Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
RiyaButu
Read & Learn

কানামাছি


বাংলা উপন্যাস


All Bengali Stories    18    19    20    21    22    23    24    25    (26)     27      

শ্যামল বৈদ্য

Syamal Baidya
ত্রিপুরা সরকারের সলিলকৃষ্ণ দেববর্মণ পুরস্কারপ্রাপ্ত শ্রী শ্যামল বৈদ্য ত্রিপুরার একজন বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক। সময় সময়ে ওনার অনেকগুলি বই প্রকাশিত হয়েছে এবং পাঠকদের কাছে খুব সমাদৃত হয়েছে। ওনার লেখা দুটি উপন্যাস ক্রমপর্যায়ে আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হচ্ছে।




কানামাছি
বাংলা উপন্যাস
লেখকঃ শ্যামল বৈদ্য, আগরতলা, ত্রিপুরা

Previous part    



২য় পর্ব

বাড়িটা এক্কেবারে জনশূন্য মনে হচ্ছে। একটা মানুষকেও এদিক-ওদিক দেখা যাচ্ছে না। ঘরের দরজায় এসে সহদেববাবু ইতস্তত করেতে লাগলেন। গলা ছেড়ে ডাকবেন না কী কলিংবেল চাপবেন তাই আনমনে ভাবতে লাগলেন। আজ বাড়িটাকে প্রয়োজনের চাইতে একটু বেশিই যেন গম্ভীর মনে হচ্ছে তার। এখন তো অনিরুদ্ধ অনেকটাই ভালো, অন্তত বিপদ কেটে গেছে সেটা তো বলাই যায়। তবুও এই বাড়িটার উপর ঝড়টা তো শেষ হয়ে যায়নি এখনও। তাই বাড়ির পরিবেশ গম্ভীর হবে নাই বা কেন? এত বড়ো দুর্ঘটনার পর বাড়ির প্রাণটাই যেন কে শুষে নিয়ে চলে গেছে। আর দাঁড়িয়ে থাকতে মন চাইল না তার। তাড়াতাড়ি প্রয়োজনীয় কথাগুলি সেরে ফেলতে হবে। তাই অপেক্ষা না করে কলিংবেল চাপলেন অবশেষে তিনি। একটু পরে দরজা খুলে সামনে এসে দাঁড়াল বাড়ির কাজের মহিলা একজন। সহদেববাবুকে দেখেও ঐ মহিলা কিছু না বলেই ভেতরে চলে গেলেন। সহদেববাবু দোতলায় গিয়ে উঠলেন। দরজা হাঁ-করে খোলা। ঘরে কেউ নেই। কেমন যেন অগোছালো আর অযত্নে পড়ে আছে ঘরটা। তিনি খালি ড্রয়িং-রুমে একা চুপ করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। এই বাড়িটা তার কাছে বড়ো অচেনা মনে হচ্ছে আজ। যদিও সহদেববাবু খুব একটা এই বাড়িতে আসতেন না। মেয়ের বাড়িতে ঘন ঘন আসা ছেলের মা বাবারা পছন্দ করে না। তাই তিনি মেয়ের অসুস্থ মাকে মাঝে মাঝে পাঠালেও নিজে এই বাড়িতে বিশেষ কাজ না থাকলে আসেন না। তাছাড়া বিয়ের আগের ঘটনাগুলি মনে হলেই তার মনে হয় তার মেয়ের কাছ থেকে যত বেশি দূর সরবেন তিনি ততই তার মেয়ে বাপ-নির্ভরতা কাটিয়ে সংসারী হয়ে উঠবে। কিন্তু মেয়েটা তা চাইলেও ঈশ্বর যেন তা চাইলেন না। মাধবীও বড্ড বেশি আবেগ প্রবণ ও জেদি মেয়ে। তার মাথায় কে যে এই কথাটা ঢুকিয়েছে তিনি বুঝতে পারলেন না, যে এই পরিবারটি নাকি বিশেষ ভালো নয়। তাই শুরু থেকেই এই বিয়েতে সে অনিচ্ছুক ছিল। পরে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তার মা-র অসুখের কথা বলে নিমরাজি হলে আর দেরি করেননি তিনি। কিন্তু বিয়ের পর বারবার যখন সে ছুটে আসতে লাগলো বাপের বাড়িতে তখন তিনি বুঝতে পারলেন আর যাই হোক মেয়ের মনে শান্তি নেই। আজ অব্দি কখনোই তাকে দেখে তার সুখী মনে হয়নি। তবুও সহদেববাবু মেয়ের শ্বশুরবাড়ির কোনও ব্যাপারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে চাননি। তিনি চাইতেন মেয়ে এই বাড়িতে যে করেই হোক নিজের সুখটা ফিরে পাক। বেশি আদর করে যে বাচ্চাদের বড়ো করা হয় তারা সংসারে মানিয়ে নিতে একটু সময় নেয়। তবে তার বিশ্বাস ছিল মাধবীও একদিন অবশ্যই মানিয়ে নিতে পারবে এবং সুখীও হবে। তাই তিনি নিজে এমনকি মাধবীর মাও খুব কম এই বাড়িতে আসতেন। এত কাছাকাছি বাড়ি হয়েও তাদের আসা যাওয়া ছিল প্রায় নাম মাত্রই। কিন্তু এই ঘটনার পর থেকে তিনি আর এই বাড়ি ছাড়তে পারছেন না। একটার পর একটা মানসিক যন্ত্রণা তাকে ঘরে বসে থাকতে দেয় না। কী করে এত বড়ো কাণ্ডটা ঘটল তিনি এখনও বুঝতেই পারছেন না।




অনিরুদ্ধ-র মা ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াতেই সহদেববাবু উঠে দাঁড়ালেন। তার অগোছালো কাপড় পরা, অবিন্যস্ত চুল দেখে বোঝাই যাচ্ছিল তিনি শুয়ে ছিলেন। তার চোখগুলিও ফোলা ফোলা দেখাচ্ছে, তিনি সম্ভবত কাঁদতে কাঁদতে শুয়ে পড়েছেন। তিনি সোফায় বসতে গিয়ে বললেন, আপনি দাঁড়িয়ে কেন? বসুন।

অনিরুদ্ধ আজ কেমন আছে দিদি?

