Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
Read & Learn
 

Bangla Story

( বাংলা গল্প )

All Pages   ◍    5    6    7    8    (9)     10    11    12    ...

ভবানী আর চোর

- হরপ্রসাদ সরকার







এক রাজদরবারে একদিন এক অপরাধীকে হাজির করা হল। তার বিরুদ্ধে অনেক দিন থেকেই চুরির অভিযোগ, ডাকাতির অভিযোগ। কিন্তু তাকে সৈনিকরা অনেক চেষ্টা করেও আগে ধরতে পারেনি। শেষে যখন সে ধরা পরল, বিচারে রাজা তাকে প্রাণদণ্ড দিলেন।

সেই চোর চুরি করাকে একটা মজার খেলা মনে করত। সে নিজেকে চোরদের উস্তাদ ভাবত। সে মনে করত তাকে কোনদিন কেহ ধরতে পারবে না। কিন্তু সে জানত না উস্তাদের ও উস্তাদ থাকে। তাই যখন সে ধরা পরল আর তার মৃত্যুদণ্ড হল, তখন সে কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হল আর তার মজার খেলার সব মজা হাওয়ায় উড়ে গেল। সে প্রাণের মায়ায় হাউ-মাউ করে রাজসভাতে কাঁদতে লাগল আর প্রাণের ভিক্ষা চাইতে লাগল।

শেষে রাজা তাকে মুক্তি দিতে রাজি হলেন কিন্তু একটা শর্তে। শর্তটা ছিল, পাশের শহরে একজন জ্ঞানী, সজ্জন, সৎ লোক থাকেন। নাম ভবানী। লোকে তাকে খুব শ্রদ্ধা করে। সেই ভবানীর কাছে এই চোরকে এক বছর চাকর হয়ে, ভবানীর সাথে সাথে থাকতে হবে। তবে চোরের উপর সর্বদাই একজন গুপ্তচর নজর রাখবে। সেই চোর প্রাণ বাঁচাতে সাথে সাথেই রাজার কথায় রাজি হয়ে গেল আর মনে মনে ফন্দী আঁটল, “দুই দিন ঐ ভবানীর চাকর থেকে তারপরেই ওখান থেকে হাওয়া হয়ে যাব। হাওয়া হতে আর আমার কতক্ষণ লাগবে!”



রাজা দুজন সিপাহীর সাথে একটি চিঠি এবং সেই চোরকে ভবানীর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। ভবানীর কাছে গিয়ে চোর দেখল, এটি একটা সাধারণ বাড়ি। এখান থেকে পালাতে তার কোন কষ্টই হবে না। আর ভবানী, সে দেখতে রোগা-পাতলা। একটা ধাক্কা সামলানোই তার পক্ষে কঠিন। চোর ভেবে পেল না রাজা কেন এই ভবানীর কাছে তাকে পাঠালেন ?

ঘরের পাশেই ভবানীর অল্প কিছু জমি-জামা ছিল। সে সকাল সন্ধ্যায় সেখানেই পরিশ্রম করে চাষ-বাস করত। প্রথম দিন চোর তার সাথেই জমিতে কাজ করতে গেল। চোর খুব অবাক হল এই দেখে যে, অল্প কিছু জায়গাতেই এত ফসল হয়েছে যা একটা বড় জমিতেও হয়না। যতই চোর ভবানীর পিছন পিছন হাটতে লাগল ততই সে জমির ফলস, সব্জী দেখে একের পর এক অবাক হতে লাগল। এত ভাল আর সুন্দর ফসল এত ছোট জায়গায় সে কখনোই দেখেনি। সে বুঝতে পারল যে কৃষিকাজ সম্পর্কে ভবানীর জ্ঞানের কোন তুলনা হয়না। সে উৎসাহে ভবানীকে এটা ওটা জিজ্ঞাস করতে লাগল। ভবানীও জবাব দিতে লাগল। কথায় কথায় চোর জানতে পারল যে বহুবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন নানা কারণে ফসল নষ্ট হতে বসেছিল, রাজা সেই ফলস বাঁচাতে ভবানীর পরামর্শ চেয়েছিলেন আর তাতে খুব কাজ ও হয়েছিল। এমনটা বহুবার হয়েছে।

