Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
Read & Learn
 

মজার গল্প

Bengali Story

All Pages   ◍    16    17    18    19    20    21    (22)     23   


হিসাবধন

-হরপ্রসাদ সরকার


An offer to make a Website for you.

hostgator




সেই যুগে এক গ্রামে গুরুধন নামে এক দোকানদার ছিল। তার দোকান ভালই চলত। তবে এক সমস্যা ও ছিল। গ্রামের অনেক লোক তার দোকান থেকে অনেক জিনিস-পত্তর ওধার নিয়ে যেত। তারা আর কখনোই সেই টাকা ফিরিয়ে দিত না। আর এক সময় গুরুধন ও তা ভুলে যেত। ফলে তার কিছু ক্ষতিও হত।

তার বউ তাকে সদাই বলত পাওনার হিসাব একটি কাগজে লিখে রাখতে। এতে ভুলে যাবার সম্ভাবনা কম। ফলে ক্ষতি অনেকটাই আটকানো যাবে। কিন্তু গুরুধন খুব আলসে ছিল। সে আলস্যের কারণে কোন কিছুই লিখত না। সে সব কিছু মনে রাখার চেষ্টা করত, কিন্তু পারত না। সে মনে মনে ভাবল আমি যদি আমার স্মৃতি শক্তিকে বাড়াতে পারি, তবে সব কিছুই আমি মনে রাখতে পারব। তখন লেখা-লেখির ঝামেলা ও আর থাকবে না।

এই ভেবে সে একদিন তার গুরুদেবের কাছে গেল। গুরুদেব ছিলেন সিদ্ধপুরুষ। গুরুদেব তাকে বললেন “হে পুত্র, ভুলে যাওয়া হল একটা আশীর্বাদ। ভগবানের দেওয়া মানুষের পরম বন্ধু। তুমি এমন কিছু বর চেয়োনা, যার কারণে সব কিছু তোমার মনে থাকে। এতে কখনোই তোমার অমঙ্গল বই মঙ্গল হবে না।”

কিন্তু গুরুধন গুরুদেবের কোন কথাই শুনল না। শেষে গুরুদেব তাকে এক মন্ত্র দিলেন। এই মন্ত্রের গুনে গুরুধনের মন থেকে কোন কিছুই কখনো মুছে যাবে না। ছেলেবেলা থেকে জীবনের সব কিছু তার মনে পড়ে যাবে আর এই স্মৃতি কখনোই বিনষ্ট হবে না। গুরুদেব তাকে কঠোর সতর্কতা বানী শোনালেন, যদি কোনদিন সে এই গোপন মন্ত্রের কথা কাউকে বলে তখনিই তার মৃত্যু হবে। গুরুবাক্য অন্যথা হবার নয়। এই কঠোর বার্তা শুনিয়ে গুরুদেব সেখান থেকে বিদায় নিলেন।

আজ গুরুধন খুব খুশি। এবার আর কোন কথাই তার মন থেকে মুছে যাবে না। খদ্দেরদের সব চালাকির এবার সে যোগ্য জবাব দিতে পারবে। গুরুদেবের কাছে থেকে সে খুশি মনে বাড়ী ফিরছিল। পথে তার পরম মিত্র ‘ অতুল কবি ’ এর সাথে তার দেখা। অতুল কবি’র গান আর কবিতা গুরুধনের খুব ভাল লাগত। কিন্তু আজ অতুল কবিকে দেখতেই গুরুধনের মনে পড়ে গেল যে এই কবি বহুবার তার দোকান থেকে খাতা কলম নিয়ে গেছে কিন্তু আজো এক পয়সা দেয়নি। আর সেই সবের হিসাব করলে হয় দেড় হাজার দেড় টাকা। তার উপর ছোট বেলায় এই অতুল কবি গুরুধনের বাড়ী থেকে যত লাউ-লেবু বিনা পয়সায় নিয়ে গেছে তা যোগ করলে মোট পাঁচ হাজার পাঁচ টাকা। এত টাকা কি ছেড়ে দেওয়া যায়? তাই কাছে আসতেই সে অতুল কবির কাছে পাঁচ হাজার টাকার দাবী করে বসল। এত টাকার কথা শুনে তো অতুল কবি আকাশ থেকে পড়ল আর ভাবল গুরুধন নিশ্চয়ই তাকে ঠকানোর চেষ্টা করছে, ধাপ্পাবাজি করে টাকা হাতানোর মতলবে আছে। অতুল কবি গুরুধনের প্রচণ্ড বিরোধিতা করল। দুইজনেতে খুব বাক-বিতণ্ডার পর খুব মারামারিও হল। শেষে গ্রামবাসীরা দুজনকে আলাদা করল।

