Home   |   About   |   Terms   |   Library   |   Contact    
A platform for writers

তেজস্বিনী লোকমাতা রানী রাসমণির কিছু ঘটনা

Bangla Article

-------- বিজ্ঞপ্তি ----------
■ 'স্বরচিত ছোট গল্প প্রতিযোগিতা ( ৬০০ শব্দের )', নভেম্বর, 2022 Details

◕ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা - সেপ্টেম্বর ২০২২, Result
--------------------------

All Bangla Articles   

তেজস্বিনী লোকমাতা রানী রাসমণির কিছু ঘটনা
( 28 September 1793; রানী রাসমণির জন্মদিনে উনার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ )
rashmoni

লেখক - শিলাজিৎ কর ভৌমিক, ধলেশ্বর, আগরতলা


## কোনা গণ্ডগ্রামের মেয়েটি তাঁর বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে খেলাধুলা করছিল। খেলতে-খেলতে এক ডুমুরের গাছের তলায় সে শুয়ে পড়ে। কথিত আছে যে, ডুমুরের গাছের ফুল সাধারণত দেখা যায় না। কিন্তু যদি কেউ সেই গাছের ফুল দেখতে পায়, তাহলে সে নাকি খুব ভাগ্যশালী ও ঐশ্বর্যবান হয়। সেই মেয়েটি বিশ্রাম করতে-করতে হঠাৎ একটা ডুমুরের ফুল দেখতে পায়। আনন্দিত হয়ে মেয়েটি তাঁর বন্ধু-বান্ধবীদের ব্যাপারটা জানায়। কিন্তু কেউ তাঁকে বিশ্বাস করতে রাজি নয়। কেন না, ডুমুরের ফুল দেখাই যায় না। তখন সে তার বন্ধু-বান্ধবীদের পীড়াপীড়ি করল, তারা যেন নিজেরা এসে ব্যাপারটা স্বচক্ষে দেখে। সবাই এসে দেখল; কিছুই নেই। মেয়েটি কিন্তু ডুমুরের ফুল ঠিক দেখতে পাচ্ছিল। বাকিরা তাকে অবিশ্বাস করায় সে মনে খুব আঘাত পায়। মাকে গিয়ে সে এই ব্যাপারটা বলে। মা তাকে আশীর্বাদ করে বলেন, "তুমি একদিন রাজরানি হবে।"

মার আশীর্বাদ বৃথা যায়নি। মেয়েটি সত্যিই একদিন রাজরানি হয়েছিল। এবং তার বুদ্ধিদীপ্ততা, অসীম তেজস্বিতা ও সাহসের জন্যে সে আর পাঁচটা রাজরানির চাইতে আলাদা হয়েছিল। মেয়েটি আর অন্য কেউ নয়, সাধকপিঠ দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা 'রানী রাসমণি'।

রানী রাসমণি ছিলেন নির্ভীক, সৎ, দাপটে। তিনি ছিলেন প্রজাবৎসল, দানশীল ও ধার্মিক। অকালে নিজের স্বামী বাবু রাজচন্দ্র দাশ-কে হারিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর তিনি অত্যন্ত শক্ত হাতে নিজের জমিদারিকে দাপিয়ে সামলেছিলেন। এই নিবন্ধের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে নানা ঘটনা যা রানী রাসমণির অসীম শক্তির অকাট্য প্রমাণ।

