Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
Read & Learn
 

অপুর কথা

বাংলা গল্প

-হরপ্রসাদ সরকার

All Pages   ◍    18    19    20    21    22    23    24    (25)     26   










অপুর কথা ( ১ম পর্ব )

সে অনেক অনেক দিন আগের, ঈশানপুরের কথা। ঈশানপুর আগরতলা শহর থেকে অনেক অনেক দূরের এক গ্রাম। গ্রামে যাবার তেমন কোন বড় রাস্তা নেই। মাটির পথটি একটু প্রসস্থ। ঐটুকুই।



গ্রামের পাশ দিয়ে চলে গেছে গোমতী নদী। সব সময়ই জল ভরপুর। তাই ছোট্ট অপুকে তার মা সব সময় বলত “অপু, তুমি কিন্তু কখনো ঐ নদীর দিকে একা যাবে না। যদি যাও তবে কিন্তু আমাকে আর পাবে না। আমি চিরদিনের জন্য তোমাকে ছেড়ে ঐ আকাশে চলে যাব।”

সজলার আদরের ছোট্ট অপু কতটুকুই কি বুঝত কে জানে? তবে সে ফ্যাল ফ্যাল করে তার মার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকত। চুপ করে মা ‘র গলা জড়িয়ে ধরে মার বুকে মাথা রেখে দিত।

ব্রজহরি আর সজলার আদরের ধন অপু। অভাবী সংসারেও অপুর আলতো আলতো কথাতে হেসে খেলে দিন চলে যাচ্ছিল তাদের। ঐ শ্রাবণ মাসে চারিদিকে জল থৈ-থৈ। অপু সকাল বেলা চুপি চুপি কাউকে কিছু না বলে একা একা গুটি গুটি পায়ে চলে এল গোমতীর পারে। নদীর পারে পারে হাঁটল অনেকক্ষণ। নদীর পাশের সেই মাটির পথটিতে বসে মহা-আনন্দে তাকিয়ে রইল সেই গোমতীর দিকে। যখন তার খেলা শেষ হল সে আবার চুপিচুপি ফিরে চলল বাড়ির দিকে।

বাড়ির কাছাকাছি আসতেই সে দেখল বাড়িতে অনেক লোক। গ্রামবাসীরা অনেকেই কাঁদছে। তার মাকে উঠানে শুইয়ে রাখা হয়েছে। বাবা মাকে জড়িয়ে ধরে অঝরে কাঁদছে। কিন্তু মা কোন কথা বলছে না।

অপু মা মা বলে দৌড়ে গেল মার কাছে। সে মা ‘র গলা ধরে মা কে ডাকতে লাগল। মা চোখও খুলল না, কথা ও বলল না। অপু মাকে জড়িয়ে অনেকক্ষণ কাঁদল। কিন্তু মা আর উঠল না। শেষে গ্রামবাসীরা সবাই মিলে মা ‘কে একটা কলা গাছের ভেলাতে গোমতীর জলে ভাসিয়ে দিল।

অপু দেখল মা চলে যাচ্ছে অনেক দূরে। সে অঝরে কেঁদে কেঁদে মা মা বলে কত ডাকতে লাগল। মা আর ফিরে এল না। বাড়ির চারিদিকে মা ‘র স্মৃতি ছড়িয়ে রইল।



Popular Google Pages:

সকাল হলেই অপু চলে যায় তার মা ‘র কাছে। গোমতীকে সে তার মা বলেই ভাবতে লাগল। যতক্ষণ সে গোমতীর পারে পারে থাকে, তার মনে হয় সে তার মার পাশেই আছে। গোমতীর জলে সে হাত দিয়ে বসে থাকে। ভাবত মার শরীরেই হাত রেখেছে। গোমতীর তীরে মাটিতেই শুয়ে থাকে, ভাবে মার কাছেই শুয়ে আছে। শেষে এক সময় বাবা এসে, আদর করে কুলে করে নিয়ে যায়, স্নান করায়, ভাত খাওয়ায়। তারপর বাবাকে একটু ফাঁকি দিয়েই আবার তার মা ‘র কাছে চলে আসে অপু।

কিছু দিনের মধ্যেই বাবা একটা নতুন মা নিয়ে এল। ব্রজবাসী। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই অপুর একটা বোন ও এল। অপু শুধু জানত যে এটা তার আদরের ছোটবোন। বোনের ডান হাতের তালুতে এই বড় লাল তিলটা তার খুব ভাল লাগত।

নতুন মা অপুকে কোনদিন ভালবাসে নি। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ঘুম থেকে উঠার আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত চড়, লাথি। সারা দিন সেটা লেগেই থাকত। আজ অপু পেট ভরে খেতেও পায় না। কেউ খোঁজ রাখে না অপুর।

ছোট অপু ঘরের পিছনে লুকিয়ে লুকিয়ে অঝরে কাঁদে। মা ‘র কথাই শুধু মনে পড়ে। ভাবে কবে আবার মা আসবে ? তাকে আবার আদর করবে ?

