Home   |   About   |   Terms   |   Library   |   Contact    
A platform for writers

সাফল্যের স্বাদ নোনা

Online bangla Story

-------- বিজ্ঞপ্তি ----------
■ 'নগেন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার - মে, ২০২৪' স্বরচিত গল্প লেখার প্রতিযোগিতা, ( প্রতি বছর মে মাসে ) Result
--------------------------



List of all Bengali Stories

সাফল্যের স্বাদ নোনা

লেখিকা - জয়ন্তী চক্রবর্তী, পিতা - ঈশ্বর উমাপদ ঘোষাল, ঘটক পুর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

##
মানুষ এক আশ্চর্য জীব। আশ্চর্য শুধুই তার মনের কারণে। কখন কি জন্যে যে তার মনের সেতারে কোন্ সুর বেজে উঠবে সেটা কেউ বলতে পারে না। ঈশ্বরের সৃষ্ট সকল জীবের জন্য যে সাধারণ সংবিধান আছে মানুষের জন্যে বোধ হয় তা নয়। কিংবা গোড়াতে হয়তো তাই ছিল। কিন্তু যত দিন গেছে, সে-সংবিধান সংশোধন হতে-হতে আজ বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে এসে পড়েছে যে, তার কোনও-কোনও কাজের সত্যিই কোনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এই যেমন ধরো, আজ অরুণাংশু যে কাজটা করল তার কি সত্যিই কোনও ব্যাখ্যা আছে? ঊর্মি হাজার ভেবেও কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছে না। সেই বিকেল থেকে ঠায় বসে আছে বেচারি এই মজা নদীটার ধারে, বটের ছায়ায়। পথ চলতি লোকজন আড় চোখে দেখে যাচ্ছে। হয়তো বা একটা আধটা মন্তব্যও ছুঁড়ে দিয়ে যাচ্ছে অস্ফুটে। কিছুই স্পর্শ করছে না কথাকে। সে এখন হাতড়ে বেড়াচ্ছে তার তিন বছরের ফেলে আসা অতীতে। আঁতি-পাঁতি করে সেখানে সে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার এতদিনের চেনা মানুষটাকে; তার অরুণাংশুকে। সেই অরুণাংশুর সঙ্গে আজকের অরুণাংশুর কোথাও কোনও মিল খুঁজে পাচ্ছে না কথা। স্মৃতির পর্দায় একটার-পর একটা ছবি ফুটে উঠছে ঠিক সিনেমার মত। যদিও সেই সিনেমার নায়িকা একদিন ছিল সে। কিন্তু আজ সে কেবল দর্শক মাত্র।

কলেজে তখন ছাত্র সংসদের ইলেকশন। কথার তখন সেকেন্ড-ইয়ার চলছে। এমনিতেই লাজুক স্বভাবের বলে গোটা ফাস্ট-ইয়ারটা তেমন কোনও বন্ধু জোটেনি তার। গুটি-গুটি পায়ে অনার্সের ক্লাসে ঢুকে ক্লাস করত। তারপর চুপচাপ মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসত খাতা-পত্র ব্যাগে ভরে। ক্লাসের অন্যরা আড়ালে ওর নাম দিয়েছিল 'চুপকথা'। একমাত্র বন্ধু ছিল রিয়া। সেদিন রিয়াও আসেনি। অন্য দিনের মতো কলেজে এসে সোজা দোতলায় গিয়ে দেখল কয়েকজন মাত্র ছাত্র-ছাত্রী এসেছে। তারাও কেউ ক্লাসে ঢুকছে না। বাইরেই ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে ছোটো-ছোটো দলে। কেমন যেন একটা অন্যরকম ভাব। কথা ভাবল বাড়ি চলে যাবে। আজ আর ক্লাস হবে না মনে হয়। কেউ মারা-টারা গেছে হয়তো। ভাবতে-ভাবতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিল কথা। হঠাৎই চারদিক কাঁপিয়ে স্লোগান দেয়া শুরু হয়ে গেল। জিন্দাবাদ, মুর্দাবাদ, জিতল কারা, হারল কারা, ইত্যাদি রবে কলেজের গোটা বিল্ডিংটা যেন কেঁপে-কেঁপে উঠছে। কথার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে অজানা ভয়ে। হঠাৎ আচমকাই পিছন থেকে একটা ছেলে জাপটে ধরে মুখময় আবির মাখিয়ে দিল কথার। ভয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠেছিল কথা। আর ঠিক তখনি একটা হাত এসে ঠাস করে একটা চড় কসিয়ে দিয়েছিল অসভ্য ছেলেটার গালে। গর্জে উঠেছিল, "লজ্জা করে না? জানোয়ার! এইভাবে তোরা মেয়েদের সম্মান বাঁচাবি? দাঁড়া, আমি বলছি ব্রতদাকে। তোকে পার্টি থেকে বের করে দিতে বলব।" এরপর আরও অনেকে এসে গিয়েছিল, ঘিরে দাড়িয়ে সবাই মিলে শাসন করছিল ছেলেটাকে। লজ্জায় যেন মরে যেতে ইচ্ছে করছিল কথার। ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করছে যেকোনো দিকে। কিন্তু দু-চোখে তখন তার অন্ধকার। আবির ঢুকে গিয়ে দুটো চোখেই প্রচণ্ড জ্বালা করছে। অরুণাংশুই বুঝতে পেরেছিল। নিঃসঙ্কোচে এসে হাতটা ধরেছিল তার। বলেছিল, "এসো আমার সঙ্গে।" ওর হাত দুটোর ওপর সবটুকু নির্ভর করে কোনও রকমে নিচে নেমে এসেছিল কথা। তারপর কল খুলে আঁচলা-আঁচলা জল ছিটিয়ে ওর দুটো চোখ ভাল করে ধুয়ে দিয়েছিল অরুণাংশু। দিতে-দিতে বলেছিল "জানতে না তুমি আজ ওদের বিজয়োৎসব।? এ রকম আবির মাখামাখি, হুড়োহুড়ি চিৎকার চেঁচামেচি হবেই তা জানতে না বুঝি?"

