Home   |   About   |   Terms   |   Library   |   Contact    
A platform for writers

অতীত গড়ে ভবিষ্যৎ

স্বরচিত ছোট গল্প প্রতিযোগিতা, নভেম্বর- ২০২২ একটি নির্বাচিত গল্প

-------- বিজ্ঞপ্তি ----------
■ 'স্বরচিত কবিতা প্রতিযোগিতা, ফেব্রুয়ারি - ২০২৩' Details
--------------------------



List of all Bengali Stories

অতীত গড়ে ভবিষ্যৎ
লেখক - রাজকুমার মাহাতো, সম্পামির্জানগর, কলকাতা
স্বরচিত ছোট গল্প প্রতিযোগিতা, নভেম্বর- ২০২২ একটি নির্বাচিত গল্প


##

(১)

বসন্তের বিকেল। পাতাঝরা মরসুমের হিমেল আগত সন্ধ্যা। লেকের ধার। গাছের পাতাদের অকালে ঝড়ে পরা। ঝিলের জলে মৃদুমন্দ বাতাস। কেঁপে-কেঁপে ওঠা ঝিলের শরীর। ঠিক যেন অচেনা নারীত্বের হাতে প্রথম পুরুষত্বের ছোঁয়া আর কেঁপে ওঠা প্রতিবার। মনের ভিতর জেগে ওঠা যৌবনের কৌতূহলের উত্তর। তাদের জিজ্ঞাসা চিহ্নের মুক্তি। কত কি মনে পরে অপর্ণার। প্রথম থেকে শেষ অবধি সবটুকুই তার মনের খাতায় বন্দি। রণিতের প্রথম ছোঁয়া, তার সিগারেট পোড়া ঠোঁটের প্রথম অপর্ণার নরম মসৃণ লিপস্টিক জ্যাপ্টানো ঠোঁটের সেই অফুরন্ত হাসি। ওই তো ওই গাছটার নীচে। কলেজ পালিয়ে আসা তাদের সেই পাতাঝরা দুপুর অথবা টিউশন বাংক মেরে আসা সেই কনকনে শীতের সন্ধ্যে। কিছুই তো ভোলেনি অপর্ণা। তবে আজ এত একাকীত্ব কিসের? শুধু না পাওয়ার ব্যর্থতা কেন তার হৃদয় জুড়ে? বারবার মোচড় দিয়ে ওঠা সেই শেষ কথাগুলো, কেন বারংবার তাকে অন্যমনস্ক করে দেয়। স্বামী সংসার নিয়ে থাকা একটা সাধারণ ঘরের গৃহিণীর কেন বারবার সব ছেড়ে ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্যই বোধহয় আজ আট বছর পর আবার এই লেকের ধারে এসেছে অপর্ণা।

আট বছর! প্রায় দুই হাজার নয়শ তেইশ দিনের মাথায় এসে দাঁড়িয়েছে অপর্ণা নিজের অতীতের সামনে। তাহলে কি ভালো নেই অপর্ণা? এত ভরা সংসার, একটা নিষ্পাপ সন্তান। তাদের সাত তলার ফ্ল্যাট। সামনে ব্যলকনি। তারপর সুদূর একটা মাঠ। সেই মাঠের ওপারে সূর্যের উঁকি। এসবই তো চেয়েছিল সে। জীবনে তার আকাঙ্ক্ষা ছিল এসব। অপরিবর্তিত স্বপ্ন। অবিরাম ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে মন কেমনের একটা সন্ধ্যে হঠাৎ অপর্ণাকে কেন ফিরিয়ে দিতে চাইছে তার ভুলে যাওয়া অতীত? কেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে সেই দিনগুলোতে; জানে না অপর্ণা। পাঁচ বছরের ছেলেকে সে পাশের ফ্লাটের উজ্জলা কাকিমার কাছে রেখে এসেছে। রাতের রান্না এখনও বাকি। দুপুরের খাবারটা ফ্রিজে রেখে এসেছে কিনা মনে নেই। আজকাল খুব ভুলে যায় মেয়েটা। ডিম ভাজা চাপিয়ে ওল্টাতে ভুলে যায়। কখনও আবার ভাত চাপিয়ে গ্যাস জ্বালাতে ভুলে যায়। ডিমটা থেকে ধোঁয়া বের হয়, পোড়া গন্ধ বের হয়। ভাতটা অনেকক্ষণ ফুটছে না দেখে নীচে উঁকি মেরে দেখে গ্যাস বন্ধ । সব ভুলে যায় অপর্ণা। কিন্তু এই হঠাৎ মনে পরে যাওয়া অতীতটা ভুলতে পারে না। শত চেষ্টার পরেও আঁকড়ে ধরে সেই শেষ কথাগুলো।

