Home   |   About   |   Terms   |   Library   |   Contact    
A platform for writers

চক্রবৎ পরিবর্তন্তে

Online bangla Story

-------- বিজ্ঞপ্তি ----------
■ 'নগেন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার - মে, ২০২৪' স্বরচিত গল্প লেখার প্রতিযোগিতা, ( প্রতি বছর মে মাসে ) Result
--------------------------



List of all Bengali Stories

চক্রবৎ পরিবর্তন্তে

লেখিকা: ডঃ ভার্গবী চট্টোপাধ্যায় ভট্টাচার্য্য, বালিগঞ্জ পার্ক, কলকাতা

( 'নগেন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার, মে - ২০২৪' স্বরচিত গল্প প্রতিযোগিতার একটি নির্বাচিত গল্প )

##

"ছেলের বিয়ে দেবে কবে?" এই কথা সব সময় শুনতে হয় সীমাকে। ক্লাবে, বিয়ে বাড়িতে, পৈতেতে, অন্নপ্রাশনে এমনকি শ্রাদ্ধ-বাড়িতেও। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে দেখা হলে তো কথাই নেই। আর আছে টেলিফোন। জজ-গিন্নি, ব্যারিস্টার-গিন্নি, ডাক্তার-গিন্নি, আইএএস-গিন্নি। সবার এক প্রশ্ন।

"আমারও তো সেটাই ইচ্ছে," বলেন সীমা। "ছেলে আজ 'হ্যাঁ' বললে আমি কাল বিয়ে দিয়ে দেব।"

তবে ছেলে চট করে বলতে চায় না কিছু। সীমা জিজ্ঞেস করেছিলেন, "কেমন মেয়ে বিয়ে করবি খোকন?"
খোকন বলল, "রাজকন্যা চাই। হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া।"
"লিন্ডাকে?" অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন সীমা।
"আরে না... ধ্যাৎ..." বলল খোকন।

লিন্ডার সঙ্গে আলাপ হয় বোর্ণে। কেমব্রিজের কাছে ছোট্ট গ্রাম, সেখানে তাদের ছবির মত সুন্দর বাড়ি। লিন্ডার বাবা 'স্টিফেন' পলাশের খুব বন্ধু। সপরিবারে ওদের ওখানে বেড়াতে গেছিলেন পলাশ। হাতিশালে হাতি নেই বটে, কিন্তু ঘোড়াশালে ঘোড়া ছিল। আর ছিল নিজস্ব সুইমিং পুল। লিন্ডার ঘোড়ার নাকে ক্রিম লাগিয়েছিল খোকন, না হলে নাকি তাদের সানট্যান হয়।

"উঁহু, ঠিক করে বল কেমন মেয়ে তোর পছন্দ?"
"ঠিক তোমার মত..."
"তা কি করে হয়? আমার মত একটাই তৈরি করেছিলেন ভগবান। তাকে তোর বাবা বিয়ে করে ফেলেছেন।"
খোকনকে কিছু জিজ্ঞেস করলে সে এত আগডুম বাগডুম বলে ! অগত্যা সীমা পলাশের দ্বারস্থ হল। পলাশ বরাবরই রাশভারী, এখন বয়সের সঙ্গে আর অফিসে প্রতিপত্তির সঙ্গে সেটা আরো বেড়েছে। ছেলেকে তাও পাকড়াও করা যায়, বাপের সঙ্গে কথা বলতে গেলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয় আরকি। সব সময় পলাশ ছোটাছুটি করে দেশে বিদেশে। বাড়িতে যেটুকু সময় থাকে, অফিসের কাজে ডুবে থাকে। খোকন যখন ছোট ছিল, তখন সীমা আর খোকনও বিদেশ সফরে সঙ্গী হয়েছে কয়েকবার। তা বলে সংসারের প্রতি দৃষ্টি নেই এমন বলা যায় না। গাড়ি আর ড্রাইভার মোতায়েন আছে চব্বিশ ঘণ্টা; ছেলের স্কুল-কলেজ, সীমার শপিং, বেড়ানো, আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়া। নিজে সময় দিতে পারেন না বলে শাড়ি গয়নায় সীমাকে মুড়ে রেখেছেন পলাশ। আর ছেলের ব্যাপারে তো কথাই নেই।
"বাবা তোমাদের অফিসে কম্পিউটার আছে, আমাদের বাড়িতে কেন নেই?" খোকন একথা বলার পর দুটো দিনও পেরোয় নি, ঘরে বসেছে কম্পিউটার। সেটা অবশ্য ইন্টারনেটের আগের যুগ। চিঠি লেখা স্লাইড বানানো আর গেম খেলা; এসব চলত তাতে। সব অফিসেই কম্পিউটার ছিল না, বাড়িতে থাকার তো প্রশ্নই নেই। কিন্তু খোকন চেয়েছে, পলাশ কম্পিউটার কিনে দেবেনই।

