Home   |   About   |   Terms   |   Book Rent   |   Contact    
A platform for writers

মিডলাইন প্রেম

বাংলা গল্প

-------- বিজ্ঞপ্তি ----------
◕ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা - সেপ্টেম্বর ২০২২, Details..
--------------------------



All Bengali Stories    161    162    163    (164)     165    166   

মিডলাইন প্রেম
লেখক - আবরার নাঈম চৌধুরী, বাংলাদেশ
( মার্চ, ২০২২-এর একটি নির্বাচিত গল্প)


## মিডলাইন প্রেম

#
আজ বুধবার, ১০ই ফেব্রুয়ারি ২০২১। বাসের সামনের সিটে বসে আছি। সায়েন্স ল্যাবের দিকে বাস ছুটছে। হঠাৎ পিছনে শোরগোল শুনতে পেলাম —
"মামা দেখেন না একটু? আমার কাছে নাই আর টাকা!"

"আমার কাছে নাই পাঁচশ টাকা ভাংতি। বিশটা টাকা ভাংতি রাখতে পারেন না?"

পিছে তাকালাম। দেখলাম সাদা এপ্রোন এবং মুখে মাস্ক পরা একটা মেয়ে টাকা ভাংতির সমস্যায় পড়েছে। আশেপাশের মানুষও এগিয়ে আসছে না।

"ভাই! ভাড়া কত উনার?" আমি এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করাতে বাসের হেল্পার বলল, "বিশ টাকা..."

মানিব্যাগ থেকে বিশ টাকার নোট বের করে দিতেই হেল্পার চলে গেল। আমিও নিজের সিটে বসে পড়লাম। বাটা-সিগন্যাল এসে রাস্তার এক পাশে দাঁড়াল বাস। বাস থেকে সবাই এক-এক করে নেমে যাচ্ছে। তন্দ্রার পাহাড় নেমে এসেছে চোখে। হঠাৎ কে যেন বলে উঠলো, "বসতে পারি?"

ঘুম-ঘুম চোখে তাকিয়ে দেখি সাদা এপ্রোন এবং মুখে মাস্ক পরা সেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে, "পাশের সিটে যাবেন? আমি বসব।"

"জি..."

আমি পাশের সিটে চলে গেলাম। মেয়েটি বসে পড়ল। কিছু যাত্রী বাসে উঠে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। রাস্তার পাশে কিছু তরুণ-তরুণীর ফুচকা খাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ল। তাদের সাথে মাস্ক নেই। করোনার এমন সময়ে তাদের সাথে মাস্ক রাখা উচিত ছিল।

"আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।" কথটি শুনে চমকে ডান পাশে তাকালাম। বললাম, "আমাকে কিছু বলছেন?"

"জি, ধন্যবাদ।"

"কি জন্য?"

"ভাংতি বিশ টাকা দিয়ে সাহায্য করার জন্য।"

উত্তরে আমি মুচকি হাসলাম।

"মামা! এখানে নামব, নামিয়ে দেন।"

বাস থামল। মেয়েটা বাস থেকে নেমে সোজা ফুটপাথ ধরে হাঁটা শুরু করল। আমি বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইলাম।

১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২১; বৃহস্পতিবার। এলিফেন্ট রোডে ট্রাফিক জ্যামে ফেঁসে আছি। মতিঝিল যাব। কিছু যাত্রী উঠল, কিছু যাত্রী নামল। হঠাৎ পিছন থেকে শোরগোলের শব্দ শুনতে পেলাম। মহিলার সাথে হেল্পারের ভাড়া নিয়ে বিতর্ক। "কী হল? কী ব্যাপার?" ভেবে পিছনে তাকাতেই দেখি সেদিনের সেই মেয়েটি, সদা এপ্রোন আর মাস্ক পরা। সিট থেকে উঠে পিছনে এগিয়ে গেলাম।

"মামা! ভাড়া তো ১০ টাকা। আপনি ২০ টাকা কেন বলছেন?"

"আপনেরে কে বলল ভাড়া ১০ টেকা?"

"কে বলল মানে?"

"সায়েন্স ল্যাব থেকে মতিঝিলের ভাড়া ১০ টেকা কোন হালায় কইল আপনারে?"

"আপনি কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি করছেন এখন..."

