Home   |   About   |   Terms   |   Library   |   Contact    
A platform for writers

বৃদ্ধাশ্রম

স্বরচিত ছোট গল্প প্রতিযোগিতা, নভেম্বর- ২০২২ একটি নির্বাচিত গল্প

-------- বিজ্ঞপ্তি ----------
■ 'স্বরচিত কবিতা প্রতিযোগিতা, ফেব্রুয়ারি - ২০২৩' Details
--------------------------



List of all Bengali Stories

বৃদ্ধাশ্রম
লেখক - চন্দন চ্যাটার্জি, পশ্চিমবঙ্গ
স্বরচিত ছোট গল্প প্রতিযোগিতা, নভেম্বর- ২০২২ একটি নির্বাচিত গল্প


## অর্ক ওরফে অর্ঘ্য দাশগুপ্ত চলেছেন কলিকাতা থেকে মহেশপুর। তিনি নিজেই গাড়ি চালাচ্ছেন, পাশে বিদেশিনী স্ত্রী সেলিনা, চোখে সোনালি রঙের রোদ-চশমা, মাথায় কালো চুলের মাঝখানে কিছু রূপালী রেখা।

মহেশপুর বীরভূমের এক প্রত্যন্ত গ্রাম, ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে, এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে আছে তিলপাড়া ব্যারেজ, বিশাল জলাধার। অর্ঘ্যর ছোটবেলা কেটেছে এই গ্রামে, মহেশপুর হাই স্কুল, সিউড়ি মহাবিদ্যালয় তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতা ইউনিভার্সিটি, তারপর সরবন ইউনিভার্সিটি (Souboune University ), ফ্রান্স। দীর্ঘ ২৫ বছর পদার্থবিদ্যায় অধ্যাপনা করে গত মাসে অবসর। এই অবসর সময়ে একবার তার মাটির কথা, নিজের জন্মভূমির কথা মনে পড়ল। তাই সুদূর লুক্সেমবার্গ থেকে মহেশপুর।

অর্ঘ্য, বাবা-মার একমাত্র সন্তান। তার বাবা সমীর দাশগুপ্ত ছিলেন মহেশপুরের জমিদারের নায়েব; জমি - জায়গা ছিল বেশ কিছু এবং একটা মস্ত বড় বাড়ী। মোটা-মোটা গোল- গোল থাম-ওয়ালা বড় বাড়ী। অনেক ঘর, সামনে একটা বড় উঠান। টাকা-পয়সার প্রাচুর্য থাকলেও ওর বাবা কিন্তু ছেলেকে কঠোর শাসনে মানুষ করেছেন। তিনি নিজে কখনও অন্যায় করেন নি এবং অন্যের অন্যায়কে কখনোই প্রশ্রয় দিতেন না। অর্ঘ্যর মা, চারুলতা দেবী মাঝেমধ্যে ছেলে-পক্ষ নিলেও তিনি তাকে থামিয়ে দিতেন। অবশ্য এই জন্যই আজ সে মানুষের মতো মানুষ হতে পেরেছে।

বিজ্ঞানে অর্ঘ্যর মাথা বরাবরই পরিষ্কার। যখন কলকাতার পড়া শেষ করল তখন সে ঠিক করল ডক্টরেট করার জন্য বিদেশে যাবে। কলকাতায় থাকাকালীন রামকৃষ্ণ মিশন, গোলপার্ক থেকে ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজ শিখেছিল কৌতূহলবশতঃ, কিন্তু সেটা তার জীবনের এত বড় পরিবর্তন আনবে তখন সে ভাবেনি। অর্ঘ্য যখন তার বাবাকে বিদেশ যাবার কথা বলল, সমীরবাবু প্রথমে না করেছিলেন কিন্তু মাতৃস্নেহের কাছে পরাভূত হয়ে শেষ পর্যন্ত জমি-জমা বিক্রি করে টাকা ছেলের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। জমিই ছিল উনার আয়ের মূল উৎস, কাজেই জমি বিক্রি করার পর তাদের আয়ের উৎস প্রায় একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। হাতে কিছু জমানো টাকা ছিল তা দিয়ে কোনরকমে দুটি প্রাণী জীবন ধারণ করতে লাগলেন। এখনকার মতো তখন মোবাইল, ই-মেইল এসব ছিল না। হাতের লেখা চিঠির উপর ভরসা করতে হতো। অর্ঘ্য বিদেশে গিয়ে প্রথমে ঘনঘন চিঠি দিত, সেইটাই এই দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার অমৃত সুধা। ক্রমে-ক্রমে চিঠি দেওয়ার পরিমাণ কমতে লাগল, একদিন তার মায়ের হাতের একটা চিঠিতে খবর পেল তার বাবা মারা গেছেন । তারপরে অর্ঘ্য আর কোনও চিঠি দেয় নি বা দেশ থেকেও কোন চিঠি আসেনি। বৃদ্ধ মা একা-একা কি করছে, কিভাবে আছে, কি খাচ্ছে, সে কথা জানার প্রয়োজন মনে করল না।

