Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
RiyaButu
A platform for writers

নয়নবুধী


ত্রিপুরার ইতিহাসের পটভূমিতে রচিত একটি উপন্যাস


All Bengali Stories    44    (45)    46    47    48    49    50    51    52   

লেখক - হরপ্রসাদ সরকার, ধলেশ্বর, আগরতলা

-------- বিজ্ঞপ্তি ----------
◕ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা - সেপ্টেম্বর ২০২২, Details..
--------------------------


নয়নবুধী
( এক পাঁজালীর প্রেমিকা )
পর্ব ২২
ত্রিপুরার ইতিহাসের পটভূমিতে রচিত একটি উপন্যাস
লেখক - হরপ্রসাদ সরকার, ধলেশ্বর, আগরতলা
( এই উপন্যাসের সকল স্বত্ব সরকারি রেজিস্ট্রিকৃত ভাবে লেখক দ্বারা সংরক্ষিত )


নয়নবুধী: সমস্ত পর্বগুলি: All Parts



◕ নয়নবুধী
পর্ব ২২
ঐ বাঁশ ঝাড় থেকে ইন্দ্র কয়েকটি মুলি-বাঁশের ছোট-ছোট চোঙা সংগ্রহ করে একটি লতা দিয়ে শক্ত করে তাদের একসাথে বেঁধে নিল; জল রাখার আধার। তারপর একটি আধ-কাচা মোটা বাঁশ বেছে নিয়ে তার একটি গাঁটের ঠিক উপরে তরোয়াল দিয়ে ছোট ফুটো করে দিল। ফুটো হতেই সেই বাঁশটি থেকে গলগল করে একেবারে পরিষ্কার, ফকফকে পানীয় জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। সকাল-সকাল সেই জল পান করে তৃষ্ণা মিটিয়ে বাকী জল মুলি-বাঁশের চোঙাগুলিতে ভরে নিল ইন্দ্র। তৃষ্ণার সময় কাজে লাগবে। ইন্দ্র জানে ফল, ফসারি, কন্দ, মুল ইত্যাদি কোনও কিছুরই অভাব নেই এই বনে, কিন্তু এই পাহাড়ি পথে জলের অনেক অভাব। নিজেকে একটু ঘুচিয়ে ইন্দ্র এবার পথ ধরে এগোতে লাগল।

পথে চলতে-চলতে মানুষ পথিক হয়ে যায়, আর কঠিন পথে চলতে-চলতে বীর হয়ে যায়। কঠিন পরিবেশ আর পরিস্থিতি শুধুই বীরের জন্য, সে বীরের পরীক্ষক, বীর খুঁজে বের করাই তার কাজ। সেই নির্জন, নিস্তব্ধ, বিপদ সংকুল পাহাড়ি সুগভীর বনে একা পথ চলতে-চলতে ইন্দ্রের ভাব-অনুভূতিগুলি বীরত্বের সকল দরজা একে-একে খুলে দিতে লাগল। নতুন দরজা এক নতুন দিগন্ত খোলে। নিজের অজান্তেই নিজের কাছে নিজের নতুন পরিচয় পেতে লাগল ইন্দ্র।

আজ ইন্দ্র আর একা নয়, সাথে চলছে তার মনের অদৃশ্য সেনা। সাথে কোমরের বাঁ পাশে ঝুলছে তরোয়াল, ডান হাতে কাঁচা বাঁশের শক্ত লাঠি, কোমরের দু'পাশে শক্ত বড়-বড় হলুদ সুপারির ছড়া, কলা পাতার ছোট পুটলিটিতে আঁটো করে বাঁধা চিতা বাঘের শুকনো মল, আর জল-চোঙা। ইন্দ্র কয়েক পা এগিয়ে বিনা কারণে বিকট এক চীৎকার দিয়ে তার হাতের লাঠিটি শা-শা করে বিদ্যুৎ বেগে হাওয়ার মাঝে চালিয়ে দিল। তার গগন-ভেদী চিৎকার-ধ্বনি খণ্ড-খণ্ড প্রতিধ্বনি হয়ে উড়তে লাগল বনে-বনে। নির্জন, নিস্তব্ধ বনের এই অংশটুকু আকস্মিক এই শব্দ-ক্ষেপে একটা ঝটকা খেয়ে কেঁপে উঠল, আর আরও নীরব হয়ে গেল। লাঠির আগাতে 'শোম-শোম' শব্দ করে কয়েক টুকরা বাতাস যেন মাটিতে ভেঙ্গে পড়ল। আচমকা অনেকগুলি পাখি ভয়ে খুব কোলাহল করে দ্রুত ডানা ঝাপটে উড়ে গেল আকাশে, বানরের দল পড়ি-কি মরি হয়ে পালাতে লাগল এ ডাল থেকে ও-ডালে। ক্ষণিকের মধ্যেই আলো বাতাস ছেড়ে বাকী সব কিছু চারিদিকে ফাঁকা হয়ে গেল।

