Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
Read & Learn
 

Bangla Kahini

( বাংলা কাহিনী )

All Pages   ◍    1    2    3    (4)     5    6    7    ...


সহায়তা

-হরপ্রসাদ সরকার


An offer to make a Website for you.

hostgator




সেই রাজধানীতে এক ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন। নাম ছিল বাসুদেব।অনেক কিছুর ব্যবসা ছিল তার। আমদানি ও ছিল ভাল। এত ধন-সম্পদ কি আর সাথে নিয়ে যাবেন , তাই তিনি অনেক কাল যাবৎ গরিব মানুষকে সহায়তা করছেন।

কিন্তু লোকে তার সহায়তা নিতে চাইত না। খুব কম লোক উনার কাছে সহায়তা চাইত। তার কারণ ছিল আজব।

বাসুদেব খুব খিটখিটে মেজাজের ছিল। মুখে যা আসত তাই বলত। গালি ছিল তার মুখের অলংকার। কেউ সহায়তার জন্য এলে তাকে তেমনি অনেক কথার সন্মুখিন হতে হত। বাসুদেবের সেই কথার আঘাতে আধা লোক এমনি পালিয়ে যেত। আর যারা সেই কথা শুনে ও পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকত তাদের দেওয়া হত খেত-খামারের কাজ , গরু-মহিষের সাফ সাফায়ের কাজ অথবা চাল, ডালের বস্তা উঠা-নামানোর কাজ।যার যে রকম যোগ্যতা সেই রকম কাজ।
সেই কাজের বহর দেখেই আবার কিছু লোক পালিয়ে যেত। আর যারা তার পরেও টিকে থাকত, সারাদিন কাজ করত, তাদের দিনের শেষে বিশাল রান্না ঘরে মিলত ভরপেট খাবার আর জমিদারের দীবানের হাতে মিলত পয়সা-কড়ি। তাদের কেউ-কেউ আবার বাসুদেবের বাড়িতেই সারা বছরের কাজ ও পেয়ে যেত।

সেই বিশাল রান্না ঘরে সারাদিনই চলত রান্না-বান্না। সেই ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকত চার-পাঁচ লাঠিয়াল। শুধু ছোট-ছোট ছেলেমেয়েদের আর অতি বৃদ্ধদের সেই রান্না ঘরে যাওয়ার অনুমতি ছিল।

এই সব কারণে বাসুদেবের পিছনে পিছনে কুমতলবের লোক ও কম ছিল না ,যারা তাকে খুব ঈর্ষা করত। তারা প্রায়ই এ নিয়ে রাজার কাছে নালিশ করত। বাসুদেবের খুব নিন্দা করত। রাজা শুধু শুনতেন। হ্যাঁ, হুঁ কিছুই বলতেন না আবার কিছু করতেন ও না।শুধু মুচকি মুচকি হাসতেন।

কিছুদিন পর সেই নিন্দুকেরা একদিন হাসতে হাসতে রাজার কাছে এলো। অতি উৎসাহে আর আনন্দে রাজাকে বলল “ বাসুদেবের উচিত শিক্ষা হয়েছে। পর পর দুদিন তার বাড়িতে ডাকাত পরল। বাসুদেবের লাঠিয়ালদের মেরে-কেটে ,প্রায় সব ধন-সম্পত্তি নিয়ে ডাকাতরা পালিয়েছে। এখন বাসুদেব ফকির। তার সমাজসেবা ও বন্ধ আবার তার বিশাল রান্নাঘর ও বন্ধ।” নিন্দুকদের খুশীর অট্টহাসি অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পরল।