গুরুধনের নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে। মাথার চুল কিছু ছিঁড়ে অতুল কবির হাতের মুঠায় আছে। গায়ের জামা ছিঁড়ে অসংখ্য জানালা হয়ে আছে। গ্রাম বাসীরা তাকে এক মরা গাছের গুড়িতে বসিয়ে, অতুল কবির সাথে ঝগড়া করা থেকে বিরত থাকতে আবেদন, নিবেদন, অনুরোধ, আদেশ দিতে লাগল। আর গুরুধন হাঁপাতে হাঁপাতে মাথা তুলে এক একজন গ্রামবাসীকে দেখে মনে মনে তার হিসাব করে। এই হিসাব থেকে পনের, কুড়ি বছর আগের একটা সুই পর্যন্ত বাদ যায় না।

ফলে যারা গুরুধন আর অতুল কবিকে আলাদা করতে এল, গুরুধনকে শান্ত করার চেষ্টা করল, এবার গুরুধন তাদের সবাইকে সবার হিসাব বলে দিতে লাগল। তোমার ৫০০ টাকা বাকী, তোমার এক হাজার টাকা বাকী। পনের বছর আগের একটি সুপারির দামের কথা কি কারো মনে থাকার কথা? যা হবার তাই হল। আগে অতুল কবি উত্তেজিত হয়েছিল। এবার গ্রামবাসীরা। সবাই ভাবল, অতুল কবিই ঠিক বলছে। গুরুধন টাকা হাতানোর নতুন ফন্দি এঁটেছে। এই ফন্দি মরণ ফাঁদ হওয়ার আগে এখানেই শেষ হওয়া দরকার। ফলে অতুল কবির বাকী কাজটা গ্রামবাসীরাই করেদিল। মেপে মেপে সবাই এক সাথে, যার যার হিসাব দিল বরং হিসাবের বেশীই দিয়ে দিল। নিজের জামা, ধুতি, চাঁদর, ছাতা, গামছা, জুতা আর মুখের কয়েকটা দাঁতের কোন আর হিসাব পেল না গুরুধন। অনেক হাতে পায়ে ধরে সে গ্রামবাসীদের থেকে মুক্তি পেয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঘরে গিয়ে পৌঁছল।

বৌয়ের কোন কথার আর জবাব দিল না সে। চুপ চাপ খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ল আর মনে মনে গুরুদেবকে ডাকতে লাগল। গুরুদেব এই বিপদ থেকে আমাকে বাঁচাও, রক্ষা কর গুরুদেব, রক্ষা কর। একসময় গুরুধন ঘুমিয়ে পড়ল। স্বপ্নে গুরুদেব দেখা দিলেন। তিনি বললেন, “পুত্র, এই কারণেই আমি বার বার তোমাকে বারণ করেছিলাম। বলেছিলাম, ভুলে যাওয়াটা ভগবানের দেওয়া একটা আশীর্বাদ। তুমি আমার কোন কথাই শুননে না। এক বিশাল শক্তি হাতে নিয়ে বসলে। হে পুত্র, শক্তি আর ক্ষমতার সাথে সাথে দায়িত্ব ও চলে আসে। তুমি শুধু তোমার স্বার্থে এই বিশাল শক্তিকে ব্যবহার করেছ। ফলে বিনাশ তো অবশ্যম্ভাবী।”

কাতর সুরে গুরুধন বলল, “আমাকে পথ দেখান গুরুদেব, আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করুন।”