সকালের জমির কাজ শেষ করে যখন তারা বাড়িতে ফিরল দেখল এক ধনী শেঠ হাত জোর করে দাঁড়িয়ে আছে। কাল উনার বাড়িতে দুপুরে খাবার নিমন্ত্রণ। সেই ধনী শেঠ চলে যাবার কিছু পরেই সেখানে একটা গরিব লোক এসে হাজির হল। হাত জোর করে সে বলল “মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। কিন্তু ঘরে কোন টাকা-কড়ি নাই। এখন কি করি? ভেবে পাচ্ছি না। আপনিই শুধু আমাকে সাহায্য করতে পারেন।”

ভবানী একটু সময় ভাবল তারপর একটি চিঠি লিখে তার হাতে দিয়ে দিল। বলল “কাল সকালে এটি নিয়ে রাজ দরবারে যাবে। একশটা স্বর্ণ মুদ্রা পেয়ে যাবে। আশা করি এতেই তোমার কাজ হয়ে যাবে। তবে ধীরে ধীরে, যতদিনে হয় এর অর্ধেক তোমাকে ফিরিয়ে দিতে হবে।” সেই গরিব লোকটি সজল নয়নে হেসে উঠল, যেন সে মেঘ না চাইতেই জল পেয়ে গেল। সে খুব খুশি হয়ে ভবানীকে অনেক অনেক আশীর্বাদ দিতে লাগল। সে ভেবে পাচ্ছিল না কিভাবে ভবানীকে কৃতজ্ঞতা জানাবে।



সেই চোর দাঁড়িয়ে মনে মনে হিসাব করতে লাগল একশ স্বর্ণ মুদ্রা চুরি করে জমাতে তার ত্রিশ বছর লাগত। আর রাজা কিনা ভবানীর এক চিঠিতে একদিনেই একশ স্বর্ণ মুদ্রা দিয়ে দেবেন? তার মনের সমুদ্রে একটা নতুন বিচার-ভাবনার ঝড় উঠল।

পরদিন তারা সেই ধনী শেঠের বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে গেল। এত সব ভাল ভাল রান্না, এত সব খাবার চোর কখনো চোখেই দেখেনি। সে জানতে পারল যে, একবার এই শেঠের ব্যবসাতে খুব লোকসান হয়। নিজের ব্যবসা বাঁচাতে সে ভবানীর কাছে সাহায্য চেয়েছিল। ভবানীর এক চিঠিতেই রাজা শেঠকে দশ হাজার স্বর্ণ মুদ্রা ঋণ দিয়ে দিয়েছিলেন। এই দশ হাজার স্বর্ণ মুদ্রার কথা শুনে চোর ক্যাবলার মত হা করেই তাকিয়ে রইল। সে আর হিসাব করেই পেল না এত স্বর্ণ মুদ্রা চুরি করে জমাতে তার কত বছর লাগবে। আর রাজা কিনা ভবানীর এক কথাতেই তা শেঠকে দিয়ে দিলেন?

চোরের মনে এক তুফান উঠল। “এক ভাল মানুষ যদি শুধু নিজের কাজ আর কথার গুনে এত এত কিছু করতে পারে তবে আমি কেন শুধু শুধু চুরি করে মরতে বসেছিলাম।” তার এই ভাবনার অঙ্কুর ধীরে ধীরে বৃক্ষে পরিণত হতে লাগল। সে ভবানীর কাছে থেকে মন দিয়ে কৃষি কাজ শিখতে লাগল। দেখতে দেখতে এক বছর পার হয়ে গেল, দু বছর পার হয়ে গেল। শেষে ভবানীর কথাতেই সেই চোর একদিন রাজ দরবারে হাজির হল।