অনেকটা ভালো।

কথা বলছে?

না। একটু সময় চুপ করে রইলেন দু-জনেই। তারপর অনিরুদ্ধ-র মা আবার বললেন, দাদা কিছু মনে করবেন না, সেদিন মাথার ঠিক ছিল না তাই অনেক কটু কথা বলেছি। ওসব মনে রেখে আপনি আমাদের উপর অভিমান করে থাকবেন না।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সহদেববাবু। তিনি এই ব্যাপারে কিছু না বলে সরাসরি টপিকসে ঢুকে গেলেন, অনিরুদ্ধ সুস্থ হয়ে গেলে আমিও একটু নিশ্চিত হতে পারতাম দিদি। সত্যিই ঘটনাটা কী হয়েছে পরিষ্কার বুঝতে পারতাম। মেয়েটার আজ অব্দি কোনও খবর পেলাম না। বেঁচে আছে নাকি ওকে মেরে ফেলেছে কে জানে?

সহদেববাবু মুখে না বললেও মনে মনে ভাবলেন, অনিরুদ্ধ কথা না বলা অব্দি মাধবীরও কোনও খবর সম্ভবত পাওয়া যাবে না। আজ প্রায় দিন পনেরো হয়ে গেল তবু সে সুস্থ হয়ে উঠতে পারল না। আদৌ সে সে সুস্থ হবে তো? যদি সে আর সুস্থ না হয় আর মাধবীরও কোনও খবর পাওয়া না যায়, তাহলে? হায় ঈশ্বর বাকি জীবন কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে তাকে চলতে হবে কে জানে। সবাই বারবার কলঙ্ক লেপে দেবে তাদের উপর।

অনিরুদ্ধের মা কষ্টকল্পিত একটা হাসি ফুটিয়ে বললেন, আপনি বসুন দাদা। অনেকটা পথ হেঁটে এসেছেন। আমি একটু চা করি।

সহদেববাবু জোর বাধা দিয়ে বললেন, না না আমি চা খাব না, আপনি বসুন। একটু কথা বললে মনটা শান্তি পায়। কিছুতেই মনের শান্তি খুঁজে পাচ্ছি না। তাই আবোল তাবোল কথা বলি আর এদিক-ওদিক ঘুরি। ঠাকুরের কাছে একটাই প্রার্থনা করি সারাদিন, যদি অনিরুদ্ধ ভালো হয়ে ওঠে, যদি মেয়েটার কোনও খবর পাওয়া যায়।

বউমা-র কোন খবর এখনও পেলেন না তাহলে?



Popular Google Pages:

না। লাগিয়ে অ্যাকসিডেন্টের জায়গাটা বারবার খুঁজে দেখেছি, কিন্তু কিছুই ট্রেস করতে পারিনি। আমার এক ভাইপো আর ভাগনে মিলে সব তন্নতন্ন করে খুঁজেছে।

অনিরুদ্ধ-র মা মুচকি হাসলেন। তার এই হাসির মধ্যে একটা রহস্য যেন লুকিয়ে আছে। যা তাদের আলোচনার তাল বা লয়ের সাথে মিলছে না।

অনিরুদ্ধ-র মা বললেন, কেন মেয়ের জন্য এত করছেন বেয়াইমশাই? আপনার শরীরটার দিকেও তো নজর দিতে হবে। আপনি আর আগামীকাল থেকে মেয়েকে খুঁজতে বেরুবেন না। আপনাকে দেখে আমার ভীষণ খারাপ লাগছে।

এসব কি বলছেন? মেয়েটা কোথায় ভ্যানিশ্ হয়ে গেল খুঁজে দেখতে হবে না? এত বড়ো অ্যাকসিডেন্টের পর মেয়েটা কোথায় হারিয়ে যেতে পারে বলুন তো? এই পাহাড়ে তো বাঘ ভাল্লুক নেই যে খেয়ে নিয়েছে। তার বডিটা পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না।

আপনি ভুল করছেন দাদা। এটা অ্যাকসিডেন্ট নয়, ইটজ এ প্রি-প্ল্যানড্ মার্ডার ক্যাস।

কথাটা শোনা মাত্র সহদেববাবু যেন ভয়ানক চমকে উঠলেন। তার চোখ কোটর থেকে প্রায় বেরিয়ে আসার জোগার। তার এই অবস্থা দেখে নিজেকে সামলে নিলেন অনিরুদ্ধের মা।

তিনি আবার বললেন, আপনি অসুস্থ মানুষ তাই কথাটা আপনাকে বলা হয়নি। আপনি ভালো মানুষ বলেই আপনার মেয়ে সতী সাবিত্রী বলে ভাববেন না। আমার কপালের সাঙ্ঘাতিক জোর বুঝলেন তাই মরতে মরতেও আমার ছেলেটা অল্পের জন্য হয়তো বেঁচে যাবে। সে মরে গেছে ভেবেই ওকে ওরা ফেলে রেখে গেছে সেদিন।

এসব কী বলছেন আপনি? মার্ডার! কেন? অনিরুদ্ধ-র কোনও শত্রু থাকতে পারে নাকি? আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে নাতো দিদি?

না দাদা, ভুল হবে কেন? পুলিসের কথাটাই আমি বলছি আপনাকে। অনির শরীরে অনেক মারধরের স্পট্ পাওয়া গেছে। ওকে খুন করে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। কী বলছি আপনাকে বুঝতে পারলেন না? সে মরে গেছে ভেবেই খুনি ওকে ফেলে চলে গেছে।

সহদেববাবু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন অনিরুদ্ধ-র মা-র দিকে। এসব কি বলছেন মহিলা। তাহলে কী মাধবীকে তুলে নিয়ে গেছে কেউ?

