Home   |   About   |   Terms   |   Library   |   Contact    
A platform for writers

ভালোবাসার কি সত্যিই অন্ত আছে?

( 'নগেন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার'- ২০২২-এর একটি নির্বাচিত গল্প)

-------- বিজ্ঞপ্তি ----------
■ 'স্বরচিত ছোট গল্প প্রতিযোগিতা ( ৬০০ শব্দের )', নভেম্বর, 2022 Details

◕ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা - সেপ্টেম্বর ২০২২, Result
--------------------------



List of all Bengali Stories

ভালোবাসার কি সত্যিই অন্ত আছে?
লেখিকা - সায়নী পাল, বাবা - পরিতোষ পাল, নন্দননগর, বেলঘড়িয়া
( 'নগেন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার'- ২০২২-এর একটি নির্বাচিত গল্প)


## ভালোবাসার কি সত্যিই অন্ত আছে?

লেখিকা - সায়নী পাল, বাবা - পরিতোষ পাল, নন্দননগর, বেলঘড়িয়া

কাহিনীর সূত্রপাত হয় রোহিনী আর আদ্রিককে কেন্দ্র করে। রোহিনী একটি কলেজে ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে পড়ছে। আদ্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং করছে। গ্রীষ্মের তীব্র প্রখর রোদে রোহিনী আর আদ্রিকের প্রথম দেখা হয়, টিপিক্যাল কোনও সিনেমার সিনের মতো অ্যাক্সিডেন্টে আলাপ নয়, বরং প্যাচপ্যাচে গরমের মেকাপহীন তৈলাক্ত রূপে।

রোহিনী একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও দামি পোশাক, আলিসান দেহগঠন, রূপচর্চা কোনটাই সাধ্যে কুলোয় না। আর আদ্রিক? ওকে তো ২ মাইল হেঁটে যেতে হয় ২০ টাকা সঞ্চয়ের জন্য। আদ্রিক কোনও মেধাবী ছাত্র নয়। মাত্র ৬০ শতাংশ নম্বর পেতে তাকে বিসর্জন দিতে হয় তিনশোটার বেশি রাত। দুজনেই স্বাবলম্বী হয়ে চায়। তবে এই সমাজে থেকে ভাল চাকরির আসা করা আকাশের চাঁদ ছোয়ার মতো। আদ্রিকের আবার একটা গ্যারেজ আছে। তাই দিয়ে সে সংসারের তিনটি পেট চালাচ্ছে। তবে রোহিণীর বাবা একটা পুরনো প্রকাশন অফিসে কাজ করেন। রোহিনী কোনও স্বর্গের অপ্সরা ছিল না যে আদ্রিক তাকে দেখা মাত্রই প্রেমে পড়বে। সে ছিল বড় সাদামাটা, কিছুটা সংস্করী।