#
রানী রাসমণির স্বামী বাবু রাজচন্দ্র দাশ যখন জীবিত ছিলেন তখন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর রাজচন্দ্রের কাছ থেকে দু'লক্ষ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু অনেকদিন ধরে তিনি সেটা ফেরত দিচ্ছিলেন না। এমনকি, রাজচন্দ্র দাশের মৃত্যুর পরেও তিনি সেটা ফেরত দিচ্ছিলেন না। হঠাৎ একদিন দ্বারকানাথ ঠাকুর রানী রাসমণির এস্টেটের ম্যানেজার হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখনই রানীমা সুযোগ পেয়ে যান সেই দু'লক্ষ টাকা ফেরত নেওয়ার জন্যে। মধ্যস্থকারী ছিলেন রানীমার ছোট ও বিশ্বস্ত জামাই মথুরামোহন বিশ্বাস। দ্বারকানাথ ঠাকুর রানীমাকে বলেন, "আপনার এস্টেটের দেখভাল করার জন্যে একজন বিশ্বস্ত লোক দরকার।" রানীমা তখন বলেন, "কিন্তু সেরকম বিশ্বস্ত লোক পাওয়া দুষ্কর।" দ্বারকানাথ ঠাকুর নিজে রানীমার এস্টেটের ম্যানেজার হওয়ার জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তখন রানীমা যবনিকার আড়ালে দাঁড়িয়ে তাঁকে বলেন, "সে তো খুব ভালো কথা। কিন্তু আমার স্বামীর কার কাছে কতটুকু পাওনা আছে, সেটা এখনও আমার জানা নেই। আর যে দু'লক্ষ টাকা আপনি নিয়েছিলেন, সেটা এক্ষুণি ফেরত দিলে আমার বিশেষ উপকার হয়।" দ্বারকানাথের কাছে একথা বজ্রসম ছিল। কিন্তু তাঁর হাতে তখন নগদ অর্থ না থাকায়, তিনি রানী রাসমণির নামে রংপুর ও দিনাজপুরে তাঁর 'স্বরূপপুর' পরগণাটি লিখে দেন। তখন সেই পরগণাটির বার্ষিক আয় ছিল ৩৬০০০ টাকা। এরপরও দ্বারকানাথ ঠাকুর ফের রানী রাসমণির এস্টেটের ম্যানেজার হওয়ার জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তখন রানীমা তাঁকে বলেন, "আপনার মতো লোককে আমার এস্টেটের ম্যানেজার বানানো আমার পক্ষে ধৃষ্টতা। আর আমার সামান্যটুকু বিষয়-সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্যে আমার তিন জামাতাই সক্ষম।"

#
'জগন্নাথপুর' বলতে রানীমার একটি তালুক ছিল। সেই তালুকের চারিদিকে নড়াইলের জমিদার রামরতন রায়ের জমিদারী ছিল। রামরতন রায় চাইছিলেন জগন্নাথপুর তাঁর জমিদারীতে চলে আসুক। এই কারণে তিনি সেই জায়গায় অপহরণ, লুটপাট ও খুনোখুনির মতো নানারকম কুকর্ম চালিয়েছিলেন। রানী রাসমণির কানে ব্যাপারটা পৌঁছেছিল। তিনি তখন 'মহাবীর' নামক এক বলশালী লাঠিয়ালকে নিযুক্ত করলেন। মহাবীর জগন্নাথপুরে পা রাখার পর রামরতন রায়ের লোকেরা পালিয়ে গেল। কিন্তু কিছুদিন পর রামরতন রায়ের-ই কিছু লোক পেছন থেকে মহাবীরকে আঘাত করল। সেই আঘাত সইতে না পেরে মহাবীর মৃত্যুবরণ করলেন। এরপর রানীমা উত্তর ২৪ পরগণা, হুগলী সহ অন্যান্য জায়গা থেকে লাঠিয়াল, সড়কি ও অন্যান্য লোকজন জোগাড় করলেন রামরতন রায়ের লোকদের শিক্ষা দেওয়ার জন্যে। পরিস্থিতি বুঝে রামরতন রায়ের লোকেরাও তৈরি ছিল। কিন্তু যখন রানী রাসমণির লোকেরা হাতে অস্ত্র নিয়ে মুখে "জয় মায়ের জয়", "জয় রাণী রাসমণির জয়" তারস্বরে বলতে-বলতে এগিয়ে আসছিল, তখন রামরতন রায়ের লোকেরা ভয়ে পালিয়ে যায়। এরপর রামরতন রায়ের বিরুদ্ধে রানীমা মামলা দায়ের করেন। দু'বছর এই মামলা চলতে থাকে। শেষে জগন্নাথপুরের অধিকার রানীমার হাতে চলে আসে। উক্ত ঘটনা দিয়ে ফের প্রমাণিত হয় যে রানী রাসমণি ছিলেন এক অসাধারণ নারী।