আপনার কথা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না দিদি।

আমিও পারিনি দাদা। পরে বুঝেছি এটাই সত্য। বউমাকে হয় কিডন্যাপ করা হয়েছে নয়তো - ।

থামলেন কেন বলুন?

না না বলছিলাম আপনার মেয়ের কোনও অ্যাফায়ার ট্যাফায়ার কি ছিল কারো সাথে? মানে বিয়ের আগে সে কারো সাথে মেলামেশা করতো?

সহদেববাবু না বা হ্যাঁ কিছুই বলতে পারলেন না। তিনি অবাক চোখে বোকার মতো তাকিয়েই রইলেন। উওর না পেয়ে মহিলা আবার বললেন, সে আপনারা ভালো বলতে পারবেন। তবে প্রেম টেম যার সাথে করতো তার সাথেই মেয়ের বিয়ে দিলে পারতেন। যে কারণে আপনার মেয়ে আজ অব্দি এই সংসারে মনই বসাতে পারল না। আমি প্রথম দিনই বুঝতে পেরেছিলাম বুঝেছেন। ফুলশয্যার রাত পেরোলে স্বামী স্ত্রী-র যে শারীরিক ও মানসিক ভাষা থাকে তা ওদের মধ্যে ছিল না। তাও আমি অপেক্ষায় ছিলাম কিন্তু সেই সম্পর্ক আর তাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। আর সে কারণেই হয়তো পথের কাটা সরাতে গিয়ে আমার ছেলেটার জীবনটাই শেষ হতে বসেছিল। আমার ছেলের উপর আক্রমণের জন্য আমি কিন্তু কাউকেই সন্দেহের তালিকার বাইরে রাখছি না। যদি কোনও প্রমাণ আমার হাতে আসে তাহলে তাকে কিন্তু আমি জেল খাটিয়ে ছাড়বো।

দিদি! আঁৎকে উঠলেন সহদেববাবু। দয়া করে আর এমন কথা বলবেন না। আমার মেয়েকে আমি জানি সে কখনোই এমন কাজ করেতে পারে না। পুলিস পয়সা খেতে এসব কথা বলছে আপনারা ওদের প্রশ্রয় দেবেন না।

রাগে অপমানে সহদেববাবুর শরীরটা অস্থির হয়ে উঠল। অনিরুদ্ধ-র মার-র কথার মধ্যে যে ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে তা তো ভয়ঙ্কর। তার মানে মাধবী কারও সাথে মিলে অনিরুদ্ধকে খুন করতে চেয়েছিল? বিয়ের একবছর পর মাধবী কেন এমন করতে যাবে? তিনি এই কথাগুলি কিছুতেই মানতে পারলেন না। অনিরুদ্ধের খবর নিতে এসে মেয়ের শাশুড়ির যে চেহারা তিনি দেখতে পেলেন তা মোটেই আশার কোনও কথা নয়। তাহলে ওরা কি সবাই তাদের প্রতিপক্ষ ভাবছে। এই বাড়িতে আর সময় নষ্ট না করে তিন বেরিয়ে এলেন।

এমনিতেই এই ক-দিন অনিয়ম, ধকল, দুশ্চিন্তায় তিনি বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছেন, কিন্তু আজ মেয়ের শাশুড়ির মুখের কথা শোনে তার শরীরের সব শক্তিই যেন কোথায় হারিয়ে গেল। ফুটপাতে একটা চায়ের দোকানে একটা টুল টেনে চুপ করে বসে রইলেন। এসব কী বললেন এই মহিলা? কথাগুলি তার কানের মধ্যে এখনও বারবার তীব্র পটকার মতো আওয়াজ করে করে ফেটে যাচ্ছে আর তার মাথার সেরিব্রাম যেন গলে গলে বেরিয়ে আসছে। অথচ অনিরুদ্ধ-র মা-র কথাটার তিনি প্রতিবাদও করতে পারছেন না। কারণ যে সমস্যাটা চাপা দিতে তিনি জোর খাটিয়েছেন মেয়ের উপর তা যে তাকে প্রত্যাঘাত করবেই না তা তিনি একদিন ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু এতদিন পর মাধবী সেই পুরানো খেলায় আবার মেতে উঠেছে! না না তিনি একথা পুরোপুরি নস্যাৎ করেও দিতে পারছেন না। তাই নীরবে মহিলার কথা ক-টি শুনে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তবুও হার মেনে বসে গেলে এখন চলবে না। যদি মাধবী অপরাধী হয় তাহলে তাকে বিন্দুমাত্র সহযোগিতা তিনি করবেন না বরং তার যেন শাস্তি হয় সেই চেষ্টাই তিনি করে যাবেন। তবে সে যদি নিরপরাধ হয় তাহলে তাকে যথাযথ সাহায্যও তাকেই করতে হবে। তার শ্বশুর বাড়ির কেউ আর তার দিকে ফিরে তাকাবে বলে মনে হল না।

