Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
Read & Learn
 

মজার গল্প

Bengali Story

All Pages   ◍    17    18    19    20    21    22    (23)     24   


খারাপ সময়

-হরপ্রসাদ সরকার


An offer to make a Website for you.

hostgator




এই কিছুদিন আগের একটি সত্য ঘটনা। আমার তিন শিক্ষিত বন্ধু সাগর, বিশাল আর মিঠু নিজ নিজ ব্যবসায় খুব লোকসানে পড়ল। খুব লোকসান বলতে খুব লোকসান। জমা পুঁজি, ঘরের সোনাদানা সব তো শেষ হলই, সাথে ব্যবসাও বন্ধ হয়ে গেল। তারা যে কাজেই যায়, সেই কাজেই ক্ষতি আর ক্ষতি। এক টাকা লাভ হলে, দশ টাকা লোকসান। তারা ভেবেই পাচ্ছিল না, কি করবে না কি করবে। অগত্যা তিন যুবক-বন্ধুই ঘরে বসে গেল। খুব খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে তারা জীবন অতিবাহিত করতে লাগল। সবারই বৌ-বাচ্চা আছে ফলে পরিস্থিতি খুব খারাপ দাঁড়াল। ঘরে বসার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বন্ধু তিন রকমের কাজ করতে লাগল।

বিশালঃ- এই খারাপ সময়টাকে সে কিভাবে কাজে লাগবে তাইই ভাবতে লাগল। এই খারাপ সময়টা যেন বৃথা না যায়, এই ভেবে সে বহু কষ্ট করে একটা কম্পিউটার কিনে আনল। আর দিন-রাত, নিষ্ঠার সাথে খুব পরিশ্রম করে, কম্পিউটার নিয়ে পড়াশুনা করতে লাগল। এক পা, এক পা করে এগোতে এগোতে সে কিছুদিনের মধ্যেই কম্পোটারর সাগরে গিয়ে পড়ল। সে আর কম্পিউটার ছাড়ল না- কম্পিউটার ও তাকে ছাড়ল না। সে দ্রুত বেগে তার ভাল সময়ের দিকে দৌড়াতে লাগল, আর ভাল সময়টাকে আপ্রাণে পরিশ্রম করে নিজের দিকে টানতে লাগল।

মিঠুঃ- সে কিছুদিন হতাশ হয়ে ঘুরাঘুরি করে শেষে বিশালকে দেখে, বিশালেরই অনুকরণ করতে লাগল। তবে অন্য ভাবে। কম্পিউটারে তার মাথা ছিল না। সে একটা হাতের কাজ শিখতে শুরু করল। সে সেলাই মেশিন কিনে এনে সেলাই শিখতে লাগল। ছয় মাসেই সে নিজেকে সঠিক কাবিল বানিয়ে ফেলল। আর তার টুকটাক রোজগার ও শুরু হয়ে গেল।

সাগরঃ- সে সারাদিন ঠাকুর ঠাকুর করে ঠাকুর ঘরেই পরে থাকল। TV তে খেলা দেখে, খবর দেখে, দুই তিনটা পত্রিকা পড়ে, ম্যাগাজিন পড়ে সময় কাটাতে লাগল। সে আবার ব্যবসা শুরু করতে ভাল সময়ের অপেক্ষা করতে থাকল।

আজ প্রায় দুই বছর পরে, বিশাল এক বিরাট কম্পিউটারের ব্যবসার মালিক। তার দিন দুনি তো রাত চৌগুণ ব্যবসা বেড়ে চলছে। গাড়ি, বাড়ি সব লাইন ধরে তার দিকে আসতে লাগল। মিঠু ভাল দর্জির কাজ শুরু করল। কিছু টাকা জমতেই সে তার পুরানো ব্যবসা ও শুরু করল। এখন সে এক সাথে দুটি ব্যবসা চালাচ্ছে। সে চার পাঁচ জন কর্মচারীও রেখেছে। আর সাগর? তার ভাল সময় আজো এলো না। আজো সে বাড়িতে বসে TV দেখে, পত্রিকা পড়ে। ঘরে খুব অশান্তি। আর এই অশান্তির কারণে সে ঠাকুরের উপরে বিশ্বাস ও হারিয়েছে। আজ সে আর ঠাকুর ঘরে যায় না। তবে ব্যবসা শুরু করতে ভাল সময়ের অপেক্ষা ঠিকই করছে।