#
ইংরেজরা এক সময় গরীব কৃষক ও চাষিদের আর্থিক অসহায়তার সুযোগ নিয়ে নীল-চাষ করাত। বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে, ইংরেজরা আর্থিকভাবে সম্বলহীন চাষিদের জমি কিনে তাদের দিয়ে নীল-চাষ করাত। আর এ ব্যাপারে অনিচ্ছুক চাষিদের উপর খুব অত্যাচার করত। রানী রাসমণির মকিমপুর পরগণাতেও 'ডানকেন' সাহেবের নেতৃত্বে নীল-চাষে অনিচ্ছুক চাষিদের উপর পৈশাচিক অত্যাচার করা হত। উৎপীড়িত চাষিরা নিরুপায় হয়ে রানীমার শরণাপন্ন হলেন। রানীমা সেখানে ৫০ জন লাঠিয়াল পাঠান। সেখানে তারা ডানকান সাহেবকে আচ্ছা করে উত্তম-মধ্যম দিয়ে অর্ধমৃত করে দিল। এরপরে ইংরেজরা রানীমার নামে মামলা করলে আদালত সেটিকে খারিজ করে দেয়। এরপর রানীমা মকিমপুর থেকে আরও যত ইংরেজ ছিল, তাদের সবগুলিকে ওখান থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এই ছিলেন রানী রাসমণি।