বাড়ি না ফিরে তিনি আবার নার্সিং হোমে যাবেন বলে মনস্থির করলেন। কেন যেন তার আর বাড়িতে ঢুকতে ইচ্ছে করছে না তিনি নিজেই জানেন না। সারাদিন খালি পাগলের মতো এখান থেকে ওখানে ছুটছেন। মেয়েটার একটা খোঁজ না পেলে তিনি মনেও তো আর শান্তি পাচ্ছেন না। তড়িঘড়ি একটা রিকশা ডেকে দ্রুত তিনি চড়ে বসলেন। আর সময় নেই হাসপাতালে গিয়ে জামাইকে দেখতে হবে। রিকশা যত সামনের দিকে এগোচ্ছে তিনি ততই মাধবীর ছোটবেলার কথা ভাবতে লাগলেন। দুই বিনুনি ঝুলিয়ে মেয়েটা যখন স্কুলে যেত তখন কত প্রাণবন্তই না ছিল। কিন্তু বিয়ের এক বছর ধরে মেয়েটা যেন রক্তশূন্যতায় ভুগছে। রাস্তায় দলে দলে বাড়ি ফেরা প্রতিটি মেয়ের দিকে হাঁ-করে তিনি তাকিয়ে রইলেন! আনমনে তিনি যেন মাধবীকে যেন ওই বাচ্চা মেয়েদের ভিড়েই খোঁজছেন। তার মেয়ে যে কবে কখন এত বড়ো হয়ে গেছে তার বিশ্বাসই হচ্ছে না। এই মেয়ে আবার তরুণকে পাওয়ার জন্য তার বৈবাহিক সম্পর্ক কবে অস্বীকার করতে পারবে? আর সে প্রেমকে সার্থক করার জন্য সে খুন পর্যন্ত করতে পারে! সত্যিই এমন কোনও খারাপ কাজ করে বসেনি তো মেয়েটা? যে কাজের জন্য তার সুন্দর ভবিষ্যৎ একদম ধ্বংস হয়ে যাবে? একটা প্রশ্ন তাকে ভয়ানক জ্বালাচ্ছে কিছুতেই রেহাই পাচ্ছেন না। কয়েকটা শব্দের অভিঘাত যে এত তীব্র হতে পারে তা এখন তিনি বুঝতে পারছেন। মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরুনোর পরও এই কয়েকটা শব্দ তাকে ক্রমাগত উৎপীড়ন করেই চলেছে।

হঠাৎ প্রকাশবাবুর কল এল, তিনি রিসভ করলেন। হ্যাঁ বলছি - দাদা বলুন - আমি।

আপনি কোথায় বেয়াইমশাই?

আমি রিকশায় আছি। নার্সিং হোমের দিকেই আসছি।

শুনুন একটা ভালো খবর আছে মশাই। অনিরুদ্ধ-র জ্ঞান ফিরেছে।

বলেন কী! ওহ ঈশ্বর! তুমি আমার কথা শুনেছ।

হ্যাললো - বেয়াই মশাই -।

বলুন - আমি শুনছি -।

আপনি তাড়াতাড়ি আসুন এখন বউমা-র সব খবর আমরা পাবো। আর আমার ঘরের বউকে কেউ আটকে রাখতে পারবে না। শুনুন বেয়াইমশাই - বলছি অনিরুদ্ধ আমাকে বলল সে আপনার সাথে কথা বলতে চায়। পুলিস আসার আগে আপনি যে করেই নার্সিং হোমে পৌঁছে যান। আপনার সাথে নাকি ওর অনেক কথা আছে।

এই তো আমি পৌঁছে যাচ্ছি।

আচ্ছা ঠিক আছে। আসুন তাড়াতাড়ি।

সহদেববাবুর মনটা আশায় ভরে উঠল। যাক তাহলে অনিরুদ্ধ সুস্থ হয়ে উঠছে। জামাইটা সুস্থ হয়ে উঠলে তার কাছ থেকে সত্যি কথাটা জানা যাবে। কোথায় হারিয়ে গেছে মাধবী? এবার জানা যাবে মাধবী কোথায় আছে, তার কী হয়েছে? তিনি রিকশাওয়ালাকে তাড়া দিতে লাগলেন, চলো ভাই চলো - তাড়াতাড়ি।

অনিরুদ্ধ-র জ্ঞান ফিরেছে। তাকে আই সি ইউ থেকে জেনারেল কেবিনে শিফট করা হয়েছে। প্রকাশবাবু চুপটি করে তার পাশে বসে রয়েছেন। ছেলের এইটুকু উন্নতিতে তিনি যে কতটা স্বস্তি পেয়েছেন তা তার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। সহদেববাবু কেবিনে যেতেই তিনি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।

আসুন আসুন বেয়াইমশাই, অনি-র শরীর এখন একটু ভালো। সে আপনার সাথে কথা বলতে চাইছে। আপন বসুন আমি আছি বাইরে।

সহদেববাবু ইতস্তত করে বললেন, না না বাইরে থাকবেন কেন? আমরা দু-জনেই একসাথে অনি-র সাথে কথা বলব।

প্রকাশবাবু হেসে বললেন, আপনার জামাই তো শুধু আপনার কাছেই কিছু বলতে চায়। জ্ঞান ফেরার পর থেকে সে আপনাকে খুঁজছে। আমি বাইরেই আছি, কথা শেষ হলে আমাকে ডাকবেন। মাগো তুমি আমার কথা শুনেছো মা, এবার আমার বউটাকে ফিরিয়ে দাও।

বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠল সহদেববাবুর। কী বলতে চায় অনিরুদ্ধ? মাধবী বেঁচে আছে তো? তার একমাত্র মেয়ের কোনও দুঃসংবাদ এই মুহূর্তে শুনতে পাবেন না তো? অনিরুদ্ধ-র কাছে গিয়ে তিনি আস্তে করে ডাকলেন, বাবা অনি - তুমি শুনতে পাচ্ছ? এখন কেমন আছো বাবা?

অনিরুদ্ধ চোখ খুলে তাকাল। তার চোখে বিস্ময় যেন এখনও লেগে আছে। অ্যাকসিডেন্টের দৃশ্যটা বোধ হয় এখনও তার চোখ থেকে যায়নি। সে এদিক-ওদিক কষ্ট করে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিল। না ঘরে কেউ নেই শুধু তারা শ্বশুর ও জামাই।

অনিরুদ্ধ আস্তে আস্তে করে উওর দিল, এই তো আছি - ভালোই আছি। আপনি আর মা?