আদ্রিক আর রোহিনী মানে রুহির প্রেমযাত্রা শুরু হয় অন্যভাবে। আদ্রিক পরিবারের পাশে দাঁড়াতে মাঝে-মাঝে বিভিন্ন ডেকরেশনের টিমে কাজ করে। সেই সূত্রেই গিরিশপার্কে একটা মডেলিং প্রতিযোগিতার ডেকরেশনের কাজে এসেছে সে। সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে রুহি মানে রোহিনী। রোহিণীর প্রতি অবিচার করা হলে তার প্রতিবাদ জানায় আদ্রিক। কিন্তু আদ্রিকের প্রতিবাদে কিছুই ফল হয় না। সেইদিন প্রথম আদ্রিকের কানে রোহিনী নামটা পৌঁছে গেল। এরপর প্রায় একমাস পরের কথা। একদিন বাড়ি ফিরে দেখে ওর হাতে থাকা হাত ঘড়িটা চুরি হয়েছে। সে চিন্তায় পরে যায়, কারণ সেটা তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটার দেওয়া। যদিও সেই মানুষটা এখন আর ওর জীবনে নেই। ঘড়ির জন্য মনখারাপ করে রাতের খাবার না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ল সে। হঠাৎই সে অনুভব করল ওর মাথার বালিশটা চোখের বর্ষণে ভিজে যাচ্ছে। আদ্রিক চাইলেও সেই বর্ষণ থামাতে পারছে না। মাত্র দুবছর আগেও রেঁনেসা ওর জীবনের সবকিছু ছিল। রেঁনেসা ছিল কানাডার মেয়ে কিন্তু ওর বড়ো হয়ে ওঠা উত্তর কলকাতার বুকে। একই স্কুলে পড়তো আদ্রিক আর রেঁনেসা। আদ্রিক রেঁনেসাকে বিদেশিনী মেম বলে ডাকতো। রেঁনেসাও আদ্রিককে নিজের সবটা দিয়ে ভালোবাসতো। রেঁনেসার বাবার কারণে ওকে কানাডায় চলে যেতে হয়। চাইলেই আদ্রিক আর রেঁনেসার গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু ভালোবাসা এত সহজ নয় যে, যে কেউ চাইলেই সেই মায়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে উড়তে পারবে। রেঁনেসা ফিরে আসে আদ্রিকের কাছে। ততদিনে দুজনেই অ্যাডাল্ট। তাই সারাজীবন এক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ওরা দুজন। কিন্তু হঠাৎই আদ্রিকের বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়। পরিবারের করুন অবস্থায় তখন আর দুজনের এক হওয়া হল না। কেটে গেল ছয়মাস। রেঁনেসা বার-বার আদ্রিকের ওপর চাপ দিতে থাকে। হঠাৎ একদিন রেঁনেসা আদ্রিককে দেখা করতে বলে। সেইদিন আদ্রিক জীবনের সেরা ধাক্কাটা পেয়েছিল, কারণ তার বিদেশিনী মেম যে বিচ্ছেদ দাবী করেছিল। সেদিন আদ্রিকের কথা বলার কোনও শক্তিই ছিল না। খালি বলেছিল, "বেশ... বিদেশিনী মেম তুমি যখন চলে যেতে চাইছো, তখন আমি আটকাবো না। তবে কথা দাও আমাকে কখনও ব্যর্থ প্রেমিক বলবে না। কারণ আমি তোমাকে সব সময় তোমার স্বাধীনতার দিয়েছি, তোমার ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়েছি। বাকিটা তোমার ইচ্ছা..."

অনেকেই ভাবেন রেঁনেসাই অন্যায় করেছিল কারণ সে অপেক্ষা করেনি। আসলে গল্পটা দুমুখী। রেঁনেসার বাবা তার প্রথমা স্ত্রী মানে রেঁনেসার মা মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয় বার বিয়ে করেছিলেন। সেই স্ত্রী রেঁনেসাকে মায়ের ভালোবাসা দিয়ে সযত্নে বড়ো করে তুলেছেন। হঠাৎই তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তাই রেঁনেসাকে দ্রুত সুপাত্রের সাথে বিয়ে দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তাই রেঁনেসারও কিছুই করার নেই। আদ্রিক সবটাই জানে, তাই সে একবারও তার বিদেশিনী মেমকে আটকানোর চেষ্টা করেনি। রেঁনেসা চলে যায় কানাডায় বরাবরের জন্য। কিন্তু মন তো মানতে চায়নি তাই আদ্রিক আজও রেঁনেসার।

এসব ভাবতে-ভাবতে ভিজে বালিশে আরেকটা রাত কাটিয়ে দিল আদ্রিক। সকালে ফ্রেশ হয়ে পান্তা ভাত খেয়ে বেরিয়ে গেল কলেজের উদ্দেশ্যে। পড়া শেষে একটা চাকরি জোগার করতে পারলেই পরিবারের হাল ধরতে পারবে সে। এইসব ভাবতে-ভাবতে বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছে আদ্রিক। এমন সময় চোখ গেল রাস্তায় পড়ে থাকা একটা আইডি কার্ডের দিকে। অনেকেই সেটিকে এড়িয়ে চলে যাচ্ছে। আদ্রিক কার্ডটাকে তুলে নিয়ে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। কার্ডটা কাদামাখা অবস্থায় থাকায় কার্ডে থাকা ছবিটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু কার্ডে থাকা নাম আর নম্বরটা বোঝা যাচ্ছে। আদ্রিক ফোন নম্বরটায় ফোন করল। বলল, "হ্যালো! কে বলছেন? মিস রোহিনী? "

ওপাশ থেকে কর্কশ শব্দে বলে উঠল, " হ্যাঁ বলছি। বলুন কি দরকার? "

"ম্যাডাম আমি আপনার আইডি কার্ডটা রাস্তায় কুড়িয়ে পেলাম। মনে হল খুব প্রয়োজনীয় এটা, তাই কার্ডে থাকা নম্বরে ফোন করলাম। "