সব শুনে পলাশ সীমাকে বললেন, "তুমি সবাইকে না বলে দাও।"
"সেকি!" সীমা তো অবাক।
"খোকন প্রেম করছে।"
'হাঁ হাঁ...' করে উঠল সীমা। "হতেই পারে না!!"
বাদ-প্রতিবাদ করা পলাশের ধাতে নেই। তাই তিনি উত্তর দিলেন না।
"তুমি কি করে বুঝলে?"
তোমার প্রথম কথা আর দ্বিতীয় প্রশ্নের মধ্যে সামঞ্জস্য নেই, বললেন পলাশ।
আর উত্তর পাওয়া যাবে না সেটা বিলক্ষণ জানেন সীমা। কাজেই গজগজ করতে করতে তিনি চলে গেলেন, "এই লোককে বিয়ে করে কী বিড়ম্বনায় না পড়েছি। কখন কি ভাবে আর কখন কি করে; এই পঁচিশ বছরেও বুঝতে পারলাম না।"

#
পলাশের অনুমান সত্যি। কিছুদিন বাদে মহুয়াকে নিয়ে বাড়িতে এলো খোকন। সেদিন সীমা আর মহুয়া দুই বাঘিনী পরস্পর পরস্পরকে জরিপ করে নিল। দুজনেরই মুখে মেকি হাসি। দুজনেরই চোখের ভাষা কুটিল। সেদিন রাতে পলাশকে অবশ্য অনেকগুলো কথা বাড়তি খরচ করে সান্ত্বনা দিতে হয়েছিল সীমাকে।

"শেষে এই?"
"হুঁ..."
"তুমি তো বাবা। তুমি কি কিছুই বলবে না?"
"কি বলব? বললে কি খোকন শুনবে? তাই বলে কোনো লাভ নেই।"
"কোথায় আমি ভাবছি জজ-গিন্নি, ব্যারিস্টার-গিন্নি, তাদের ঘর থেকে মেয়ে এনে খোকনের সঙ্গে বিয়ে দেব। আমায় খুব করে ধরেছিল গো, বুঝেছ?"
"কি আর করবে বলো?"
"এ তো শাঁকচুন্নি।"
"না... অতটা খারাপ না। তোমাকে মানিয়ে নিতে হবে, আর তাকেও মানিয়ে নিতে হবে।"
"আমাকে তো গ্রাহ্য করবে না – দেখলে না দেমাকে কেমন মটমট করছে। এত দেমাক কিসের গা? ঐ তো চেহারা!"
"সাবধানে থেকো সীমা। শিক্ষিতা মেয়ে। এটাকে পরীক্ষা বলে মনে করো। তুমি যদি সামলাতে না পারো লোকে তোমায় দজ্জাল শাশুড়ি বলবে।"

রাগ করে সীমা তিন দিন কথা বলেননি খোকনের সঙ্গে। ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করেননি। খোকনের কি উৎকণ্ঠা! বারবার মার কাছে আসছে, মার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু পলাশ অবিচল। তার মুখে ওই এক কথা, "মানিয়ে নাও সীমা।"

সীমার রাগ হবে নাই বা কেন? রাজপুত্রের মত দেখতে খোকন। পলাশ তো জমি-জমা বাড়ি-ঘর কম করেননি। পৈত্রিক সম্পত্তিও কম নয়; না পলাশের, না সীমার। সেখানে এরকম গরিব ঘরের সাধারণ দেখতে মেয়ে — রাগে দুঃখে চোখে জল আসে সীমার।