রাজা চোরের মধ্যে এমন পরিবর্তটাই চেয়েছিলেন। তিনি খুশি খুশি চোরকে কিছু জমিন প্রদান করলেন চাষ-বাস করার জন্য। চোর এখন চাষ-বাস করেই মহা আনন্দে দিন কাটায়। সে তার গুরুর মত এত উস্তাদ না হলেও লোকে তাকে উস্তাদের চোখেই দেখতে লাগল।
Top of the page

হনুর কথা

- হরপ্রসাদ সরকার

তনু আর রবি দুই বন্ধু একই স্কুলে, সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। তাদের বাড়িও পাশাপাশি। একই সাথে তারা পায়ে হেটে স্কুলে যায়। আবার একই সাথে ফিরে আসে।

একদিন স্কুলে যাবার সময়, তাদেরই সমবয়সী ঐ পাড়ার একটি বদমাশ ছেলে তাদের পথ আটকে দাঁড়ায়। সে রবিকে বলে “তুই তো ভাল ছেলে। সেটা আমি জানি আর তাই আমি তোকে ভালবাসি। তোর সাথে আমার কোন ঝগড়া নাই। তুই যা। কিন্তু তনু একটা দুষ্ট ছেলে, বাজে ছেলে। তনুর সাথে আমার কিছু কথা আছে।”

রবি মনে মনে ভাকে “যাক বাবা সেই বদমাশ ছেলেটা আমাকে ভাল ছেলে ভাবে, আমাকে ভালবাসে। কেন তার সাথে আমি শুধু শুধু ভেজাল পাকাব? আমি তার সাথে ঝগড়া না করে পালাই। তনুর যা হবার হোক, আমি তো বাঁচলাম”। রবি চলে গেলে বদমাশ ছেলেটা তনুর সব টিফিন খেয়ে নিলো, তার কয়েকটা বই-খাতা ছিঁড়ে দিল।

কয়েক দিন পর পরই এমনটা হতে লাগল। সেই ছেলেটা কখনো তনুর খাতা কেড়ে নেয়, কখনো তনু কাছে যদি এক-দুই টাকা থাকে তা কেড়ে নেয়। সে তনুকে খুব ধমকায়, “কাউকে যদি আমার কথা বলিস তবে কিন্তু তোকে খুব মারব”।

প্রায়ই এমন হয়রানি হতে হয় বলে তনু বাড়ি থেকে টিফিন আনা বন্ধ করে দিল। সে আর পয়সা ও নিজের কাছে রাখে না, বই-পত্র ও অনেক কম নিয়ে চলতে লাগল।

সেই ছেলেটা যখন দেখল যে তনুর ব্যাগে আর তেমন কিছু পাওয়া যাচ্ছে না , তখন সে একদিন দুজনেরই পথ আটকে বলল “তনু এখন ভাল ছেলে হয়ে গেছে। কিন্তু রবি তুই খুব অহংকারী হয়ে গেছিস। তুই দাঁড়া, তোর সাথে আমার কথা আছে।” তনু চলে গেলে বদমাশ ছেলেটা রবির সব টিফিন খেয়ে নিলো, তার বই-খাতা ছিঁড়ে দিল, পকেটে পাঁচ টাকা ছিল সেটাও কেড়ে নিলো।

রবি মনে মনে খুব দুঃখ পেল। সে ভাবল, কেন সেদিন বদমাশ ছেলেটির কথায় বিগলিত হয়ে তনুকে একা ছেড়ে চলে গেলাম? তাই তো আজ তনু আমাকে ছেড়ে চলে গেল। বদমাশ ছেলেরা এমনই করে এক- অন্যের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে দেয়। আর তখন নিজে বেশ মজা করে। তাদের স্বার্থে আঘাত লাগলেই তাদের প্রশংসা অত্যাচারে বদলে যায়। তারা শুধু প্রশংসা করে নিজের কার্যসিদ্ধির জন্য। বদমাশদের ছলনার অভাব হয় না। সে ভাবল কখনোই আর এমন দুষ্ট লোকের প্রশংসাতে বিগলিত হব না।