"এই মামা! কী সমস্যা? আমাকে বলেন। কী হয়েছে?" আমার কথা শুনে হেল্পার পিছনে তাকিয়ে বলল, "দেখেন তো, ভাড়া ২০ টেকা মানতেই চায় না।"

"আচ্ছা উনি আপনাকে কত দিয়েছে?"

"১০ টেকা।"

"এই নেন, বাকি ১০ টাকা। যান, খুশি তো?"

"হ..."

হেল্পার চলে গেল। আমি মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললাম, "ভালো আছেন? চিনতে পেরেছেন?"

"আরে আপনি? আজকেও একই বাসে?"

"জি, মতিঝিল যাচ্ছি," বলেই সামনে এসে আমার সিটে বসে পড়লাম। জ্যাম ছাড়ল। বাস দ্রুত গতিতে এগিয়ে কাঁটাবন এসে থামল। আমার পাশের সিটের যাত্রী সহ কিছু যাত্রী বাস থেকে নেমে পড়ল। ঘড়ির দিকে তাকালাম; বিকাল ৫টা।

"বসতে পারি?"

পাশে তাকিয়ে দেখলাম সাদা এপ্রোনের মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে।

"আরে বসুন," বলেই পাশের সিটে চলে গেলাম।

"আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।"

আমি মুচকি হেসে বললাম, "আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।"

মেয়েটি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, "কেন? কেন?"

আমি হেসে বললাম, "ভাড়া নিয়ে এমন ঝামেলা না হলে আমি তো বুঝতেই পারতাম না, আপনিও একই বাসে।"

"ও আচ্ছা। মতিঝিল যাচ্ছেন?"

"জি। আপনি?"

"আমিও..."

আমি হেসে বললাম, "ভালোই তো হল।"

"মানে?"

"না মানে একই গন্তব্য। গল্প করতে-করতে যাওয়া যাবে।"

"ও আচ্ছা।"

মেয়েটা মাস্ক মুখ থেকে নিচে নামাল। এই প্রথম মেয়েটার মিষ্টি চেহারা আমার সামনে দৃশ্যমান হল। আমি জলের বোতল এগিয়ে দিয়ে বললাম, "জল খাবেন?"

"না, না। ঠিক আছে।"

"কেন? আমি অপরিচিত দেখে খাচ্ছেন না?"

"না, না, তা নয়। আমার সাথে জলের বোতল আছে।"

"আমি ভেবেছি আপনি খুব ক্লান্ত। তাই জলের বোতলের কথা বলেছি।"

"কিভাবে বুঝলেন আমি ক্লান্ত?"

মুখে মৃদু হাসি নিয়ে বললাম, "এমন মিষ্টি চেহারায় ঘুম-ঘুম ভাব সুস্পষ্ট। তাই ধারণা করেছি আপনি খুব ক্লান্ত।"

"মিষ্টি চেহারা? আমি?"

ওর এই কথার উত্তরে কিছু বললাম না। মুচকি হাসলাম। আমার হাসি দেখে মেয়েটাও হেসে ফেলল "কতজনকে এমন কথা বলেছেন?"

"যদি বলি আপনাকেই প্রথম বললাম।"

মেয়েটা মুচকি হাসল। লজ্জা পেল বোধয়। খানিক বাদে বলল, "আমার তা বিশ্বাস হচ্ছে না।"

"কেন?"

"কারণ ছেলেরা এই ধরণের কথা অনেক মেয়েদেরই বলে।"

"বাহ! আপনি তো দেখছি ছেলেদের স্বভাবের উপর পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন।"

"স্বভাবের উপর নয়, রোগের উপর। পিএইচডি ডিগ্রি নয়, এমবিবিএস ডিগ্রি।"

"আপনি ডাক্তার?"

"হুম, আপনি কী ভেবেছেন?"

"সাদা এপ্রোন দেখে ভেবেছি আপনি হয়তো মেডিকেল স্টুডেন্ট।"

মেয়েটা হেসে বলল, "কী? এই বুড়িকে আপনার স্টুডেন্ট মনে হয়?"

আমি মুচকি হেসে বললাম, "এত সুন্দরী একটা মেয়ে কিভাবে বুড়ি হয়?"

"আচ্ছা হয়েছে আর পাম দিতে হবে না।"

"আচ্ছা, আর পাম দিব না।"

মেয়েটা এবার চোখ বড় বড় করে বলল, "তার মানে পাম দিচ্ছিলেন?"