রাজা আর এক মুহূর্ত দেরী করলেন না। সোনার সিংহাসন ছেড়ে উঠলেন। সেনাপতিকে আদেশ দিলেন এখুনি ডাকাতদের খুঁজে বের করতে , সৈনিকদের আদেশ দিলেন এই নিন্দুকদের বন্দী করতে কারণ এটা এদের ষড়যন্ত্র ও হতে পারে আর মহামন্ত্রীকে আদেশ দিলেন রাজরথ সাজাতে। আদেশের যথাযথ পালন শুরু হয়ে গেল। রাজা তক্ষুনি মহামন্ত্রী, সেনাপতি আর রাজ সৈনিকদের নিয়ে হাজির হলেন বাসুদেবের বাড়ি।

স্বয়ং রাজাকে নিজ বাড়ীতে দেখে চারিদিকে হাঁক-ডাক পরে গেল। রাজা অসুস্থ বাসুদেবের পাশে বসলেন। তাকে উৎসাহ দিলেন। মহামন্ত্রীকে আদেশ দিলেন অবিলম্বে বাসুদেবকে আবার তার ব্যবসা শুরু করার জন্য সহস্র স্বর্ণ মুদ্রা দেওয়া হোক।

রাজা বললেন “আমি জানি আপনি একজন সৎ এবং সত্যিকারের পরোপকারী মানুষ। লোকে যাহাতে আপনার সহায়তার মিথ্যা লাভ না উঠায় তার জন্যই আপনি সব সময় এক কঠোর আর নিকৃষ্ট রূপ ধরে থাকেন। আর যারা পরিশ্রম করতে ভয় না পায় তাদের আপনি যথাযথ সাহায্য ও করেন। আপনার মত লোক আমার রাজ্যের শোভা।”

বাসুদেবর মনে ভরসা জাগল সে আবার ব্যবসা শুরু করল আর রাজ সহায়তায় বাসুদেব খুব তারাতারি আবার আগের জায়গায় ফিরে এলো।
Top of the page

বন্ধু

-হরপ্রসাদ সরকার

ঘটনাটি আমার এক ডাক্তার বন্ধুর, আর তার মুখেই শুনা। বন্ধুটির নাম সুপ্রতিম। তার বাবাও ডাক্তার। ফলে সে কোন দিন জানত না অভাব কাকে বলে। ছোটবেলা থেকেই ধনীর ছেলে ধনীর মতই বড় হয়েছে। তবে সে মনের দিক দিয়ে ধনী হয়েছে অনেক অনেক পরে।

তখন তার বয়স বার/তের। পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। সকাল এগারটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত স্কুল চলত। দুপুরে এক ঘণ্টার ছুটি ছিল।

বেসরকারি স্কুল, খরচাও খুব বেশী। তাই ধনী ছাত্ররাই তার সহপাঠী ছিল। তবে একজন ছিল আলাদা, দেবেশ। তার বাবা বিভিন্ন স্কুল-কলেজের সামনে, কিংবা বিভিন্ন মেলাতে ঘুরে ঘুরে বাদাম, চানাচুর, আইসক্রীম ইত্যাদি বিক্রি করত। কিন্তু চাইতেন ছেলে পড়াশুনা করুক, অনেক বড় হোক। তাই তিনি কষ্ট ও করতেন অমানুষিক।

কিন্তু হল ঠিক উল্টা। টাইফয়েডে দেবেশের চোখের আলো প্রায় ফুরিয়ে গেল। সে কোন ভাবেই কোন লেখা আর দেখতে ও পারে না , পড়তে ও পারে না। ফলে যে ছেলেটি একটা স্বপ্ন নিয়ে স্কুলে যেত তাকে ঐ স্কুলের সামনেই বাদাম নিয়ে বসে থাকতে দেখা গেল। তার বন্ধুরাই তার কাছ থেকে বাদাম কিনত।

আর এই বন্ধুদের মধ্যে একজন ছিল সুপ্রতিম। সে দেবেশের চোখের আলোর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রোজ তার বাক্স থেকে দুই হাত ভরে বাদাম চুরি করত। এক টাকার বাদাম বলে পাঁচ টাকার বাদাম নিয়ে নিত। দেবেশ একে তো দেখতে পেত না তার উপর সে নিজের বন্ধুদের খুবই বিশ্বাস করত।