আমাদের কথা ভেব না। আমরা তো তোমাদের কথা ভেবেই উন্মাদ হয়ে আছি। এখনও মাধু-র কোন খবর পাওয়া যায়নি। কোথায় হারিয়ে গেল মেয়েটা কিছুই বুঝতে পারছি না। কী বলবে বাবা তুমি আমাকে বল? আমি তোমার কাছ থেকে সব শুনতে চাই। আমাকে কিছুই তুমি লুকোবে না।

অনিরুদ্ধ একটু সময় চুপ করে রইল। তার চোখ যেন সামান্য আর্দ্র হয়ে উঠল। তারপর বলল, আপনি আমাকে কথা দিন এখন আপনাকে যা বলব তা আপনি কাউকে বলবেন না। আমার কথা শুনেও আপনি স্বাভাবিক থাকবেন? আপনি শপথ করে বলুন তাহলেই আমি আপনাকে সব বলব।

হ্যাঁ অনিরুদ্ধ, তুমি বল।

আবার চুপ করে ফেলল সে। কোন সুদূরে তার দৃষ্টি যেন হারিয়ে গেছে। টুল টেনে জামাই-র পাশে উন্মুখ হয়ে বসে রইলেন সহদেববাবু। না তিনি তাড়া দিলেন না। ধৈর্য্ ধরে বসে রইলেন জামাইয়ের কথা শুনার জন্য। অনিরুদ্ধ আবার নিজেকে সামলে নিয়ে বলতে লাগল। আমার কথা শুনে আপনি ভয় পাবেন না। আমি জানি এই কথাগুলি শোনার জন্য আপনি প্রস্তুত নন। তবুও আপনাকে না বলে আমিও শান্তি পাচ্ছি না। শুনুন, অযথা মাধু-র জন্য পাগলের মতো ঘুরে আর শরীর খারাপ করবেন না। ওর কিচ্ছু হয়নি সে ভালো আছে। আমার বিশ্বাস সে এই শহরেই কোথাও লুকিয়ে আছে।

চমকে উঠলেন সহদেববাবু। মানে! এসব কী বলছ তুমি?

হ্যাঁ। কথাটা আপনাকে ডেকে এনে বললাম কয়েকটি কারণে। প্রথমত তার জন্য যে উদ্বেগ আপনার মনে আছে সেটা কেটে যাবে। ওকে ফালতু খোঁজাখুঁজি থেকে আপনি বেঁচে যাবেন। তাছাড়া এর সাথে জড়িয়ে আছে বোস-বাড়ির সন্মান। কথাটা যেন কেউ জানতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখবেন। আমি আজ যা বলব তা আপনি কখনোই আমার মা-বাবাকে বা পুলিসকে বলতে পারবেন না।

তুমি আগে বলো অনি, আমি মাধুর সম্বন্ধে জানতে চাই। কোথায় চলে গেছে এই পাষাণী। তুমি আমাকে সব খুলে বল।

হ্যাঁ বলছি। এখুনি আর সব না বললে আর সময় হয়তো নাও পেতে পারি।

অনি! এসব কথা মুখেও উচ্চারণ করবে না তুমি। আমাদের জন্য তোমার মা-বাবা সবার জন্য তোমাকে সুস্থ হয়ে উঠতে হবে। তুমি শান্ত হয়ে বল আমি শুনছি।

দেখুন সেদিন গাড়িটা আসলে অ্যাকসিডেন্ট হয়নি। ফেরার পথে মাধু মোবাইলে কথা বলতে বলতে আমাকে বলল, একটু দাঁড়াও তো। আমি ভেবেছিলাম মাধু-র হয়তো কোনও সমস্যা হচ্ছে তাই দাঁড়িয়ে পড়লাম। আর তখনি আমার উপর তিন চারটি ছেলে আচমকা চড়াও হয়। আমাকে বেধড়ক মেরে ওরা আমাকে পাহাড়ের উপর থেকে নীচে ফেলে দেয়। একবারের জন্যও মাধু আমাকে বাঁচাতে আসেনি। আমার বিশ্বাস সে ওই ছেলেদের কারও সাথেই পালিয়েছে। এই কথাগুলি আপনি কাউকে বলবেন না প্লীজ। মাধু ভুল করেছে, সে আমার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে, আমি মরে গেলে সে ঠিক আবার বেরিয়ে আসবে দেখবেন।

সহদেববাবুর হাত পা সব ঠান্ডা হয়ে যেতে লাগল। এসি চলছে ঘরের ভিতর। তারপরও তিনি ঘেমে উঠলেন। তার মুখের সব কথা কোথায় হারিয়ে গেল। তিনি কী বলবেন কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। এবার তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল, তিনি হাঁপিয়ে উঠলেন। অনিরুদ্ধ কখনোই মিথ্যে কথা বলতে পারে না। আর যে সত্যি কথাটা সে এইমাত্র উচ্চারণ করেছে তা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তিনি বোবার মতো হাঁ-করে তাকিয়েই রইলেন মুখে কিছুই বললেন না।

অনিরুদ্ধ আবার বলল, বিয়ের আগে মাধু-র কারো সাথে যদি কোনও সম্পর্ক থেকে থাকে তার সাথে কথা বলুন। ওকে পেয়ে যাবেন। মাধুকে আমি খুব ভালোবাসি বাবা, সে এখন আরো বড়ো কোনও ভুল করে না বসে সেটা দেখবেন। ওই ছেলেগুলি ভালো নয়, তারা বিপদে পড়তে পারে বুঝতে পারলে মাধুকে সরিয়েও দিতে পারে। তবে আমি একটা ছেলেকে জানি তার সাথে মাধু-র সম্পর্ক এখনও আছে। বিয়ের আগে এই ছেলেটাকেই মাধু বিয়ে করবে বলে বলেছিল।

এ-টুকুন ছেলে এত বড়ো হৃদয় পেল কোত্থেকে? এক্সে মেয়ে তার জীবন শেষ করে দিতে চায় তাকেও সে ক্ষমা করে দিতে পারে! এমন একটা হীরের টুকরো ছেলের মনটা মেয়েটা চিনতে পারল না? দুঃখে রাগে ভিতরে ভিতরে দুমড়ে মুচড়ে শেষ হয়ে যেতে লাগলেন সহদেববাবু।