গতকাল রাতে খুব কেঁদেছে অপর্ণা। সারারাত চোখের জল বাঁধ মানেনি। বালিশে মুখ গুঁজে টের পেতে দেয়নি কুশলকে। কুশল অফিস থেকে ফিরে আর অপর্ণার দিকে তাকায় না। কেমন যেন চোখটা লুকিয়ে-লুকিয়ে ঘোরে। ছেলেকে অংক করানোর সময় অপর্ণা চা দিতে গেলে মুখটা নীচু করেই বলে, "রেখে দাও, নিয়ে নেব।" কিন্তু আগে কুশল এমন করতো না তো। অপর্ণা আগেও ওকে চা দিতে গেলে চায়ের কাপ সমেত প্লেটটা নেওয়ার সময় অপর্ণার হাতে হাত রাখত কুশল। কেঁপে উঠত অপর্ণা। এখন আর সেসব করে না কুশল।

" অপর্ণা?" একটা গম্ভীর গলার স্বরে হুস ফেরে মেয়েটার। চোখের মধ্যে জমে থাকা জলটা ভয় পেয়ে টুপ করে গড়িয়ে যায় নিচের দিকে। তার নরম মসৃণ গাল বেয়ে, গলা দিয়ে সোজা নেমে ব্লাউজের কাপড়ে মিলিয়ে যায় জলটা। অপর্ণা অভিমানী চোখে পাশে তাকায়। অভিমানী ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে। জলে ভরা চোখ দুটো যেন কত কালের কত কষ্ট জমিয়ে রেখেছে। তাদের ঝরে পরার অনুমতি নেই। মুখটা ভেংচে অপর্ণা বলে, " এই আসার সময় হলো তোর? সারাটা জীবন আমি তোর অপেক্ষা করব? কেন?"

পাসে বসে ছেলেটা। আলতো করে অপর্ণার হাতটা নিজের হাতে তুলে নেয়। একটা ঝটকায় হাতটা সরিয়ে নেয় অপর্ণা। মেয়েটা আগাগোড়াই বড্ড অভিমানী। সামনের দিকে তাকায় ছেলেটা। মুখে কোন কথা নেই ছেলেটার। অপর্ণার মাথাটা আরও গরম হয়ে ওঠে। এত দেরি করে এসেছে, অথচ মুখে কোন কথাও নেই! কি ধরনের ছেলে রে বাবা? নিজেই শুরু করে অপর্ণা। দাঁতে-দাঁত পিষে বলে, "যে পুরুষের নারীর অভিমান ভাঙানোর ক্ষমতা নেই, তাকে আমি পুরুষ বলে মনেই করি না।" এখনও চুপ ছেলেটা। সামনের জলের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। সামনে ঝিলের জলে লাল অস্তগামী সূর্য দুলছে। পাখিরা বাসায় ফিরছে একে-একে। কিচিমিচি রবে ভেঙ্গে চুরচুর হয়ে যাছে অসীম এক নিঃস্তব্ধতা। অপর্ণা মুখটা বেঁকিয়ে আবার বলল, "আবার এই সময়ে হুডি পরে এসেছে। বাজে ছেলে। কিন্তু তুই তো এসব পরতিস না!"