বুড়ি ভিখারি

-হরপ্রসাদ সরকার

সেই সময়ে সেই রাজার দেশে, এক পাহাড়ের পাদদেশে, এক গ্রামে এক গরিব বিধবা মা ও তার মেয়ে থাকত। তাদের ভাঙ্গা ঘরের চাল দিয়ে আকাশের তারা সুন্দর দেখা যেত। মা লোকের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে এক আনা- দুই আনা রোজগার করত। তার রূপসী যুবতী মেয়ে ঘরে বসে গ্রামবাসীদের জামাকাপড় সিলাই করে এক আনা- দুই আনা পেত। কোন ভাবে খুব কষ্টের মধ্য দিয়ে তাদের সংসার চলছিল। তাদের না ছিল ভাল ঘর, না ছিল ভাল কাপড়। না ছিল ভাল থাকার জায়গা, না ছিল দামী গয়না, না ছিল ভাল খাবারের জোগাড়। তবে তাদের মন ছিল সোনার। তাই গ্রামের সবাই তাদের স্নেহ করত। আর কনক দেখতেও ছিল কনকের মতই সুন্দরী, সুশ্রী, নম্র, ভদ্র।

কিন্তু কনক তাদের অবস্থা এমন ছিল না। তারাও এক সময় ভাল অবস্থায় ছিল। কনকের বাবার ভাল ব্যবসাও ছিল। কিন্তু কনকের কাকা তার বাবাকে খুব ঠকিয়ে সব টাকা পয়সা নিজের করে নেয়। এই দুঃখে দুঃখে কনকের বাবা মারা গেল। আজ কনক দুবেলা খেতে পায়না, কিন্তু তার কাকা, কাকী আর কাকাতো বোন, হেমা প্রতিদিন মাছ-মাংস আর দশ-পনের তরকারি দিয়ে ভাত খায়। যতটুকু খায় তার থেকে বেশী লোকসান করে। কাউকে কিছুই দিতে চায়না। কেউ কিছু চাইতে এলে হৈ –হৈ করে আসে আর গালি-গালোজ শুরু করে দেয়। কনক আর তার মাকে, কনকের কাকা, কাকী আর হেমা দু চোখে দেখতে পারেনা। সব সময় ঝগড়া করতে মুখিয়ে থাকে, সারা গায়ে কনকের দুর্নাম গেয়ে বেড়ায়। হেমা আর কনক সমবয়সী। দুজনই সুন্দর। তবু লোকে কনককে খুব ভালবাসে, এটা হেমা আর তার মা, বাবার সহ্য হয় না। তাই তারা সব সময়ই কনকের ক্ষতির চিন্তা করে। ফলে কনক আর তার মা সব সময়ই তাদের থেকে দুরেই থাকে।

এমনি করে দিন যাচ্ছিল। একদিন এক থুরথুরে বুড়ি ভিখারি কাকার বাড়িতে গিয়ে উঠল, ভিক্ষা চাইল। কেউ ভিক্ষা দিতে বের হল না। বুড়ি কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করল। তখন হেমা এক মুঠ চাল এনে বুড়ির গায়ে ছুড়ে দিয়ে, কষে দুটি গালি দিয়ে হন হন করে ঘরে চলে গেল। বুড়িটি হি হি করে কিছুক্ষণ হেসে চলে গেল। সে গিয়ে উঠল কনকের বাড়িতে। ভিক্ষা চাইল। গত দুই দিন ঘরে খাওয়ার কিছুই ছিল না। কনকের মার খুব জ্বর, তাই তিনি ঝিয়ের কাজ করতে পারেনি। ফলে রোজগার ও হয়নি, ঘরে চাল ও আসেনি। সেলাইয়ের কাজ মাস খানেক কিছুই হচ্ছে না। তাই ঘরে একটি দানাও ছিল না।