সেই চোখের জল আজও শুকায়নি তার। শুধু চোখের জল মোছানোর লোকটা বিপদ বুঝে টুক করে পালিয়ে গেছে পর-পারে। খুব রাগ হয় সীমার। ছবিটার দিকে তাকালে অভিমান হয় খুব। সেদিন মনে মনে কথা বলছিলেন পলাশের সঙ্গে, "দেখছো তো আমার অবস্থা।"
"হুঁ..."
"তুমি তো 'হুঁ...' বলেই খালাস। তোমার কিছু করা উচিৎ ছিল। আজ এইভাবে একলা পড়ে আছি।"
"তুমি তো বৃদ্ধাশ্রমে নেই। নিজের ফ্ল্যাটে আছো। ছেলে রোজ আসে দিনে অন্তত একবার। দুটো ফ্ল্যাট তো ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে।"
"বাচ্চাগুলোকেও দেখতে দেয় না। বউ আমায় দু'চোখে দেখতে পারে না।"
"তোমারও দোষ আছে। তুমিও মানাতে পারোনি।"
রাগ এসে গেল সীমার, "বুঝতে পারি না, একটা লোক কি করে অফিসে এত তুখোড় আর বাড়িতে এত আনাড়ী হয়!!"
"অফিসে আমি যে পদে ছিলাম, তাতে আমার প্রধান অস্ত্র ছিল দূরদৃষ্টি।"
"আর ঘরে? "
"তোমায় দোষারোপ করছি না। কিন্তু তুমি কিছুতেই মহুয়ার চোখ দিয়ে সমস্যাটা দেখতে পারছ না। আমিও সমান দোষী। ছেলে যখন যা চেয়েছে তাই দিয়েছি। তখন ভাবা উচিত ছিল। যখন সে মদ খেতো, তুমি বলতে, 'আজকাল একটু-আধটু সবাই খায়। মদ খাওয়াটা স্ট্যাটাসের লক্ষণ।' যখন তার বান্ধবীর সংখ্যা বাড়তে লাগলো, তুমি বলতে, 'মেনি মুখো পুরুষ ভালো নয়, পুরুষ মানুষ বার মুখো হতেই পারে।'"
"তা বলে এই?"
'হু হু' করে কাঁদছিলেন সীমা। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো খোকন, "বাবার কথা মনে পড়ছে মা? তাই বাবার ছবি দেখে কাঁদছো?"
কে জানে? বাবার কথা ভেবে, নাকি নিজের কথা ভেবে, কেন কাঁদছেন সীমা?