ছেলেটা কোন উত্তর দেয় না। বরঞ্চ হুডিটা আরও একটু ভাল করে মুখের সামনের দিকে টেনে নেয়। অপর্ণা অবাক হয় না। সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টিতে। সন্ধ্যা নেমেছে লেকের ধারে। লাল আর কালোর মিশ্রণে তৈরি হয়েছে একটা মিষ্টি আলো। এ আলো, অন্ধকার আর আলোর মধ্যেকার দূরত্বকে দূর করে। অপর্ণা সামনের দিকে তাকিয়েই বলে, "আমি ভালো নেই রণিত। একেবারে ভালো নেই। কুশল আর আমাকে সেভাবে ভালবাসে না। কেমন যেন হয়ে গেছে ও। আমার দিকে তাকায় না ভালোমতো। আমাকে আর ছোঁয় না কুশল।"

ছেলেটি চুপ। তার উত্তর দেওয়ার অপেক্ষা করে না অপর্ণা। আবার বলে, "আমি কুশলকে খুব ভালোবাসি রণিত। আমাকে আমার মত থাকতে দিবি? লক্ষ্মীটি। ছেড়ে দে আমায়। কেন ফিরে এসেছিস তুই? আমার কুশল আমার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। রণিত, আমাকে মুক্তি দে প্লিজ?"

(২)

পেটে টান পরে ভাতের অভাবে, আর মনে টান পরে ভালোবাসার অভাবে, একটু ছোঁয়ার অভাবে। একটা বুক-বালিশ দরকার হয় সমস্তটা ভোলার জন্য। সেই সমস্ত অতীত যাকে ঘষে মেজে তৈরি হয় নতুন ভবিষ্যৎ। উদ্দাম বেগে ছুটে চলে আঁকড়ে ধরার কারবার। কার পিঠে প্রেমের আঁচড়ের দাগ কতটা গভীর, পরীক্ষা হয় প্রতিদিন। ভালোবাসা বাড়ে, নরম ঠোঁটের লাল দাগটা ভালোবাসা তখন।

কুশল যেদিন অপর্ণাকে মিসেস গুপ্তর কাছে নিয়ে গেল। সেদিন অপর্ণার শারীরিক অবস্থা চরমে। সকাল থেকে মাথা তুলতে পারেনি মেয়েটা। ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে সোজা তারা এসেছে মিসেস গুপ্তর চেম্বারে। মাথা তুলে দেখেনি অপর্ণা। মিসেস গুপ্ত অপর্ণার সাথে একাকী কিছু কথা বলতে চেয়েছিলেন। তাই কুশল বাইরের চেয়ারে বসে অপেক্ষারত। তার চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। কিছুক্ষণ পর অপর্ণা বেরিয়ে এল। মৃদু নেশাতুর গলায় বলল, "তোমাকে ডাকলেন, একা কিছু কথা বলবেন। যাও, আমি এখানে বসছি।" কুশল ভেতরে যেতে মিসেস গুপ্ত কুশলকে বসতে বললেন। হাতের কলমটা প্রেসক্রিপশনের উপর রেখে কুশলের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুমি জানো না অপর্ণার কি হয়েছে?"

কুশল এই প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিল না। একটু থতমত খেয়ে একবার ডান দিকে দেখল, না দরজাটা বন্ধ আছে। আর একবার বাঁদিকে, না সেদিকে ইট বালি সিমেন্টের মোটা প্রলেপের দেওয়াল। তারপর তাকাল মিসেস গুপ্তের দিকে। মিসেস গুপ্ত তখনও কুশলের দিকে তাকিয়ে কুশল মৃদু স্বরে বলল, "আমি যেটা ভাবছি, সেটাই কি?"