কয়েক দিন তেমনি চলতে লাগল। সেই বদমাশ ছেলেটির ভয়ে ভয়েই তনু আর রবির দিন কাটতে লাগল। প্রায় মাস খানেক পড়ে একদিন হঠাৎ তনুর এক পিসতুতো ভাই, ভানু শহর থেকে তাদের বাড়িতে বেড়াতে এলো। সেও তাদের মতই সপ্তম শ্রেণীতেই পড়ে। সে পড়াশুনাতে ও খুব ভাল কিন্তু তবু স্কুলের সব ছেলেরা তার থেকে দুরেই থাকতে চায় কারণ সে মহা পাজি। তার দস্যিপনায় মাতা, পিতা, শিক্ষক, ছাত্র সবাই অতিষ্ঠ। কিন্তু যেহেতু সে পড়াশুনাতে খুব ভাল তাই অনেকেই তার দস্যিপনাকে ছেলেমানুষি মেনে নিয়ে তার পক্ষেই কথা বলে। তার এই দস্যিপনার জন্যই সবাই তাকে ভানুর বললে হনু বলে ডাকে এবং চিনে।

হনুকে দেখে তনুর তনুতে যেন প্রাণ ফিরে এলো। সে সব কথা গোপনে হনুকে খুলে বলল। হনু অগ্নিশর্মা হয়ে বলল “সব দোষ তোদের। তোরা দুজনে মিলে প্রথম দিনই যদি তাকে ঠেঙ্গিয়ে দিতি তবে সে এমন সাহস আর করতেই পারত না।”

পরদিন হনুকে সাথে নিয়েই রবি আর তনু স্কুলে চলল। সময় মত সেই বদমাশ ও সামনে এসে তাদের পথ আটকে দাঁড়াল। তনু আর রবির সাথে নতুন একটা পাখী দেখে সে খুশিই হল। হনু তাকে জিজ্ঞাস করল কেন সে তাদের পথ আটক করেছে? বদমাশ ছেলেটা বেশ দাদাগিরী দেখাতে শুরু করল আর বড় বড় ডিংগী হাঁকতে লাগল। সে বেশ হুমকি-ধমকি দিতে লাগল। সে নিজের শক্তির বড়াই করছিলই কি হঠাৎ হনু তার ডান গালে, কানের কাছে খুব কষে, খুব জোরে, বিদ্যুৎ বেগে চটাস করে এক চড় মারল। এতে বদমাশ ছেলেটি ছেবড়ে খেয়ে উঠল। সে বুঝতেই পারল না কি হয়ে গেল।

তনু, রবি বা হনু কেউই জানত না যে বদমাশ ছেলেটির ডান কানে ব্যামো ছিল। ফলে যা হবার তাই হল। হনুর চড়ে বাঁদরের বাদর নাচ শুরু হল। জোরে কাঁদতে কাঁদতে বাঁদর মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগল। আচানক এমনটা দেখে ভয়ে চোখের পলকে হনু, তনু, আর রবি সেখান থেকে মন্ত্রের মত হাওয়া।

অনেকদিন পরে আবার এক শীতের কনকনে সকালে গ্রামের পুকুরের পারে এই তিন জনের সাথে সেই অপরজনের দেখা হল। তাদের আসতে দেখেই সেই অপরজনটি ঝড়ের মত পরি-কি-মরি হয়ে পুকুরের ঠাণ্ডা জলেই লাফিয়ে পড়ল আর দেখতে দেখতে সাতরে ও পারে উঠেই কাঁপতে কাঁপতে হাওয়া।


Top of the page



All Pages     5    6    7    8    (9)     10    11    12    ...