#
তিন ভাই, তিন বউ, তিন মেয়ে। মহুয়া সবচেয়ে বড়, তারপর মমতা, আর সবচেয়ে ছোট মধুরা। বাড়িতে সব সময় চাঁদের হাট। মেয়েরা হাসছে, খেলছে, ঝগড়া করছে। বাবা কাকারা কখনো গরম গরম পলিটিক্স-এর আলোচনা করছেন, কখনো উদাত্ত কণ্ঠে আবৃত্তি করছেন, কখনো বা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছেন। বউরা রান্না-বান্না, পরনিন্দা, পরচর্চা, সাজগোজ, কেনাকাটা সব নিয়ে ব্যস্ত। গম গম করছে তিন তলা বাড়ি।
"এই মৌ! মহুয়া!"
"ডাকছিলে ছোট কাকি?" বলে এক ছুটে ঘরে ঢুকলো মহুয়া। মেয়ে তো হাঁটে না, ছোটে। সিঁড়িতে দুটো ধাপ লাফিয়ে লাফিয়ে ওঠে। পারলে উড়ে যায়। বড়রা কতবার বলেছেন, আস্তে আস্তে চলাফেরা করতে। নইলে নিন্দে হবে শ্বশুরবাড়িতে। কিন্তু কে শোনে কার কথা?
"দেখ তো মা ছাদে বড়িগুলো শুকাতে দিয়েছি, আকাশ কালো করে আসছে..."
বাকিটা শোনার তর সইলো না মহুয়ার। দুড়দাড় ছাদে গিয়ে বড়িগুলো তুলে আনলো। আবার খানিক বাদে কাকির গলা জড়িয়ে ধরে বলল, "তোমার হাতে নিমকি খাইনি কতদিন..."
বড় বউয়ের হাতের আচার, মেজ বউয়ের নাড়ু আর ছোট বউয়ের নিমকির অপূর্ব স্বাদ। কাঁচকলার কোপ্তায় একটু জোয়ান দিলে ভারি ভালো খেতে হয় সেটা। হিংয়ের কচুরিতে ঠিক কতটা পরিমাণ হিং দিলে স্বাদটা ঠিকঠাক খোলে, এই নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয় বউদের মধ্যে। বউরা তিনজনেই রান্নায় সিদ্ধহস্ত। তবে ছোটজনের কাছেই সবচেয়ে বেশি বায়না করে মেয়েরা আর ফরমাইশ করে তাদের বাবারা। ভাইদের মধ্যে মেজ ভাই সবচেয়ে জমাটি। বড়ভাই মুখে বই গুঁজে থাকেন বেশির ভাগ সময়। ছোট দুই ভাই জোর-জার করে তাঁকে দলে টানেন। ছোট ভাই পাড়াতে হিরো। বাড়ি থেকে বেশি ক্লাব ঘরে ক্যারাম খেলতে দেখা যায় তাঁকে। দুর্গাপূজো কালীপুজো সব কিছুরই প্রধান হোতা সে। তখন মেজদা হাত লাগায় ছোট ভাইয়ের সঙ্গে। মেয়েরা আর মায়েরা একসঙ্গে মেতে ওঠে পুজোর আনন্দে। কিন্তু বেড়াতে যেতে হলে, সে কু ঝিকঝিক ট্রেনে করেই হোক, আর গাড়িতে সার্কাস চিড়িয়াখানা সিনেমা দেখাই হোক, তখন মেজভাই অগ্রণী ভূমিকা নেয়।
আর মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে হাসিখুশি মহুয়া। সে দিদি; সব সময় দিদিগিরি ফলাতে খুব ভালোবাসে। বোনেদের সে যেমন শাসন করে, তেমনই তাদের ভালোবাসে। ছোটদের পান্ডা সে। যেদিন যেমন খেয়াল চাপে, সেদিন সেটা করা চাই। বাবা কাকাদের সঙ্গে হাত লাগিয়ে তুবড়ি বানানো, মা কাকিমাদের সঙ্গে হাতে-হাতে মালপোয়া বানানো, সবেতেই আছে মহুয়া। সঙ্গে সঙ্গে তার বোনেরাও। নতুন বছরে বই মলাট দিতে হবে, পুজোতে নতুন জামা-জুতো কিনতে হবে, ক্রিসমাস পালন করতে হবে, সব তার দায়িত্ব।
"হামলোক কেক খাতা হায় আর সান্তাকো মানতা হায়," একবার সে বলেছিল স্কুলের এক হিন্দুস্তানি মেয়েকে। মহুয়ার অনুরোধে ছোট কাকা একবার ক্রিসমাস বুড়ো সেজেছিল। বড়দের রাজি করিয়ে একবার দস্তুর মত ধুমধাম করে পুতুলের বিয়ের ব্যবস্থা করেছিল মহুয়া। আর মেজো-কাকার কাছে বায়না করে ছোট্ট একটা কুকুর ছানা বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। এখন আর তারা তিনজন নয়, তিনে একে চার। ছোট্ট কুকুরটা এখন বাড়ির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সব ব্যাপারে 'ভউ-ভউ' করে সে তার বক্তব্য রাখে।
একটু যখন বড় হল মহুয়া, তখন কলকাতায় কলেজে পড়তে চলে গেল। সেখানেই আলাপ খোকন মানে সুদীপের সঙ্গে। না, মহুয়া সুন্দরী নয়। মধুরা পরমা সুন্দরী, ঠিক যেন মোমের পুতুল। ক্লাসের সহপাঠিনীদের মধ্যে অনেকেই মহুয়ার থেকে অনেক বেশি সুন্দরী। আর সুদীপকে দেখতে ঠিক রাজপুত্রের মত। তবে মহুয়ার মত প্রাণবন্ত প্রাণোচ্ছল মেয়ে দেখা যায় না। বাড়িতে যেমন, কলেজেও তেমনি। সে কখনো সরস্বতী পুজোর ব্যবস্থা করছে, কখনো নাটকের রিহার্সাল দিচ্ছে, কখনো কলেজে বর্ষবরণ, নবীন-বরণ, বিদায় সংবর্ধনা এসবের ব্যবস্থা করতে ব্যস্ত। হলে কি হবে, এখনো ছোটকা তার চুল এলোমেলো করে বলে, "পাগলি মেয়ে! দস্যি কোথাকার!"
সেই মেয়েকে যখন সুদীপ বিয়ে করতে চাইলো, তখন বাড়িতে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। এ তো আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া। বাড়ির বড়রা কেউই দেরি করতে চাইলেন না। মেয়ের বয়স বেড়ে যাচ্ছে বলে চাপাচাপি করতে শুরু করলেন। আসলে তাদের ভয় হচ্ছিল যে, এত ভালো পাত্র যদি হাতছাড়া হয়ে যায়। শুভক্ষণে বিয়ে হয়ে গেল মহুয়া আর সুদীপের। যদি রূপকথা হত, তাহলে লিখতে হতো — এবার তারা সুখে স্বচ্ছন্দে ঘরকন্না করতে লাগলো। সেখানেই হত যবনিকা পতন। কিন্তু জীবনটা রূপকথা নয়, রুঢ় বাস্তব। কিছুটা আঘাত প্রত্যাশিত ছিল। মা সাবধান করে দিয়েছিলেন, " মহুয়া, তোর শাশুড়ির গতিক সুবিধের বুঝলাম না। খেয়াল রাখিস। সাবধানে থাকিস।"
"তুমি কিছুটি ভেবো না মা, " বলল মহুয়া। "আমি সব ম্যানেজ করে নেব।"
তবে ম্যানেজ করা অত সহজ না। এরা স্কুলের বা কলেজের বন্ধু না, কিংবা এরা বাপের-বাড়ির সদস্যও না। এত জোরে হাসে মহুয়া যে সীমার মাথা ধরে যায়। পলাশকে দেখে মাথায় ঘোমটা দিতে মাঝে মাঝে ভুলে যায় সে। সুদীপকে নাম ধরে ডাকে। সকালে উঠতে দেরী হয়। মহুয়ার দোষের লিস্ট বিশাল। কিন্তু দ্বিতীয় আঘাতটা অপ্রত্যাশিত। এই বিয়ে মহুয়ার বাপের বাড়ির এত দিনের এত আনন্দের যৌথ পরিবারে ভাঙ্গন ধরিয়ে দিল। মেজোকাকি আর ছোটকাকি বলাবলি করতে লাগলেন, "মহুয়া তো লটারি টিকিট জিতে ফেলেছে।" এই কথাটার মধ্যে বড্ড বেশি শ্লেষ লুকিয়ে ছিল। লটারি বারবার জেতা যায় না। মধুরা আর মমতার কপালে নিছক সাদামাটা বর নাচছে, সুদীপের পাশে তারা বড়ই নিস্প্রভ হবে রূপে, গুণে, কুলে, শীলে। এই নির্মম সত্যটা কিছুতেই মানতে পারছিলেন না তাঁরা।
বাইরের সবই ঠিকঠাক চলতে লাগলো। সুদীপের আদর আপ্যায়নে ত্রুটি হলো না কখনো। মহুয়া বাপের বাড়ি এলে হাসি, গল্প, মজা, গান চলত আগের মতই। তবু কোথাও একটা তাল কেটে গেছে। মহুয়ার পরনের শাড়িগুলো দামি, গয়নাগুলো দামি, গাড়িটা খুবই দামী; পাড়ার লোকে হাঁ হয়ে যেত। বাড়ির লোকের গর্বে বুক ফুলে যেত — এত বড় ঘরে পড়েছে আমাদের মহুয়া। কিন্তু তার সঙ্গে কোথাও একটা মিশে থাকতো চাপা দীর্ঘশ্বাস। বুকে জ্বালা ধরিয়ে দিত।

