Home   |   About   |   Terms   |   Library   |   Contact    
A platform for writers

উৎসর্গ

Online bangla Story

-------- বিজ্ঞপ্তি ----------
■ 'নগেন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার' স্বরচিত গল্প লেখার প্রতিযোগিতা, মে -২০২৩ Result
--------------------------



List of all Bengali Stories

উৎসর্গ

লেখিকা: কাজী তৃণা লায়লা ( রুমকি ), বাবা - কাজী গোলাম রব্বানী, ঢাকা, বাংলাদেশ

( নির্বাচিত গল্প, 'নগেন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার - মে, ২০২৩' )

##
বড়লোক বাবার একমাত্র সন্তান রিয়া। সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছে। চঞ্চল, সাহসী, মিশুক, হাসিখুশি আর খুবই আবেগী মেয়ে। ছোটবেলা থেকে শহরে বড় হলেও গ্রামের সরলতা ওকে ভীষণ মুগ্ধ করে। তাই কলেজের প্রথম দিনই ওর বন্ধুত্ব হয় গ্রামের সহজ-সরল লাজুক একটি মেয়ের সাথে। লোকে বলে স্কুল জীবনের পর নাকি আর সত্যিকারের বন্ধুত্ব হয় না। কিন্তু রিয়া আর জুলির বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে এই জনশ্ৰুতি খাটে না। কলেজের প্রথম দিন চটপটে রিয়া সবার সাথে নিজে গিয়েই পরিচিত হচ্ছিল। হঠাৎ সামনে পড়লো একটা সাদাসিধে মেয়ে। রিয়া হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "হায়! আমার নাম রিয়া, রিয়া চৌধুরী, তুমি?" মেয়েটি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে একটা ভীতসন্ত্রস্ত চেহারা নিয়ে বলল, "আমি জুলি।" জুলির আচরণ দেখে ওর সম্পর্কে কৌতূহল জাগে রিয়ার। কৌতূহলবশত এক কথা, দু' কথা বলতে-বলতে কখন যে দুজন অন্তরঙ্গ বান্ধবী হয়ে গেল নিজেরাই বুঝতে পারলো না।

জুলির কথাবার্তায় বোঝা যায় ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে। পরিবারের কথা তেমন একটা বলতে চাইতো না কখনো। তাই রিয়াও খুব একটা জোর করতো না। জুলি প্রথমে কিছুদিন লেডিস হোস্টেলে থাকলেও, পরে রিয়া ও তার পরিবারের অনুরোধে রিয়াদের বাড়িতে চলে আসে। বিশাল বাড়িতে রিয়ার সাথে ওর বাবা-মা আর কিছু কাজের লোক থাকে। অবশ্য ওর বাবাও বেশিরভাগ সময় ব্যবসায়ের কাজে দেশের বাহিরে থাকে, তাই বলতে গেলে বাসায় কেবল রিয়া আর রিয়ার মা-ই থাকে। জুলিকে সঙ্গী হিসেবে পেয়ে তারা খুবই খুশি হলো। আজোপাড়া গায়ের সাধারণ মেয়েটি মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই নিজেকে একদম চলনে-বলনে চৌধুরী পরিবারের একজন করে তুলল।

কলেজের প্রথম দুই মাস খুব ভালো সময় কাটিয়েছে দুই বান্ধবী। আড্ডা, ঘুরাঘুরি, খুনসুটিতে সময়টা বেশ কাটছিল। হঠাৎ একদিন রিয়ার চিকেন পক্স হল। মাস খানেক ঘর থেকে বের হতে পারে নি। জুলি একাই রিয়ার বাবার গাড়িতে করে কলেজে যেত। চঞ্চলতা আর মিষ্টি হাসির জন্য রিয়া ছিল ক্লাসের সবার ক্রাশ। জুলি প্রতিদিন কলেজে আসলেই সবাই ওকে ঘিরে ধরত রিয়ার খবর জানার জন্য। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত সময় এলো। একদিন জুলির পাশাপাশি রিয়াও গাড়ি থেকে নামলো। রিয়া নামতেই ক্লাসের সবাই ছুটে চলে এলো ওর কাছে। সহপাঠীদের এমন উচ্ছ্বাস দেখে রিয়ার মন খুশিতে ভরে উঠল। রিয়া হঠাৎ খেয়াল করলো এত হৈচৈ এর মাঝে একটা ছেলে চুপচাপ এককোণে দাঁড়িয়ে আছে। ওকে আগে কখনো দেখেছে বলেও মনে পড়ছে না। রিয়া জুলিকে জিজ্ঞেস করলো, "ছেলেটা কে? চিনিস?"