ভিখারির ডাকে কনক খালি হাতেই ঘর থেকে বের হয়ে এল। লজ্জায়-অপমানে তার চোখ ছল ছল করছিল। তার মুখ থেকে কোন কথাই সরছিল না। সে মাথা নিচু করে অতি কষ্ট বলল –“আজ যে ঘরে কিছুই নেই। তোমাকে কি দেব।”

তার এই কথাতেই ভিখারির মন গলে গেল। কনকের কথাগুলির মধ্যে যে চরম সততা লুকিয়ে আছে ভিখারির বুঝতে বাকি রইল না। ভিখারিও ছল-ছল চোখে তাকিয়ে রইল কনকের দিকে যেন আরো ভাল করে দেখতে চাইছে কনককে। ভিখারি দেখল কনক একটি ছেঁড়া জামা গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। রুক্ষ চুল। মলিন গালে, চোখের জলের দাগ স্পষ্ট। এত দরিদ্রতার মধ্যেও কনকের রূপ যেন, কালো ঘন মেঘকে ছিন্ন ভিন্ন করে পূর্ণিমা চাঁদের আলোর মত বেড়িয়ে আসছে।

ভিখারি অনেকক্ষণ চেয়ে রইল কনকের দিকে। তারপর হি হি করে হাসতে লাগল। কনক অবাক হয়ে চোখ তুলে চাইতেই থুরথুরে বুড়ি ভিখারি বলল, “ও কথা বলিস না রে পাগলি। আজ তো আমি তোর কাছ থেকে ভিক্ষা না নিয়ে যাবই না। এই আমি এখানেই গাছতলাতে বসলাম। তুই ভিক্ষা দিলেই তবে যাব।”

- ‘কিন্তু?’

কনককে থামিয়ে বুড়ি বলল – “আগে আমাকে একটু খাবার জল দে। আগে জল খাব তবে ভিক্ষা নেব।”

কনক হাসি মুখে ঘর থেকে খাবার জল নিয়ে এল। বুড়ি হি হি করে হেসে বলল – “এই জল তো আমি খাব না। তুই কলসি কাঁখে ও পাহাড়ের ঝর্নাতে স্নান করেত যা। স্নান সেরে কলসি ভরে জল নিয়ে আসবি। সেই জল আমি খাব। যা যা, এখুনি আমার কথা মত কাজ কর।”

কনক না করতে পারল না। সে অবাক হয়ে কলসি কাঁখে বেড়িয়ে গেল পাহাড়ের ঐ ঝর্ণার দিকে। এই ঝর্ণাটিকে সবাই চিনে। কনকও বিকালের দিকে প্রায়ই এখানে বেড়াতে আসে।

কনক সেই ঝর্ণাতে স্নান করে, এক কলসি জল নিয়ে তাড়াতাড়িই ফিরে এল। বুড়ি ভিখারি তেমনিই বসেছিল। কনক কাছে আসতেই সে জলের গেলাসটা কলসির দিকে বাড়িয়ে দিল – “দে লো জল দে। খুব তেষ্টা পেয়েছে যে।”

কিন্তু কি অবাক কাণ্ড, কনক ঐ গেলাসে যেই জল ঢালতে গেল অমনি দুটি সোনার টুকরা টুক-টুক করে গেলাসটির মধ্যে পড়ে গেল। ভিখারি লাফিয়ে উঠল – “কি রে, তুই যে বললি আজ ঘরে কিছুই নাই। তবে এই সোনার টুকরা এল কোথা থেকে? আমার সাথে মিথ্যা বলেছিলি। তুই এই দুটি সোনার টুকরা কলসির মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলি?”

কনকও খুব অবাক হল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিলনা। সে থতমত খেয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল।

- ‘এবার বল, এই সোনার টুকরা গুলির কি করবি?’

