Home   |   About   |   Terms   |   Library   |   Contact    
A platform for writers

রক্তমাংস

( 'নগেন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার'- ২০২২-এর একটি নির্বাচিত গল্প)

-------- বিজ্ঞপ্তি ----------
■ 'স্বরচিত ছোট গল্প প্রতিযোগিতা ( ৬০০ শব্দের )', নভেম্বর, 2022 Details

◕ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা - সেপ্টেম্বর ২০২২, Result
--------------------------



All Bengali Stories    166    167    168    169    (170)     171   

রক্তমাংস
Writer – অনিন্দ্য রক্ষিত, পিতা- (স্বঃ) কমনীয় কুমার রক্ষিত, নোনাচন্দনপুকুর, ব্যারাকপুর,
( 'নগেন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার'- ২০২২-এর একটি নির্বাচিত গল্প)


## রক্তমাংস
Writer – অনিন্দ্য রক্ষিত, পিতা- (স্বঃ) কমনীয় কুমার রক্ষিত, নোনাচন্দনপুকুর, ব্যারাকপুর,

গোপাল সাহার বাজার থেকে মাছ আর শাক-সব্জির কেনাকাটা সেরে পূবমুখো হাঁটা ধরল তারাপ্রসাদ। এখন শুধু কলা আর শশা নেওয়া বাকি। ওগুলো বাজারের বাইরে থেকে নেবে। বড়রাস্তার ধারে দয়ালগুরু মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের একপাশে, মাটিতে বসে ডালা পেতে দোকানদারি করে ধনিয়া। ও খুব কচি-কচি শশা আর দেশি কাঁঠালি কলা রাখে। ভালো পেয়ারাও রাখে। মা পেয়ারা খেতে খুব ভালোবাসে। কয়েকটা নিতে হবে।

নদীর ধারে, পূর্বপুরুষের তৈরি বাড়িতে তারাপ্রসাদরা থাকে। বাড়িটার বয়স একশ পনেরো বছর হলেও বাড়ির বাসিন্দাদের যত্নে সেটা এখনও দিব্যি বাসযোগ্য আছে। নিষ্ঠাবান শাক্ত পরিবার ওদের। তারাপ্রসাদের ঠাকুরদার বাবা, যাঁর আমলে এই বাড়িটা তৈরি হয়েছিল, সেই বামাচরণ

সান্ন্যাল সিদ্ধ তান্ত্রিক ছিলেন। তিনি নাকি সাধনবলে স্বয়ং মা কালীর দর্শন পেয়েছিলেন। তারাপ্রসাদের ঠাকুরদা করালীপ্রসন্ন সান্ন্যাল একদা স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই বাড়ির তিন বিঘের বাগানের দক্ষিণদিকে কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করে গেছিলেন। আজও সেখানে মা দক্ষিণা দেবী নিত্য পূজা পেয়ে থাকেন। বিশেষ-বিশেষ তিথিতে ধুমধাম করে মায়ের পূজা হয়। তারাপ্রসাদের বাবা কালীকৃপা সান্ন্যাল আমৃত্যু তাঁদের পারিবারিক কালী মন্দিরের প্রধান সেবায়েত ছিলেন। তাঁর দেওয়া মন্ত্রসিদ্ধ দৈব ওষুধ খেয়ে অনেকের অনেক জটিল রোগ ভালো হয়ে যেত বলে শোনা যায়। তারাপ্রসাদদের এই সান্ন্যাল বংশের কালীভক্তির নানা আশ্চর্য কাহিনী এ অঞ্চলে লোকমুখে আজও প্রচলিত।

বংশের এই ভক্তিভাবের ধারা তারাপ্রসাদের মধ্যে সেরকম প্রবলভাবে না আসলেও মা কালীর প্রতি ছেলেবেলা থেকেই ওর একটা টান আছে। আপন মায়ের মতোই, মন্দিরের মাকেও ওর খুব আপনজন, যেন একটা ভরসাস্থল বলে মনে হয়। ছোটবেলা থেকে শেখা অভ্যাসেই, প্রতিদিন সকালে স্নান করে মন্দিরে গিয়ে মাকে দর্শন আর সাষ্টাঙ্গ প্রণাম না করে ও কোনও কাজ শুরু করে না। তা ছাড়া, প্রতি সন্ধ্যেয় নিজের কাজকর্ম সেরে বাড়িতে ফিরে, মায়ের আরতি দেখে। আর, বিশেষ বিশেষ তিথিতে নির্জলা উপোষ করে, সমস্ত আচার-বিধি মেনে মায়ের পূজা দিয়ে, মায়ের পায়ে অঞ্জলি দেয় তারাপ্রসাদ।