জুলি বলল," চিনি, ছেলেটির নাম রোমান। অন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে মাইগ্রেশন করে এসেছে। তুই অসুস্থ হওয়ার পরদিন থেকে আমাদের সাথে ক্লাস করছে। তাই দেখিস নি।"

রিয়া মনে -মনে বলে উঠলো, "আচ্ছা! এই ব্যাপার!"

সত্যি কথা বলতে ছেলেটিকে রিয়ার ভালো লেগে গেছে। রোমানের সুদর্শন চেহারা আর মোহনীয় ব্যক্তিত্ব যেকোনো মেয়েকেই মুহূর্তে দিওয়ানা করে দিতে পারে। কলেজে সবার ক্রাশ রিয়া হলেও, রিয়ার ক্রাশ রোমান।

সময়ের সাথে-সাথে রিয়া আর রোমানের সম্পর্কটা প্রেমে পরিণত হয়। রোমানের সাথে সম্পর্কটা যত গভীর হচ্ছিল, জুলির সাথে বন্ধুত্বটা যেন তত ফিকে হয়ে যাচ্ছিল। একদিন কাউকে কিছু না বলে জুলি কোথায় যেন চলে গেলো। সব সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্ট ডিলিট করে, ফোনটা সুইচ অফ করে, মোবাইল না নিয়েই নিরুদ্দেশ হয়ে গেল মেয়েটা। পরনের কাপড়টা পরেই বেরিয়েছে। পার্স ছাড়া কিচ্ছু নিয়ে যায় নি সাথে। জুলির এমন চলে যাওয়া রিয়ার মনে একটা দাগ কেটে গেল। সে মনে-মনে বলল, "আমি হয়ত রোমানকে বেশি সময় দিতে গিয়ে, জুলিকে অনেক অবহেলা করে ফেলেছি। ছিঃ ছিঃ কাজটা আমি একদম ঠিক করিনি। এখন আমি ওকে কোথায় খুঁজবো?"

রিয়ার মা বাপের বাড়ি গেছে, বাবা সিঙ্গাপুর। এসময় বাবা-মাকে জুলির বিষয়টা জানানো ঠিক হবে না। তাই রিয়া রোমানের সাথে পরামর্শ করে জুলিকে খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিল। তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রোমান বলল, "আজ না হয় থাক। আমরা কালকে সকাল থেকে খুঁজতে শুরু করবো। আজকে সারারাত ধরে বরং আমরা একটু চিন্তা করি কিভাবে খুঁজলে ভালো হয়।" রিয়া রোমানের কথায় সায় দিলো।

জুলির কথা চিন্তা করতে-করতে রিয়ার দু'চোখে ঘুম নেমে এলো। সকালবেলা ঘুম ভাঙ্গলে দেখে ১০টা বেজে গেছে। ফোনে ৫৬ টা মিসড কল, ৮৫ টা মেসেজ নোটিফিকেশন। রিয়া আঁতকে উঠলো। ওর মনে একটা কু ডাকলো। ক্লাসের মোটামুটি সবাই কল করেছে, এসএমএস দিয়েছে। রিয়া প্রথমেই রোমানকে কল দিল। রোমান কল ধরেই বলল, "ওহ! রিয়া তুমি এখনো ঘুমাচ্ছো? এদিকে সর্বনাশ হয়ে গেছে।' রিয়ার মনে একরাশ উৎকণ্ঠা এসে জমা হলো। সে শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করলো, "কেন? কী হয়েছে?"