এভাবে কি আর ব্যবসা চলে। ফলে কিছু দিনের মধ্যেই দেবেশের ব্যবসা ও বন্ধ হয়ে গেল। তাকে আর সেখানে দেখা গেল না। এর মধ্যে সুপ্রতিমের বাবার বদলির আদেশ এলো। তারাও দূর শহরে চলে গেল। কথাটা এখানেই শেষ। তবে শুরু হল অন্য জায়গায়।

পৃথিবীর অনেক ঘটনাই একটা বৃত্তের মত ঘুরে ঘুরে আবার সামনে চলে আসে। তখন অনেকে নিজেকে ঠিক করার সুযোগ পায় এবং ঠিক করে ও নেয়। আবার অনেকে সুযোগ পেয়েও সুযোগকে চিনতে ভুল করে। এমনটাই হল সুপ্রতিম এর সাথে।

তখন সে সবে ডাক্তারি পাশ করে নতুন চাকরী পেয়েছে, সেইই তার পুরানো ছেলেবেলার শহরে। থাকার জন্য সরকারি জায়গা ও পেয়েছে। সে রোজ তার সেই ছেলেবেলার স্কুলের সামনে দিয়েই নিজের গাড়ী করে হাসপাতালে যায় আবার ফিরে আসে। সবাই তাকে ডাক্তারবাবু , ডাক্তারবাবু ডাকে, সম্মান করে।

একদিন হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার সময় হঠাৎ সে তার সেই পুরানো বন্ধুকে দেখতে পেল, ঠিক তার স্কুলের সামনে।দেবেশকে চিনতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি। আজ দেবেশ সম্পূর্ণ অন্ধ। একটা মলিন, ছেঁড়া জামা গায়ে, হাতে একটা দুতারা।শীর্ণ শরীর, রুক্ষ চুল। মাটিতে বসে সে সুরে-বেসুরে গান গায়ে যাচ্ছে। সামনের আধ ভাঙ্গা বাটিতে কেউ কেউ কিছু পয়সা দিয়ে যাচ্ছে , অথবা কেউ ফিরেও দেখছে না।

দেবেশের সেই গান সোজা আঘাত করল সুপ্রতিমের বুকে। কেউ বোঝোক না বোঝোক সুপ্রতিম ঠিক বুঝতে পারল সেই গানের মানে। সুপ্রতিমের চোখের সামনে ভেসে উঠল তার ছেলেবেলার কথা। সে কত ভাবে, দিনের পর দিন ঠকিয়েছে তার এই অসহায় বন্ধুটিকে। সে আর গাড়ীতে বসে থাকতে পারেনি।ধীর পায়ে নেমে এলো বন্ধুটির পাশে, চোখের ধারা বইতে লাগল। সে ধীর হাতে দেবেশের হাতটি ধরল।

থতমত খেয়ে চমকে উঠল দেবেশ। কিন্তু দুই হাতে সেই হাতটা ভাল করে ধরে সে আরো বেশী চমকে উঠল। প্রাণখোলা এক নিখাদ ঈশ্বরীয় হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। হৃদয়ের সুগভীর তল থেকে একটা আবেশের সুর বেড়িয় এলো “সুপ্রতিম, আমার বন্ধু।” দুই হাতে সে আরো শক্ত করে জড়িয় ধরল সুপ্রতিমের হাতটা।

সুপ্রতিম ভিজা গলায় বলল “চিনতে পেরেছিস ?”
দেবেশঃ হ্যাঁ। তুই যে আমার ছেলেবেলার বন্ধু। আমার আপনজন।
সুপ্রতিমের গলা এমন ধরে এলো যে সে দীর্ঘক্ষণ আর কিছু বলতে পারল না। শুধু তেমনি তার হাত ধরে বসে রইল। শেষে অনেক কষ্টে কাঁপা গলায় বলল “ চল আমার সাথে।”