প্রায় আট-ন মাস আগে, ধনিয়াকে প্রথমবার যেদিন তারাপ্রসাদ দেখেছিল, ও অবাক হয়ে গেছিল। মিষ্টির দোকানের এক পাশে মাটিতে বসে, একটা ছোট ঝুড়িতে অল্প কিছু শশা, পেয়ারা আর কাঁঠালি কলা সাজিয়ে রেখে বিক্রি করছে ময়লা শাড়ি পরা, বছর পঁচিশের, কালচে-বাদামী রঙের যে বউটি, তার মুখটা অবিকল ওদের মন্দিরের মায়ের মতন!! সেরকমই আয়ত দুই চোখ! লম্বা নাক। পুরু আর চওড়া দুটো ঠোঁট আর তার পেছনে ঝকঝকে সাদা দাঁতের সারি। শুধু জিভটা বেরিয়ে নেই, এইটুকুই তফাৎ। ঢেউ খেলানো ঘন কালো চুলের রাশি, বসে থাকা শরীরটার মাথা থেকে কাঁধের দু'পাশ দিয়ে নেমে এসে প্রায় মাটি ছুঁচ্ছে। সিঁথিতে জ্বলজ্বল করছে মেটে-সিঁদুর। কপালে ঐ সিঁদুরেরই বড় টিপ। নাকে নাকছাবি, দু'কানে দুল আর গলায় হার দুলছে। সবগুলোই সস্তার ঝুটো গয়না। বউটা বড়-বড় দু'চোখ মেলে তারাপ্রসাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, "কী লিবেন, বাবু ?" অপরূপ এক লাবণ্য বিরাজ করছিল ওর মুখে! তারাপ্রসাদ মুগ্ধ হয়ে গেছিল সে মুখ দেখে! মায়ের চিন্ময়ী রূপের কথা এতদিন শুধুমাত্র কানে শুনেছিল। সেদিন যেন দু'চোখ ভরে দর্শন করল!

"তোর নাম কী রে, মা ?" ধনিয়ার ফলের ঝুড়ির সামনে বসে, ওর দিকে বেশ অবাক আর কিছুটা ভক্তিভরা দৃষ্টিতে চেয়ে জিজ্ঞেস করেছিল তারাপ্রসাদ।

সুন্দর হাসি হেসে নিজের নাম বলেছিল ধনিয়া। ওর সঙ্গে আরও কথা বলে তারাপ্রসাদ জেনেছিল, ওরা দারভাঙ্গা থেকে পাঁচ মাস আগে এখানে এসেছে। এখন কোলেপাড়ায়, নবীনবাবুর বস্তিতে খোলা ভাড়া করে রয়েছে। ও আর ওর স্বামী ফাগুলাল, আগে স্টেশন রোডে ভুট্টা-সেঁকা বিক্রি করত। গত মাস থেকে ফাগুলাল, বোসপাড়ার রতন সাহার বিল্ডিং তৈরির কোম্পানিতে মিস্তিরিদের যোগাড়ুর কাজ পেয়েছে। ঘরে বুড়ি শাশুড়ি আছে। তার কাছে চার বছরের ছেলেটাকে রেখে, ধনিয়া ভোর চারটেরও আগে ঘর থেকে বেরিয়ে ফার্স্ট বাস ধরে, আট মাইল দূরে নাজিরগঞ্জের পাইকারি বাজারে যায়। সেখান থেকে ফল কিনে এনে এখানে বসে।

সেদিন মন্দিরের বাইরের এই রক্তমাংসের জগতে দাঁড়িয়ে, মায়ের চিন্ময়ী রূপ দর্শন করে দারুণ আনন্দ বুকে নিয়ে ঘরে ফিরেছিল তারাপ্রসদ।

#
"তোর স্বামী তো এখন রতনের কাছে কাজ করছে। আগের চেয়ে ভালো রোজগার করছে। তুই তাহলে আর এত কষ্ট করিস কেন, মা ?" তারাপ্রসাদ একদিন জিজ্ঞেস করেছিল ধনিয়াকে। উত্তরে ধনিয়া বলেছিল, "একা মরদের রোজগারে আজকাল ক্যায়সে চলে, বাবু ? উপরসে, উর তো হররোজ কাম মিলে না। ঘরে ছোটা বাচ্চা আছে ; বিমার সাস্ আছে ... মেহেঁগাই দিন-ব দিন বেড়ে গেলো ..."