রোমান বলল, "জুলি ট্রেনে কাটা পড়েছে।" যেন এমন একটা ভয়ানক কথা শুনবে বলেই ভীত ছিল রিয়া। কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে পড়লো। কী করবে, কী বলবে, কিচ্ছু বুঝতে পারছিল না। তারপর জিজ্ঞেস করলো, "খবরটা কোত্থেকে জানলে?"

রোমান বলল, "প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায়, তারপর টিভিতেও দেখলাম।"

রিয়া কিছু না বলে ফোন কেটে দিয়ে ফেইসবুকে ঢুকতেই খবরটা দেখলো। মোটামুটি খবরের শিরোনামটা ছিল এমন, "ট্রেনে কাটা পড়ে কলেজ ছাত্রী বিবি জয়নাবের মৃত্যু, ১৪ ঘণ্টা পরও খোঁজ নেয় নি স্বজনরা।" খবরটা রিয়া কিছুতেই মেলাতে পারছিল না। নামে মিল নেই। কিন্তু খবরের সাথে যে ছবিটা ব্যবহার করা হয়েছে ওটা জুলির। এটা ওর খুব প্রিয় ছবি। তাই সব সময় পার্সে রাখতো। রিয়া গত পহেলা বৈশাখে নিজের হাতে ছবিটা তুলে দিয়েছিল। কেবল এই জন্যই রিয়া কিছুটা বিশ্বাস করছিলো এটা জুলি। রিয়া সাথে-সাথে রোমানকে কল করে বলল, "তোমার সাথে আমার অনেক কথা আছে, প্লিজ ১১টার মধ্যে লেকের ধারে চলে এসো।" রোমান সম্মতি জানালো। রিয়া কারো কোনও মিসড কল ও ম্যাসেজের উত্তর না দিয়ে সোজা লেকের ধারে চলে গেল।

রিয়া আর রোমান লেকের ধারে বসে আছে। তাদের সাথে যুক্ত হলো একরাশ নীরবতা। নির্জনতা ভাঙ্গলো রিয়ার কথায়—

রিয়াঃ আমার কী মনে হয় জানো, রোমান?

রোমানঃ কী?

রিয়াঃ খবরে হয়ত ভুল করে জুলির ছবিটা ব্যবহার করেছে। নাহলে জুলি কীভাবে বিবি জয়নাব হয়?

রোমানঃ না, খবরে ঠিক ছবিই ব্যবহার করা হয়েছে। জুলি আর আমাদের মাঝে নেই। ওর আসল নামই বিবি জয়নাব।

রিয়াঃ কী বলছো এসব?

রোমানঃ ঠিকই বলছি। জুলি অজোপাড়া গায়ের হত-দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। জন্মের ৩ মাস আগে ওর বাবা মারা যায়। বাবার নাম ছিল জয়নাল। তাই ওর দাদি বাবার নামের সাথে মিলিয়ে নাম রেখেছিল বিবি জয়নাব। জন্মের তিন বছর পর ওর মা অন্য লোকের সাথে চলে যায়। তিনি আর কখনো ফিরে আসে নি তার অতীত জীবনে। এমন কী ছোট্ট ফুটফুটে মেয়েটার কথা চিন্তা করেও না। জুলির চাচার আয়ে সংসার চলতো। তাই জুলি একপ্রকার ঝি-চাকরের মতই জীবন কাটিয়েছে চাচা-চাচীর সংসারে। ঘরে একমাত্র ভরসার মানুষটি ছিলো দাদি। জুলিকে সবসময় স্নেহ-মমতা দিয়ে আগলে রাখতো। স্কুল পাস করার কিছু দিন পর দাদিও মারা যায়। দাদি মৃত্যুর আগে তার সব গয়না আর কিছু জমানো টাকা জুলির হাতে তুলে দিয়ে বলেছিল, "আমার তো উপরে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এলো। আমার মৃত্যুর পর তুই এই নরকে আর থাকিস না। শহরে গিয়ে ভালো কলেজে ভর্তি হবি, ঠিকমত লেখাপড়া করবি। আমি উপর থেকে যখন দেখবো তুই ভালো আছিস, তখন আমার আত্মা শান্তি পাবে।' জুলি দাদির মাঝেই বাবা-মায়ের স্নেহ-মমতা সব খুঁজে পেয়েছিল। তাই দাদির মৃত্যু ওকে ভীষণভাবে দুর্বল করে দেয়। পরবর্তীতে নিজেকে সামলে নিয়ে একাই শহরের পথে পাড়ি জমায় সে। শহরে এসে নিজেকে খুব বেমানান মনে হচ্ছিল তার। তুমি যখন কলেজের প্রথম দিন ওকে নাম জিজ্ঞেস করেছিলে, তখন প্রথমবারের মতো দাদির দেওয়া নামটা ওর সেকেলে মনে হয়েছিল। তাই 'বিবি জয়নাব' না বলে, বলেছিল জুলি।"

