Home   |   About   |   Terms   |   Book Rent   |   Contact    
Flag
A platform for writers

জীবন রং বদলায়

বাংলা গল্প

All Bengali Stories    116    117    118    119    120    121    (122)     123    124    125   



জীবন রং বদলায়
বাংলা গল্প
স্বরচিত গল্প প্রতিযোগিতার ( নগেন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার , ২০২১) একটি নির্বাচিত গল্প
লেখিকা : অর্পিতা ভাণ্ডারী, বাবা: আশিস ভাণ্ডারী, শ্যামবসুর চক, ডায়মন্ড হারবার, দক্ষিণ 24 পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ


## জীবন রং বদলায়
বৈশাখ মাসের মধ্যাহ্ন কালীন সময়ে, কালবৈশাখীর দরুন গতরাতে এবং আজ সকালের বৃষ্টিতে চারিদিকের প্রকৃতি -পরিবেশ সিক্ত। যেন সদ্যস্নাতা নববধূর মত নবরূপে সজ্জিত হয়েছে প্রকৃতি। এখন বৃষ্টি হচ্ছে না। আকাশ শালিক পাখির ডিমের মতো নীল। সকালের সেই ঝড়-জলের ভীষণ রূপ আর বজ্রের ভয়ংকর করাঘাতের পর এমন রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া, ব্যাপারটা যেন মরীচিকার মতোই মনের ভুল বলে মনে হয়। পুকুর পাড়ের একটা কোনে একটা বিশাল আকার রাধাচূড়া গাছের শাখা হলুদ-হলুদ ফুলের গহনায় যেন সজ্জিত হয়ে আছে। দুপুরের ঘন রোদে তার ফুলগুলো যেন মিশে গেছে। ফুলের ভারে গাছটির একটা বৃহদাকার ডাল পুকুরের জলের উপর ঝুঁকে পড়েছে, মনে হয় যেন এখুনি ভেঙে পড়ে যাবে জলে। কিংবা গাছের ঐ ফুল সজ্জায় সজ্জিত সুন্দর শাখাটি পুকুরের জলে নিজের রূপ দেখছে।

পুকুর ঘাট প্রায় জনহীন। দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। স্তব্ধতা যেন সবকিছুকে গ্রাস করেছে। এই দুজনের মধ্যে একজন গৃহবধূ বাসন মাজছে আর একজন প্রায় বছর-দশেকের একটা মেয়ে তার পাশে বসে তাকে সাহায্য করছে। হঠাৎ চোখের সামনে থেকে ছোট্ট একটা মাছরাঙা চোঁ করে পুকুরের জল থেকে একটা মাছ ধরে নিয়ে একটা সোনাঝুরি গাছে গিয়ে বসলো। সঙ্গে সঙ্গে বালিকাটি তার দিকে তাকাল ; সেদিকে তাকিয়েই সে বসে রইল। তার ইচ্ছে হয়‌ পাখিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে। কিন্তু পাখিগুলো খুব নিষ্ঠুর, সে ওদের সঙ্গে খেলতে গেলেই তারা উড়ে যায় ! পাখিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে হয়তো সেও একদিন পাখিদের ভাষা বুঝতে পারবে, তাদের সঙ্গে খেলতে‌ পারবে আর হয়তো তারও সাতরঙা রামধনুর মতো ঝলমলে দুটো ডানা গজাবে। তখন সে দূর দেশে চলে যাবে পক্ষীরাজ ঘোড়ার মত তেপান্তরের মাঠের ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমীর কাছে।এসব ভাবনাতেই সে যখন মগ্ন আছে তখন সে একটা কথা শুনতে পেল, "শকুন্তলা, বাড়ি যাবি না?"

চমক ভেঙে সে বধূটির দিকে তাকিয়ে বলল, "চলো বৌঠান।"

শকুন্তলা মনে-মনে বেশ লজ্জা পেল। সে ভাবনায় মগ্ন হয়ে থাকায় সব বাসন বৌঠান একাই মেজেছে আবার ধুয়ে ফেলেছে‌। তাই বৌঠান রাগ করলো কিনা তা সে বুঝতে পারল না। দুজনেই বাসন হাতে বাড়ির দিকে চলতে-চলতে দু-একটা কথা বলছে, এমন সময় দূর থেকে কোকিলের সুমিষ্ট গান ভেসে আসলো। তারপর শকুন্তলাও কোকিলের কণ্ঠের নকল করে কোকিলের সঙ্গেই সেই সংগীত প্রতিযোগিতায় যেন অংশগ্রহণ করলো।

শান্তমতী রোয়াকে পা ছড়িয়ে বসে তেঁতুল ছড়াচ্ছিল। তার পাশে একরাশ তেঁতুল ছোটো যেন একটা পাহাড়ের আকার ধারণ করেছিল। শকুন্তলা আর পদ্মকে ঘরে ঢুকতে দেখে সে গজ-গজ করে উঠলো, "এত সময় ধরে বাসন মাজা হচ্ছিল, না নতুন করে পুকুর কেটে তবে বাসন মাজলে বাছারা? নাও এবার দয়া করে গৃহ প্রবেশ করে অন্য কাজগুলো কর দিকি..."