মিসেস গুপ্ত বললেন, " হুম, সিজোফ্রেনিয়া।"

কুশল হাতের মুঠোটা শক্ত করে ধরল। চোয়ালগুলো শক্ত হয়ে উঠল ছেলেটার। চোখদুটো রক্তজবার মত লাল। গলার স্বরটা তিনগুণ বাড়িয়ে কুশল বলল, " কিন্তু, ও তো সুস্থ হয়ে গেছিল। আবার? কি করে? কেন? এও সম্ভব?"

মিসেস গুপ্ত এতগুলো প্রশ্নের একসাথে তার দিকে ছুটে আসায় কোনপ্রকার বিরক্তি না দেখিয়েই বললেন, "হ্যাঁ, যে গিয়েছিল সে আসলে যায়নি। তাকে চাপা দিয়ে রেখেছিলে তুমি। আবার সে তার সমস্ত বাঁধন খুলে ফিরে এসেছে।" উঠে দাঁড়ালেন মিসেস গুপ্ত। শাড়ীর আঁচলটা ডান কাঁধে তুলে কাঁচের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। মুখটা তুলে দেখলেন বাইরে। অপর্ণা চেম্বারের জানালার কাঁচ ভেদ করে চলন্ত শহরটাকে দেখছে এক দৃষ্টিতে। মিসেস গুপ্ত বললেন, " অপর্ণার সিজোফ্রেনিয়া এখন অ্যাডেল সিনড্রোম-এ পরিণত হয়েছে কুশল। তুমি তোমার ভালোবাসা দিয়ে ওর যতটুকু খামতি পূরণ করবে ভেবেছিলে। সেটা আসলে সম্ভব হয়নি। তোমাদের বিয়ের এত বছর পর এসে কোথাও একটা শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে অপর্ণার মনে। আর সেই শূন্যতায় ঢুকে পরেছে মেয়েটার ফেলে আসা অতীত। এখন ওর অতীতকে কাজে লাগিয়েই তোমায় ওর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হবে। আর এই কাজটা একমাত্র তুমিই পারবে।"

মাথায় হাত দিয়ে বসে পরে কুশল। তার সমস্ত চিন্তা-ভাবনা আজ লোপ পেয়েছে। মনে পরছে আজ থেকে বছর আট আগের সেই দিনগুলো। সেই একটা অবাস্তব ঘোর থেকে অপর্ণাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। অপর্ণার মনের সমস্ত জড়তাকে ভুলিয়ে নতুন করে তাকে বাঁচতে শেখানোর, তাকে আঁকড়ে ধরার সেই লড়াই।

(৩)

আট বছর আগের একটা সন্ধ্যে। লেকের ধার। বাসায় ফিরে আসা পাখিদের কোলাহল। লেকের জলের মৃদ্য-নৃত্য। ঝড়ে পরা পাতাদের মাড়িয়ে যাওয়ার শব্দ। লেকের একটা বেঞ্চিতে বসে অপর্ণা আর রণিত। দুই জন দুই পাশে। মাঝে দুটো ব্যাগ। আর সেই ব্যাগের মাধ্যমে তৈরি করা তাদের মধ্যেকার এক গভীর দূরত্ব। রণিত নিজের ব্যাগটা তুলে অন্য পাশে রাখল। মনে-মনে ভাবল কিছুটা দূরত্ব বোধহয় কমল। সামনের দিকে মুখ করে বলল, " এটাই তোর ফাইনাল ডিসিশন?"

অপর্ণা মুখটা নিচের দিকে করে এককথায় উত্তর দিল, "হ্যাঁ।"

ঢোক গিলল রণিত। অনেকটা কষ্ট ভিতরে চলে গেল। সামনের দিকে তাকিয়ে বলল, "আমার কথাটা একবারও ভাববি না? আমাদের ভালোবাসার কথা..."