আমি হেসে ফেললাম তার কথা শুনে, বললাম, "না, না।"

সেও হেসে ফেলল। বলল, "আপনি এই মাত্র বললেন..."

আমি কোনোরকমে হাসি থামিয়ে বললাম, "আচ্ছা বাদ দিন ..."

"হুম, ধরা খেয়েছেন। এখন তো বাদ দিতে বলবেনই।"

নিচের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলাম। অতঃপর তার দিকে তাকিয়ে বললাম, "আপনার নাম?"

"নওরিন।"

"শুধু নওরিন?"

"না, না। সামিয়া নওরিন।"

"খুব সুন্দর নাম। ঠিক আপনার মতো।"

নওরিন লজ্জায় লাল হয়ে গেল। মুচকি হেসে বলল, "আবারো পাম দেওয়া হচ্ছে?"

আমি ওর কথা শুনে হেসে ফেললাম। অতঃপর বললাম, "না। মোটেও পাম দিচ্ছি না। সত্যি বলছি।"

"ধন্যবাদ। আপনার নাম?"

"আবরার। পুরো নাম আবরার নাঈম চৌধুরী।"

"ও আচ্ছা চৌধুরী সাহেব।" বলেই নওরিন হেসে ফেলল। ওর এই মিষ্টি হাসির সাথে যোগ দিলাম আমিও, বললাম, "বলতে পারেন।"

"চৌধুরী সাহেব ডাকব?"

"ঠিক আছে। আপনাকে ডাকার অনুমতি দিলাম।"

"ও, এর মানে আর কেউ এই নামে ডাকে না?"

"না, সবাই আবরার নামে ডাকে।"

"ঠিক আছে চৌধুরী সাহেব, আপনাকে 'আবরার' নামেই ডাকব," বলেই নওরিন মুচকি হাসল। আমি মুচকি হেসে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালাম। এভাবে দু'জনের কথোপকথনের ফাঁকে বাস কখন যে মতিঝিল পৌঁছে গিয়েছে টেরই পেলাম না। মতিঝিল এসে বাস দাঁড়াতেই দু'জন বাস থেকে নেমে রাস্তার এক পাশে দাঁড়ালাম। নওরিন মৃদু হেসে বলল, "আসি তাহলে। আবার দেখা হবে। ভালো থাকবেন।"

আমিও মৃদু হেসে বললাম, "জি। আপনিও ভালো থাকবেন।"

নওরিন চলে গেল দৃষ্টির বাইরে। আমিও বাসার পথ ধরলাম।

#
১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২১। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। ছাতা মাথায় সায়েন্স ল্যাবের মোড়ের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছি। আমার মতো অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে বাসের অপেক্ষায়। কী ব্যাপার? বাস আসছে না কেন? আর কত দেরি? এদিকে বৃষ্টিও থামার নাম নেই। হঠাৎ রাস্তার অপর পাশে এমন একজনকে দেখলাম যার উপস্থিতির জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। নওরিন! রাস্তার অপর পাশে মাথার ওপর আকাশী রঙের ছাতাটা মেলে-ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে লক্ষ্য করেছে সে? দেখলাম নওরিন রাস্তা পার হয়ে এদিকেই আসছে। হঠাৎ সামনে একটা বিআরটিসি বাস এসে দাঁড়ালে সে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। এদিক-সেদিক তাকালাম। দেখলাম না।

"আমাকে খুঁজছেন?"

চমকে গেলাম পরিচিত কণ্ঠস্বরটি শুনে। পিছে তাকালাম। দেখলাম নওরিন দাঁড়িয়ে। নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি?"

"হ্যাঁ। আমি। তো আমাকে এভাবে খুঁজার কারণ?"

"না... মানে... এমনি... আসলে..."

নওরিন মুচকি হেসে বলল, "এমনি?"

"না... মানে... এই যে, বাস চলে এসেছে।"

বাস এসে দাঁড়াল। আমি ওকে বললাম, "আসুন। আপনি মতিঝিল যাবেন?"

"হ্যাঁ।"

বাসে উঠে বসলাম দু'জন। বন্ধ জানালা দিয়ে বৃষ্টির জলকণা গড়িয়ে পড়ছে। এই পড়ন্ত বিকেলে আনমনা মনে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে নওরিন। "পুরাতন দিনের কথা মনে পড়ছে?"