দেবেশের কোন কথাই আর তার কানে গেল না। সে দেবেশের হাতটা ও আর ছাড়ল না, হাতটা ধরে টেনে টেনে তাকে গাড়ীতে উঠাল। সোজা নিজের ঘরে। ঘরে যা ছিল খেতে দিল , অনেক গল্প করল। শেষে দেবেশের হাতে এতগুলি টাকা দিয়ে দেবেশকে তার বাড়িতে ছেড়ে এলো।

পরদিনই দেবেশকে নিয়ে সোজা হাসপাতাল। কিছুদিনের মধ্যেই দেবেশের চোখের অপারেশন হল। চোখে আলো ফিরে এলো। একদম ঠিক না হলেও চলতে ফিরতে কোন অসুবিধা রইল না।
তার কিছুদিন পর সুপ্রতিম ঐখানেই একটা বাড়ি বানালো। তার কলেজের আরেক ডাক্তার, গীতশ্রীকে বিয়ে করল। দুজনই চাকরি ছেড়ে ঐ বাড়িতে গরীব মানুষের জন্য এক ডাক্তারখানা খুলল। আর দেবেশ সেই ডাক্তারখানার কেরানী-বাবু। কেউ এখানে এলে প্রথমে তার কাছ থেকেই টিকিট নিতে হবে।

শেষে একদিন দেবেশকে ও সবাই জোর করে বিয়ে করাল। আজ দেবেশের মেয়ে আর সুপ্রতিমের মেয়ে এক সাথেই সেই স্কুলে পড়াশুনা করে যেই স্কুলে দুই বন্ধু পড়াশুনা করত।
তবে স্কুলের খরচ-পত্র নিয়ে দুই বন্ধুতে মাঝে মধ্যে ঝগড়া হয়। কারণ ঐ ব্যাপারে দেবেশের কোন কথাই সুপ্রতিম শোনে না।
Top of the page