অপর্ণার মুখে কোন কথা নেই। অঝোরে চোখগুলো আজ তার ভাষা হয়ে ঝরে পরছে রণিতের সামনে। পাশের বড় গাছটা থেকে অচেনা একটা পাখি ডেকে উঠল। সেও তার সঙ্গী হারিয়েছে বুঝি। রণিত মুচকি হাসল। সামনে একজোড়া রাজহাঁস মুখে-মুখ লাগিয়ে কি যেন বলছে একে অপরকে, হয়ত ভালোবাসার স্বীকারোক্তি। অপর্ণা রণিতের মুচকি হাসির দিকে তাকিয়ে বলল, "আসলে তুই এখনও সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারিস নি। বাড়ি থেকে একটা ছেলে দেখেছে। সামন্ত জ্যেঠুর ছেলে। বিলেত থেকে ডাক্তারি পড়ে এসেছে। আর তুই? এখনও কাঁধে গিটার আর গায়ক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। কি করব বল আমি? আমার জায়গায় তুই হলে কি করতিস?"

রণিত জোড়ে হেসে উঠল। তার ভিতরের অনেক না বলা কথাগুলো ঢোক গিলে নিল ছেলেটা। উঠে দাঁড়িয়ে, ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে তাকাল অপর্ণার দিকে। রণিতের ঠোঁটগুলো থরথর করে কাঁপছে। হাসতে থাকার বৃথা চেষ্টা ভেদ করে ভিতরে জমে থাকা কষ্টেরা নিজেদের অস্তিত্ব অপর্ণার সামনে এনে ধরল। রণিতের চোখগুলো যেন অজান্তেই বলে উঠল, "এই গিটার আর এই গানকেই তুই ভালোবেসেছিলি একদিন অপর্ণা। আজ সেই বস্তুগুলোই তোর কাছে মূল্যহীন হয়ে উঠল! নাকি, একজন গিটারধারী স্ট্রাগেলার ছেলের ভালোবাসার কাছে একজন বিলেত ফেরত ডাক্তারের ভালোবাসা হেরে গেল। কেন অপর্ণা কেন?" এই না বলা কথাগুলো হয়ত অপর্ণা বুঝে গিয়েছিল। সে যখন উঠে দাঁড়াল রণিত তখন কয়েক পা এগিয়ে গেছে ফেরার পথের দিকে। চলে যাচ্ছে রণিত, নিজের বেকারত্বের ভালোবাসা বুকে জাপটে ধরে; খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে ছেলেটা, একা। পিছন ফিরে তাকাল রণিত। অপর্ণা ওর দিকে তাকিয়ে ছিল। মুখটা নীচু করে নিল ছেলেটা। রণিত আবার মুচকি হাসল, তার কাঁপতে থাকা ঠোঁট-দুটো বলে উঠল, "ভালো থাকিস তুই, ফিরে আসিস আবার।" রণিতের মুখে একটা বিকৃত বেদনার হাসি ফুটে উঠল। অপর্ণা মুখটা নিচে নামিয়ে নিল। রণিত এগিয়ে গেল। পরে থাকল বেঞ্চিটা আর বেঞ্চির কাঠে লেপটে থাকা এক-টুকরো ভালোবাসা।

(8)