আমার কথা শুনে বাস্তবে ফিরে এলো সে। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "কিছু বললেন?"

"পুরাতন দিনের কথা মনে পড়ছে বুঝি?"

"কিভাবে বুঝলেন?"

"আনমনা হয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন, তাই বললাম।"

নওরিন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, "হুম, বাবার কথা মনে পড়ছে।"

"বাবার কথা? কেন? কোথায় উনি?

"বাবা আমার স্মৃতিতে আছে, চির অম্লান হয়ে।"

"উনি কী..."

"নেই। বাবা নেই..."

মনের ভেতরটা কেঁপে উঠল। নিজেকে সামলে বললাম, "আসলে আমি বুঝতে পারি নি..."

"না, ঠিক আছে। আচ্ছা বাদ দিন। আপানর কথা তো জানাই হল না। আপনি চাকরি করেন?"

"না। শিক্ষিত বেকার বলতে পারেন।" বলেই মুচকি হাসলাম।

নওরিনও মুচকি হাসল. বলল, "শিক্ষিত বেকার? বাহ দারুণ বললেন তো!"

উত্তরে কিছুই বললাম না। মৃদু হাসলাম শুধু।

"তো চৌধুরী সাহেব? বেকারই থাকবেন? চাকরি করার ইচ্ছে নেই বুঝি?

"না, না। থাকবে না কেন? এই তো একটা ইন্টারভিউ দিয়ে আসলাম।"

"বাহ! কেমন হল ইন্টারভিউ?"

"জি। আশা করছি হয়ে যাবে। ভালোই হল।"

"কোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশুনা করেছেন?"

"ট্রিপল ই।"

"ও, চৌধুরী সাহেব দেখছি ইঞ্জিনিয়ার।"

"লজ্জা দিচ্ছেন?"বলেই মুচকি হাসলাম।

"লজ্জা কেন দিব?"

"এখনো তো ইঞ্জিনিয়ারিং পোস্টে চাকরিটা হয়নি।"

"হয়নি তো কী হয়েছে? হয়ে যাবে। আর হলেই তো আমার লাভ।"

অবাক হলাম ওর কথা শুনে, বললাম, "কিভাবে?"

"এই যে, ট্রিট পাবো। কি? ট্রিট দিবেন তো?"

"অবশ্যই দিব। তা, ট্রিট দিতে হলে তো যোগাযোগ করতে হবে।"

"মানে?"

"মানে, চাকরি পেলে আপনাকে জানাতে হবে না? কোথায় ট্রিট দিব তাও তো বলতে হবে।"

"হুম... তো?"

"তো, আপনার মোবাইল নাম্বারটা যদি পাই তাহলে..."

"বুঝেছি। চৌধুরী সাহেবের আমার নাম্বার দরকার। ০১৭১..."

অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলটা বের করে ওর নাম্বারটা টুকে নিলাম। কিছুক্ষণ দু'জনই চুপচাপ। নীরবতার দেওয়াল ভেঙ্গে বললাম, "আপনার আনমনা ভাব দেখে ভেবেছিলাম..."

"কী ভেবেছিলেন?"

"আপনি হয়তো আপনার প্রাক্তনের কথা ভাবছেন!"

"প্রাক্তন মানে?"

"মানে এক্স বয়ফ্রেন্ড।"

"ও আচ্ছা। তা বলেন। আপনি তো সুন্দর বাংলা বলেন! লেখালিখি করেন নাকি?"

"এই টুকটাক বলতে পারেন।"

"বাহ! বই বের করেছেন?"

"না, কিন্তু সামনে করব। ইচ্ছে আছে।"

"ও আচ্ছা। কোন টাইপের লেখা লিখেন?"

"রোমান্টিক।"

"তাই? কিন্তু আপনাকে দেখলে মনে হয় না আপনি রোমান্টিক।"

"ভালোবাসার অনুভূতিগুলো কিন্তু মনের ভিতর থেকে আসে। আমি সেই অনুভূতিগুলো কলম দিয়ে লিখি, প্রকাশ করি।"

"হুম, বুঝলাম। আপনার কেউ আছে? স্পেশাল কেউ? মানে গার্লফ্রেন্ড?"

মুচকি হেসে বললাম, "নাহ। এই দুর্ভাগার জীবনে এখনো কেউ আসেনি।"

"এসে যাবে খুব শীঘ্রই।"

"আপনি কিভাবে জানেন?"

