Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
Read & Learn
 

গোবিন্দ

( বাংলা গল্প )

- হরপ্রসাদ সরকার

All Bengali Stories    20    21    22    23    24    25    26    (27)     28    29   







◕ গোবিন্দ

কাঞ্চনমালা গ্রামে একটি বড় শ্রীকৃষ্ণ মন্দির ছিল। মন্দিরের পূজারি একদিন ভিন গ্রাম থেকে নিজ গ্রামে ফিরে আসছিলেন। তিনি একাই ছিলেন। পথ মধ্যে ছিল এক দুর্গম বন। সেই বন পেরিয়ে তবে কাঞ্চনমালা গ্রামে আসতে হবে। আর এই বন ছিল বাঘ, ভাল্লুক আর বাকী হিংস্র পশুদের আড্ডা। পূজারি ভগবানের নাম স্মরণ করে হাটতে শুরু করলেন। এই দিকে বাঘ ডাক, ওই দিকে সাপের হিস্-হিস্ শব্দ কানে আসছে। পূজারি নিডর হয়ে পথ চলতে লাগলেন।


◕ Bengali Story writing competition. More..


হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন এই গভীর বনে, মাটির পথের ধূলায় বসে একটি সাত-আট বছরের ছেলে একা একা কাঁদছে। তিনি খুব ঘাবড়ে গেলেন।
কাছে গিয়ে তাদের বললেন, বাছা কে তুমি? আর আপনিই বা কে? এখানে - এই গভীর বনে কেন?

ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে বলল - আমার নাম গোবিন্দ। আমার সৎবাবা আমাকে এখানে ফেলে চলে গেছে।

কিছু বুঝতে আর পূজারি বাকী রইল না। গোবিন্দের জন্য উনার মনে খুব দয়া হল। তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন, এই ছেলেটাকে যদি এখানে ফেলে রেখে যাই তবে নিশ্চিত কিছুক্ষণের মধ্যেই সে বাঘের পেটে যাবে। না না এমন ফুলের মত একটি শিশুকে কিছুতেই এখানে ফেলে রেখে আমি যেতে পারব না। যে করেই হোক একে আমার বাঁচাতে হবে, জঙ্গল থেকে বের করেতেই হবে। যা হবে পরে দেখা যাবে।

তিনি গোবিন্দের হাত ধরে চলতে লাগলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর আবার দেখতে পেলেন যে, পথের পাশে একটি অন্ধ বৃদ্ধ মাথা নিচু করে বসে আছে। কঙ্কালসার দেহ, মলিন একটি ধুতি, হাতে তেরা-বাঁকা এক লাঠি। আবারও পূজারি খুব অবাক হলেন। তিনি কাছে গিয়ে বললেন, বাবা কে আপনি? কেন এই গভীর জঙ্গলে বসে আছেন?

থুরথুরে বৃদ্ধ কাঁপতে কাঁপতে পাথর চোখে বলল, আমি তো বাবা চোখে দেখি না। কোলে-পিঠে করে যে ছেলেকে বড় করেছি ,সেই এখন ছেলের বউয়ের গোলাম। আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল। যেদিকে পথ নিয়ে গেল তখন সেই দিকেই চলে গেলেম। আর যা থাকে কপালে। এখন আমার কাছে বন-জঙ্গল আর রাজপ্রাসাদ সবই তো এক।



পূজারি দেখলেন কাঁদতে কাঁদতের বৃদ্ধ-র চোখের জল পর্যন্ত ফুরিয়ে গেছে। কত অত্যাচার যে বৃদ্ধ-র উপর হয়েছে তা বুঝতে উনার আর বাকি রইল না। তিনি মনে মনে ভাবলেন এদেরকে আমার এই জঙ্গল থেকে বের করতেই হবে। এদের বাঁচাতেই হবে। কাঞ্চনমালা মন্দিরের এক কোনে নিশ্চয় তাদের জায়গা হবে। আর না হয় মন্দিরের প্রসাদ সবাই মিলে ভাগ করে খাব। কিন্তু যে করেই হোক এদের রক্ষা করতেই হবে।