#
সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। সাদামাটা বরদের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল মধুরা আর মমতার। মনে হয় সুখেই আছে তারা। সঠিক জানে না অবশ্য মহুয়া। ওদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেছে। সবাই ব্যস্ত নিজের নিজের সংসার নিয়ে। কিন্তু অন্য একটা কারণও থাকতে পারে। একবার সুদীপের সঙ্গে দেখা করেছিল মমতার বর। সুদীপ নাকি তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে। কি অপমান? বাইরে অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করেছে মমতার বর। কিন্তু সুদীপ তাকে ডেকে নেয়নি ভিতরে। অপেক্ষা করে করে সে চলে গেছে। মহুয়া জানে মদে চুর হয়ে ছিল সুদীপ। তার পক্ষে লোকের সঙ্গে দেখা করা বা কথা বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সে কথা মানতে চায়নি মমতা বা তার বর। ওদের মতে অপমানটা ইচ্ছাকৃত। বড়লোক তো, তাই হেনস্থা করেছে গরীব কুটুমদের।
কাকে কি বলে বোঝাবে মহুয়া? বড়দের মধ্যে বেঁচে আছেন শুধু মা আর ছোটকাকি। মার বুদ্ধি ঠিকঠাক কাজ করে না। শুরু হয়েছে ডিমেনশিয়া। কাকির জ্ঞান টনটনে, কিন্তু পায়ের ব্যথায় কাবু। তাকে কি বুঝিয়েছে মধুরা আর মমতা কে জানে? আগেও যে মনোমালিন্য হত না তা নয়, কিন্তু ফের মিটমাট হয়ে যেত। এখন আর মিটমাট হবার নয়। মহুয়ার বাপের বাড়ি এখন ভূতের বাড়ি। যে বাড়ি একদিন হাসি গল্পে গানে গমগম করতো, তাতে থাকেন এখন শুধু দুই বুড়ি আর দুজনের দুটো আয়া। মহুয়া, মধুরা, মমতা এখন তিনটি ভিনগ্রহের প্ৰাণী। মধুরাকে এত মিষ্টি দেখতে ছিল, বাবার বাৎসরিকের সময় মহুয়া দেখল মধুরার চেহারাটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। জিজ্ঞেস করাতে ফিকে হাসি হাসলো সে। বলল, "তুই কি করে বুঝবি দিদি? তুই ভালো আছিস, ভাল থাক।" মমতা তো মুখ ঘুরিয়েই চলে গেল। মমতা উগ্র সাজগোজ করেছিল। মহুয়ার মনে পড়ল মেকআপ করা বারণ ছিল বাড়িতে। লিপস্টিক দূরে থাক, নেল-পালিশ পরলেও রাগ করতেন কাকা। শুধু নাচের প্রোগ্রামের সময় ছাড় ছিল। তখন পুরোদস্তুর মেকআপ করা হতো। কি ভালই না লাগত তখন। তবু এই শ্রাদ্ধ-বাড়িতে মমতার সাজ দৃষ্টিকটু। আগেকার দিন হলে দিদি হিসেবে মমতাকে বকুনি দিত মহুয়া। কিন্তু গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। মহুয়ার আর বলবার মন নেই, মমতার শোনবার মন তো নেই বটেই। মহুয়া কি সুখেই না আছেই; ভাগ্যিস জানে না মধুরা আর মমতা। তাঁদের ভুল ভাঙ্গানোর ইচ্ছাও নেই মহুয়ার। দিন বদলে গেছে। বোনেরা আর সুখ-দুঃখের সাথি নয়। মন খুলে গল্প করা আজ ইতিহাস। নিজের মনেই গুমরে মরে মহুয়া। হয়ত মধুরা আর মমতাও।