গুরুদেব- একটাই পথ পুত্র, তুমি সততা আর নিষ্ঠার সাথে তোমার এই ক্ষমতাকে সমাজের উন্নতির কালে লাগাও, মানুষের সেবার কাজে লাগাও। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।

এক নতুন দিশা পেল গুরধন। সে পরম সততা আর নিষ্ঠার সাথে তার গুরুর কথা মতই কাজ করতে লাগল। দেখতে দেখতে তার খুব প্রভাব বাড়তে লাগল। দশ গ্রামের ধনী, গরিব সবাই যে কোন সামাজিক কাজের অথবা যে কোন অনুষ্ঠানের হিসাব-নিকাশের দায়িত্ব গুরুধনকেই দেয়। হিসাবে এক পয়সার ও এদিক সেদিক হয় না। গ্রামবাসীরা তাই তাকে আদর করে গুরুধনের বদলে ডাকে হিসাবধন।

স্বর্ণ প্রাপ্তি

-হরপ্রসাদ সরকার

এক গ্রামে একটি ছেলে ছিল রাজু। সে ছিল আলসে আর গপ্পখোর। দিন রাত সে বন্ধু বান্ধবদের বাজে আড্ডায় ঘুরে বেড়ায়। ঘরে এসে খায়-ঘুমায় আবার বেড়িয়ে পরে। তার বাবা দিন মজুরি করে সংসার চালায়, রাজু সে খবর রাখে না।

একদিন রাজুর বাবা চোখ বুজলেন। রাজু পড়ল অথৈ জলে। বৃদ্ধ মা আর ছেলের সংসার কোন ভাবেই চলে না। একদিন খাওয়া জোটে তো অপরদিন খাওয়া জোটে না। আরাম আয়েস এবার রাজুর পিছনে কালসাপ হয়ে দৌড়াতে লাগল। রাজু দিশাহারা হয়ে দিন রাত এদিক ওদিক ছোটা ছোটি করে, তার চোখের জল আর নাকের জল এক হয়, কিন্তু কোন লাভ হয় না। সে যে কাজেই যায় সেখানেই দুর-দার তাকে সইতে হয়। আবার কেউ কেউ এক দুই ঘা লাগিয়ে তাকে তাড়িয়ে দেয়। কারণ ও থাকে, রাজু কাজ জানে না দু পয়সার কিন্তু বিজ্ঞ আলাপ তার হাজার টাকার। তার উপর আবার যেখানে সুই না লাগবে সেখানে কুড়াল লাগিয়ে কাজের এবং সম্পত্তির খুব লোকসান করে। ক্রমে অবস্থা এমন দাঁড়াল যে তার ভিক্ষা করে খাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় রইল না।

তেমনি এক দিনে সে খবর পেল যে গ্রামের শেষ কোনে, বড় মাঠটিতে মাটি খুঁড়ে অনেকেই নাকি ছোট বড় তরতাজা সোনার টুকরা পাচ্ছে। গ্রামের সব মানুষ সেই মাঠটিতে গিয়ে পড়েছে। রাজুও গেছে। সে দেখল, বিশাল বড় মাঠ, এপার ওপার দেখা যায়না। প্রচুর লোক কোদাল গেনতি নিয়ে মাটি খুঁড়ছে। রাজু বাবুর মত মাঠে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। ভাবল সব বাজে কথা। কোথাও কিছু মিলবে না। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা হয়ে এল। সন্ধ্যার ঠিক আগে সবাইকে অবাক করে, রাজুর ঠিক সামনেই অনেকেই বেশ ছোট-বড় সোনার টুকরা পেল। আর সোনার টুকরা পেতেই চারিদিকে হাহাকার পরে গেল।

পরদিন ও আবার একই অবস্থা। রাজু মাঠে গিয়ে বাবুর মত ঘুরতে লাগল। ভাবল দেখি আজ কি হয়। আজ হয়তো কিছুই মিলবে না। কিন্তু আজো সন্ধ্যার ঠিক আগে রাজুর সামনেই আরো কয়েকজন সোনার টুকরা পেল।