রিয়া এখন সব মেলাতে পারছে। কেন প্রথমদিন নিজের নাম বলতে জুলি এত সময় নিয়েছিল। মাঝে-মাঝে জুলি বলে ডাকলে কেন কোনও সাড়া দিত না সে। রিয়া ভেবেছিল জুলি হয়ত কানে একটু কম শোনে। কিন্তু এখন ওর কাছে সব পরিষ্কার। সত্যিই তো নকল নাম আর কতক্ষণ মনে রাখা যায়? রিয়া চিন্তার জগৎ থেকে বেরিয়ে বাস্তবতায় ফিরে এলো। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, "এত কথা তুমি কী করে জানলে রোমান? জুলি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল। ও আমার বাসায়, আমার সাথেই সারাদিন থাকতো। আমি কিছু জানি না। অথচ, তুমি এতকিছু জানো কীভাবে?"

রোমান একটা ব্যস্ততার ভাব দেখিয়ে, রিয়াকে একা রেখেই সেখান থেকে তড়িঘড়ি চলে যায়। রিয়া বার-বার কল দিচ্ছিল, কিন্তু রোমান কল রিসিভ করছিল না। এক পর্যায়ে ফোন সুইচ অফ করে দিল। তারপর থেকে আর কখনো রোমানের সাথে ফোনে যোগাযোগ হয়নি রিয়ার। কৌতূহল জাগলো রিয়ার মনে। ও ভেবে পাচ্ছিলো না আসলে এসব কী হচ্ছে। খানিকবাদে সাহসী রিয়া এসব চিন্তা বাদ দিয়ে পুলিশ স্টেশনে গেল জুলির লাশ আনতে। কিন্তু পুলিশ রিয়ার কথাকে কোনও পাত্তাই দিচ্ছিলো না। পুলিশ ওকে পরিষ্কার জানিয়ে দিলো সঠিক অভিভাবক ছাড়া কাউকে লাশ হস্তান্তর করা হবে না। রিয়া মন খারাপ করে বাসায় ফিরে এলো। বাসায় বাবা-মা কেউ নেই, রোমানকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। জীবনে প্রথমবার নিজেকে এত একা লাগছে রিয়ার। বাসায় ফিরতেই কাজের লোকেরা ওর সেবা যত্ন করতে অস্থির হয়ে গেলো। এসব কিছুই ভালো লাগছে না ওর। নিজের ঘরে গিয়ে বাতি নিভিয়ে আনমনে শুয়ে আছে রিয়া। হঠাৎ কী যেন একটা পড়ার শব্দ হলো। বাতি জ্বালিয়ে দেখলো টেবিল থেকে কিছু বই নিচে পড়ে গেছে। রিয়ার চোখ পড়লো একটা লাল মলাটের ডায়েরির ওপর। ডায়েরিটা হাতে নিয়ে দেখলো যা ভেবেছিল ঠিক তাই। এটা জুলির সেই প্রিয় ডায়েরিটা। যেটা সে কাউকে ধরতে দিত না। কিন্তু এত প্রিয় ডায়েরিটা না নিয়েই চলে গেলো কেন? ইচ্ছে করেই রেখে গেছে? নাকি যাওয়ার এত তাড়া ছিলো যে নিতে ভুলে গেছে? রিয়ার কৌতূহল আরও বাড়লো। কারো ব্যক্তিগত জিনিসে যে হাত দিতে নেই, এই ভদ্রতাটুকু রিয়ার জানা আছে। কিন্তু জুলির অস্বাভাবিক মৃত্যু আর রোমান কীভাবে এতকিছু জানলো, সেই রহস্য উন্মোচন করতে রিয়া ডায়েরিটা পড়তে শুরু করলো।