মহুয়ার দুই ছেলে, রাজু আর টিপু। দুজনেই পড়াশুনায় ভালো। রাজু এবার ক্লাস টুয়েলভ দেবে, আর টিপু উঠলো ক্লাস নাইনে। সেদিন স্কুল থেকে ম্লান মুখে বাড়ি ফিরল টিপু। বিকেলবেলা বাড়ি ফিরে গোগ্রাসে খায় দুই ছেলে। সেখানে টিপু বিকেলে কিছু খেলো না, রাতেও কিছু খেলো না। ঘর অন্ধকার করে চুপচাপ বসে রইল। প্রমাদ গুনল মহুয়া। যে ছেলে স্কুল থেকে ফিরে কলকলিয়ে কত কথা বলে — "জানো তো মা আজ স্কুলে এই হয়েছে। বুঝলে মা দিদিমণি আজকে ক্লাসে সবাইকে বলেছে...।" সেই ছেলে ঘরের দরজায় কাগজে লিখে সেঁটে রেখেছে "ডু নট ডিস্টার্ব"। মহুয়া অনেক সাধ্যসাধনা করে দরজা খোলালো, আরো বেশি সাধ্যসাধনা করে মুখ খোলালো। টিপুর কথা শুনে মহুয়ার তো চোখ চড়ক গাছ। টিপুর স্কুলের ছয় মাসের মাইনে বাকি। রাজুর দু মাসের মাইনে বাকি। স্কুলে অপমান করেছে টিপুকে। কয়েক মাস হল সংসার খরচের টাকা নিয়ে খিটিরমিটির হচ্ছে সুদীপ আর মহুয়ার। আগে মহুয়া সুদীপের পকেট থেকে মাঝে মাঝে দুশো পাঁচশো টাকা ঝাড়তো। কিন্তু আজকাল পকেটে সে-কটা টাকাও থাকে না। পকেটে থাকে শুধু আধপোড়া বিড়ি; দামি ব্র্যান্ডের সিগারেট প্যাকেটের বদলে।