"না... মানে... আমাকে তো কেউ বলেনি..."

"কে আবার বলবে? তুমি তো কারো সাথে মেশো না। মিশলে জানতে পারতে..."

চোখ ধোয়ার পরও ক্রমাগত জল বেরোচ্ছিল দু-চোখ দিয়ে। অরুণাংশু ওকে হাত ধরে প্রায় জোর করেই নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিয়েছিল ওর বাইকে। বলেছিল, "এক্ষুনি ভাল কোনও স্পেশালিষ্ট না দেখালে খুব ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।"

খুব আড়ষ্ট হয়ে কোনোরকমে বসেছিল কথা, পেছনের ছোট্ট রডটার সাপোর্টে। অরুণাংশু চালাচ্ছিল খুব আস্তে-আস্তে। যেখানে বাম্প সেখানে এসে বলেছিল, "কাঁধটা ধরো। নইলে পড়ে যেতে পার।"

কথা ধরে নি। ভয়ে-ভয়ে বলেছিল, "আমি বরং হেঁটে যাই..."

অরুণাংশু বলেছিল, " আমি বাঘ-ভালুক নই। অরুণাংশু চ্যাটার্জি। সেকেন্ড-ইয়ার কমার্স।"

কথা কিছুটা বাধ্য হয়েই বলেছিল, আমি..."

"জানি... তুমি 'চুপকথা'। সবাই তাই বলে..."

দু-জনেই হেসে উঠেছিল।

সেদিন ডাক্তার বর্মণের চেম্বারে নিজেকে কথার বন্ধু বলে পরিচয় দিয়েছিল অরুণাংশু। সেই শুরু। তারপর সাত-সাতটা বছর কেটে গেছে। বন্ধু থেকে কখন যে ওরা বিশেষ বন্ধু হয়ে উঠেছে পরস্পরের, নিজেরাই জানতে পারেনি। বি. এ. পাশ করে দুজনেই ভর্তি হয়েছে একই কোচিং সেন্টারে। সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিয়েছে, যাকে বলে ডু-অর-ডাই মানসিকতা নিয়ে। অরুণাংশুর দেখা-দেখি কথাও যখন টিউশানি করতে শুরু করল তখন অরুণাংশুই তাকে বারণ করেছিল। বলেছিল, "তোমার তো আর আমার মত সংসার টানার দায় নেই। কি দরকার সময় নষ্ট করবার? পুরো কনসেনট্রেশন দিয়ে লড়ে যাও।"

কথা ততদিনে কথা বলতে শিখে গেছে বেশ। অরুণাংশুর সঙ্গে মন-প্রাণ খুলে মিশতে-মিশতে স্বভাবের জড়তাটা কেটে গেছে তার। হাসতে-হাসতে সে বলল, "তোমার সংসারের মানুষগুলো বুঝি আমারও কেউ নয়? আমাকেও তোমার ভারের কিছুটা বইতে দিতে হবে অরুণ।"

অরুণাংশু গাঢ় চোখে অবেক্ষণ তাকিয়ে ছিল কথার দিকে। সে চোখের দৃষ্টির সামনে সিঁদুরের মত লাল হয়ে উঠেছিল কথা। তারপর দু-হাতে ঢেকে ফেলেছিল মুখ।