কথাগুলো সে শকুন্তলাকে নয়, তার ষোড়শী পুত্রবধূ পদ্মকেই উদ্দেশ্য করে বলেছে। পদ্ম কোনও উত্তর না দিয়েই অন্য কাজের উদ্দেশ্যে চলে গেল। পিতা-মাতা নামকরণের সময় কি আর ভেবেছিল যে তাদের শান্তমতী বড় হয়ে এমন করে নাম হাসাবে ! সর্বদাই যার মেজাজ লবঙ্গের মত ঝাল-ঝাল থাকে। কিন্তু সে মনের দিক থেকে ভালো মানুষ।

শকুন্তলা শান্তমতীর কাছে গিয়ে বসে বলল, "তেঁতুল কি করবে মা?"

শান্তমতী এ-বাড়ির সকলের সঙ্গে ধানি লঙ্কার মত কথা বললেও মেয়েকে সে কখনো ধমক দিয়ে কথা বলে না। অর্থাৎ তখন সে সত্যিই শান্তমতী মাতা হয়ে যায়। অতএব সে একগাল হেসে জবাব দিল, "এই অবেলায় তেঁতুল খা তুই, তারপর অম্ল হোক। এসব বুদ্ধি নিয়ে কি করে যে পরের বাড়ি যাবি তা কে জানে!"

#
জানালার ধারে বসে শকুন্তলা বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। সাদা-সাদা মেঘগুলো বরফে ঢাকা পাহাড়ের মত দেখাচ্ছে। দূরের বড়-বড় নারকেল গাছগুলো যেন এক একটা দৈত্যের মতন দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে হেলে দুলে তারা যেন রাজকুমারীকে গিলতে যাচ্ছে। হয়তো রাজকুমার ওই দিক থেকে পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চেপে তাকে বাঁচাতে আসবে। কাছাকাছি একটা তুলো গাছে লণ্ঠনের মতো কত তুলো ঝুলছে। ওই তুলো গাছটাও হয়তো কোনও এক ছদ্মবেশী দৈত্য। এসব ভাবতে-ভাবতেই বিকাল শেষ হয়ে যায় আর অন্ধকারের অবগুণ্ঠনে মুখ ঢেকে কালো বধূ হাজির হয়। তারপর মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আবদার করলেই তো সে শুনতে পাবে রাক্ষস-রাক্ষসী আর পরীদের গল্প। রাতে ঘুমের মধ্যেও সে নীল পরী আর লাল পরীদের স্বপ্ন দেখবে, তাদের সাথে কথা বলবে।

সকাল প্রায় আটটা বাজে,পদ্ম শাশুড়ির ভয়ে সকাল-সকাল স্নান করে এসে পূজা ঘরে আলপনা দিচ্ছে। আজ মঙ্গলবার, আর মঙ্গলবার সকাল-সকাল ভালো করে পূজা না করলে নাকি অমঙ্গল হয়। শকুন্তলা আকাশের দিকে মুখ করে রোয়াকে বসে ছিল, আজ আবার আকাশে মেঘ জমে অন্ধকার হয়ে আছে। বৃষ্টি হবে বুঝাই যাচ্ছে। এমন অসময়ে বৃষ্টি হবে তা ভেবে শকুন্তলার একদমই ভালো লাগছে না। এবার ঘরে বসে থাকতে হবে, বাইরে খেলা বন্ধ। সত্যিই প্রকৃতি গিরগিটির মতো রং বদলাতে পারে। কখনো রাতের ঘন অন্ধকার, আবার কখনো সোনা রোদে রাঙা দিন। এই রোদ - এই বৃষ্টি। কিন্তু শকুন্তলার মনে হয় পরীদের রানী রাগ করেছে, তাই আকাশে মেঘ করেছে। পরীদের রানী কাঁদলে বৃষ্টি হবে। কিন্তু তার মনে এত কষ্ট কে দিল তা শকুন্তলা ভেবে পায় না। কিন্তু কেবল প্রকৃতিই নয় জীবনও যে রং বদলায় তা এই বালিকার মনকে কে বোঝাবে? শকুন্তলার জীবনেও যে বদল ঘনিয়ে আসছে তার কারণ কে ভাবতে চেষ্টা করবে? শকুন্তলার জীবনেও কি শকুন্তলার মতো কোনও দুষ্মন্তের আবির্ভাব ঘটতে পারে? যদি সেই দুষ্মন্তের মনে রাক্ষসের মত প্রবৃত্তি হয় তাহলে তাকে কে রক্ষা করবে? তার জন্য কি কোন রাজপুত্র পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে আসবে না উদ্ধার করতে?