#
সিপাহীবিদ্রোহে জয়ী হওয়ার পর ইংরেজ সরকার নানান জায়গায় নিজেদের ঘাঁটি বসায়; সেখানে ইংরেজ সৈনিকরা থাকত। তাদের মাথার উপর থাকত এক অফিসার (Officer Commanding)। এই ঘাটি তৈরি করার উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে আগের মতন বিদ্রোহ যেন মাথাচাড়া না দেয়, তার দিকে কড়া নজর রাখা। রানীমার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের প্রাসাদের কাছেই এসব ইংরেজরা বিকেলে মদ্যপান করে উন্মত্ত হয়ে থাকত। রাস্তায় কোনও পথচারী এলে মাতাল অবস্থায় সেসব ইংরেজ সৈনিকরা তাদের মারধর করত। একদিন ব্যাপারটা রানী রাসমণির দারোয়ানদের চোখে পড়ে। তারা বাধা দিয়ে উন্মত্ত ইংরেজদের লাঠিপেটা করে। ব্যাপারটা ইংরেজদের ঘাটিতে অন্যান্য সৈনিকদের কানে পৌঁছয়। তারা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যে রানীমার প্রাসাদে পৌঁছতে গিলে দারোয়ানদের বাধার সম্মুখীন হয়। সেসময় তারা কয়েকজন দারোয়ানকে খুন করে প্রাসাদে প্রবেশ করে। ঠিক ওই মুহূর্তে রানীমার জামাতারা কেহ বাড়িতে ছিলেন না। তাঁরা নিজদের কাজে বাইরে ছিলেন। রানীমা সব টের পেয়ে বাড়ির মেয়েদের ও নাতি-নাতনিদের পেছনের দরজা দিয়ে একটা সুরক্ষিত জায়গায় পাঠিয়ে দেন। ইংরেজরা সেই মুহূর্তে রানীমার প্রাসাদে তুমুল ভাঙচুর শুরু করে। সেখানে তারা রানীমার কিছু পোষ্য পাখি কেটেকুটে মেরে ফেলে। রানীমা সেই সময় তাঁর গৃহদেবতা রঘুনাথজীর মন্দিরের সামনে তরোয়াল হাতে একা রণচণ্ডী মূর্তিসম রূপ ধারণ করে মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, ইংরেজরা তাঁর প্রাসাদে যা খুশি তা করুক, কিন্তু তাঁর গৃহদেবতার দিকে যেন হাতও বাড়াতে না পারে। এমন সময় আততায়ী ইংরেজদের কেহ-কেহ ওইখানে এসে উপস্থিত হয় এবং রানীমাকে আক্রমণ করে। কিন্তু তারা শক্তিময়ী রাণী রাসমণির তলোয়ারের প্রত্যাঘাত সহ্য করতে না পেরে ওখান থেকে সরে যায়। ঠিক ঐ সময় রানীমার ছোট জামাই মথুরামোহন বিশ্বাস বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত হয়। বাড়ির বাকি দারোয়ানরা তাঁকে প্রাসাদের ভেতরে গোটা ঘটনা অবগত করান। মথুরবাবু তৎক্ষণাৎ স্থানীয় কলিঙ্গবাজারে গিয়ে পুলিশকে খবর দেন এবং সেই সঙ্গে তিনি পুলিশ নিয়ে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে ইংরেজদের ঘাঁটিতে যান। সেখান থেকে তিনি কলিঙ্গবাজার থানার অফিসার ও ঘাঁটির অধিনায়ক বা Officer Commanding-কে নিয়ে নিজ প্রাসাদে চলে আসেন। সেখানে অধিনায়ক তূর্যধ্বনি দেন। সেই ধ্বনি শুনে প্রাসাদে তাণ্ডবে উন্মত্ত ইংরেজরা তাদের অধিনায়কের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এরপর অধিনায়ক সেসব ইংরেজদের ভর্ৎসনা করেন এবং মথুরবাবুকে সান্ত্বনা দিয়ে তাঁর সব সৈনিকদের নিয়ে সেখান থেকে চলে যান। এরপর দু'বছর ধরে রানীমা ১২জন ইংরেজ দেহরক্ষীদের তাঁর প্রাসাদ রক্ষা করার জন্যে বলবৎ করেন, যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে। পাশাপাশি তিনি ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে প্রাসাদের ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ আদায় করেন। রানীমা চাইলে তাণ্ডবলীলা চলাকালীন প্রাসাদ থেকে সরে যেতে পারতেন। কিন্তু সেটা না করে তিনি তাঁর গৃহদেবতার মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক ভৈরবী মূর্তি ধারণ করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, রানী রাসমণি এক অসামান্য সাহসী ও নির্ভীক নারী ছিলেন যিনি মৃত্যুকেও ভয় না করে তার চোখে চোখ রাখতে পারতেন।

#
রানীমার জীবনের এমন অসংখ্য ঘটনা উনাকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। এই তেজস্বিনী নারীর সম্মানে সেই সময় একটা গান মানুষের মুখে-মুখে ঘুরত। সেই গানটি হল –
"ধন্য রাণী রাসমণি রমণীর মণি।
বাংলায় ভালো যশ রাখিলে আপনি।।
দীনের দুঃখ দেখে কাঁদিলে আপনি।
দিয়ে ঘরের টাকা পরের জন্যে বাঁচালে প্রাণী।।
যে যশ রাখিলে তুমি হইয়ে রমণী।
ঘরে ঘরে তোমার নাম গাইল দিবস রজনী।"

তথ্যসূত্র: রানী রাসমণির জীবনবৃত্তান্ত – নির্মলকুমার রায়


All Bangla Articles   


## Disclaimer: RiyaButu.com is not responsible for any wrong facts presented in the Stories / Poems / Essay / Articles / Audios by the Writers. The opinion, facts, issues etc are fully personal to the respective Writers. RiyaButu.com is not responsibe for that. We are strongly against copyright violation. Also we do not support any kind of superstition / child marriage / violence / animal torture or any kind of addiction like smoking, alcohol etc. ##


◕ RiyaButu.com, এই Website টি সম্পর্কে আপনার কোনও মতামত কিংবা পরামর্শ, কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। যোগাযোগ:
E-mail: riyabutu.com@gmail.com / riyabutu5@gmail.com
Phone No: +91 8974870845
Whatsapp No: +91 6009890717