রুহি ধন্যবাদের স্বরে বলল, " আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দেব বুঝতে পারছি না। আমি এতক্ষণ কার্ডটাই খুঁজছিলাম। আমি গিরিশ পার্কে আছি। ওটা যদি একটু পৌঁছে দিতেন তাহলে খুব উপকার হত। "

আদ্রিক বরাবরই মানুষের উপকারে ছুটে আসে। সে কলেজ না গিয়ে গিরিশ পার্কে রওনা দিল। সেখানে গিয়ে রোহিনীকে খুঁজে পেল সে। রুহি বলে, " আমি রোহিনী সেনগুপ্ত। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। "

আদ্রিক বলল, "আমি আদ্রিক রায়। কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? আপনি কি সেইদিন কম্পিটিশনে ছিলেন? "

"হ্যাঁ, কিন্তু আপনি জানলেন কি করে? "

এমন সময় রুহির বন্ধু এসে ওকে ডেকে নিয়ে যায় আর আদ্রিকের বন্ধু ফোন করে জানায় আদ্রিকের বাবার আবার শরীর খারাপ করেছে। ডাক্তার বলেছে এবার অপরেশনটা না করালে আর বাঁচানো যাবে না। আদ্রিক চিন্তায় পড়ে যায়। আসলে জীবন তো কোনও সিনেমা নয় যে কোনও দেবদূত এসে পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল। আদ্রিক ফোনটা ধরলো এবং কর্কশ শব্দ শুনে বুঝে গেল ওটা রোহিনী। রুহি বলল, "আদ্রিক একটা হেল্প করবেন? আমার ভাইটাকে কদিনের জন্য পড়াবেন? "

আদ্রিক একথা শুনে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, "আমি পড়াবো মানে? আমি তো প্রফেশনাল টিচার নই। "

"হ্যাঁ আমি জানি আপনি টিচার নন। এ কারণেই বলেছি। এখন বছরের মাঝখানে কোনও কোচিং সেন্টারই ওকে ভর্তি নিতে চাইবে না। এদিকে ওর মাধ্যমিক পরীক্ষা চলে এল। ব্যক্তিগত কারণে ওর টিচার পড়ানো ছাড়ছেন। তাই আপনি যদি ক'টা দিন ওকে সাহায্য করতেন তাহলে খুব উপকার হত। "

আদ্রিক পরিবারের কথা ভেবে রাজি হয়ে গেল। পরের দিন আদ্রিক রুহির দেওয়া ঠিকানা মতো ওদের বাড়ি গেল। সেখানে ঢোকা মাত্রই একটা বিশেষ জিনিস নজরে এল। ওদের বাড়ির ব্যালকনিটা বাগানে পরিণত হয়েছে। রুহির মনের সৌন্দর্যতা ওর বাহ্যিক রূপে প্রকাশ না পেলেও বাড়ির সজ্জারীতিতে তা স্পষ্ট। এভাবেই শুরু হল আদ্রিকের রুহির প্রতি ভালোলাগা। প্রায় চার মাস পর হঠাৎ রুহি জানতে পারে আদ্রিকের বাবা মারা গেছেন। আদ্রিকও রুহিদের বাড়িতে আসা যাওয়া বন্ধ করে দেয়। রুহির ভাইয়ের পরীক্ষাও শেষ। রুহি অনুভব করে, ও আদ্রিক কে ভালোবেসে ফেলেছে। আদ্রিককে তা সরাসরি জানলো রুহি। কিন্তু আদ্রিক সেদিন নিজের জীবন সাজানোর মতো পরিস্থিতিতে ছিল না। তাই সে রুহিকে সরাসরি না করে দেয়। ধীরে-ধীরে রুহিও আদ্রিকের প্রতি মায়া কাটিয়ে ক্যারিয়ারে মন দেয়।