সে দিন অপুর খুব জ্বর। আগের দিন রাতেও খাবার জোটেনি। ভোর হতে না হতেই কপালে জুটল লাথি। নতুন মা তাকে গোমতীতে পাঠাল জল আনতে।

ছোট অপু, ছোট্ট একটা কলসি নিয়ে কাঁপা পায়ে, দুর্বল পায়ে চলল তার মা ‘র কাছে। মা ‘র কুলে বসে, হাতে তার ছোট্ট কলসি নিয়ে সে অপলক মা ‘র পানে চেয়ে রইল। ছোট্ট অপুর চোখ দিয়ে নীরবে বয়ে চলল জলের ধারা।

হঠাৎ তার চোখের সামনে নেমে এল অন্ধকার। রুগ্ন, শীর্ণ, ক্লান্ত অপুর আর কিছু মনে নেই। সে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল তার মায়ের কুলে, গোমতীর তীরে। যখন অপুর ঘুম ভাঙ্গল, তখন সে চারিদিকে তাকিয়ে দেখল সে একটা বিশাল ঘরের, খুব সুন্দর একটা খাটে, মখমলে বিছানায় শুয়ে আছে আর তার চারপাশে অনেক লোক। কাউকে সে চিনে না।

সে দেখল ঠিক তার মা ‘র মতই দেখতে একজন বসে আছে তার শিয়রে। তাঁর চোখে জল। অপু তাঁকে মা বলেই ভাবল আর মা-মা বলে চীৎকার করে বিমলার গলা জড়িয়ে ধরল। বিমলাও মা ‘র মতন অপুকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই অপু আবার জ্ঞান হারাল।

মাঝরাতে অপুর যখন আবার জ্ঞান ফিরে এল, সে দুর্বল সুরে মা-মা বলে মা ‘কে ডাকতে লাগল। বিমলা অপুর পাশেই ছিল। সে অশ্রু ভরা হাসি মুখে অপুর কপালে চুমু দিতে দিতে বলল “এই তো মা, আমি এখানে? তুমি ঘুমাও, আমি আছি তোমার পাশে।”

অপু তেমনি দুর্বল সুরে মাথা নাড়িয়ে বলল “তুমি আবার আমাকে ফেলে চলে যাবে না তো ? আমার যে খুব কষ্ট হয়।” চোখের জলে ভেসে অপুর হাতটাকে নিজের হাতে নিয়ে বিমলা বলল “না, মা, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। কক্ষনো যাব না। তুমি তো আমার সোনামণি। এবার তুমি ঘুমাও !”

অপু তেমনি মাথা নেড়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

অপু এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। সে এখন আগরতলার বিখ্যাত রায় বাড়ির ছোট মালকিন, অপরাজিতা। কোটিপতি ব্যবসায়ী উপেন রায়ের একমাত্র মেয়ে। ছোট্ট অপুর চারপাশে সব সময় দু-চার জন চাকর বাকর থাকে অপুকে দেখা শোনা করার জন্য। অপু কখনো বাবার কুলে বসে, কখনো মার কুলে বসে মোটরে করে ঘুরে বেড়ায়।

মা ‘র গলা জড়িয় ধরে গল্প শোনে। বাবার কাঁদে চড়ে ফুল পারে। উপেন রায় আর বিমলার দীর্ঘদিনের শূন্য ঘরে অপুকে নিয়ে খুশীর হাট বসল। মা এক পলক ও চোখের আড়াল করেন না অপুকে। আর উপেন রায় মেয়েকে না দেখে কাজেই বের হন না। দুজনেরই নয়নের মনি অপু ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। পুরানো অনেক স্মৃতি তার মন থেকেও মুছে গেল।



পরবর্তী পর্ব

Top of the page
All Pages     18    19    20    21    22    23    24    (25)     26