পর্বত-সম এই গর্জন আর তার প্রতিধ্বনি এক নেশার মত কাজ করল ইন্দ্রের স্নায়ু-মণ্ডলীতে। যুদ্ধের আগে শব্দ-ব্রহ্ম দিয়েও যুদ্ধের পরিণাম অতি সহজেই পাল্টানো যায়, এ এক অতি প্রাচীন নীতি। এই শব্দ-ব্রহ্মে আত্মবিশ্বাস আর শারীরিক বল যেমন পাওয়া যায়, তেমনি তা বুকের রক্তকেও ঠাণ্ডা হতে দেয় না, গরম রাখে বরাবর। যোদ্ধার সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, স্নায়ু, মন, চেতনকে রণক্ষেত্রে সর্বদা তাজা-তরুণ আর সজাগ রাখে এই গর্জন। অজানা, অচেনা ছিচকে বিপদ দূরে রাখাতে এ এক মহা-ঔষধ। ক্ষুদ্রের জন্য এটা বিশাল। এই গভীর বনে নিজের শব্দ-ব্রহ্মে নিজেই তাজা ইন্দ্র। এ যেন নিজেই নিজেকে সাহায্য করা।

অতি সতর্কতার সাথে পথ চলতে লাগল ইন্দ্র। পথটিকে যতটা জঙ্গলপূর্ণ ভেবেছিল, পথটি তত জঙ্গলপূর্ণ নয়। পাহাড়ি লাল-মাটির আঁকা-বাঁকা রাস্তা, ছোট-বড় পাথরে পরিপূর্ণ। পথের মাঝে ঘাস কিংবা গাছ-গাছালি নেই বললেই চলে। কিন্তু পথের দু'পাশের বন অতি ঘন, গভীর। ইন্দ্র বুঝতে পারল, বন্য জন্তুর আক্রমণ হলে দু'পাশের বনের মধ্য থেকেই হবে। সামনে কিংবা পিছন থেকে আক্রমণের সম্ভাবনা খুব কম। কারণ আগে-পিছে সব কিছুই বহুদূর পর্যন্ত পরিষ্কার সুন্দর দেখা যাচ্ছ। ইন্দ্র উভয় পাশের বনের দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে ধীর পায়ে এগোতে লাগল। বনের ভয়াবহ নিস্তব্ধতা এবং নিজ মনের একাকীত্বের ভয়কে দূর করতে একটু পরে-পরেই সে তার শব্দ-ব্রহ্মকে চালিয়ে দিতে লাগল। এতে কিছু ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলেও, অনেক নিশ্চিত-ক্ষতির হাত থেকে সহজেই রেহাই পাওয়ার সুবিধাও আছে। এই শব্দ-ব্রহ্মের কল্যাণে পথের উভয় পাশে কত শত শিয়ালকে গাছের ফাঁকে-ফাঁকে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে দেখেছে, বনো শূয়রদের 'ঘোঁত-ঘোঁত' করতে-করতে পাগলের মত পালাতে দেখেছে, খরগোসগুলি তো তিড়িং-তিড়িং করে কয়েক লাফে হাওয়া, বনমোরগ, বন্য কুকুর আরও কত কি'র ছুটা-ছুটি দেখেছে সে। ঠিক এমন সময় হঠাৎ বুকের রক্ত হিম করে, একটি বাঘের গর্জন খুব কাছে থেকে ভেসে এল। ইন্দ্রের হাত-পা ঠাণ্ডা হবার অবস্থা। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সে তার লাঠিটি দিয়ে অতি দ্রুত একবার মাটিতে একবার পাশের গাছে এলোপাথাড়ি বাড়ি মারতে লাগল আর বিকট ভাবে চীৎকার করতে লাগল। কয়েক বাড়িতেই লাঠিটির আগা ফেটে চৌ-চিড়, সেই ফাটা-বাঁশের আওয়াজ আরও বেশী হতে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যেই যেন একটি তুফান শুরু হয়ে গেল ওখানে। আসে-পাশের যত পশু-পাখি ছিল সব হৈ-হল্লা করে আরেক তুফানের মত পালিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর ইন্দ্র পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করল। কিন্তু কোনোদিকে থেকে আর কোনও হুঁ-হা শুনে নি।