প্রায় একটা বছর কেটে গেল রুহি আদ্রিকের গল্প অসমাপ্ত কাহিনীর মতো মিলিয়ে গেল। একটার পর একটা মাল্টি ন্যাশনাল ফ্যাশন হাউজ রুহিকে বাতিল করতে থাকে। আদ্রিকও জীবনের রুক্ষ পথে দিশেহারা। পরিস্থিতির চাপে আদ্রিক টিউশনিটা প্রফেশনাল ভাবে শুরু করেছে। রুহির বে-রঙিন জীবনে আবার আদ্রিকের অনুপ্রবেশ ঘটে। রুহির মাসতুতো দিদির বিয়েতে বরের বন্ধুর ভাই হিসাবে আমন্ত্রিত ছিল আদ্রিক। বিয়ের হট্টগোলের মাঝেও কাজল-কালো দুটো চেনা চোখ ওর নজরে এসেছে। রুহি আদ্রিককে জিজ্ঞেস করে কেমন আছে সে? উত্তরে আদ্রিক ভালো থাকার কথা জানালেও জীবনের ওঠা-পরা স্পষ্ট ওর মুখে ফুটে উঠেছে। কিছুটা সময় একসাথে কাটিয়ে বুঝতে পারে ঠিক কতটা ঝড় বইছে দুই সাগরের বক্ষে। তবে এবার রুহি আদ্রিকের নিরামিষ জীবনে আমিষের স্বাদ এনেই দিল। সে আদ্রিককে নতুন করে চাকরির জন্য চেষ্টা করতে উদ্বুদ্ধ করল। রুহির কর্কশ কণ্ঠেও আদ্রিক যেন নবজাগরণের স্বাদ খুঁজে পেল।

রুহি একটা টেলারিং-এর ব্যবসা শুরু করল। দেখতে-দেখতে সম্পর্কটা অনেক সহজ হয়ে উঠল। আদ্রিকের মন রোহিণীর সৌন্দর্যহীন রূপের আড়ালে থাকা মুক্ত মনের খোঁজ পেয়ে গেল। সত্যিই এত সাধারণভাবে যে ভালোবাসা যায় তা প্রমাণ করে দিল রোহিনী আর আদ্রিক। ওরা ভুলেই গেছে যে বাস্তবে জীবনকে সামাজিক বন্ধনে বাঁধতে হয়। আদ্রিক একটা প্রাইভেট সেক্টরে কাজ পেয়েছে। তাকে কাজের সূত্রে। ব্যাঙ্গালোর যেতে হল। রুহি সব মেনে নিয়ে নিজের ব্যবসা, পরিবার সবটা সামলে যাচ্ছে। ঠিক একবছর পর আদ্রিক কলকাতায় ফিরল। ও জানতো না ঠিক কি অপেক্ষা করে আছে ওদের জীবনে। রুহি তার বাবাকে আদ্রিকের বিষয়ে জানালে তার বাবা বিয়েতে অমত প্রকাশ করে। একদিন রোহিনী আদ্রিক সঙ্গে গঙ্গার পাড়ে দেখা করে। সেই চেনা কর্কশ শব্দে রুহি জিজ্ঞেস করল, " আচ্ছা আদ্রিক আমরা যদি এক হতে না পারি, আমি যদি তোমায় ছেড়ে চলে যাই তাহলে তুমি আমার কথা মনে করবে? "

আদ্রিক নিজেকে সামলে নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে, "হঠাৎ একথা কেন বললে? "

রুহি বলতে আরম্ভ করল, "আসলে তুমি তো জানোই আমি বড়ো ফ্যাশন হাউসে কাজ করতে চাই। বেশ কিছু বছর ধরে চেষ্টা করেও একটা কাজ জোগার করতে পারিনি। তবে এখন সুযোগ এসেছে। কাপুর ফ্যাশন হাউসের ওউনার রাজশেখর কাপুর আমাকে বিয়ে করতে চান। বাবা, ভাই দুজনেই চায় আমি যেন এই প্রস্তাবে সম্মত হই। নিজের স্বপ্ন আর অর্থাভাব পূরণে আমি প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছি। আজ রাত বারোটা দশের লগ্নে আমার আর শেখরের রেজিস্ট্রি ম্যারেজ। ভোর চারটে কুড়িতে ফ্লাইট। তাই শেষবারের জন্য তোমার সাথে দেখা করতে এলাম। "

কথাগুলো ঠিক বুঝে উঠতে পারল না আদ্রিক, কেবল রেঁনেসার কথা ভাবত লাগল। রুহি কথাগুলো বলেই বাসে উঠে গেল। আদ্রিক মনে-মনে বলতে লাগল, "না এটা হয় না। বিদেশিনীকে ও আটকাতে পারেনি, তবে রোহিনী কে সে যেতে দেব না। " কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে সেদিন ভোর চারটের আগে আদ্রিক রুহির বাড়ি পৌঁছাতে পারল না। সেও চলে গেল। অসহায় পরাজিত আদ্রিক কেবল নিজের মৃত্যু কামনা করতে লাগল। ছেলের এহেন অবস্থা দেখে আদ্রিকের মা তার পরিচিত মেয়ের সাথে আদ্রিকের বিয়ে দিয়ে দিল।