- ‘আমি জানি এগুলি আমার জিনিস নয়। এগুলি যখন তোমার গেলাসে পড়ল তখন, তুমিই এই সোনার টুকরাগুলি নিয়ে যাও। মনে কর তুমি তোমার ভিক্ষা পেয়ে গেছ।’

কনকের এই কথা শুনে বুড়ি ভিখারির চোখ ছানাভরা হয়ে রইল। সে ফ্যাল-ফ্যাল করে চেয়ে রইল কনকের দিকে। কনক কিছু না বলে ভিজা শরীরে ঘরে চলে গেল। ভিজা জামাকাপড় ছেড়ে, ঘর থেকে বের হয়ে সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। বুড়ি তো এখনো যায়নি, উল্টা সেই গাছের নীচে বসেই রান্না জুড়ে দিয়েছে। আর সে কি রান্নার বহর? যেন রাজভোগের আয়োজন।

বুড়ি কনকের দিয়ে চেয়ে হি-হি করে হেসে বলল – “কই রে পাগলী, বড্ড খিদে পেয়েছিল তো, তাই এখানেই রান্না শুরু করে দিলাম। আমি আবার ছাই কলা দিয়ে খেতে পারিনা। খাবই যখন একটু ভাল করেই খাব। আমি এখানে রান্না করে খেলে তোমার কোন অসুবিধা নেই তো?”

কনক মিষ্টি হাসি হেসে বলল- “না না , কোন অসুবিধা নেই। তুমি তোমার মত করে রান্না করে পেট ভরে খাও।”

এই বলে কনক ঘরে চলে যাচ্ছিল কি বুড়ি আবার ডাক দিল – ‘ও পাগলী, আমাকে একটু সাহায্য করবি না? আমি যে আর একা সামলাতে পারছি না। তার উপর আমার আবার কয়েকটা থালা বাটির ও দরকার পড়েছে।’

হাসতে হাসতে কনক বলল – দাঁড়াও আসছি।

এমন রান্না শুরু হল যেন স্বর্গের রান্না। মধুর, সুস্বাদু গন্ধে চারিদিক ছেয়ে গেল। হেমা আর তার মা-বাবা উকি দিয়ে দেখতে লাগল, ফকিরের বাড়িতে আবার এমন খাবারের গন্ধ কোথা থেকে এল? সব দেখে শুনে তো তাদের পিত্ত জ্বলতে লাগল।

খুব তাড়াতাড়িই রান্না শেষ হয়ে গেল। রান্না শেষ হতেই বুড়ি বলল – ‘ একা একা খেতে আমার তো ভাল লাগেনা। আর আমি এত কিছু কি একা খেতে পারবো? আয় আয়, মাকে ডাকে নিয়ে আয়। সবাই মিলে একটু আহার করি।’

কনক ভেবে পাচ্ছিল না এ সব আজ কি হচ্ছে। সে ধীর পায়ে ঘরে গিয়ে মাকে বাইরে নিয়ে এল। মা বাইরে এসে এত সব খাবার-দাবার দেখে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, জেগে আছেন কি স্বপ্ন দেখছেন? তিনি একবার কনকের মুখের দিকে তাকাচ্ছেন তো আরেকবার বুড়িটিকে চিনতে চেষ্টা করছেন।

থুরথুরে বুড়িটি দুই পা এগিয়ে এসে শক্ত হাতে অসুস্থ মাকে ধরে গাছতলাতে নিয়ে গেল। বলল “খাও গো খাও, এ সব তো তোমার মেয়েরই খাবার। পেট ভরে খাও।”

অনেক যুগ পরে কনক আর তার মা এমন পেট ভরে এত সব খাবার খেল। এ সব দেখে কাকা-কাকীর তো মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। তারা কি-করবে-না-কি-করবে, ভেবে পাচ্ছে না। বুড়ি বলল –‘কিছু খাবার তো অবশিষ্ট রয়ে গেল, তা তোমরা রাতে পেট ভরে খেয়ে নিও বাপু। আমি চললুম। আজ দিব্যি খাবার হয়েছে। এই বলে বুড়ি তার হাড়ি বাসন তেমনি ফেলে রেখে চলে গেল। ফিরেও তাকাল না।’