দু -বছর কেটে গেছে। এখনও শরৎকালে পুকুরে শালুক ফোটে, বর্ষায় পুকুরে আর নদীতে জল টলমল করে। ফিঙে পাখি গুলো লাফালাফি করে। বনের হরিণীদের ছোটাছুটিতে কোনও বিধি-নিষেধ না থাকলেও এখন থেকে শকুন্তলাকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও নানা বিধিনিষেধ মানতে হবে। তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। দ্বাদশী বয়সী শকুন্তলা এবার পতিগৃহে যাত্রা করবে। পাত্রের নাম শিকারি মিত্র। শকুন্তলা সকলকে চোখের জলে ভাসিয়ে চলে গেল। কিন্তু এ শিকারি যে কত হরিণীকে বিয়ে করে রেখেছে আগে থেকে তা কি বোঝা সম্ভব তার পক্ষে? অন্দরমহলে শকুন্তলার সাত-আটটা সতীন। তারই বয়সী ছেলেমেয়েরা তাকে দেখতে এসে তার স্বামীকে জিজ্ঞাসা করল, "বাবা, এটা আমাদের নতুন মা?"

শকুন্তলার বেশ বিরক্তি বোধ হয়। বরের চেহারাও দৈত্যের মতো। যেমন রূপকথায় থাকে, রাক্ষস। বিয়ের সময় শকুন্তলা মালা গলায় দেওয়ার বদলে ভয়ে‌ মাটিতে ফেলে দিয়েছিল। শুভদৃষ্টির সময় এসে মাটির দিকেই তাকিয়ে ছিল। এবার জীবনটাও মাটি হবে। এক মাস পর এক সপ্তাহ জ্বরে ভুগে তার স্বামী মারা গেল ! তার চার পাঁচ দিন পরে তাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়া হল ! আবার সে নিজের জন্মস্থান, তার বাপের বাড়ি ফিরে আসলো। এবার এই বালিকা বিধবাকে উদ্ধার করতে কোন রাজকুমারের উদয় হবে?

#
একদিন শকুন্তলা নদীর ধারে বসে আছে। মনে তার দারুণ হতাশা। এ হতাশা স্বামী কিংবা শ্বশুরবাড়ির আশ্রয় হারানোর জন্য নয়, সামাজিক অবহেলার জন্য। শান্তময়ীও এখন তার জ্বালাময়ী কথা মেয়েকে শোনায় ! এমনকি বৌঠানও আচার-ব্যবহারে বুঝিয়ে দেয় বিরক্তি। সবার কাছে সে এখন বোঝা। তার অলক্ষ্যেই দু"ফোঁটা জল চোখ থেকে পড়ে। তারপরই তার মনে হয় কেউ তার দিকে দেখছে ! তার চোখে পড়ে কিছু দূরেই কেউ একজন দাঁড়িয়ে যে তার দিকে দেখছে ! শকুন্তলা তাড়াতাড়ি কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে নিল। সবাই বলে দিয়েছে তার মুখ ঢেকে রাখতে। কেউ তার মুখ দেখলে পাপ হবে।

সত্যিই জীবন গিরগিটির মতোই রং বদলায়। কিন্তু শকুন্তলার জীবনের রং বদলানোর ছিল,তা আগেই বদলেছে। আর কোন রং বদলাবে না। কলুষিত হয়েছে জীবনের সকল রঙ। সকল দুষ্মন্ত নিষ্ঠুর। শকুন্তলা একবার জলে ঝাঁপ দিয়ে জীবন শেষ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু মৃত্যু এত সহজলভ্য নয়। সবাই আত্মহত্যা করতে পারে না। জীবন এখন শুকনো পাতার মতো হয়ে গেছে। বাতাস যেখানে নিয়ে যাবে সে সেখানেই যাবে, না হলে চিরকালের মতন মাটিতে চুপচাপ পড়ে থাকতে হবে। নিজের কোনও ক্ষমতা নেই। তারপর মাটিতে মিশে মাটি হয়ে যেতে হবে। বহু পথ আছে যেখান থেকে আর এগিয়ে সামনে যাওয়া কঠিনই নয় বড় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। অদৃষ্টের পরিহাসে না মানুষের কুসংস্কারে কত শকুন্তলা শুকনো পাতা হয়ে অক্ষম হয়েছে, এ কথা কে-কাকে বুঝবে? আর হয়তো এই অক্ষমতা তার শক্তি হীনতা অবস্থা থেকেই জীবন আবার প্রাণপ্রাচুর্য পূর্ণ হয়ে নতুন রঙে রঙিন হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু শকুন্তলার জীবনে তা হল না। তবুও এ কথা সত্য যে, জীবন যেকোনো রং বদলাতে পারে।
( সমাপ্ত )


Next Bengali Story

All Bengali Stories    116    117    118    119    120    121    (122)     123    124    125   


## Disclaimer: RiyaButu.com is not responsible for any wrong facts presented in the Stories / Poems / Essay / Articles / Audios by the Writers. The opinion, facts, issues etc are fully personal to the respective Writers. RiyaButu.com is not responsibe for that. We are strongly against copyright violation. Also we do not support any kind of superstition / child marriage / violence / animal torture or any kind of addiction like smoking, alcohol etc. ##


◕ RiyaButu.com, এই Website টি সম্পর্কে আপনার কোনও মতামত কিংবা পরামর্শ, কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। যোগাযোগ:
E-mail: riyabutu.com@gmail.com / riyabutu5@gmail.com
Phone No: +91 8974870845
Whatsapp No: +91 7005246126