আসলে আমরই বিরাট ভুল হয়ে গেছে বাবা। মাধু বারবার আমাকে বারণ করা সত্বেও আমি গুরুত্ব দেইনি। ভেবেছিলাম বিয়ের আগের এই ছেলেমানুষি হয়তো বিয়ের পর কেটে যাবে। আজ বুঝতে পারছি মাধু তার প্রেম নিয়ে কতটা সিরিয়াস ছিল।

একটা দীর্ঘশ্বাস বয়ে গেল অনিরুদ্ধ-র। কী বলবেন সহদেববাবু তাকে কিছুই মনস্থির করতে পারলেন না। তার ভিতরে এখন যে ঝড় বইতে শুরু করেছে তা যেন তাকে ভেঙেচুরে শেষ করে দিবে। তিনি আর একটিও কথা বলতে পারলেন না। মাথা নুইয়ে চুপ করে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলেন অনিরুদ্ধ-র বাবা বসে আছেন। তাকে দেখেই তিনি লাফিয়ে উঠলেন। কী কথা হল? কী বলেছে জামাই?

সে সুস্থ হয়ে যাবে দাদা। মাধুকে খুঁজে বেরে করেতে বলেছে।

হ্যাঁ, এটা ঠিক বলেছে। বউমা-র যে কী হল কিছুই বুঝতে পারছি না। তার কোনও ট্রেস্ই পাওয়া যাচ্ছে না! পাবো পাবো তাকেও খুঁজে পাবো মশাই আপনি দেখে নেবেন। ছেলে ফিরেছে যখন তখন বউও ফিরবে।

আমার তা মনে হচ্ছে না দাদা! আমার মনে হয় আপনার বউমা মরে গেছে।

বেয়াইমশাই! এসব কী বলছেন আপনি? আপনি ওর বাবা!

তাই তো কষ্ট বেশি পাচ্ছি। বাবা হওয়া কখনো কখনো মনে হয় অপরাধ।

প্রকাশবাবুও বিষণ্ণভাবে তাকালেন তার বেয়াইমশাই-র দিকে। কেন এমন কথা বললেন সহদেববাবুর মতো শান্ত মানুষটি? কী বলল অনিরুদ্ধ যা তাকে দুঃখ দিতে পারে? আর এখন কী সান্ত্বনা তিনিই বা দেবেন তাকে? একদিকে ছেলের এই অবস্থা অন্যদিকে বউটির কোনও খবর নেই। এরই মধ্যে ঘরে বাইরে নানান আজেবাজে কথাও উঠতে শুরু করেছে। প্রকাশবাবু এসব কথা বিশ্বাস করেন না। নিজের মেয়ে আর ছেলের বউয়ের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায় তিনি বুঝতে পারেন না। চশমা খুলে ঝাপসা কাচটা ধূতির খুঁটে একবার পরিষ্কার করে নিলেন। অবাধ্য চোখের জলটা কেন যে কারণে অকারণে বারবার বেরিয়ে যায়!

আমার বউমা-র কিছু হবে না বেয়াইমশাই, সে আবার আমার ঘরে ফিরে আসবে আপনি আমার কথা মিলিয়ে নেবেন একদিন।

সহদেববাবু আর কিছুই বলতে পারলেন না। তিনি নীরবে নার্সিং হোম থেকে বেরিয়ে ঘরে চলে এলেন। বাড়ি ফিরে তিনি ঘরে বন্দী হয়ে রইলেন। সারাদিন তার শরীর যেন এক অব্যক্ত জ্বালায় জ্বলতে লাগল। কাউকে কিছু বলতেও পারছেন না। অন্য কারোর সাথে আলোচনা করলে মনের বোঝা কিছুটা হাল্কা হয়। কিন্তু অসুস্থ স্ত্রী-র সাথে তিনি এই ব্যাপারে কোনও কিছুই আলোচনা করলেন না। এমনকি এত বড়ো ঘটনার খুব সামন্যই তাকে তিনি জানিয়েছেন।

এখন অনেক রাত ঘরে পায়চারি করছিলেন সহদেববাবু। কোথায় যেতে পারে মাধবী? সে কী আবার সেই তরুণেরই পাল্লায় পড়ে গেল? অনেক কষ্ট করে এই যন্ত্রণার হাত থেকে উদ্ধার করেছিলেন। মেয়েও বিয়ের পিড়িতে বসতে সন্মতি দিয়ে বলেছিল, আর কখনো ওই ছেলের সাথে সন্মন্ধ রাখবে না। তাহলে কী এমন ঘটেছিল মাধবীর জীবনে যা ওকে এত বড়ো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করল। অনিরুদ্ধ মিথ্যা বলতে পারে না। মাধবী তাকে খুন পর্যন্ত করে ফেলতে চেয়েছিল? কথাটা মাথাটা আসতেই তার সমস্ত স্নায়ুতন্ত্র যেন আচমকা দপ করে থেমে গেল। তিনি আর কোনও শক্তি শরীরে খুঁজে পেলেন না। কিন্তু কেন মাধবী এমন করতে গেল? কী কম ছিল অনিরুদ্ধ-র মধ্যে? অমন সোনায় মোড়ানো ছেলেকে জামাই করতে পেরে সব মেয়ের বাপের ধন্য হয়। আর তুই ওকে সামন্য ভালবাসাটুকু তো দিলি না! ওকে মেরে ফেলার চক্রান্ত পর্যন্ত করে ফেললি। না না আর ভাবতে পারছেন না সহদেববাবু। তার মেয়েটা পড়াশুনায় এত ভালোছিল, গানে নজর কাড়া শিল্পী ছিল - তার রুচি এত ছোট হতে পারে? সে এত বড়ো ভুলটা করতে পারলো? বড্ড কঠোর চোখে আয়নার দিকে তাকালেন সহদেববাবু। মাধবী তার আগে যে ভুলটা করেছিল তার জন্য তিনি তাকে মাফ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার যে ভুলটা সে করেছে তার জন্য তাকে আর মাফ করা যায় না। তিনি পিতা হলেও একটা এত বড়ো অপরাধকে ক্ষমা করতে পারবেন না। অনিরুদ্ধ যতই তার উপর বিরক্ত হয় হোক, একজন অপরাধী এইভাবে ছাড়া পেয়ে যেতে পারে না।