কেটে গেল পাঁচটা বছর। আদ্রিকের স্ত্রী মীরা এবং কন্যা রুহিকে নিয়েই আদ্রিকের জীবন কাটছে। হ্যাঁ আদ্রিক নিজের মেয়েকে রুহি নামেই ডাকে, তাতে অবশ্য মীরার কোনও আপত্তি নেই। হঠাৎ একদিন সকালে মীরা বায়না ধরলো মীরাকে তার পছন্দের শাড়ি কিনে দিতেই হবে। বর্তমানে আদ্রিকও বেশ ভালো টাকা উপার্জন করছে। কলকাতার ব্রাঞ্চের হেড অফিসার পদে সে কর্মরত। মীরা বাচ্চাদের মতো বায়না ধরে আদ্রিকের কাছে। আদ্রিক ওর কথা একটুও ফেরাতে পারে না। তাই বিবাহবার্ষিকীর দিনই মীরা আর রুহিকে সঙ্গে নিয়ে বেড়িয়ে পরল মীরার সেই পছন্দের শাড়ি কিনতে। মীরা আজ নিজেই ড্রাইভ করল। ওরা একটা বড়ো শাড়ির শোরুমের সামনে নামলো। সেটা ছিল কাপুর স্টাইলসিটি। তিনজন ভিতরে প্রবেশ করল। মীরা ব্যস্ত শাড়ি কিনতে। ও বরাবর একাই পছন্দ করে। আদ্রিক শোরুমটা ঘুরে দেখছে। এমন সময় কানে এল শোরুমের ওউনার রাজশেখর কাপুর আসছেন শোরুম দেখতে। মুহূর্তের মধ্যেই আদ্রিক বুঝে গেল এই সেই মানুষ যার সাফল্যের জন্য ওর রোহিনী ওকে ছেড়ে চলে গেছে। সে ওউনারের রুমে গেল। আদ্রিক জিজ্ঞেস করল, " হাও আর ইউ মিঃ কাপুর? হাও ইজ ইওর ফ্যামিলি? আই নো ইউ কান্ট রিকল মি বাট্ আই নো ইউ ওয়েল। "

মিঃ কাপুর বললেন, "এক্সকিউস মি, আপনি কে? আর কি সব বলছেন এগুলো? "

আদ্রিক এবার ক্ষোভে অভিমানে ফেটে পড়ল। বলল, "কেন বুঝতে পারছেন না বুঝি? রোহিনী কেমন আছে? আপনার স্ত্রী রুহি আমার গার্লফ্রেন্ড ছিল। কেবলমাত্র আপনার সাফল্যের জন্য সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল। জাস্ট ফর ইউ। "

রাজশেখর বললেন, "ওয়েট ম্যান। কিসব বলছেন এগুলো? আর কে রোহিনী? আমার স্ত্রীর নাম রনিতা কাপুর। "

আদ্রিক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "আপনি কাপুর ফ্যাশন হাউসের ওউনার রাজশেখর কাপুর না? "

উত্তরে শেখর বলল, "হ্যাঁ, কিন্তু আমি রুহি বা রোহিনী বলে কাউকে চিনি না। আমার মনে হয় আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। "

এমন সময় রুহি এসে আদ্রিকের কাছে বায়না করতে লাগল। আদ্রিক রুহি আর মীরাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েই রওনা দিল রোহিণীর বাড়ির দিকে। হাজার প্রশ্নের জগতে সে দিশেহারা। কেন রোহিনী এমন করল? সে কোথায় কি করছে এখন? নানা প্রশ্ন দলা বেধে রইল মনে মধ্যে। সে রুহির বাড়ি পৌঁছানো মাত্র চিৎকার করে রোহিনীকে ডাকতে লাগল। অনেক ডাকাডাকির পর রোহিণীর ভাই বেরিয়ে এল। আদ্রিক ভেতরে গেল। রুহির ভাই ওকে বসতে বলল। আদ্রিক প্রশ্ন করল, "ভাই তোমার দিদি কোথায়? কেমন আছে ও? "