অন্ধকার হয়ে এসেছে। পাখিগুলো খানিক আগে চুপ করেছে। দু-একটি নাম না জানা পাখি ডেকে উঠছে। সম্ভবত তাদের না ফিরে আসা প্রিয়জনদের জন্য। অপর্ণা আর ছেলেটা একই ভাবে বসে লেকের সেই ফেলে যাওয়া বেঞ্চিতে। এই বেঞ্চিতেই বসে তাদের শেষ আলোচনা হয়েছিল। সেই থেকে এই বেঞ্চির গায়ে লেগে রয়েছে অপর্ণার একটুকরো অপূর্ণ ভালোবাসা। আট বছর পর আজকে আবার অপর্ণা আর রণিত একে অপরের মুখোমুখি। তবে রণিত কেন যে মুখটা ঢেকে রেখেছে! জানে না অপর্ণা। সে জানে, সে বিবাহিত। তার একটা ভরা সংসার আছে। লোক জানাজানি হলে একটা খুব বাজে ব্যাপার দাঁড়াবে। কিন্তু গত এক-দুই মাসে কেবল ফোনেই কথা হয়েছে দুজনের। তাদের সেই স্বীকারোক্তির ফোনগুলো অপর্ণাকে যেন নতুন করে তার জীবন ফিরিয়ে দিচ্ছে। সে জানে লোকজন এটার নাম পরকীয়া দেবে, কিন্তু তাতে ওর কিছু এসে যায় না। মনে পরে অপর্ণার সেই দিনটার কথা। এইতো মাস দুয়েক আগের সেই বর্ষা-মুখর একটা দিন। অপর্ণার মাথা ব্যথার রোগ চিরকালের, সেটা কুশলও জেনে গেছে ততদিনে। কিন্তু সেদিন একটু যেন লাগামছাড়া ব্যথা আঁকড়ে ধরেছিল অপর্ণাকে। গত কয়দিন থেকেই ওর মনটা বড্ড খারাপ। মাথার যন্ত্রণাটা বেড়েছে এই কয়দিন। কুশল ওকে কয়েকটা মেডিসিন দিয়েছে বটে, তবুও কিছুতেই যেন নিজেকে সামলাতে পারছে না, সংসারে মন নেই মেয়েটার। সারাক্ষণ মাথাটা কেমন যেন একটা ভার হয়ে থাকে। ছেলেকেও সময় দিতে পারছে না ঠিক করে। ওর এই অবস্থার জন্য একমাত্র রণিত দায়ী, সেকথা জানে অপর্ণা। এতদিন রণিতের কথা মনে পরেনি ওর। এখন হঠাৎ করেই কেন যেন রণিত ওর উপর ভর করেছে। সারাক্ষণ তাদের সেই ফেলে আসা দিনগুলো অপর্ণার চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়। ঠিক সেই সময়ে অপর্ণার ফোনটা বেজে ওঠে। ফোনটা রিসিভ করে অপর্ণা "হ্যালো' বলে।

ওপার থেকে কিছুটা নিঃশ্বাসের শব্দের সাথে ভেসে আসে একটা কথা, "কেমন আছিস?"

অপর্ণা প্রথমটা কিছুই বুঝতে না পেরে বলে, "ভালো আছি। কিন্তু আপনি কে?" ওপারে একটা গাড় নিস্তব্ধতা। আর কিছু বলতে হয়নি ফোনের ওপারে থাকা লোকটিকে। অপর্ণা নিজেই বলে ওঠে, "রণিত?"

ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা "হুঁ" শব্দটা অপর্ণার অন্তরটাকে এক মূহুর্তে কাঁপিয়ে তোলে। তার সমস্ত বর্তমান পৌঁছে যায় ফেলে আসা অতীতে। এক মুহূর্তে সে ভুলে যায় সে এখন কারোর বাড়ির বউ, এক সন্তানের মা। তারপর থেকে প্রতিদিন কুশলের হাসপাতালে যাওয়ার পর দুজনের সেই অতীতের ফেলে আসা স্বীকারোক্তি জমা হতে থাকে দুজনের মনে। ধীরে-ধীরে অপর্ণার মাথা ব্যথা কমে আসে। নিজেকে অনেকটা সুস্থ পায় অপর্ণা। আর তার এই হঠাৎ পরিবর্তন নজর এড়ায় না কুশলের। ধীরে-ধীরে অপর্ণা কুশলের থেকে সরতে থাকে কুশলের চোখের সামনে। কিছুই করতে পারেনা কুশল।

(৫)