দরজায় এসে দাঁড়ালেন দিপালী। স্বামীর এই ছন্নছাড়া জীবনযাপন তিনি লক্ষ্য করছেন মাধবীর নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই। মেয়ে জামাই-র দুর্ঘটনার পর তিনি যেন একটু বেশিই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। হওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। আজকাল কতই তো অ্যাকসিডেন্ট হয়, কত মানুষের জীবনে স্থায়ী পঙ্গুত্ব নিয়ে আসে। সময় সুযোগে প্রাণও কেড়ে নেয়, এসব নিয়েই চলছে আধুনিক জীবন। কিন্তু আজ তাকে যেন বেশিই মনমরা মনে হচ্ছে তার।

কিগো, ঘুমোবে না?

চমকে উঠলেও নিজেকে সামলে নিলেন সহদেববাবু। হেসে বললেন, তুমি ঘুমোওনি এখনো?

ঘুম পাচ্ছে না। তোমার ঘরে আলো জ্বলছে দেখে এলাম। ভাবলাম এত রাতে কী করছো তুমি।

কিছু না। আজ মনটা একটু ভালো লাগছে তাই রাত জাগছি। তোমাকে বলিনি বুঝলে, অনিরুদ্ধ-র আজ জ্ঞান ফিরেছে, সে এখন অনেকটাই সুস্থ। আজ কেবিনের বাইরে আনা হয়েছে তাকে। অনিরুদ্ধ আমার সাথে কথাও বলেছে। যদিও তার শারীরিক কষ্ট এখনও রয়ে গেছে। কিন্তু আমার বিশ্বাসে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে। আমার মন বলছে তার কোনও ক্ষতি হবে না।

তাই! আমাকে আগে বলবে তো।

দিপালীদেবী দেয়ালে টাঙানো মা-কালীর ক্যালেন্ডারের দিকে দু-হাত তুলে প্রণাম করলেন। তারপর আচমকা প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা মাধু এসেছিল? মাধু-র সাথে জামাই-র কথা হয়েছে?

কেন হবে না? হয়েছে তো ওরা তো, অনেকটা সময় ওরা বসে বসে কথা বলল। অবশ্য ডাক্তার বারণ করেছে জামাইকে যেন বেশি বিরক্ত করা না হয়। তাই আমরা বারণ করেছি এখন বেশি কথা বলতে।

বাব্বা ঠাকুর আমার ডাক শুনেছেন। আচ্ছা তুমি মাধুকে একবার আসতে বলবে তো। অ্যাকসিডেন্টের পর মেয়েটা একবারও এল না বাড়িতে। ওর শ্বশুর বাড়ি গিয়েও তার দেখা পেলাম না সেদিন। কোথায় থাকে মেয়েটা?

সহদেববাবু এ কথার কোনও উত্তর দিলেন না। তিনি যে কী লড়াই ঘরে বাইরে করছেন সেটা কাউকে না বলে বুঝানো যাবে না। ঘরে খবরের কাগজ বন্ধ করে দিয়েছেন। টিভির নিউজ চ্যানেলগুলি সব সময় বন্ধ করে রাখেন যেন তার স্ত্রী ওখান থেকে মাধবীর কোনও খবর না পেয়ে যায়। যদি মাধবীর খবর তার কানে কোনও কারণে চলে আসে তাহলে আর উপায় থাকবে না। এই অসুস্থ মহিলাটি তার মেয়ের এমন কর্ম কিছুতেই মেনে নিতে পারবেন বলে মনে হয় না। তখন তাকে সুস্থ রাখাটাই আরো এক ঝামেলা হয়ে যাবে।

তিনি আনমনেই যেন জিজ্ঞেস করে বসলেন, আচ্ছা ওই যে একটা ছেলে যাকে বিয়ে করবে বলে মাধু জেদ ধরেছিল তার নামটা মনে আছে তোমার?

সে তো তরুণ। কেন?

না-না এমনিই।

হঠাৎ তোমার একথা মনে পড়ল কেন?

না আজ ছেলেটার সাথে আচমকা দেখা হয়ে গেল।

কোথায়?

নার্সিংহোমের কাছেই।

সে কি অনিরুদ্ধকে দেখতে এসেছিল?

না। সে হয়তো এ-পথেই কোথাও যাচ্ছিল। আচ্ছা ওসব ছাড়ো, এসো আমরা এক সাথে ঘুমোব আজ, ভীষণ একা একা লাগছে।

স্বামীর এমন কথা শুনে হেসে ফেললেন দিপালী। মাধবীর জন্মের পর থেকে তারা আর একই বেডে রাত কাটায়নি। তাদের মেয়ে কোনওদিন দেখেনি মা বাবা একসাথে শুতে। বড়ো হয়ে মাধবী মাঝে মাঝে প্রশ্ন করতো, কিগো মা তোমাদের তো কোনওদিন একসাথে শুতে দেখিনি। তোমরা আসলেই হাজবেন্ড-ওয়াইফ তো? দিপালী মেয়ের কথা শুনে হাসতেন, বকতেন। আজ হঠাৎ তার বরটি অসুস্থ স্ত্রীকে পাশে নিয়ে শুতে চাইছেন কেন? নিশ্চয় তার মনে কোনও দুশ্চিন্তা এসে বাসা বেঁধেছে। এত চাপা স্বভাবের মানুষ, না বললে কিছু বোঝার উপায় নেই। তিনি স্বামীর বিছানার অতিরিক্ত বালিশটা টেনে নিয়ে ডাকলেন, এসো এখন থেকে আমি এখানেই শুবো। এখন তো মা ভাগ হয়ে যাবে ভয়ে তোমার সাথে আর কেউ ঝগড়া করবে না।

◕ This page has been viewed 584 times.