প্রশ্নগুলো শোনা মাত্রই রুহির ভাই কেঁদে ওঠে আদ্রিককে জড়িয়ে ধরে বলে, " তুমি কি কিছুই জানো না দাদা? দিদি তো আর বেঁচে নেই। "

আদ্রিক অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, "মানে? কি বলছো এসব? কি করে হল? সেইদিন ঠিক কি কি হয়েছিল আমাকে খুলে বলো ভাই। "

রুহির ভাই বলতে আরম্ভ করে, "দিদি পাঁচ বছর আগেই মারা গেছে। সেদিন ছিল ভয়ানক অভিশপ্ত দিন। বাবা তোমাদের সম্পর্কটা মেনে নিয়েছিল। দিদি ভেবেছিল খবরটা তোমাকে দিয়ে তোমায় অবাক করে দেবে। কিন্তু হঠাৎ সবটা শেষ হয়ে গেল। দিদির কিসব মেডিক্যাল রিপোর্ট এলো। সেদিনের পর থেকেই দেখতাম দিদি কেমন যেন বদলে যেতে লাগল, শুধু কান্নাকাটি করতো। কিসের রিপোর্ট ছিল তা জানতে আমার আর বাবার অনেকটা সময় লেগে গেল। জানতে পারলাম দিদির ব্লাড ক্যান্সার। প্রায় লাস্ট স্টেজ। ডাক্তার বলল আর হয়তো এক বা দু'মাস সময় আছে দিদির কাছে। সেই সময় আর্থিক অবস্থার কারণে দিদির জন্য শেষ চেষ্টাও করতে পারিনি আমরা। ও আমাদের কাছে সবটা লুকিয়ে যায়। হঠাৎ একদিন ও ডিসিশন নিল ও তোমার সাথে বিয়ের নাটক করবে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। পরিকল্পনা মতো সবটা গুছিয়ে ফেলল। আমাকে আর বাবাকে ওর দিব্বি দিয়ে বলল তুমি যেন এসব কোনোভাবেই জানতে না পারো। বাবাও বাধ্য হয়ে সবটা মেনে নিল। বাকীটা তো তুমি নিজেই দেখেছো। সেদিনের পর দিদির কষ্টটা আরও বেড়ে গেল। তারপর ঠিক পনেরো দিনের মাথায় ও আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেল। বাবাও দুবছর হল মারা গেছে। এখন এক পিসি, দিদা আর আমি থাকি এই বাড়িতে। "

কথাগুলো শোনা মাত্রই আদ্রিক চিৎকার করে কেঁদে উঠল। টেবিলে রাখা রুহির ছবিটাকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে বলতে লাগল, "কেন রুহি কেন? কেন আমাকে কিছুই বললে না? একটা সুযোগ তো দিতে পারতে আমাকে। অন্তত শেষ পথটা একসাথে হাঁটতাম না হয়। আমি কি এতটাই অযোগ্য ছিলাম? "

ক্লান্ত পরাজিত শরীরে বাড়ি ফিরে এল আদ্রিক। সব ঘটনা আদ্রিক মীরাকে খুলে বলল। মীরা নিশ্চুপ হয়ে আদ্রিককে জড়িয়ে ধরল। পেছন থেকে আদ্রিকের মেয়ে রুহি এসে আদ্রিকের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল, "বাবা আমি কোথাও যাইনি। এই তো এখানেই আছি। তোমার রুহি..."

কিছু সম্পর্কের কোনও ইতি হয় না। বাস্তবে উপসংহারেই নতুন করে জীবন যুদ্ধের নবজাগরণ হয়।
( সমাপ্ত )


Next Story

List of all Bengali Stories


## Disclaimer: RiyaButu.com is not responsible for any wrong facts presented in the Stories / Poems / Essay / Articles / Audios by the Writers. The opinion, facts, issues etc are fully personal to the respective Writers. RiyaButu.com is not responsibe for that. We are strongly against copyright violation. Also we do not support any kind of superstition / child marriage / violence / animal torture or any kind of addiction like smoking, alcohol etc. ##


◕ RiyaButu.com, এই Website টি সম্পর্কে আপনার কোনও মতামত কিংবা পরামর্শ, কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। যোগাযোগ:
E-mail: riyabutu.com@gmail.com / riyabutu5@gmail.com
Phone No: +91 8974870845
Whatsapp No: +91 6009890717