ছদ্মবেশী

-হরপ্রসাদ সরকার

এক রাজা ছিলেন। তার এক আজব নেশা ছিল। তিনি হঠাৎ হঠাৎ ছদ্মবেশে কিছুদিনের জন্য হারিয়ে যেতেন। আসলে তিনি রাতের বেলায় নিজ রাজ্যে ঘুরে বেড়াতেন। এই কথাটা শুধু মহামন্ত্রী আর প্রধান সেনাপতি জানতেন।
রোজ গভীর রাতে রাজপ্রাসাদের পিছনের পুরানো মন্দিরে রাজার সাথে এদের দেখা হত। আর কথা অনুসারে, একদিনের জন্য ও যদি রাজার আসা বন্ধ হয় তবে যেন মহামন্ত্রী আর সেনাপতি ধরে নেন যে রাজা বিপদের আছে আর তক্ষুনি যেন রাজার খোঁজ শুরু হয়।
তেমনি এক রাতে রাজা ভিখারির বেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এমন সময় চার-পাঁচ ডাকাত তাকে ঘিরে ধরল। তাদের মুখ ঢাকা, হাতে ছুরি।
তারা রাজার সব ছিনতাই করে রাজাকে কিল-চড় মারছিল কি হঠাৎ এই হট্টাকট্টা এক যুবক ছায়ার মত কোথা থেকে হাজির হল আর রাজাকে বাঁচাতে ডাকাতদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে একাই সেই ডাকাতদের উপর ভারী পড়ল আর প্রাণ বাঁচাতে ডাকাতরা এদিক ওদিক ছুটে পালিয়ে গেল।
রাজার শরীরে অনেক আঘাত লাগল। ছেলেটার শরীরেও অনেক আঘাত লাগল।
রাজা ঐ ছেলেটির সাহস, বুদ্ধি আর শক্তি দেখে অবিভুত হয়ে গেলেন। তিনি ছেলেটির জিজ্ঞাস করলেন “ তোমার নাম কি ? তুমি কে ? হঠাৎ তুমি এত রাতে কোথায় থেকে এখান হাজির হলে ? আর এরাই বা কারা ছিল ?
ছেলেটি ছদ্মবেশী রাজার ছেঁড়া পুটলা-পুটলি গোছাতে গোছাতে বলল “ দেখ ভাই আমি রাতে মিছে কথা বলি না। প্রতিজ্ঞা আছে। তাই আমি তোমাকে আমার নাম ভুল বলতে পারব না আবার সত্যি নাম ও তোমাকে বলতে পারব না। কারণ আমি একজন চোর। চুরি করতে বের হয়েছিলাম। পথে দেখলাম তোমাকে ডাকাতরা মারছে তাই চলে এলাম। আচ্ছা আমি যাই। ”
রাজা অবাক হয়ে গেলেন, বললেন “যাবে, ঠিক আছে। তবে আবার কোথায় তোমার দেখা পাব ?”
চোরঃ কেন?
রাজাঃ আমি তোমার সাথে থাকতে চাই।
চোর কি জানি কি একটু ভাবল। তারপর বলল “ঠিক আছে, তোমাকে আমার সাথে রাখতে পারি তবে তুমি আমার সম্পর্কে কাউকে কিছু বলবে না।”
রাজা তুরন্ত মাথা নেড়ে বলল “ না না আমি কাউকে কিছু বলব না।” চোর তখন রাজাকে সাথে নিয়ে আবার ছায়ার মত মিলিয়ে গেল।
রাতে চোর এক ধনী বাড়িতে চুরি করতে ঢুকল আর রাজাকে বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে বলল। রাজা সদর দরজা থেকে নজর রাখছিল বাড়ির দারোয়ানের উপর।
অনেক টাকা-কড়ি চুরি করে চোর ফিরে এলো সেই বাড়ী থেকে। তারপর সোজা চোরের ঘরে। খুব সাধারণ বাড়ি, খুব সাধারণ ঘর।
ঘরে ডুকে চোর চুরির মালের সমান তিন ভাগ করল। এক ভাগ দিল রাজাকে। আরেক ভাগ রাখল নিজে। রাজা অবাক হয়ে বলল “ আরেক ভাগের কি হবে ?”
চোর হেসে বলল “ ঐ টাকাটা দিয়ে লোকের সাহায্য হবে।”
রাজা অবাক হয়ে গেলেন। আজকের মত এমন অভিজ্ঞতা তার আর কোন দিন হয়নি। এ আবার কেমন চোর। চুরিও করে আবার সাহায্য ও করে। ব্যাপারটা আরেকটু গভীরে জানতে রাজা বললেন “ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু খুলে বলবে কি ?”
চোর হেসে বলল “ জানি তুমি বুজতে পারবে না। তার তোমাকে যখন আমার বন্ধু-ভাইই ভেবেছি , তখন আর কিছুই লুকাব না।”