খুব মনে পড়ছে কম্পিটিটিভ পরীক্ষার দিনগুলোর কথা। এক-দু'দিন তো নয়। টানা পাঁচ-পাঁচটা বছর একের-পর এক পরীক্ষায় বসে গেছে তারা। দু-জন একসঙ্গে বসে ফর্ম ভরতো। পরীক্ষার সেন্টারও পড়ত এক জায়গায়। দুরু-দুরু বক্ষে পাশাপাশি হেঁটে হলে ঢুকতো ওরা। তারপর হাফ-টাইমে এক সাথে বসে টিফিন খাওয়া আর কোশ্চেন নিয়ে চুলচেরা আলোচনা। রেজাল্ট বের হলে কথা কিছুতেই দেখতে যেত না। অরুণাংশুকেই যেতে হত। বারবার হতাশ হতে-হতে কথা যখন ভেঙে পড়ত, অরুণাংশুই তাকে চাঙ্গা করে তুলতো আবার। কখনো বকে, কখনো বুঝিয়ে, কখনো বা শুধুই আদর করে। ‌ আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে কখনো-কখনো আবৃত্তি করতো-
"পাড়ি দিতে নদী, ভাঙে হাল যদি
ছিন্ন পালের কাছি-
কিছু নাই ভয় জানি নিশ্চয় তুমি আছো আমি আছি।"

এই বটতলাতেই কত গাঢ় নির্জন দুপুর, কত মধুর সন্ধ্যা কেটে গেছে তাদের। সে-সবের আর কোনও মূল্যই রইলো না। একঝুড়ি ভাঙা কাঁচের মতোই মিথ্যে হয়ে গেল কথার কত সাধের বেলোয়ারি চুড়িগুলো!

সন্ধ্যা নেমে আসছে। এবার ফিরতে হবে। মাথার ওপর ঝাঁকড়া বট গাছটার ডালে-ডালে দলে-দলে বাসায় ফিরে আসছে পাখিরা। কারো মুখে খাবার, কারো মুখে খড়-কুটোর টুকরো। কারো মুখে শুধুই গান। স্ত্রী-পুরুষে মিলে ঘর বেঁধেছে ওরা। গিন্নীটি ডিমে তা দেয়, কর্তাটি উড়ে যায় খাবারের খোঁজে। দু-জনে মিলে ঠোঁটে করে কুড়িয়ে আনে খড়, টুকরো, পশম, তুলো। বাসার সদ্য ফোটা বাচ্চাগুলোকে ওম দিতে হবে যে। ধীরে-ধীরে ঘন অন্ধকারে ঢেকে আসে নদী তীর। লোক চলাচল কমে আসে। কথা উঠে দাঁড়ায়। দু-খানি চোখ তার ভরে আসে জলে। মানুষ কেন এত নিষ্ঠুর? জীবন কেন এত জটিল? যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের, মানুষের সাথে তার কেন দেখা হয় না? কেন? কেন আজ কথার এই সাফল্যে তুমিও খুশি হতে পারলে না অরুণাংশু? স্কুলের চাকরিটা হয়ে গেছে কেবল এই কথাটা বলতে আজ কথা তোমার কাছে আসেনি। সে এসেছিল বলতে, "চলো অরুণ, এবার তবে আমরাও ডানা পেতে বসি। অনেক দিন তো হলো ওড়া-উড়ি।" তাই-তো সে আজ জীবনে প্রথম খোঁপা বেঁধেছে। তোমার দেয়া বাসন্তী রঙের জামদানি শাড়িখানা পরেছে গুছিয়ে। কপালে টিপ এঁকেছে কুমকুমের। আর তুমি? কিছুই দেখলে না। কিছুই শুনলে না। বুঝলে না কিছুই। শুধু মুখের ওপর বলে দিলে, "তুমি জিতে গেছ, কথা। আমি হেরে গেছি। তোমার আর আমার পথ এখন থেকে আলাদা। কারো অনুকম্পা নিয়ে বাঁচতে পারব না।"

"কথাকে দু-পায়ে মাড়িয়ে তুমি চলে গেলে অরুণ? আমার বদলে চাকরিটা যদি তোমার হতো অরুণ? আমি কি এমন করে তোমায় ছেড়ে চলে যেতে পারতাম? না তুমিই আমায় যেতে দিতে?" জীবনে কখনো নিজেকে এমন নিঃস্ব মনে হয়নি কথার। আজ তার মনে হলো সাফল্যের স্বাদ শুধু মধুর নয়, কখনো-কখনো সে-স্বাদ নোনাও হয়। বড় নোনা।
( সমাপ্ত )


Next Bangla Story

List of all Bengali Stories


## Disclaimer: RiyaButu.com is not responsible for any wrong facts presented in the Stories / Poems / Essay / Articles / Audios by the Writers. The opinion, facts, issues etc are fully personal to the respective Writers. RiyaButu.com is not responsibe for that. We are strongly against copyright violation. Also we do not support any kind of superstition / child marriage / violence / animal torture or any kind of addiction like smoking, alcohol etc. ##


◕ RiyaButu.com, এই Website টি সম্পর্কে আপনার কোনও মতামত কিংবা পরামর্শ, কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। যোগাযোগ:
E-mail: riyabutu.com@gmail.com / riyabutu5@gmail.com
Phone No: +91 8974870845
Whatsapp No: +91 6009890717