এমন ভাবেই ধীরে-ধীরে অতি সাবধানে পথ চলতে লাগল ইন্দ্র। সাবধান, সতর্ক, সচেতন; তবেই জীবন। সে বুঝতে পারছে জঙ্গলের পথ চলা এত সহজ নয়; অদৃশ্য চাপ মহাভারের মত সদা চেপে বসে আছে বুকে। এই অদৃশ্য ভার বহন করাই বেশী কষ্টের। নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে প্রায় আধ ক্রোশেরও কম পথ চলতে বেলা দুপুর হয়ে গেল। শরীর ক্ষুধা-তৃষ্ণায় ক্লান্ত। ইন্দ্র একটু বিশ্রামের জন্য উপযুক্ত জায়গার সন্ধানে রইল।

ধুলোমাখা পথের পাশে এই জায়গাটি অন্য জায়গার তুলনায় বেশ পরিষ্কার, বেশ খোলামেলা, তবে পরিত্যক্ত। মনে হল, গত দশ বছরে কোনও মানুষ এই জায়গায় আসেনি। দেখে মনে হচ্ছে, কোনও এক সময় এই জায়গাটি একটি হাট ছিল। তার মানে, আশে-পাশে গ্রাম থেকে থাকতে পারে। কিন্তু গ্রাম থাকলে, এই হাট শ্মশান কেন? ইন্দ্র জানে, কত গ্রাম, কত জনপদ সময়ের সাথে চলতে না পেরে হঠাৎ উজাড় হয়ে যায়। কেমন ভাবে, তা তো ইন্দ্র নিজের চোখেই দেখেছে; এক রাতও সময় লাগে না।

এই ভুবনে জীবনের-পথ সদাই অচেনা, কিন্তু পিছনের পথটি খুব চেনা। সেই ভাঙ্গা হাটে একটি গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে পিছনে ফেলে আসা মাটির পথটির দিকে তাকাল ইন্দ্র। কত স্মৃতি, কত ঘটনা জড়িয়ে শুয়ে আছে এই পথ...

ইন্দ্র উদাস মনে কিছু ভাবছে ঠিক এমন সময় হঠাৎ তার মনে হল কিছু বাতাস বিদ্যুৎ বেগে শোঁ-শোঁ করে তার পাশ দিয়ে চলে গেল। সেই বাতাসের অল্প বাতাস তার গায়েও লাগল। ইন্দ্র চমকে উঠল। এটা কি? কোনও তীর, কেউ কি তীর ছুড়লো তার দিকে? নাকি তাকে নিশানা করে ডাকাত দল ছোড়া ছুড়লো? কোনও জন্তু-জানোয়ার কিংবা কোনও পাখি! নাকি মনের ভুল?

ইন্দ্র অতি বিস্ময়ে চারিপাশে দেখতে লাগল। আচমকা আবার, আরেক বার। চোখের পলকে পর-পর কয়েকবার এমনটা হল। কি এটা!! গা শিহরে উঠল ইন্দ্রের, শরীর ভার হয়ে এল। শক্ত হাতে তলোয়ারটা ধরে হুঙ্কার দিয়ে উঠে শাঁ-শাঁ করে সেটা হাওয়ার মাঝে চালিয়ে দিল সে, "কে? কে ওখানে? কে?"