মোটামুটি ডায়েরির এক তৃতীয়াংশ পড়ার পর রিয়া বুঝতে পারলো, রোমান কিছু ভুল বলে নি। ছোটবেলায় বাবাকে না দেখার কষ্ট, মায়ের পরকীয়া, চাচা-চাচীর অত্যাচার, দাদির স্নেহ-মমতা, শহরে এসে বিবি জয়নাব থেকে জুলি হয়ে ওঠার গল্প, সবকিছু সুন্দরভাবে লেখা আছে ডায়েরিতে। রিয়ার আগ্রহ আরও বেড়ে গেল । রিয়া ডায়েরি পড়ছে আর ঘটনাগুলো ওর কল্পনায় ভেসে উঠছে। রিয়ার চিকেন পক্স হওয়ার পর জুলি একটু একা হয়ে গেলো। এমনিতে দুই বান্ধবী একই রুমে থাকতো, কিন্তু রোগটা ছোঁয়াচে হওয়ায় জুলি আলাদা একটা রুমে গিয়ে থাকতে শুরু করে। রিয়াদের বিশাল বাড়ি, থাকার ব্যবস্থার কোনও অসুবিধা নেই। রিয়াকে ছাড়া প্রথম কলেজে যাচ্ছে, তাই খুব মন খারাপ জুলির। রিয়ার বাবার গাড়ি জুলিকে কলেজে নামিয়ে দিলো। সে বুঝতে পারলো একজোড়া চোখ অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। জুলি কিছুটা লজ্জা পেয়ে ক্লাসে চলে গেলো। ক্লাসে গিয়ে দেখে ছেলেটা ওর পাশেই বসে আছে। আজ নতুন কিছু ছেলে মেয়ে দেখতে পাচ্ছে ক্লাসে। পরে জানা গেলো ওরা মাইগ্রেশন করে অন্য ডিপার্টমেন্ট থেকে এসেছে। ছেলেটা সারাক্ষণই ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর থেকে প্রতিদিনই জুলি তার ব্যাগে কখনো ফুল, কখনো চকলেট, কখনো বা মনের সবটুকু আবেগ দিয়ে লেখা চিঠি পেত। জুলি বুঝতে পারলো ছেলেটি ওর প্রেমে পড়েছে। জুলিরও ভালো লাগতে শুরু করে ছেলেটিকে। সপ্তাহ-খানিকের মধ্যেই প্রেম হয়ে যায় দুজনের। জুলি অনেক লাজুক। ও সবার সামনে ছেলেটির সাথে কথা বলতে লজ্জা পেত। তাই কেউ বুজতে পারে নি, এদের দুজনের মাঝে কিছু চলছে। দেখতে-দেখতে মাস পেরিয়ে গেলো। রিয়া সুস্থ হয়ে কলেজে এলো। তারপর থেকেই ছেলেটি জুলিকে এড়িয়ে চলতে থাকে। জুলি ভালোভাবে বুঝতে পারছে যে ছেলেটি নতুন কোনও সম্পর্কে জড়িয়েছে। জীবনের প্রথম প্রেমেই প্রতারিত হলো ভেবে মনে-মনে মেয়েটা খুব দুঃখ পায়। বিষয়টা রিয়াকে শেয়ার করবে কিনা তা নিয়ে খুব দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছিলো। একদিন সিদ্ধান্ত নিয়েই নিল রিয়াকে সব ঘটনা খুলে বলে ওর থেকে পরামর্শ নেবে। কিন্তু সেদিনই রিয়াকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখতে পায় নিজের ভালোবাসার মানুষের সাথে। জুলির ডায়েরির শেষ দু'টো লাইন ছিল, "ভালোবাসার মানুষটি কে দীর্ঘদিন না দেখে থাকা সম্ভব। কিন্তু প্রিয় বান্ধবীর সাথে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে সে দৃশ্য সহ্য করা সম্ভব নয়।" শেষ লাইন দুটো রিয়ার অন্তরে কাটার মত বিঁধে গেলো। রিয়ার আর বুঝতে বাকি রইলো না রোমানই ছিল জুলির সেই প্রতারক প্রেমিক। হয়ত প্রেমিকের সাথে বান্ধবীকে একসাথে দেখার দৃশ্য সহ্য করতে না পেরেই এক বুক কষ্ট নিয়ে ট্রেনের নিচে গিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছে মেয়েটা।