চোরঃ আমার নাম কান্তি। মা’কে চোখে দেখিনি। বাবার কোলে পিঠেই মানুষ। বাবা ছিলেন এক গরিব, সৎ চাষি। আর আমি ভুল সঙ্গতে পড়ে চুরি করতে শিখি। দুই তিন বার ধরাও পরি। তারপর থেকে এমন বদনাম রটে যায় যে কোথাও আর কাজ পাই নি। তখন থেকে এটাই আমার জীবিকা। আমার এই বিপথে চলা বাবার সহ্য হয়নি। খুব তারাতারি তিনি বিছানায় পড়লেন। তিনি তার মৃত্যুকে দেখতে পেরেছিলেন।
মৃত্যুর কিছু আগে তিনি আমাকে দুটি প্রতিজ্ঞা করতে বলেন।তিনি বলেছিলেন এই প্রতিজ্ঞাই তোমাকে আবার সৎ মানুষ বানিয়ে দেবে। বাবার সেই প্রতিজ্ঞা আমি আজো অক্ষরে অক্ষরে পালন করছি। প্রথম প্রতিজ্ঞা , আমি রাতে মিছে কথা বলতে পারব না। আর দ্বিতীয় প্রতিজ্ঞাটি ছিল, আমি রাতে যে বাড়িতে চুরি করব, চুরির একটা অংশ পরদিন সেই বাড়িতে দিয়ে আসব। কোন দিন এই প্রতিজ্ঞার অন্যথা হয়নি। আজকের চুরির একটা অংশ কালকে ঐ বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসব।
রাজার বিস্ময়ের আর সীমা রইল না তিনি অবাক সুরে বলেন “লোকে তোমাকে চোর বলে সন্দেহ করে না?”
কান্তিঃ “ কেউ হয়ত করে। কিন্তু কোন চোর কি আবার তার চুরির মাল ফিরিয়ে দিয়ে যায় ? তাই অনেকে বিশ্বাস ও করে। আর বাবা হয়ত এটাই চেয়েছিলেন। লোকে আমাকে বিশ্বাস করুক।” কান্তির গলা ভারি হয়ে এলো।
রাজা ঠিক বুঝলেন এ জাত হীরা। তাকে এ ভাবে ফেলে রাখা যায় না।
ভোর বেলায় দুজনেরই ঘুম ভাঙ্গল। দুজনে কান্তির ছোট সব্জীর বাগানটা ঘুরে দেখলেন। তারপর দুজনে বেরিয়ে পরলেন। আবার সেই কালকের জায়গা , সে ধনী বাড়ি। অতি বিনীত এবং সংস্কারি ভাবে কান্তি সেই বাড়িতে গেল আর কিছু পরে যথারীতি ফিরে ও এলো।
রাজা বিনয়ের সুরে বললেন কাল থেকে বাড়ি যাইনি। বৌ , বাচ্চা হয়তো না খেয়ে আছে, হয়তো খুব দু-চিন্তায় আছে। আমি তবে বাড়ি যাই। রাতে আবার তোমার সাথে এখানেই দেখা করব। কান্তি রাজাকে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল।
রাতে কান্তি অনেক্ষন অপেক্ষা করে বাড়িতে ফিরে এলো। আজ রাতে বন্ধুটি আর আসেনি।
পরদিন সকালে রাজদরবারে, রাজা রাজার বেশে রাজ সিংহাসনে বসে আছেন। ধরে আনা হল কান্তিকে। হাজির করা হল রাজদরবারে।
কান্তি ভয়ে ভয়ে আর মুখ তুলে তাকায়নি। হঠাৎ তার কানে একটা চেনা সুর বাজল "কি বন্ধু চিনতে পেরেছ কিনা দেখতো ?"
আরে এ তো সেই ভিখারি বন্ধুর শব্দ। কান্তি মুখ তুলে আসে পাশে দেখল। কিন্তু না দেখা গেল না।
রাজা অট্টহাসি হেসে বললেন “এদিকে বন্ধু , এদিকে।”
রাজার মুখ পানে চেয়ে কান্তির শরীর অবশ হয়ে এলো। তার পা কাঁপতে লাগল।
রাজা আজ্ঞা দিলেন কান্তিকে তার আসনে বসানো হোক। যথারীতি কান্তিকে একটা আসনে বসানো হল। কান্তি কিছুই ভেবে পাচ্ছিল না।
রাজা ঘোষণা করলেন “আজ থেকে কান্তি আমার রাজসভার সদস্য। আমার রাজ্যের বিভিন্ন অসামাজিক কাজ প্রতিরোধের দায়িত্ব থাকবে কান্তির উপর। মহামন্ত্রী, কান্তিকে তার কাজকর্ম পরিচালনার যথাযথ শিক্ষা দেওয়ার কাজ আজ থেকেই শুরু হোক।”
কান্তি হাত জোর করে তার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে জল। সে মনে মনে বাবাকে প্রণাম করল "তাই বুঝি তুমি আমাকে প্রতিজ্ঞা করতে বলেছিলে?"
রাজা বন্ধুর সুরে কান্তিকে বললেন “তবে তোমাকেও যে প্রতিজ্ঞা করতে হবে , তুমি তোমার পুরানো কাজ চিরদিনের জন্য ছেড়ে দেবে !”
সজল নয়নে মাথা নেড়ে কান্তি তার সম্মতি জানাল।
Top of the page