এত বড় বাড়ীতে চারুলতা দেবী একা প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থা। একদিন তিনি ঠিক করলেন ছেলের কাছে যাবেন। মাতৃস্নেহ অন্ধ হয় জানতাম, কিন্তু অবুঝ সেটা জানা ছিল না। তিনি লেখাপড়া খুব বেশি জানতেন না, কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা ছিল এবং সমীর বাবুর কাছে মাঝেমধ্যে রবীন্দ্রনাথের কবিতা শুনতেন। কাজেই কাউকে জিজ্ঞেস করে তিনি ছেলের কাছে চলে যাবেন। এই বিরাট বাড়িতে একা থাকতে থাকতে তিনি প্রায় হাঁপিয়ে উঠেছিলেন। তাই একদিন সঙ্গে যা ছিল কপর্দক তা আঁচলে বেঁধে সদর দরজায় তালা বন্ধ করে তিনি চললেন, প্রথমে মহেশপুর থেকে সিউড়ি বাসে, তারপর সিউড়ি থেকে কলকাতায়।

সকালবেলায় বেরিয়ে সিউড়ি পৌছাতে-পৌছাতে দুপুর গড়িয়ে গেল। একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, "কলকাতার বাস কোথায় থেকে পাব বাবা?" সেই লোকটা বৃদ্ধকে সরকারি বাস ডিপো দেখিয়ে দিল। চারুলতা দেবী সেখানে গিয়ে দেখলেন ডিপোতে কোন বাস নেই। একজনকে জিজ্ঞেস করতে সে জানালো কলকাতা ফেরত বাস আসলে তারপরে যাবে, অতএব তাকে অপেক্ষা করতে হবে। ইতিমধ্যে খিদে তেষ্টা পেয়েছে; সঙ্গে বাতাসা মুড়ি আছে। তিনি সেই বাস ডিপোর এক ধারে বসে মুড়ির পোঁটলাটি বার করলেন। সাথে নারকেল নাড়ু আছে, সেটা অবশ্য ছেলের জন্য। তিনি একমুঠো মুড়ি নিয়ে মুখে পড়তে যাবেন, অমনি সামনে দেখলেন দুটো ছেলে তার মুড়ির প্যাকেটের দিকে ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বাচ্চা দুটো দেখে চারুলতা দেবীর খুব মায়া হল। তাদের পরনে কোন জামা নেই, শুধু একটা আধ-ময়লা হাফপ্যান্ট, গায়ের রং কালো, পাঁজরা গোনা যাবে।

তিনি বললেন, "তোরা কারা, কোথায় থাকিস, কি চাই?"

তারা উত্তর দিলো তারা দুই বন্ধু, তাদের সঙ্গে আরও দুজন আছে; ওই কোনেতে থাকে। এই বলে তারা আঙ্গুল দিয়ে বাস ডিপোর একটা কোনা দেখিয়ে দিল। সেখানে দুটো বড় বস্তা আর একটা ভাঙ্গা টিনের পেটি আছে, এই ওদের সম্পত্তি। ডিপোর দুটো দেওয়াল আছে বটে কিন্তু মাথায় আকাশ খোলা। তাদের বাবা-মার কথা জিজ্ঞেস করতে তারা জানালো, জন্ম থেকেই তারা চারজন একসাথে থাকে, কে তাদের বাবা-মা তা জানে না।

চারুলতা দেবীর যখন সন্তান হয় তখন তিনি সিউড়ি হাসপাতালে এসেছিলেন। এক নার্সের কাছে একটা কথা শুনে ছিলেন 'এবরসন '(Abortion), যার বাংলা অর্থ হল গর্ভপাত, অসময়ের সন্তান। এরা কি তাহলে...

এক মুহূর্তের জন্য তার মাথা ঘুরে গেল, খুব রাগ হলো ঐ মায়েদের প্রতি। তার চোখ দুটো ভিজে গেল, তার মানে পৃথিবীতে এরকম অনেক আছে। এদের জন্য কিছু করা দরকার। তিনি কাপড়ের খুঁটে চোখ মুছলেন, তারপর সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। ছেলে দুটোকে জিজ্ঞেস করলেন, "আমার বাড়ি যাবি?"

ছেলে দুটো এ পর্যন্ত বাড়ি দেখে এসেছে, কিন্তু তার ভেতরে থাকার যে অনুভূতি, আনন্দ, সুখ তা তাদের জানা নেই। তারা রাজি হল, তারপর অন্য ছেলে দুটোকে ডাকল। চারুলতা দেবী এই চারজনকে সঙ্গে নিয়ে আবার মহেশপুরে চললেন। ছেলের কাছে যাওয়া মাথায় উঠল, একটা নতুন কাজ করতে যাচ্ছেন, মনে নতুন আনন্দের সঞ্চার...