নওরিন মুচকি হেসে বলল, "দেখবেন চলে আসবে।"

"আপনার আছে কেউ স্পেশাল? বয়ফ্রেন্ড?"

"না তো।" অতঃপর কণ্ঠস্বর নিচু করে নওরিন জিজ্ঞেস করল, "কেন বলেন তো? কোনও সুদর্শন ছেলের সন্ধান দিতে পারবেন?"

"সুদর্শন ছেলে আশেপাশেই আছে। খুঁজলেই পাবেন।"

"তাই নাকি? আমি তো আশেপাশে সুদর্শন কাউকে দেখছি না।"

"ও আচ্ছা। ঠিক আছে। না দেখলে আর কি করা।"

"পোড়া-পোড়া গন্ধ পাচ্ছি। কী যেন পুড়ছে?"

"কী পুড়ছে? বাসে আগুন লাগল না তো?"বলেই বাসের চারপাশে তাকালাম।

"কারো মন পুড়ছে।" বলেই মুচকি হাসল নওরিন।

কথাটার অর্থ বুঝতে পেরে লজ্জা পেলাম. বললাম, "মজা নিচ্ছেন?"

"আমার প্রেমে পড়েছেন?"

"না, মানে..."

"আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি..."

"হ্যাঁ পড়েছি।"

"ভালোবাসেন আমাকে?"

"হ্যাঁ।"

"চিনেন না, জানেন না, ব্যাস! ভালোবেসে ফেললেন? ভালোবাসা কী এতই সস্তা?"

"না আমি আসলে বলতে চাচ্ছিলাম..."

"আপনার আর কিছুই বলতে হবে না। মামা! এখানে নামব।"

আমি সিট থেকে উঠে দাঁড়ালাম। নওরিন জানালার পাশের সিট থেকে উঠে বাসের দরজার সামনে দাঁড়াতেই বাস থেমে গেল। বাস থেকে নেমে আকাশী রঙের ছাতাটা মেলে ধরে হাঁটা দিল। আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। নওরিন চলে যাচ্ছে। আর কী দেখা হবে?

#
রাত বারোটা বেজে পনেরো মিনিট। বিছানায় শুয়ে আছি। নওরিনের একটা কথা বারবার মনে পড়ছে, "চিনেন না, জানেন না, ব্যাস! ভালোবেসে ফেললেন? ভালোবাসা কী এতই সস্তা?" সত্যিই তো, ভালোবাসা জিনিসটা সস্তা নয়, অনেক দামী একটা জিনিস।

"কীরে ঘুমাসনি এখনো?" মায়ের কণ্ঠস্বর শুনে উঠে বসলাম. বললাম, "ঘুমাওনি মা?"

"তুই এখনো ঘুমাসনি কেন? কোন কিছু নিয়ে টেনশন করছিস?"

"না মা। এমনি, ঘুম আসছে না। তুমি শুয়ে পড়।"

"ঠিক আছে। ঘুমিয়ে পড়িস," বলেই মা রুম থেকে বেরিয়ে পড়লেন। হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠল। এত রাতে কে কল দিবে? ভাবতে-ভাবতে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখি নওরিনের নাম্বার। কল রিসিভ করে বললাম, "হ্যালো..."

মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে নওরিন বলল, "হ্যালো। কী করছেন? ডিস্টার্ব করলাম না তো?"

"না, না। ডিস্টার্ব কেন হব?"

"রাগ আমার উপর?"

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে অতঃপর বললাম, "না, রাগ না।"

"বুঝেছি, রাগ করেছেন।"

"না, না একদমই না।"

"না, আমার আসলে এভাবে কথাটা বলা ঠিক হয়নি।"

আমি চুপ করে রইলাম, এর উত্তরে কিছুই বললাম না।

"আমাকে মাফ করে দেওয়া যায় না?"

নওরিনের এই কথাটা শুনে মনটা নড়ে উঠল। বললাম, "তুমি তো ঠিকই বলেছ। ভালোবাসা জিনিসটা তো সস্তা না। খুব দামি একটা জিনিস।"

উত্তরে নওরিন কিছুই বলল না, চুপ করে রইল।

"এই নওরিন! এই!..."

"বল।"

"এই দামি জিনিসটা আমি কী পেতে পারি না?"