এরপর থেকে শশা, কলা, পেয়ারা, সবেদা কিনতে হলে তারাপ্রসাদ ধনিয়ার কাছেই আসে। ইতিমধ্যে ধনিয়ার ব্যবসা ধীরে-ধীরে বেড়েছে। ওর ছোট ফলের ঝুড়ির জায়গা নিয়েছে বড় বাখারির ডালা। তারাপ্রসাদ ধনিয়াকে বরাবরই 'মা' বলে ডাকে বটে, কিন্তু ধনিয়া কখনও সাতচল্লিশ বছরের তারাপ্রসাদকে কাকা, দাদা বা ভাইয়া ইত্যাদি কিছু বলে ডাকে না। ওর আর পাঁচজন খরিদ্দারের মতন তারাপ্রসাদকেও ও বাবু বলেই ডাকে। সে ডাকুকগে। তারাপ্রসাদ সেই যে প্রথমদিন ওর মধ্যে মা কালীকে দেখেছে, সেই থেকে ও ধনিয়াকে আর পাঁচটা মানুষের মতো দেখে না। মায়ের মতো দেখে। ওর সবচেয়ে ভালো লাগে ধনিয়ার খাঁটি দেহাতি রূপটি। এ তো আর কোনও মেকআপ শিল্পীর হাতের কাজ নয় ; মা কালী স্বয়ং যেন নিজের হাতে নিজের চলমান মূর্তি বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিয়েছেন!

#
দয়ালগুরু মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সামনে এসে থামল তারাপ্রসাদ। ধনিয়ার সামনে দুটো লোক বসে ফল বাছছে। তারাপ্রসাদ মিষ্টির দোকানের দিকে সরে দাঁড়িয়ে, বাজারের থলেগুলো দোকানের দেওয়ালের গায়ে নামিয়ে রেখে, রাস্তায় চলা মানুষজন যানবাহন দেখতে লাগল। ঐ দুজনের নেওয়া হয়ে গেলে ও নেবে। ওর সময় লাগবে। ফল বাছতে-বাছতে মায়ের সংসারের খুঁটিনাটি খবর নেবে। ওর বুড়ি শাশুড়ির খবর নেবে। ফাগুলালের কাজকর্ম কেমন চলছে সে-খবর জানবে। গত সপ্তাহে ফল কিনতে এসে শুনেছিল, ওর ছেলেটা জ্বরে ভুগছে। পাঁচদিন ধরে বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। ওকে একজন ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়ে দেখানোর জন্য ধনিয়াকে সেদিন কিছু টাকাও দিয়েছিল তারাপ্রসাদ। তারপর আর বাজারে আসা হয় নি। ছেলেটা এখন কেমন আছে, ডাক্তার কী বলল, সেগুলোও জানতে হবে। মা-ছেলেতে অনেক আলাপ হয় এখানে এলে।

মিষ্টির দোকানের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে তারাপ্রসাদ দেখল, একটা বাইক এসে কয়েক হাত দূরে, ধনিয়ার ফলের ডালার অন্যপাশে থামল। বাইক থেকে নেমে যে ছেলেটা ধনিয়ার দিকে এগিয়ে গেল তাকে তারাপ্রসাদ খুব ভালো করেই চেনে। বিল্ডার রতন সাহার চ্যালা হাঁদু পাল। রতনের হয়ে পুরনো বাড়ি খুঁজে বেড়ায় চাদ্দিকে। ওদের বাড়িতেও এসেছিল একদিন। বাড়িটা কেনার প্রস্তাব দিয়েছিল। সুবিধে করতে পারে নি।

হাঁদুকে ধনিয়ার কাছে যেতে দেখে তারাপ্রসাদ বিরক্ত হল। স্বভাব-চরিত্রের দিক থেকে, যেমন হাড় বজ্জাত বলে এলাকায় কুখ্যাত ঐ রতন সাহা তেমনই তার যোগ্য চ্যালা এই হাঁদু। দুটোতে মিলে করে- না, এমন কুকর্ম নেই! এই বদ ছোঁড়াটার ধনিয়ার সঙ্গে কী কাজ ? – ও ভাবল। পরক্ষণেই মনে পড়ল, ফাগুলাল তো রতনের কাছেই কাজ করে। হয়তো ওরই কোনও খবর দিতে বা নিতে এসেছে হাঁদু।