জুলির ডায়েরি পড়ে রিয়া আরও জানতে পারে, রোমান নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী সন্তান। বাবা ছোটো-খাটো একটা সরকারি চাকরি করতো। কখনো নয়-ছয় করে রোজগার করেনি। তাই সংসারে সব সময় টানাপোড়েন লেগেই থাকত। এখন পেনশনের টাকা দিয়ে কোনও মতে সংসার চলছে। অভাব ভালো লাগে না রোমানের। ওর চাই বাড়ি, গাড়ি, কাড়ি-কাড়ি টাকা আর বিলাশ-বহুল জীবন। তাই বড় লোকের কোনও সুন্দরি মেয়েকে হাত করে বিয়ে করাই ছিল রোমানের জীবনের লক্ষ। অর্থাৎ, রোমানের চাই রাজ্যসহ রাজকন্যা। প্ৰথমে জুলিকে রাজকন্যা ভেবে হ্যাংলার মত পেছন-পেছন ঘুরতে থাকে। তারপর যখন জুলির সম্পর্কে সবকিছু জানলো, তখন জুলিকে ছেড়ে রিয়ার পেছনে ঘুরতে শুরু করলো। রোমান খুব ভালো করেই জানে মেয়েরা একটু যত্নের পাগল। যখন কোনও মেয়ে দেখে একটা ছেলে তাকে কেয়ার করছে, পাগলের মত ভালোবাসছে, তার জন্য জীবন দিতেও রাজি। মেয়েরা তখন নিজের অজান্তেই ছেলেটির প্রতি দুর্বল হয়ে যায়। আর এই দুর্বলতা কাজে লাগিয়েই অল্প সময়ে মেয়েদেরকে বশ করে ফেলত রোমান।

রিয়ার ডায়েরি পড়া শেষ। ডায়েরির কিছু পাতা এখনো খালি। বেঁচে থাকলে হয়ত লিখে শেষ করতে পারত। জুলির জীবনটা এতই ছোট যে, আত্মজীবনী লিখতে একটা ডায়েরির সবগুলো পাতাও উল্টাতে হয় নি। গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিয়া ডায়েরিটা বন্ধ করলো। মেয়েটির চোখ ছলছল করছে। প্রচণ্ড একটা অপরাধবোধ কাজ করছে ভেতরে। জুলির আত্মহত্যার জন্য নিজের ওপর থেকে দায় সরাতে পারছে না কিছুতেই। এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল। রিয়া নিজে গিয়ে দরজা খুলল। রিয়ার বাবা-মা একসাথে বাসায় এসেছে। ইতোমধ্যে জুলির খবরটা ওনাদের কাছেও পৌঁছে গেছে। রিয়া দরজা খুলতেই মা-বাবা, মেয়ে তিনজনই আবেগী হয়ে পড়লো। রিয়া বাবা-মাকে সব ঘটনা খুলে বলল। জুলির কষ্টের শৈশব, রোমানের সাথে প্রেম, আত্মহত্যা, পুলিশ লাশ দিতে অস্বীকৃতি জানানো, জুলির লাল মলাটের ডায়েরি, সবকিছু বাবা-মাকে জানালো রিয়া। বাবা-মা ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল," যা হয়েছে তোমার অজান্তেই হয়েছে। এখন তো আর কিছু করার নেই, আমরা বরং জুলির লাশটা সসম্মানে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করি। এটাই এখন আমাদের করনীয়।" রিয়া মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেই যাচ্ছে।