সুদীপকে জিজ্ঞেস করে কোন সদুত্তর পাওয়া গেল না। সংসার খরচের বাঁচানো টাকা দিয়ে আপাতত ছেলেদের স্কুলের মাইনে মেটাল মহুয়া। কিন্তু এইভাবে চলে না। রাজুর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার শখ; সামনের বছর অনেকগুলো টাকার ধাক্কা। টিপুও বড় হচ্ছে। তাকে কলেজে পড়াতেও টাকা দরকার। মহুয়া নিরুপায়। সুদীপের ব্যাংকের হিসেব, ক্রেডিট কার্ড এগুলো সব খতিয়ে দেখল সে। বিস্ময়য়ের পর বিস্ময়। সত্যি সত্যি কি ভয়ংকর অবস্থা সেটা বুঝতে পেরে পাথর হয়ে গেল মহুয়া। ক্রেডিট কার্ড ম্যাক্স আউট করে গেছে। আরো যে কত ধার, তার ঠিক ঠিকানা নেই। শেষ-মেষ কাবুলিওয়ালার কাছ থেকেও ধার করেছে। ভদ্রাসনটুকু অবধি বন্ধক রেখেছে সুদীপ।

স্তব্ধ হয়ে বসে রইল মহুয়া। শ্বশুরমশাইয়ের বাড়ির দলিল, জমির দলিল, কোম্পানির শেয়ারের কাগজপত্র সব ছত্রাকার হয়ে আছে। কিছু আছে, কিছু নেই। যা আছে তাও কোথায় আছে কে জানে। ব্যাঙ্কের লকারে কাগজপত্র খুঁজতে গেল মহুয়া। সাজগোজের শখ তার বহুদিন মিটে গেছে। যে গয়না পরে সে বিয়েবাড়ি যেত, যে গয়না দেখে প্রথম জ্বালা ধরেছিল কাকিদের আর বোনদের; তা প্রায় এক দশক ধরে লকারবন্দি। লকারে গিয়ে আরেক প্রস্থ মানসিক আঘাত। বিয়ের গয়না কিছু নেই। এমনকি শাশুড়ির গয়নাগুলোও নেই। সব হয় বিক্রি হয়ে গেছে, নয়তো বন্ধক দেওয়া হয়েছে। আরও একটা তথ্য পেল মহুয়া। শ্রীমতী নামের কোনও এক মহিলা ব্যাঙ্কের টাকা নিঃশেষ করতে সাহায্য করেছে; তার নামে সুদীপের অনেক টাকা বেরিয়েছে। আবছা আবছা মনে পড়ছে মহুয়ার, রেসিং গাড়ি প্রসঙ্গে এই নাম শুনেছে সে। মোবাইল ঘেঁটে শ্রীমতী আর সুদীপের কিছু ঘনিষ্ঠ ছবিও পাওয়া গেল। আর প্রচুর ক্যাশ টাকা তোলা হয়েছে ব্যাঙ্ক থেকে; তারও কোনও হদিশ নেই। কি করবে এখন মহুয়া? তার পরামর্শ করার কোনো লোক নেই। বাবা, কাকারা সবাই পরলোকে। মধুরা, মমতা আর তাদের বরেরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে মহুয়ার। কাঁদলোও সে। একদিন দুদিন তিনদিন। সব হারানোর যন্ত্রণা বড় মারাত্মক। একাই লড়তে হবে তাকে। স্বামী থেকেও নেই। শুধু শুকনো মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে দুই ছেলে রাজু আর টিপু। এবার সে চোখ মুছে উঠে দাঁড়ালো। চোখের জল উবে গেছে, তার বদলে ঝরছে আগুন। এবার তার অগ্নিপরীক্ষা। কে বলল তার পাশে কেউ নেই? রাজু আছে, টিপু আছে, আর আছেন — এটা ভাবতে বুকে মোচড় দিয়ে উঠল; তার শাশুড়ি মা। কিন্তু কোন মুখে শাশুড়ির কাছে গিয়ে দাঁড়াবে সে?