ধনিয়ার দিকে অনেকটা ঝুঁকে পড়ে, প্রায় ওর কানে মুখ ঠেকিয়ে কী যেন বলল হাঁদু। তারাপ্রসাদ এতটা দূর থেকে কিছু শুনতে পেল না। তবে এটা দেখল যে কথাটা শুনে ধনিয়া বেশ খুশি-খুশি মুখ করে মাথা নেড়ে 'হ্যাঁ' বলল। এরপর হাঁদু আর একটা কিছু বলল ওর কানে। কথাটা শুনে ধনিয়া ঠোঁট বেঁকিয়ে এক অদ্ভুত হাসি হেসে ঘাড় কাৎ করে চোখের কোনায় হাঁদুর দিকে চেয়ে, "ধ্যেৎ! যাও তো আভি ... সালা ভুখা লোম্ড়ি …" বলে হাসতে লাগল। হাঁদুও ওর পানমশলা-খাওয়া, খয়েরি ছোপধরা বড় বড় দাঁতগুলো মেলে ধরে, 'অ্যাঃ অ্যাঃ অ্যাঃ অ্যাঃ' – শব্দে বিশ্রী হাসি হাসতে-হাসতে বাইকে উঠে, "যা বললাম মনে থাকে যেন ... দুপুরে ফোন করব কিন্তু …" বলে বাইক স্টার্ট দিল। ধনিয়ার তার সামনে বসা দুই খদ্দেরকে ফল বেছে-বেছে দিতে লাগল। ওর মুখে সুখের হাসির রেশ।

এতক্ষণে ধনিয়ার দিকে ভালো করে দেখল তারাপ্রসাদ। লক্ষ করল, আজ ধনিয়া একটা নতুন শাড়ি পরেছে। ফিনফিনে পাতলা শাড়ি। ধনিয়ার ফলের ডালাটার দিকে তাকাল তারাপ্রসাদ। ফলের পরিমাণ আজকাল অনেক বেশি থাকে, কিন্তু শশাগুলো আজকে তেমন কচি বলে মনে হচ্ছে না তো ... কেমন যেন হলদেটে, কোঁচকানো ছাল ... পেয়ারাগুলোও বড্ড বেশি পাকা বলে মনে হচ্ছে ... কিন্তু ধনিয়া তো কখনও এরকম বাজে ফল বেচে না ... ওর হলোটা কি ?

তারাপ্রসাদ হঠাৎ লক্ষ করল, একজন খদ্দেরের দিকে অনাবশ্যক রকম ঝুঁকে পড়ে তাকে ফল বাছতে সাহায্য করছে ধনিয়া। ওর মিহি শাড়ির আঁচল, বুক থেকে খসে কোলের ওপরে পড়েছে আর শরীরের তুলনায় খুব বেশি রকমের ছোট ব্লাউজটাকে প্রায় ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে ভারি দুই স্তন। ওর সামনে বসা লোকদুটো ফল বাছা বন্ধ করে ড্যাবড্যাবিয়ে সেদিকেই চেয়ে রয়েছে।

চকিতে ধনিয়ার মুখের পানে চাইল তারাপ্রসাদ। চমকে উঠল। এতক্ষণ ভালো করে দেখে নি। এখন দেখল। ধনিয়ার সিঁথির মেটে-সিঁদুর আর কপালের সেই বড় টিপ উধাও! তার বদলে, কপালের দুপাশের চুলগুলো ছোট করে কাটা আর পিঙ্গল রঙ্গে রাঙ্গানো। সেগুলো ওর কপালের দুপাশ থেকে ঝুলছে। ওর বার্ণ্ট আম্বার রঙের লাবণ্যভরা মুখটা, সস্তার বিউটি পার্লারের মেকআপ-এর প্রভাবে বার্ণ্ট সিয়েনা রঙ নিয়েছে। গালে উগ্র গোলাপির ছোঁয়া … ঠোঁটে, ধ্যাবড়ানো ক্রিমসন লিপস্টিকের রেশ। আয়ত চোখদুটোর পাতায় হালকা সোনালীর আভা। বিস্ময়ে হতবাক তারাপ্রসাদ ধনিয়ার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে আরও দেখল, লকেট বসানো একটা সরু সোনার চেন ধনিয়ার গলায় দুলছে। আর ওর বুকে নখের আঁচড়ের দাগ!