গুরুর শিক্ষা

-হরপ্রসাদ সরকার

সে কয়েক যুগ আগে কথা এক সন্ত ছিলেন। খুব জ্ঞানী, পরোপকারী, সদাচারী। উনার অনেক শিষ্য ছিল। তিনি শিষ্যদের বেদ, পুরাণ , আসন, প্রাণায়াম, সদাচার , ব্রহ্মচর্য ইত্যাদি অনেক বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। সেখানে ধনী-গরিব সব ধরনের শিষ্য ছিল। উনি নিজের শিষ্যদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ করতেন না।উনি প্রতিদিন বিকেল বেলার একটা সময়ে শিষ্যদের নিয়ে নদীর পারে পারে ঘুরে বেড়াতেন। আর পথ মধ্যেই সংসার সম্পর্কে অনেক শিক্ষা দিতেন।

একদিন তেমনি তিনি শিষ্যদের নিয়ে নদীর পারে পারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। নদীতে বাকী সময় হাঁটু জল থাকলে ও আজ জল অনেক বেশী। সেই নদীর তীরে অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে আছে খুব সুন্দর একটি যুবতী। সে নদী পার করে ওপাশের গ্রামে যেতে চায়। কিন্তু জল আজ খুব বেশী তাই সে নদী পার করতে পারছে না। এদিকে সন্ধ্যাও প্রায় নেমে আসছে।
গুরুদেব হাটতে হাটতেই বলতে লাগলেন “ পরোপকার মানুষের এক শ্রেষ্ঠ ধর্ম। আমাদের সবারই পরোপকার করা উচিত।”
আরো কয়েক পা এগিয়ে বললেন “ সব সময় নিজের চরিত্র বজায় রাখবে। চরিত্র মানুষের পরম মিত্র।”

কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ তিনি থমকে দাঁড়ালেন। পিছন ফিরে তাকালেন। বাকি শিষ্যরা ও ফিরে তাকাল। সবাই দেখতে লাগল গুরুদেবের শিষ্য চন্দজ্যোতী সেই সুন্দরী যুবতীটিকে কুলে করে নদীর ও পার পৌঁছে দিয়ে এলো। গুরুদেবের কাছে ফিরে এসে সে গুরুদেবকে প্রণাম করল। গুরুদেব তার কাঁদে হাত রেখে হেসে উঠলেন। বললেন “তোমারা কেউ আমার কথা বুঝতে পারনি। আমি তোমাদের সবাইকে পরীক্ষা করছিলাম। শুধু চন্দ্রজ্যোতী আমার ইশারা বুঝতে পেরেছিল। আমি বলেছিলাম পরোপকার মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম। সাথে একটু পরে বলেছিলাম চরিত্র মানুষের পরম বন্ধু। অর্থাৎ আমি ইশারায় বলতে চেয়েছিলাম নিজের চরিত্রটা ঠিক রেখে পরোপকার করো , আমার ইশারা সেই অসহায় কন্যাটির প্রতি ছিল। চন্দ্রজ্যোতী আমার ইশারা ঠিক বুজতে পারে , আর সেই মত কাজ ও করে।” এই বলে তিনি চন্দ্রজ্যোতীকে অনেক আশিস দিলেন।



Top of the page
All Pages     1    2    3    (4)     5    6    7    ...

Amazon & Flipkart Special Products

   


Top of the page