Previous part     Next part


Top of the page



All Bengali Stories    18    19    20    21    22    23    24    25    (26)    

লেখকের অন্যান্য বই

বুনো গাঙের চর
শ্যামল বৈদ্য
Cover photo     Buy this book

পটভূমিঃ
১৯৪২-‘৪৩ সাল, ইংরেজদের শাসনকাল। যুদ্ধোন্মাদ পৃথিবীর রক্তক্ষরণ তখনও থেমে যায়নি। মুক্তির নেশায় সারা বিশ্বের সাথে ভারতও তখন উন্মুখ। দ্বিজাতিতত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের আগে বাংলার সর্বত্র চলছে তখন দাঙ্গা। জাতি বিদ্বেষের ভয়াবহতা দেখে গান্ধীজী এসেছিলেন নোয়াখালি। হাজার হাজার বছরের বাপদাদার বসতভিটে ছেড়ে হিন্দু বাঙালিরা তখন উত্তরপূর্বের আসাম ত্রিপুরা মেঘালয়ে পালাচ্ছে বাঁচার জন্য। সে সময় হাজারে হাজারে বিপন্ন মানুষ এসে উঠেছিল ত্রিপুরায়। ত্রিপুরার উদ্বাস্তুদের দুঃখের কাহিনি কোনও উপন্যাসে তার আগে লেখা হয়নি। উদ্বাস্তুরা কী করে ছড়িয়ে পড়েছিল ত্রিপুরার পাহাড়ে? কেমন করে আদিবাসীরা তাদের আপন করে বুকে ধরেছিল? দেশভাগ ও জাতি-উপজাতিদের সহাবস্থান নিয়ে শ্যামল বৈদ্যের মরমী কলমে সৃষ্টি হয়েছে ধ্রুপদী এই উপন্যাস। দেশভাগ নিয়ে এই অঞ্চলের মানুষের কথা এই প্রথম উপন্যাস আকারে পাঠকের কাছে।
Cover photo     Buy this book



ইতরবিম্ব
শ্যামল বৈদ্য
Cover photo     Buy this book

পটভূমিঃ
এলাকার সব মানুষ জানে লোকটি বনের পশু পাখির সাথে কথা বলতে পারে। সে ডাকলে পাহাড়ে এমন কোনও প্রাণী নেই যে অমান্য করবে। কিন্তু মানুষটা কম কথা বলে এবং ভীষণ রহস্যময়।মুচি সম্প্রদায়ের এই মানুষটি জড়িবুটি বিক্রি করে চলে। লোকে বলে তার অষুধ নাকি অব্যর্থ।তার বসবাসের জায়গাটিও লোকালয় থাকে দূরে। বাড়িতে এক বুড়ি আছে যে একদম ডাইনির মতো দেখতে। এই বুড়ি এমন বিচ্ছিরি খিস্তি খেউর করে, অবাঞ্ছিত মানুষ দেখলে কামড়াতে আসে -- ভয়ে তার বাড়িতে কেউ যায় না। শহুরে বাবুরা তাকে নানা খারাপ কাজেও ব্যবহার করে। মানুষ তাকে যেমন ভয় পায় তেমনি ঘৃণাও করে, তাকে কাজে লাগায় কিন্তু তার ছায়া মাড়ায় না। রিসার্চের কাজে এক শহুরে মেয়ে ও তার বন্ধু এই রহস্যময় লোকটার সন্ধান পায়। তারাও তাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। কিন্তু ওরা একদিন আবিষ্কার করে লোকটা জঙ্গলের প্রতিটি পশু পাখির সাথে কথা বলতে পারে। সে জানে প্রকৃতির নানান অষুধি গাছের সন্ধান। তাদের রিসার্চের বিষয়ের সাথে হুবহু মিলে যায় ওই লোকটার জ্ঞান। ওরা তাকে ফলো করতে থাকে। এদিকে কাহিনির মোড়কে তার কাছেই চিকিৎসার জন্য গোপনে ফেলে দিয়ে যায় আরেক শহুরে কন্যাকে। এক আদিম মানবের সাথে সভ্যতার তখন থেকে শুরু হয় সংঘাত। অসাধারণ প্রেম এবং ব্রাত্যজনের কথা ও সংস্কৃতি এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় ছড়ানো।
Cover photo     Buy this book



পত্তু গাঁয়ের গপ্পো
শ্যামল বৈদ্য
Cover photo    

পটভূমিঃ
‘গ্রুপ থিয়েটার’ পত্রিকা ২০০২ সালে ‘অবয়ব’ নাটকের জন্য প্রথম বছর বেছে নেন ‘কালীপ্রসাদ চক্রবর্তী স্মৃতি সারা বাংলা একাংক নাটক রচনা প্রতিযোগিতা’র শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে শ্যামল বৈদ্যকে। এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তিনি পেয়েছেন বহু পুরষ্কার। এই রাজ্যের নাট্যচর্চায় শ্যামল বৈদ্যের অবদান অনস্বীকার্য; প্রায় ত্রিশ বছর ধরে তাঁর কাছ থেকে আমরা পেয়েছি প্রচুর ছোটো বড়ো নাটক। সেই নাটকগুলিই গ্রন্থিত হয়েছে তাঁর দুটি প্রকাশিত নাট্য সংকলনে। ‘পত্তু গাঁয়ের গপ্পো’ তাঁর দ্বিতীয় একাংক নাটকের সংকলন; এই নাট্য গ্রন্থে রয়েছে আটটি অসাধারণ মজার নাটক। পাঠক এবং নাট্যকর্মী সবার জন্য থাকবে নতুন ঘরানা ও অনাস্বাদিত আনন্দের ডালি। বাস্তবতার নিগুঢ় তথ্য, ব্রাত্যজনের কথা ও গরিব লড়াকু মানুষের কথা দিয়ে তৈরি নাটকের ভাবনার বিষয় কিন্তু ভয়ানক জটিল। যে নাটক মাটির কথা, মানুষের কথা বলে তাই আছে এই সংকলনে।
Cover photo    

Top of the page