একটা নিষ্পাপ ভালোবাসার মারাত্মক পরিণতির কথা ভেবে শিউরে উঠেছিল কুশল। অপর্ণাকে প্রথম দেখাতেই মন দিয়ে ফেলেছিল সে। তার সমস্ত আবেগ, তার বুকের দোমড়ানো মোচড়ানো ভালোবাসার ঘরটায় একটা টোকা মেরেছিল অপর্ণা। কি ভয়ংকর মায়াবী চোখের অধিকারী মেয়েটা। একবার চোখে চোখ পরলেই শূন্য হয়ে যায় বুকটা। মনে হয়, সেই চোখের কোনও অতল গহ্বরে বুঝি ঢুকে যাচ্ছে কুশল। প্রচণ্ড চাপ দিয়েছিল অপর্ণাকে তার বাড়ির লোক। সে যাতে রণিতকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভুলে যায়, সেই চেষ্টাই করেছিল সকলে। বাবার ইমোশনাল চাপে সেদিন লেকের ধারে রণিতকে অতগুলো কথা বলেছিল অপর্ণা। আর তারপর...তারপর যেটা হয়েছিল সেটা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি কেউ। কাঁধে গিটার আর বুক ভর্তি গানের কথা নিয়ে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলেছিল ছেলেটা। আর ঝুলেছিল একটা অপরিণত ভালোবাসা। অপর্ণা খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিল। কিন্তু রণিতের সেই খোলা চোখ আর বেরিয়ে পরা জিভ দেখে অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পরে গেছিল মেয়েটা। তারপর থেকে ছায়া হয়ে অপর্ণার সাথে-সাথে ঘুরেছিল ওই গিটারধারী ছেলেটা। অপর্ণার ভাতের থালা থেকে শুরু করে বিছানার চাদরে যেন কবজা করে নিয়েছিল রণিত। একটা মারাত্মক সিজোফ্রেনিয়া গোত্রের রোগে আক্রান্ত হয়েছিল মেয়েটা। কুশল কিন্তু হাল ছাড়েনি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে, আর নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে রণিতকে বের করে দিয়েছিল অপর্ণার অন্তর থেকে। কিন্তু সে যে আবার এভাবে ফিরে আসতে পারে এত বছর পর ধারণা ছিল না কুশলের। আসলে কথায় আছে, অতীত যেন বারবার ফিরে-ফিরে আসে।

(৬)

মৃদু হাওয়ায় দোল খাচ্ছে কৃষ্ণচূড়ার ডালের ছায়াটা। ভ্যাপারের হলদে আলো কালো অন্ধকারকে খানিক মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছে মাত্র। ওপারের বেঞ্চিতে বসে সদ্য প্রেমে পরা এক যুবক-যুবতী। হাতে-হাত চোখে-চোখ রেখে তাদের স্বীকারোক্তি অপর্ণাকে অনেক কিছু মনে করিয়ে দিচ্ছে আজ। অপর্ণার মুক্তির কথাটায় অনেকটা অবাক হয়েছিল তার পাশে বসে থাকা ছেলেটি। হুডির নিচে থাকা তার চোখজোড়া একবার আড় চোখে দেখেছিল অপর্ণাকে। পাছে অপর্ণা দেখে ফেলে, সঙ্গে-সঙ্গে মুখটা আবার অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছিল ছেলেটা। অপর্ণা মুচকি হেসে গান ধরল —
"তুমি সুখ যদি নাহি পাও, যাও সুখের সন্ধানে যাও..."
এইটুকু গেয়েই কেমন একটা অন্যমনস্ক হয়ে বলল, "এই গানটা খুব গাইতিস তুই। তোর গলায় এর পরের লাইনদুটো শুনতে খুব ইচ্ছে করে জানিস। কিন্তু..." চুপ করে গেল অপর্ণা। একবার ছেলেটির দিকে তাকাল। মুখটা নিচু করে বলল, "তবে আমি সুখেই আছি জানিস। হয়ত তুইও আমায় সুখেই রাখতিস। কিন্তু কুশল আমাকে খুব ভালো রেখেছে রে। আমার প্রতি ওর কোন অভিযোগ নেই। এই তোর সাথে এত কথা বলি ফোনে, হয়ত জানে ও। কিন্তু একদিনও মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করে না আমি কার সাথে কথা বলি। বড় ভালোবাসে আমায়।"

ছেলেটি এবার আর নিজেকে রুখতে পারল না। কাঁপা গলায় বলে উঠল "আর তুই?"