উত্তরে নওরিন এবারো চুপ করে থাকল। কিছুই বলল না।

"নওরিন!"

"বল।"

"ভালোবাসি তো, খুব বেশি, অনেক বেশি।"

নওরিন এবারো চুপ।

"এই! নওরিন!"

"হুম, বল।"

"আমার সারাজীবনের পথ চলার সঙ্গী হবে?"

নওরিনের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "আবরার! শুনো, তোমার ই-মেইল এড্রেসটা আমাকে মেসেজে দিও।"

"কেন? হ্যালো! হ্যালো! নওরিন?"

নওরিন কলটা কেটে দিল। আমার ই-মেইল এড্রেস চাইল কেন? ই-মেইল এড্রেস দিয়ে কী হবে? কিছু কি বলতে চায় ই-মেইলে, যা মোবাইলে বলতে পারবে না। এসব ভাবতে-ভাবতে ই-মেইল এড্রেসটা মেসেজে পাঠিয়ে দিলাম।

#
রাত বারোটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট। ল্যাপটপ খুলে ই-মেইলে ঢুকে দেখলাম নওরিনের ই-মেইল। ই-মেইলে নওরিন চিঠি আকারে কি যেন লিখেছে। পড়তে শুরু করলাম —
আবরার,
অবাক হয়েছ তাই না? তোমার ই-মেইল এড্রেস কেন চাইলাম? কিছু কথা আছে তোমার সাথে যা মুখে বলা সম্ভব না। আবরার! খুব ভালোবেসে ফেলেছ আমাকে, আমি বুঝতে পেরেছি। বুঝতে পেরেছি আমার প্রতি তোমার মনের আকুতি, অনুভূতি। এই ছেলেটা কখন যে আমার মন চুরি করে ফেলেছে আমি টেরই পাইনি। হ্যাঁ, আবরার আমিও তোমাকে ভালোবাসি, খুব বেশি, অনেক বেশি। হ্যাঁ, তোমার সারা জীবনের পথ চলার সঙ্গী হতে চাই। কিন্তু একটা বিশেষ বিষয় তোমার জেনে রাখা ভালো হবে। আমি ক্যানসারে আক্রান্ত। ডাক্তার বলেছে আমি বেশি দিন বাঁচব না। আবরার! আমার হাতে সময় বেশি নেই। আমার না খুব ইচ্ছে, আমার জীবনেও কোন রাজপুত্র আসবে, যে আমাকে খুব-খুব ভালোবাসবে। আমি হব তার জীবনসঙ্গিনী। আবরার! আমার এই দুরারোগ্য রোগ জানার পরও হবে আমার জীবনসঙ্গী? করবে আমাকে বিয়ে? তোমার উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম।"

ই-মেইলে নওরিনের লেখাগুলো পড়ার পর স্তব্ধ হয়ে রইলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছিনা। আমি ঠিক পড়ছি তো? ওর ক্যানসার? ঠিক আছে। যা করার এখনি করতে হবে।

#
১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০২১। মিড লাইন বাসের বাম দিকের দুই নম্বর সিটে বসে আছি। সময় সকাল ৮টা। জানালার পাশের সিটে বসা নওরিন। হঠাৎ আমার বাম হাতটা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখল। অতঃপর বলল, "তোমার বউটার কিন্তু খুব ক্ষুধা পেয়েছে। নাস্তা করেনি।"

"তাই। ঠিক আছে। মতিঝিল নেমে আমরা নাস্তা করে নিব।"