পরদিন সকালে রিয়া ওর বাবা-মায়ের সাথে গিয়ে জুলির দ্বিখণ্ডিত লাশটি গ্রহণ করলো। রিয়ার বাবা প্রভাবশালী লোক। তাই পুলিশ লাশ দিতে খুব একটা ঝামেলা করে নি। ওরা লাশটা নিয়ে জুলির গ্রামের বাড়িতে গেল। দাদির কবরের পাশে সমাহিত করা হলো বিবি জয়নাবকে।

#
১৫ বছর পর...
হঠাৎ একদিন রোমানের সাথে রিয়ার দেখা। একই প্লেনের পাশাপাশি সিটে বসেছে দু'জন। গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক। বছর দশেক আগে এক প্রবাসী বাঙ্গালীকে বিয়ে করেছে রোমান। এখন অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেয়ে গেছে। ঠিক যেমন জীবন চেয়েছিল, তেমন জীবন কাটাচ্ছে রোমান। তবুও এতকিছুর মাঝে যেন মনে সুখ নেই। নিজস্বতা বলতে কিছু নেই। পরিবারে শ্বশুর-শাশুড়ি আর বউই প্রধান। সেখানে রোমানের অবস্থানটা অনেকটা সাক্ষী গোপালের মতন। এদিকে জুলিকে সমাহিত করার পরপরই রিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নিজের জীবন উৎসর্গ করবে অসহায়, দরিদ্র ও সংগ্রামী নারীদের জন্য। তাছাড়া রিয়ার এনজিওতে একটি মানসিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র থাকবে, যেখানে বিশেষ করে আত্মহত্যাপ্রবণ রোগীদের চিকিৎসা করানো হবে। গত ৭/৮ বছরে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে বিবি জয়নাবের নামে গড়ে তোলা রিয়ার এনজিওটি। ফলস্বরূপ নারীদের অগ্রগতির জন্য বিশেষ ভূমিকা রাখায় রিয়া এবছর জাতিসংঘের 'বেস্ট উইমেন ইনফ্লুয়েন্সার এ্যাওয়ার্ড' পেয়েছে। ঐ অনুষ্ঠানে যোগদান করতেই নিউইয়র্ক যাচ্ছে রিয়া। নিজের জীবন মানব কল্যাণে উৎসর্গ করে রিয়া পেল কোটি মানুষের ভালোবাসা। অন্যদিকে, স্বার্থের পেছনে ছুটে রোমান পেল অন্তঃসারশূন্য জীবন।
( সমাপ্ত )


Next Bangla Story

List of all Bengali Stories


## Disclaimer: RiyaButu.com is not responsible for any wrong facts presented in the Stories / Poems / Essay / Articles / Audios by the Writers. The opinion, facts, issues etc are fully personal to the respective Writers. RiyaButu.com is not responsibe for that. We are strongly against copyright violation. Also we do not support any kind of superstition / child marriage / violence / animal torture or any kind of addiction like smoking, alcohol etc. ##


◕ RiyaButu.com, এই Website টি সম্পর্কে আপনার কোনও মতামত কিংবা পরামর্শ, কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। যোগাযোগ:
E-mail: riyabutu.com@gmail.com / riyabutu5@gmail.com
Phone No: +91 8974870845
Whatsapp No: +91 6009890717