"আজ কী লিবেন, বাবু ?" মুখ তুলে তারাপ্রসাদের দিকে চেয়ে, দুই ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল ধনিয়া।

তারাপ্রসাদ দেখল, এক সপ্তাহ আগেও দেখা, ওদের মন্দিরের মায়ের মুখের এই রক্তমাংসের প্রতিরূপটা আজকে কেমন যেন বিকৃত, কুৎসিত দেখাচ্ছে। এই রূপান্তর কি মাত্র গত সাত দিনে হলো? – তারাপ্রসাদ ভাবল – না কি অনেকদিন ধরেই হয়ে চলেছিল, ও দেখতে পায় নি ...

সহসা এক শূন্যতাবোধ এসে তারাপ্রসাদের মনটাকে নিদারুণ ব্যথাতুর করে তুলল। কোনও এক নিবিড় আপনজন যেন অকস্মাৎ ওর জীবন থেকে চিরতরে বিদায় নিল বলে ওর মনে হলো।

"বাবু, কুছু লিবেন না আজকে ?" ধনিয়া আবার জিজ্ঞেস করল তারাপ্রসাদের দিকে চেয়ে। আগের খদ্দের দুটো কখন যেন কেনাকাটি সেরে চলে গেছে। মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের নর্দমার গর্ত দিয়ে বাইরের নালায় ভেসে আসা ছানার জলের দিকে চেয়েছিল তারাপ্রসাদ। কোথা থেকে একটা রঙ ওঠা, রোগা বেড়াল এসে নালায় মুখ ঝুঁকিয়ে চুকচুক করে সেই জল চাটছিল। ধনিয়ার ডাক শুনে তারাপ্রসদ ওর মুখের দিকে চাইল। ধনিয়া এবারে মুখে কিছু না বলে, শুধু চোখ নাচিয়ে প্রশ্ন করল তারাপ্রসাদকে।

"আমারই ভুল হয়েছিল রে ধনিয়া, আমারই ভুল হয়েছিল…" ধনিয়ার দিকে চেয়ে বিষণ্ণ স্বরে কথাগুলো বলে উঠল তারাপ্রসাদ।

"কা ভুল হুয়া থা বাবু ?" ধনিয়া একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল।

"আমার জ্যান্ত কালীর ঘট বিসর্জন কখন যেন হয়ে গেছে ... আমি জানতেই পারি নি... জানার চেষ্টাই করি নি... এখন দেখছি, রোদে জলে নষ্ট হতে থাকা মূর্তিটা কেবলমাত্র পড়ে আছে ...," কেমন একটা ঘোরের মধ্যে থেকে যেন কথাগুলো বলে উঠল তারাপ্রসাদ। দু-তিন সেকেন্ড চুপ করে থেকে, তারাপ্রসাদের কথাগুলো বুঝবার চেষ্টা করেও কিছু বুঝে উঠতে না পেরে ধনিয়া বলল, "আপ কা বোলত্ বাবু, হমরি তো কুছু সমঝ্ মা না আওৎ বা!"

"তোকে বোঝানো যাবে না রে, তোকে বোঝানো যাবে না …" বিড়বিড়ে স্বরে কথাগুলো বলতে-বলতে আর অস্থিরভাবে মাথা নাড়তে-নাড়তে তারাপ্রসাদ বড় রাস্তা ধরে উদভ্রান্তের মতো হাঁটতে শুরু করল। দয়ালগুরু মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের একপাশের দেওয়াল ঘেঁষে রাখা তিনটে থলে ভরা আমিষ-নিরামিষ বাজার সেখানেই পড়ে রইল। ধনিয়া কয়েক মুহূর্ত ধরে বাবুর চলে যাওয়া দেখল। তারপর মুখে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব এনে বলে উঠল, "হাঃ! ই বাবুঠো অচানক পাগল বনে গেলো কি ?" তারপর ডালার ওপরে রাখা এতক্ষণের বিক্রির টাকাগুলো সাজিয়ে নিয়ে মন দিয়ে গুনতে শুরু করল।
( সমাপ্ত )


Next Story

All Bengali Stories    166    167    168    169    (170)     171   


## Disclaimer: RiyaButu.com is not responsible for any wrong facts presented in the Stories / Poems / Essay / Articles / Audios by the Writers. The opinion, facts, issues etc are fully personal to the respective Writers. RiyaButu.com is not responsibe for that. We are strongly against copyright violation. Also we do not support any kind of superstition / child marriage / violence / animal torture or any kind of addiction like smoking, alcohol etc. ##


◕ RiyaButu.com, এই Website টি সম্পর্কে আপনার কোনও মতামত কিংবা পরামর্শ, কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। যোগাযোগ:
E-mail: riyabutu.com@gmail.com / riyabutu5@gmail.com
Phone No: +91 8974870845
Whatsapp No: +91 6009890717