হ্যাঁ, নওরিন এখন আমার স্ত্রী। সেদিন ই-মেইল পাওয়ার পর, ১৩ই ফেব্রুয়ারি বাসায় নওরিনের কথা আব্বু-আম্মুকে বলি। এটাও স্পষ্ট করে বলি, ও ক্যানসারে আক্রান্ত। কিন্তু আব্বু-আম্মু সরাসরি না করে দেয়। শুরু হয় বাবা-মা'র সাথে বিতর্ক, নওরিনকে পাওয়ার যুদ্ধ। বিতর্কের এক পর্যায়ে বাবা স্পষ্ট করে বলে দিল, "ঐ মেয়েকে বিয়ে করলে আমার বাড়ির দরজা তোমার জন্য আজীবনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।" কিন্তু আমি জানি এবং মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, ভালোবাসলে ভালোবাসার মানুষের জন্য লড়াই করতে হয়। তাই বাবাকেও আমি বলে দেই, "চললাম। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।" এরপর নওরিনকে নিয়ে সোজা কাজী অফিসে। সাক্ষী হিসেবে ছিল আমার কিছু বন্ধু আর আমার প্রিয় ছোট মামা। হ্যাঁ, মামা পাশে না থাকলে আমরা পরিবার, সমাজ উপেক্ষা করে দ্বিধাহীনভাবে কাছে আসতে পারতাম না। এরপর আর কি, আমাদের বিয়ে সম্পন্ন হল। আমরা গিয়ে উঠলাম ছোট মামার বাসায়। নওরিনের কথা আর কী বলব। ও এতিম। এক মামা আছে। যে কিনা নওরিনের সমস্ত চিকিৎসার ব্যয় ভার গ্রহণ করতেন। নওরিনের বিয়ের কথা শুনে সেই মামা তাকে ঘর থেকে চলে যেতে তো বললই, চিকিৎসার ব্যয় ভারও বহন করবেন না বলে জানিয়ে দিলেন।

"কী ভাবছ?"

নওরিনের ডাকে ভাবনার দেওয়াল ভেদ করে বাস্তবে ফিরে এলাম। বললাম, "কিছু না।"

নওরিন আবারো আমার বাম হাত জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখল। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। এটা শুধু বৃষ্টি নয়। এটা হচ্ছে নওরিন ও আমার জন্য পৃথিবীর দেওয়া অভ্যর্থনা। আমি নওরিনকে প্রায়ই দেখি। শুধু চোখে নয়, মনের বারান্দা দিয়েও। আমার মনের বারান্দা সব সময় খোলা থাকে। সেখানে কালো মেঘেরা ভিড় জমায়। বৃষ্টি হয়। পাখিরা খেলা করে। রৌদ্র আসে। আর গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে নওরিন নামক এক মায়াবিনীর দেখা মিলে। তাকে দেখি। অপলক চোখে তাকে দেখি। সৃষ্টিকর্তা তার মাঝে বুঝি পৃথিবীর সমস্ত মায়া, রূপ ঢেলে দিয়েছেন। আমার মনের বারান্দা সব সময় খোলা থাকে। সেখান থেকে তার মিষ্টি হাসি আমি দেখতে পাই। দেখতে পাই তার স্নিগ্ধতা আর শুনতে পাই তার মনোমুগ্ধকর কথা। তার নয়ন ভোলানো দুষ্টুমি আমার মনের বারান্দা থেকে দেখা যায়। তার নীল শাড়ি পরা সাজের সৌন্দর্য বুঝি হুমায়ুন আহমেদের রূপাকেও হার মানায়। ঝুম বৃষ্টিতে যখন সে বাইরে বৃষ্টি উপভোগ করে আমি তখন আমার মনের বারান্দা দিয়ে তাকে দেখি আর দেখি, এই দেখার কখনো শেষ হয় না।

"কী চৌধুরী সাহেব? কী ভাবছেন?"

"কিছু না।"

"তাহলে চুপ কেন?"

"না, এমনি। আচ্ছা আমাদের সম্পর্ক শুরু হয়েছিল কোথায় বল তো?"

"কেন? এই মিডলাইন বাসে।"

"ভাবছি এটা নিয়ে একটা গল্প লিখব।"

"তাই। দারুণ হবে তাহলে। তা গল্পের নাম কী হবে?"

আমি নওরিনের চোখে চোখ রেখে বললাম, "মিড লাইন প্রেম..."
(সমাপ্ত)


All Bengali Stories    161    162    163    (164)     165    166   


## Disclaimer: RiyaButu.com is not responsible for any wrong facts presented in the Stories / Poems / Essay / Articles / Audios by the Writers. The opinion, facts, issues etc are fully personal to the respective Writers. RiyaButu.com is not responsibe for that. We are strongly against copyright violation. Also we do not support any kind of superstition / child marriage / violence / animal torture or any kind of addiction like smoking, alcohol etc. ##


◕ RiyaButu.com, এই Website টি সম্পর্কে আপনার কোনও মতামত কিংবা পরামর্শ, কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। যোগাযোগ:
E-mail: riyabutu.com@gmail.com / riyabutu5@gmail.com
Phone No: +91 8974870845
Whatsapp No: +91 6009890717