তিনি দুজনের হাত ধরে ধীরে ধীরে চলতে লাগলেন। সেই বৃদ্ধও বেশী জোরে চলতে পারেনা আবার সেই গোবিন্দও তো ছোট্ট খোকা। একটু চলতেই বৃদ্ধ-র খুব কষ্ট হয়। ফলে কিছু দূর গিয়ে জিরিয়ে জিরিয়ে তবে তিন জন আগে যায়। এভাবে চলতে চলতে বনের মধ্যেই রাত ঘনিয়ে এল। কিন্তু কি আশ্চর্য। এরই মধ্যে কত বাঘ, কত শিয়াল তাদের সামনে দিয়ে এল গেল, কিন্তু তাদের দেখেও যেন দেখতে পেল না। চুপ চাপ পথ ছেড়ে অন্য দিকে চলে গেল। পূজারি ভীষণ অবাক, কেন আজ সব কিছু এমন হতে লাগল। তিনি যেন অনুভব করতে লাগলেন, কোন এক অদৃশ্য শক্তি তাদের সাহায্য করছে। আকাশের পঞ্চমীর চাঁদ যেন দৌড়ে দৌড়ে তাদের সাথেই চলতে লাগল।

তিনি আরো শক্ত হাতে দুজনের হাত ধরে আলো-আধারে সেই গভীর বনের পথ চলতে লাগলেন। হিংস্র পশুদের ডাকে বুকের রক্ত হিম হয়ে যাচ্ছ। কিন্তু তবু থেমে গেলে চলবে না। নিজের সাথে সাথে তাদেরকেও বাঁচাতে হবে। দেখতে দেখতে প্রায় ঊষা লগ্নে তারা বনের প্রান্ত ছেড়ে কাঞ্চনমালা গ্রামের প্রান্তে এসে পৌঁছলেন। ঈশান কোন লাল হয়ে উঠছে। পূজারি পথ চলতে চলতে খুব পরিশ্রান্ত, সারা শরীর ঘেমে থক থক হয়ে আছে। তিনি পিছন ফিরে সেই বনের দিকে তাকালেন। আর কিছু মনে নেই তার। যখন জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন তিনি মন্দিরের প্রাঙ্গণে।

সকাল বেলায় গ্রামবাসীরা উনাকে গ্রামের প্রান্তে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে, উনাকে তুলে এনে মন্দিরে রাখলেন। জ্ঞান ফিরে পেয়ে তিনি গ্রামবাসীদের কাছে সেই বৃদ্ধ আর গোবিন্দ-র খোঁজ করতে লাগলেন। কিন্তু সবাই বলল, তারা কাউকেই উনার পাশে দেখেনি। তিনি তো একাই সেখানে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। পূজারি খুব অবাক হলেন। তিনি সব কথা গ্রামবাসীদের খুলে বললেন। সবাই ঘোর অবাক হয়ে সব কথা শুনতে লাগল, কিন্তু কিছুই ভেবে পেল না। তখন সভার মধ্য থেকে এক বৃদ্ধ মিনমিন করে বলল - বাপু, আমার মনে হয় তুমি যে গোবিন্দের পূজা কর সেই গোবিন্দই তোমার সাথে সাথে চলেছে। ঐ রাতে হিংস্র পশুদের হাতে তোমার নিশ্চিত মৃত্যু ছিল। কিন্তু তোমার একনিষ্ঠ গোবিন্দ সাধনা তোমার সেই মৃত্যুকে টলিয়ে দেয়। তোমার মন যখন বলেছিল - এদের এই বন থেকে বাঁচাতেই হবে, এদের এই বন থেকে রক্ষা করতেই হবে তখন তুমি নিশ্চিত ভাবে গোবিন্দের রক্ষাকবচের মধ্যে চলে গিয়েছিলে। তোমার সেই চিন্তাই তোমার চারিদিকে সেই রক্ষাকবচ সৃষ্টি করেছিল। আর তার তেজে বন্য পশুরা তোমার দিকে ফিরে তাকাতেও সাহস করেনি। তোমার বেঁচে থাকার শেষ সুযোগে তুমি সফল ছিলে। তুমি খুব ভাগ্যবান। তোমার সৎ-চিন্তা, সৎ-বুদ্ধি হোক, তোমার গোবিন্দ সেবা, গোবিন্দ সাধনা আরো সুন্দর-সবল হোক।

সবাই এই কথা শুনে ধন্য ধন্য করে উঠল। সবাই গোবিন্দের জয়ধ্বনি দিতে লাগল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে সবাই যখন খোঁজ করতে লাগল, সভার মধ্যে কে এই অমূল্য কথাগুলি বলেছিল, তখন আর সেই বৃদ্ধটিকে খুঁজে পাওয়া গেল না।


◕ Bengali Story writing competition. More..



◕ This page has been viewed 465 times.

Top of the page



All Bengali Stories    20    21    22    23    24    25    26    (27)     28    29