তাদের ফিরতে-ফিরতে সন্ধ্যে হল। এই ছেলেগুলো রাতে বাড়িটা ভালো করে দেখতে পারেনি, সকাল হতেই এত বড় বাড়ি দেখে তারা তো হতবাক। আজ থেকে এই বাড়িতে তারা থাকবে!!

চারুলতা দেবী তাদের থাকার জন্য দুটি ঘরের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। নিজের কাছে সামান্য যা সোনা দানা ছিল, তাই দিয়ে তিনি ছেলেগুলোকে সামান্য শিক্ষিত করেছিলেন এবং মানুষ করেছিলেন। এই ছেলেগুলো চারুলতা দেবীকে বড়মা বলে ডাকত এবং খুব সেবা-যত্ন করত। ইতিমধ্যে চারুলতা দেবীর বয়স প্রায় ৭৫ পেরিয়ে গেছে, ওপারের ডাক এসে পরবে যেকোনো দিন। একদিন তিনি বড় ছেলেটাকে একটা খাম দিয়ে বললেন, " যদি ও কোনদিন আসে তবে এই খামটা দিবি। আর আমার মৃত্যুর পর এই বাড়িটাতে একটা অনাথ আশ্রম খুলবি। তোদের মত অনাথ, অভাগা ছেলে-মেয়েদের জন্য এই আমার সামান্য নৈবিদ্য।"

#
অর্ঘ্যর মহেশপুর পোঁছাতে বিকেল হল। জাতীয় সড়ক থেকে একটা মাটির রাস্তা ধরে ওর গাড়ি চলতে লাগলো। একটা বটতলায় এসে সে দেখল রাস্তা দু দিকে চলে গেছে। সে ভুলে গেছে কোনটা তার বাড়ির রাস্তা। বটতলায় একটা চায়ের দোকান ছিল; অর্ঘ্য গাড়ি থেকে নেমে সেই দোকানে এক কাপ চা খেলো, তারপর দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল সমীর দাশগুপ্তের বাড়ি কোথায়। দোকানদার একটু আশ্চর্য হয়ে মনে-মনে ভাবল— এত বছর পরে নায়েব-মশাইকে কে খোঁজ করছে? জিজ্ঞেস করল, "আপনি কে?"

— "আমি তার ছেলে।"

দোকানদার একটা বিরক্তিসূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কর্কশ কণ্ঠে বলল, "ঐ দিকে..." কারণ নায়েব মশাইয়ের শেষ পরিণতি পাড়ার সবাই জানে। তার ব্যবহারে অর্ঘ্য কিছুটা আশ্চর্যান্বিত হলো বটে কিন্তু বাড়িতে যাবার তাড়া, তাই গাড়িতে এসে বসল, গাড়ি আবার চলতে লাগলো। সেই রাস্তার শেষে একটা বিরাট বড় বাড়ি দেখতে পেল, তার ওপর লেখা আছে 'চারুলতা-দেবী অনাথ আশ্রম'।

এটা নতুন হয়েছে মনে হচ্ছে, কিন্তু এটা তার মায়ের নাম এবং বাড়িটা তার চেনা-চেনা লাগছে, সদর দরজা খুলে সে ভিতরে ঢুকল। উঠানে কিছু ছেলে-মেয়ে খেলা করছে। অর্ঘ্য কিছু বলতে যাবে এমনি সময় একটা বছর পঁচিশের যুবক এসে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করাতে অর্ঘ্য তার পরিচয় দিলো। তারপর সেই যুবক তাকে নিয়ে গেল একটা বসার ঘরে, সেখানে তার মায়ের একটা বড় ছবি বাঁধানো আছে, পোর্ট্রেট ছবি। এইটা দেখে ওর চোখে জল এলো। তারপর সেই যুবকটি একটা খাম তার হাতে দিয়ে বলল, "বড়মা যাবার সময় এই খামটি আপনাকে দিতে বলে গেছেন।"

অর্ঘ্য চিঠিটা খুলে দেখল তাতে রবীন্দ্রনাথের একটা লাইন লেখা আছে—
"ছেঁড়া শিকড় পাবে কি আর
পুরানো তার মাটি..."

হাতের লেখাটা তার মায়ের এটা নিঃসন্দেহ। অর্ঘ্য মাথা নিচু করে বিনা বাক্য ব্যয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে এসে বসল।
( সমাপ্ত )


Next Story

List of all Bengali Stories


## Disclaimer: RiyaButu.com is not responsible for any wrong facts presented in the Stories / Poems / Essay / Articles / Audios by the Writers. The opinion, facts, issues etc are fully personal to the respective Writers. RiyaButu.com is not responsibe for that. We are strongly against copyright violation. Also we do not support any kind of superstition / child marriage / violence / animal torture or any kind of addiction like smoking, alcohol etc. ##


◕ RiyaButu.com, এই Website টি সম্পর্কে আপনার কোনও মতামত কিংবা পরামর্শ, কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। যোগাযোগ:
E-mail: riyabutu.com@gmail.com / riyabutu5@gmail.com
Phone No: +91 8974870845
Whatsapp No: +91 6009890717