কিন্তু সেই গভীর বনের কোথাও থেকে কোনও উত্তর এল না। ঠিক ঐ ক্ষণে ইন্দ্রের মনে পড়ে গেল তুলারাম পাড়ার এক বৃদ্ধ তান্ত্রিকের কথা। তিনি প্রায়ই বলতেন, "এমন অনেক গভীর বন আছে যেখানে অনেক সিদ্ধ তান্ত্রিক কিংবা উচ্চমানের তান্ত্রিক একান্তে লোকচক্ষুর অন্তরালে দিনের-পর দিন গভীর সাধনা করে চলেন। আমি নিজেও একসময় গভীর জঙ্গলে এমন এক ঘোর-তান্ত্রিকের শিষ্য হয়ে সাধনা করেছি। সেখানে আমি এমনও কিছু-কিছু তান্ত্রিক দেখেছি যাদের বয়স দু-তিনশ বছরেরও বেশী। কেউ বিশ্বাস করবে না, কিন্তু ওনারা নিজেদের তন্ত্রবলে সূক্ষ্ম দেহে বাতাসের মধ্য দিয়ে মনের বেগে বনের মাঝে চলাচল করেন। নিবিড় জঙ্গলে তাদের অবস্থান ভাগ্যবানেরাই টের পায়। ওনারা কারোর ক্ষতি করেন না, তবে উনাদের চলাচল টের পেলে প্রণাম করে নিজের পরিচয় দিয়ে পথ ছেড়ে দিতে হয়।"

এ কথা মনে হতেই ইন্দ্র পথের এক পাশে সরে গেল। তারপর অতি ভক্তিভরে হাতজোড় করে হাওয়ার মাঝে প্রণাম করল। বিনীত ভাবে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, "আমি দক্ষিণের তুলারাম পাড়ার ইন্দ্র। নয়নবুধীর সাথে দেখা করতে রাজধানী রাঙামাটিতে যাচ্ছি। যদি আমি আপনাদের চলার পথে এসে কোনও বাধা দিয়ে থাকি তবে আমাকে নিজ পুত্র জ্ঞানে ক্ষমা করে দেবেন।"

এ কথা বলার পর সত্যিই বিস্ময় ঘটল। ইন্দ্র লক্ষ্য করল, সামনের পথটি থেকে কিছু শুকনো পাতা ধুলাবালি সহ উড়ে গেল, অথচ চারিপাশে তেমন বাতাসই বইলো না। ইন্দ্র হাতজোড় করে তেমনি দাঁড়িয়ে রইল। মনে-মনে ভাবল, "তুলারাম পাড়ার সেই তান্ত্রিক সাধু তো তবে মিথ্যা বলে নাই।"

কিছুক্ষণ তেমনি সেখানে পথের পাশে দাঁড়িয়ে থেকে যখন তার মনে হল চারিদিক এবার শান্ত হয়ে এসেছে, তখন সে আবার পথ চলতে শুরু করল।
Next Part

গোয়েন্দা গল্প:
মাণিক্য   
সর্দার বাড়ির গুপ্তধন রহস্য   
প্রেমিকার অন্তর্ধান রহস্য   
লুকানো চিঠির রহস্য   
কান্না ভেজা ডাকবাংলোর রাত    


All Bengali Stories    44    (45)    46    47    48    49    50    51    52   


## Disclaimer: RiyaButu.com is not responsible for any wrong facts presented in the Stories / Poems / Essay / Articles / Audios by the Writers. The opinion, facts, issues etc are fully personal to the respective Writers. RiyaButu.com is not responsibe for that. We are strongly against copyright violation. Also we do not support any kind of superstition / child marriage / violence / animal torture or any kind of addiction like smoking, alcohol etc. ##


◕ RiyaButu.com, এই Website টি সম্পর্কে আপনার কোনও মতামত কিংবা পরামর্শ, কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। যোগাযোগ:
E-mail: riyabutu.com@gmail.com / riyabutu5@gmail.com
Phone No: +91 8974870845
Whatsapp No: +91 6009890717