পরদিন আবার সে বুড়ি এসে হাজির। হি-হি করে হাসতে হাসতে গাছের নীচে বসে খাবার জল চাইল। যেমন তেমন জল হলে হবে না। সেই ঝর্ণারই জল চাই। কনক আনন্দে আনন্দে কলসি কাঁখে বুড়ির জন্য ঝর্নার জল আনতে গেল। আজ স্নান সেরে কলসিটিকে সে উল্টে পাল্টে দেখল তার মধ্যে কিছু আছে কি না। কিছুই ছিল না। তারপর তাতে ঝর্ণার জল ভরার সময়ও লক্ষ্য করল তাতে কিছু পড়ছে কি না। কিছুই পরল না। সে বাড়ি ফিরেই দেখল গতকালের মত বুড়ি আবার রান্না করতে বসেছে। আর রান্নার আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে যেন রাজবাড়ির রান্না। ধীর পায়ে কনক বাড়িতে আসতেই বুড়ি তার গেলাস বাড়িয়ে দিল – ‘দে লো পাগলী, জল দে, তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে।’

কনক সেই গেলাসে জল ঢালতে লাগল। অমনি আবার সেই কলসি থেকে দুই তিন টুকরা সোনা সেই গেলাসে টপ টপ করে পরে গেল। বুড়ি হি হি করে হাসতে লাগল। কনকও হতবাক হয়ে ভাবতে লাগল, এ কেমন করে হল? আজ তো সে ভাল করে পরখ করেই জল ভরেছে।

বুড়ি ফিক-ফিক করে হেসে বলল – ‘ এ গুলির কি করবি লো পাগলি।’

- ‘এ গুলি তো আর আমার না। তুমিই যখন পেয়েছো তখন তুমিই নিয়ে যাও।’ হাসতে হাসতে কথাগুলি বলে কনক ঘরে চলে গেল। বুড়ি অবাক হয়ে কনকের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে, কেন যেন হি হি করে হেসে উঠল।

রান্না হয়ে গেল, তিন জনেই পেট ভরে খেল। কিছু খাবার অবশিষ্ট ও রইল। বুড়ি বলল – ‘সে তোমরা রাতে খেয়ে নিও। আমি তো চললুম।’ বুড়ি চলে গিয়েও আবার ফিরে এল। কনকের কাঁধে হাত রেখে, এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কনকের চোখে রেখে রহস্যময়ী হাসি হেসে বলল – ‘শোন পাগলি, কাল আমি আসার আগেই তুই স্নান সেরে আমার জন্য জল নিয়ে আসবি। মনে থাকবে তো?’ কনক মাথা নাড়ল। বুড়ি কি-জানি-কি ভেবে গোপন হাসি হাসতে হাসতে চলে গেল। অন্যদিকে লুকিয়ে লুকিয়ে আজকের সব ঘটনা কনকের কাকা, কাকী আর হেমা খুব দেখল। তাদের পিত্ত দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল। সন্ধ্যা হতেই কনকের কাকা বেশ কিছু লাঠিয়াল আর ডাকতদের বাড়িয়ে ডাকল, আর কনক ও তার মাকে আজ রাতেই খতম করে দেবার হুকুম দিল।

গভীর রাতে ডাকাতের দল দা, তলোয়ার, বল্লম নিয়ে হাজির হল কনক ও তার মাকে শেষ করে দিতে। কয়েক জন বাড়িতে ঢুকল আর কয়েক জন বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। পঞ্চমীর চাঁদের আবছা আলোতে ডাকাতরা যা দেখতে পেল তা দেখে তাদের বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। গোটা দশ খুন-খার বাঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা বাড়িতে। কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই। যে ডাকাতগুলি হাতিয়ার নিয়ে ভীতরে গিয়েছিল, তারা কোন ভাবে প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড়তে দৌড়তে ঝড়ের মত এমন পালিয়ে গেল যে একবারের জন্য ও পিছন ফিরে দেখল না। বাকিরাও যে যার দিকে ছুট দিল। এই খবর শুধু ডাকাতদের ছাড়া আর কেউ জানল না।