গরজ বড় বালাই। ছেলেদের মুখ চেয়ে আজ কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হবে মহুয়াকে। শাশুড়ি মাকে কত অকথা, কুকথা শুনিয়েছে সে। অবশ্য উনিও শুনিয়েছেন। উনি যাতে শান্তিতে থাকতে পারেন তার জন্য অন্য ফ্ল্যাটে ব্যবস্থা করে দিয়েছিল মহুয়া। কিন্তু সত্যিই কি তাই?

দুই ছেলের হাত ধরে শাশুড়ির ফ্ল্যাটে ঢুকলো মহুয়া। বিজয়ার প্রণাম ছাড়া গত পাঁচ বছরে এই ফ্ল্যাটে পা রাখেনি সে। ছেলেরা অবশ্য এসেছে সুদীপের সঙ্গে। কোথায় একটা পড়েছিল মহুয়া, দেশগুলির মধ্যে সখ্য হয় না, শুধু পজিশন হয় স্ব স্ব দেশের স্বার্থ অনুযায়ী। আচ্ছা মানুষের মধ্যেও কি তাই হয়? নইলে সুখের দিনে যে শাশুড়িকে বাড়তি বোঝা মনে হয়েছিল, আজ বিপদের দিনে কেন তাকে অবলম্বন মনে করছে মহুয়া? নাকি যে ডুবছে, সে খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়?

#
আজ বহুদিন বাদে বাড়িতে চাঁদের হাট। বৌমা এসেছে, সঙ্গে নাতিরা। সীমাকে সব খুলে বলেছে মহুয়া। সীমার মুখে এসে গেছিল, "বেশ হয়েছে। যেমন কর্ম তেমনি ফল। ঠেলা সামলাও এবারে। তখন তো ছেঁড়া জুতোর মত আমায় ফেলে চলে গিয়েছিলে।" কিন্তু সে কথা বললেন না সীমা। রাজু আর টিপুর মলিন মুখ দেখে বড় কষ্ট হচ্ছিল। টিপুর মুখখানা একেবারে পলাশ বসানো। সীমা বসবার ঘরে টাঙানো পলাশের ছবির দিকে তাকালেন। চোখ দুটো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
( সমাপ্ত )


Next bangla story

List of all Bengali Stories


## Disclaimer: RiyaButu.com is not responsible for any wrong facts presented in the Stories / Poems / Essay / Articles / Audios by the Writers. The opinion, facts, issues etc are fully personal to the respective Writers. RiyaButu.com is not responsibe for that. We are strongly against copyright violation. Also we do not support any kind of superstition / child marriage / violence / animal torture or any kind of addiction like smoking, alcohol etc. ##


◕ RiyaButu.com, এই Website টি সম্পর্কে আপনার কোনও মতামত কিংবা পরামর্শ, কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। যোগাযোগ:
E-mail: riyabutu.com@gmail.com / riyabutu5@gmail.com
Phone No: +91 8974870845
Whatsapp No: +91 6009890717