অপর্ণা আবার মুচকি হাসল এবং গাইতে শুরু করল —
"আমি তোমাকে পেয়েছি হৃদয় মাঝে, আরও কিছু নাহি চাই গো..."
ছেলেটি উঠে দাঁড়াল। অপর্ণার সামনে এসে ওকে জড়িয়ে ধরল। কষে, আরও কষে। জীবনের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে জড়িয়ে ধরল কুশল অপর্ণাকে। অপর্ণাও উঠে দাঁড়িয়ে কুশলকে জড়িয়ে ধরল। বৃষ্টি এল কুশলের চোখে, অপর্ণার চোখে তখন সুনামী। অপর্ণা নিজের বাহুবন্ধন থেকে কুশলকে পিছনে সরিয়ে ওর হাত দুটো ধরে বলল, "তুমি কি ভেবেছিলে তুমি একাই নাটক করতে পার? দেখলে তো আমিও কেমন অভিনয় শিখেছি তোমার সাথে থেকে..."

কুশলের মুখ থেকে হুডিটা অনেকক্ষণ আগেই সরে গেছে। লাল হয়ে আছে চোখ দুটো, কপালের শিরা-উপশিরাগুলো যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে। ক্ষীণ কণ্ঠে কুশল বলল, "কিন্তু তোমার মাথা ব্যথা?"

অপর্ণা বলল, "হ্যাঁ, হয়েছিল তো। সে আবার এসেছিল কুশল। কিন্তু আমি তাকে নিজের মধ্যে থাকার জায়গা দিই নি। কারণ, সেই জায়গায় তুমি আছ, আমার সন্তান আছে, আমার সংসার আছে। তোমার রণিত সেজে ফোন করার তিনদিন পরেই আমি জেনে গিয়েছিলাম সবটা। তারপর মিসেস গুপ্তের সাথে কথা বলেছিলাম।"

কুশল ভেজা চোখে বলল, " তোমাকে খুব ভালবাসি অপর্ণা। তুমি যদি চাও আমি সারাজীবন কুশল হয়ে থাকতে পারি তোমার কাছে।"

অপর্ণা হেসে বলল, "আমি আর অতীতে ফেরত যেতে চাইনা কুশল। আমার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চাই, ভালো থাকতে চাই।"

বেঞ্চিতে লেগে থাকা সেই একটুকরো ভালোবাসা আজ কুশল আর অপর্ণার গায়ে লেগেছে। যে অপূর্ণ ভালবাসাটা একদিন অপর্ণা এখানে ফেলে রেখে গিয়েছিল আজ সেই ভালোবাসাকে পূর্ণ করে ফেরত দিয়েছে এই বেঞ্চি। একটুকরো অতীত গড়েছে ভবিষ্যৎ।
( সমাপ্ত )


Next Story

List of all Bengali Stories


## Disclaimer: RiyaButu.com is not responsible for any wrong facts presented in the Stories / Poems / Essay / Articles / Audios by the Writers. The opinion, facts, issues etc are fully personal to the respective Writers. RiyaButu.com is not responsibe for that. We are strongly against copyright violation. Also we do not support any kind of superstition / child marriage / violence / animal torture or any kind of addiction like smoking, alcohol etc. ##


◕ RiyaButu.com, এই Website টি সম্পর্কে আপনার কোনও মতামত কিংবা পরামর্শ, কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। যোগাযোগ:
E-mail: riyabutu.com@gmail.com / riyabutu5@gmail.com
Phone No: +91 8974870845
Whatsapp No: +91 6009890717