পরের দিন ভোরে কাকা, কাকী আর হেমা কনককে জীবিত দেখে হয়রান। তাদের পিলে চমকে গেল। তাদের সমনে দিয়েই কনক কলসি কাঁখে জল আনতে চলল ঝর্ণার দিকে। মনে কেন জানি আজ তার খুব আনন্দ, শুধু শুধু মন আজ খুশির জোয়ারে ভাসছে। সে ঝর্ণাতে গিয়ে স্নান করেতে লাগল। স্নানের শেষ সে কলসিতে জল ভরতে লাগল। কলসিতে জল ভরা হয়েছে কি হঠাৎ তার কলসিটিতে কি যেন এসে লাগল আর টুং করে আওয়াজ হল। সাথে সাথেই কলসিটি ভেঙ্গে দুই খান হয়ে গেল। থতমত খেয়ে উঠল কনক। কিন্তু সে বেশ আশ্চর্য হয়ে দেখতে লাগল তার কলসি থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে রঙিন প্রজাপতি উড়ে উড়ে বনের দিকে চলে যাচ্ছে, কিছু দুর গিয়ে আবার ফিরে আসছে। আবার যাচ্ছে আবার আসছে। কনক কিছুই বুঝতে পারল না। সে ভয়ে চুপচাপ বাড়ির দিকে ফিরে এল।

কনক চলে যাবার পর তার কাকা, কাকী আর হেমা একটি গাছের আড়াল থেকে বের হল। তারাই ঢিল মেরে কনকের কলসি ভেঙ্গেছিল। কনক যেন আজ আর সোনার টুকরা নিয়ে বাড়িতে না যেতে পারে। কনক চলে যেতেই তারা সেই ঝর্ণাতে খুব করে স্নান করল। তারপর সবাই এক এক কলসি জল ভরে বাড়ির দিকে চলল।

ও মা, সে কি!! বাড়ির কাছে আসতেই তাদের মাথা গরম হয়ে গেল। কনকের বাড়ির সামনে সোনার রথ দাঁড়িয়ে আছে। আর তার থেকে সে দেশের রাজপুত্র নেমে আসছে। সেই রথের চারিধারে অনেক গ্রামবাসী, অনেক সিপাই। দেখতে দেখতে রাজপুত্র কনকের বাড়িতে গেল, মিষ্টি হাসি হেসে কনকের হাত ধরে, তার চোখে চোখ রেখে তাকে রথে তুলে নিল। পিছনের অন্য রথটিতে কনকের মা ও গিয়ে উঠল। গড় গড় করে রথ চলতে লাগল। টগবগ, টগবগ করে সিপাহীদের ঘোড়া চলতে লাগল। গ্রামবাসীরা ধন্য ধন্য করেতে লাগল।

এই সব দেখে কনকের কাকা, কাকী আর হেমার গায়ে যেন আগুন লেগে গেল। তার চুল ছিঁড়বে, না মাথা ভাঙ্গবে ভেবেই পাচ্ছে না। এমন সময় তাদের নজর পড়ল জল ভরা তিনটি কলসির উপর। দুঃখের মধ্যেও তাদের মনে একটু সুখের ক্ষীণ হাওয়া লাগল। তারা তিন জনই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সোনার লোভে, ভরা কলসিগুলি উলটে দিল। কৈ সোনা , কৈ হীরা। ঝর ঝর সেই কলসি থেকে অনেকগুলি কালসাপ বেড়িয়ে এল।

সেই বুড়িকে কোন দিন আর কেউ যেমন দেখল না তেমনি হেমা আর তার মা-বাবাকেও কেউ আর কোন দিন খুঁজে পেল না। কনক মহারানী হয়ে অতি সুখে জীবন কাটাতে লাগল।


Top of the page
All Pages     17    18    19    20    21    22    (23)     24   

Amazon & Flipkart Special Products

   


Top of the page