে শুধু একবার ঘর থেকে বের হয়ে দেখল ঐ দূরের মাঠে একটি লন্ঠন জ্বলছে আর তার ভাই কাজ করে চলছে।

তৃতীয় দিন রাতেও একই ঘটনা ঘটল। রাতে খাওয়া দাওয়ার পর সুজন যেই লন্ঠন আর কোদাল হাতে বের হল অমনি সে জ্ঞান হারিয়ে উঠানে পড়ে গেল। নন্দু সহ বাড়ীর সবাই দৌড়ে এলো। ঘটি ঘটি জল ঢালা হল। বহুক্ষণ পরে সুজনের জ্ঞান ফিরে এলো। তার জ্ঞান ফিরে আসতেই নন্দু হাউ-মাউ করে কেঁদে ভাইয়ের পায়ে লুটিয়ে পড়ল। সে আর ভাইয়ের পা ছাড়ল না। কাঁদতে কাঁদতে সে বলতে লাগল “দাদা, তুই আমাকে ক্ষমা কর। তুই আমাকে ক্ষমা কর। আমি আর কোন দিন তোর কথার বাইরে যাব না। এই দেখ আমি এখন থেকেই আমার ভাগের কাজ সব নিজে করব। তোকে আর আমার জন্য কোন দিন কষ্ট করতে হবে না।” এই বলে সে হাতে দাদার লন্ঠন আর কোদাল হাতে নিয়ে এই গভীর রাতে সজল নয়নে সোজা ক্ষেতের দিকে পা বাড়াল। এক অজানা খুশী, আনন্দ আর শান্তিতে নান্টুর মন ভরে উঠল। ভাইয়ের এই পরিবর্তনে আনন্দে, খুশীতে সুজনের চোখ বেয়ে আনন্দের অশ্রু নেমে এলো।
Top of the page

বাঘ বানর

-হরপ্রসাদ সরকার

এক বনে একটি দুষ্ট বানর ছিল। সে সেই বনেরই একটি বাঘকে সদাই খুব বিরক্ত করত। বাঘটি যখন গাছের নীচে ঘুমিয়ে থাকত তখন বানরটি গাছের উপর থেকে শক্ত ফল দিয়ে, কখনো পচা ফল দিয়ে বাঘটির মাথায়, পিঠে ঢিল মারত, আঘাত করত। একদিন সেই বাঘটির সহ্যের সীমা পার হয়ে গেল। সে দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে সেই বানরটিকে বলল “আরে ও দুষ্ট বানর, তুই আমাকে অনেক যন্ত্রণা দিয়েছিস। কিন্তু মনে রাখ, একদিন আমার হাতেই তোর মরণ হবে। আজ থেকে এটাই আমার জীবনের লক্ষ্য।”

এ কথা শুনে সেই বানর বলল “দূর হ রে পাজী বাঘা। আমাকে মারতে তোকে প্রথমে গাছে চড়তে হবে। কিভাবে গাছে চড়তে হয় তুই প্রথমে তা শিখ। আর তত দিন আমার ছোঁড়া পচা ফলের গন্ধ সহ্য কর। আমি জানি তুই কখনোই আমার কিছুই ক্ষতি করতে পারবি না।”

বাঘ বলল, “মনে রাখিস বানর, দিন কোন দিন কারো সমান যায় না। এত অহংকারী হোশ না। সময় বদলায়, দিন ও বদলায়। এক দিন আমার ও সময় আসবে, আমার ও দিন আসবে। সে দিনটা শুধু আমরি হবে। আর ঐ দিন আমি তোকে কোন ভাবেই ছাড়ব না।” বানর উপহাস করে বলল “দূর বোকা বাঘা। তুই আমার ঢিল খেতে খেতেই একদিন গাছের তলে মরে পরে যাবি। হা-হা-হা।” সময় বয়ে গেল। বাঘটি আর বানরের নাগাল পেল না ফলে তার মনের ঝাল ও মিটল না। তবে সে হার ও মানল না। বানরটি বনের যেই গাছের উপর ঘুমিয়ে রাত কাটাত, বাঘটিও সেই গাছের নীচেই পড়ে থাকত। যদি মনের ঝাল মিটানোর কোন সুযোগ এসে যায়!

এক দিন সেই সুযোগ ও এসে গেল। বানরটি এক রাতে ঘুমের মধ্য পাশ ফিরতে গিয়ে হাত ফসকে ধপাস করে সোজা মাটিতে পড়ল। নীচে বাঘ তৈরীই ছিল। সে ধপ করে বানরটির ঘাড় ধরে বসল, আজ সে বানরকে আর ছাড়ল না। বানরটি বুঝতেই পারল না, হঠাৎ এ কি হয়ে গেল! সে নিজের মরণকে সামনে দেখে বাঘের পায়ে পড়ে অনেক অনুনয় বিনয় করতে লাগল, নিজের প্রাণ ভিক্ষা চাইতে লাগল। মৃত্যু মুখে তার মনে পড়তে লাগল নিজের দম্ভ, নিজের অহংকার, ইতিহাস, উপহাস, নিজের কুকাজ। তার সেই সব কৃতকর্মই যেন মরণ হয়ে আজ তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। জীবনের প্রথম এই শুধু একবারই তার হাত ফসকাল, আর ঐ দিনেই নিজের প্রাণ দিয়ে তার সব হিসাব বরাবর করতে হল।


Top of the page
All Pages     16    17    18    19    (20)     21    22    23    ...

Amazon & Flipkart Special Products

   


Top of the page