রাজু বাড়িতে এসে হিসাব করতে লাগল, সবাই সোনার টুকরা সন্ধ্যার ঠিক আগেই পাচ্ছে। কাল আমিও কোদাল নিয়ে যাব। আর নিজের হিসাব মত সে সন্ধ্যার ঠিক আগে কোদাল নিয়ে মাঠে গেল আর মাটি খুঁড়তে লাগল। কিন্তু বাকিরা সোনার টুকরা পেলেও সে কিছুই পেল না। পর দিনও ঠিক একই অবস্থা। রাজু সন্ধ্যার ঠিক আগে গিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল কিন্তু অনেকে সোনার টুকরা পেল, রাজু পেল না। এমনি চলল আরো তিন চারদিন। গ্রামের প্রায় সবাই কিছু না কিছু পেল। শুধু রাজুই কিছু পেল না।

ঐ সময়েই সেই গ্রামে এক মহাসাধকের আগমন ঘটে। তিনি খুবই সিদ্ধপুরুষ ও জ্ঞানী। অনেকেই উনার কাছে গিয়ে নিজের নিজের দুঃখ কষ্টের নিবারণের উপায় জেনে এল। রাজুও গেল। সে নিজের দুঃখের কথা বলে খুব কাঁদল। কিন্তু সেই সাধন বিচলিত হলেন না। তিনি বললেন গ্রামের সবাই তো সোনার টুকরা পেল, তুমি পেলে না?

- ‘আমার ভাগ্য খারাপ গুরুদেব। আমি প্রতিদিন সন্ধ্যার সময় গিয়ে মাটি খুঁড়েছি কিন্তু কিছুই পাইনি।’ সাধক হেসে বললেন, “কেন? তুমি সন্ধ্যার সময় কেন গিয়েছিলে। সকাল বেলাতে কেন যাওনি।” - ‘সকাল বেলায় গিয়ে কি লাভ হত। সোনার টুকরা তো সন্ধ্যার সময়ই পাওয়া যেত।’ সাধক প্রচণ্ড ধমক দিয়ে তেড়ে উঠলেন, “রে মূর্খ, নিজেকে খুব চালাক ভাবিস। চালাকির দ্বারা কখনো কি মহৎ কাজ হয়? ভেবে দেখ, নিজের দিকে চেয়ে দেখ, তুই কি সোনা পাবার মত পরিশ্রম করেছিস? যারা ঐ মাঠে সারাদিন হার খাটুনি খেটেছে তারাই সোনা পেয়েছে। তুই কতটুকু মেহনত করেছিস যে সোনা পাবি? সোনা পেতে গেলে সোনার মত পরিশ্রম ও করেত হয়, চাপ তাপ সহ্য করতে হয় । যা: দূর হ, মূর্খ, দূর হ এখান থেকে।” সাধক লাঠি হাতে তেড়ে আসতেই রাজু ভয়ে পালিয়ে গেল।

সাধক পিছে পিছে আবার চেঁচিয়ে বললেন – ‘মাঠে গিয়ে আবার দুই দিন বাবুর মত ঘুরে বেড়ানো! সুযোগ কি বার বার আসে রে মূর্খ! আবার যদি এদিকে আসিস তবে তোর মাথা আমি ভেঙ্গে ফেলব।’ পরদিন সকালে গ্রামবাসীদের সাথে রাজুও কোদাল-সাবল নিয়ে মাঠে গেল, কিন্তু হায়, তারা দেখল যে বিশাল পরিমাণে রাজার সেনা হাতিয়ার নিয়ে সেই মাঠটিকে ঘিরে রেখেছে। কাউকে সেই মাঠের কাছেই ঘেঁসতে দেয়নি তারা। রাজু আর কোন সুযোগই পেল না। একে একে গ্রামের সবার দিন ফিরল, কিন্তু রাজু তেমনি কি তেমনিই রয়ে গেল।


Top of the page
All Pages     16    17    18    19    20    21    (22)     23   

Amazon & Flipkart Special Products

   


Top of the page