Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
Read & Learn
 

মজার গল্প

Bengali Story

All Pages   ◍    16    17    18    19    20    (21)     22    23   


সময়ের লাঠি

-হরপ্রসাদ সরকার


An offer to make a Website for you.

hostgator




সে অনেক দিন আগের কথা। এক বনে এক উচ্চমানের সাধু ছিলেন। তিনি একদিন তার এক শিষ্য, তপানন্দকে ডেকে বললেন, “হে পুত্র চিরদিনের মত হিমালয়ে সাধনার জন্য চলে যাচ্ছি। আমার গুরু আদেশ। কিন্তু যাবার আগে আমি আমার এই আশ্রমের সকল দায়িত্ব তোমার হাতে দিয়ে গেলাম। তুমি যোগ্য তাই তোমাকে এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে। আর এই নাও একটি দিব্য লাঠি। এটি যেমন-তেমন লাঠি নয়। এই লাঠির বিশেষ কিছু গুন আছে। এই লাঠি খুব সাবধানে প্রয়োগ করবে।”

তপানন্দ হাত জোড় করে বললেন “কেমন গুন গুরুদেব?”

গুরুদেবঃ হে বৎস, এই লাঠির দুইটি গুন আছে।

প্রথম গুনঃ তুমি যদি রাগে বা অভিমানে, কারোর ক্ষতির উদ্দেশ্য এই লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত কর তবে তোমার ভাগ্য তার কাছে চলে যাবে। তুমি ভাগ্যহীন, শ্রী হীন হয়ে পড়বে। তুমি হীন, দরিদ্র হয়ে যাবে। হে বৎস, আমরা রাগে বা অভিমানে কারোর ক্ষতি করার চেয়ে, নিজের অজান্তে নিজেদেরই ক্ষতি করি বেশী। কথায় বলে, পরের জন্য ফাঁদ পাতলে সেই ফাঁদে নিজেকেই পরতে হয়।

দ্বিতীয় গুনঃ তুমি আত্মরক্ষার কাজে যখন খুশি তখনই একে প্রয়োগ করতে পার। আর তখন সামনের জনের ভাগ্য তোমার কাছে চলে আসবে। সে তখন ভাগ্যহীন, শ্রী হীন, হত দরিদ্র হয়ে পড়বে।”

তপানন্দ হাত জোর করে বললেন, “গুরুদেব আমার ভাগ্য যদি অপরের কাছে চলে যায় তবে কি তাকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না?”

গুরুদেবঃ না পুত্র। ২৪ বছর পর্যন্ত তুমি আর তোমার ভাগ্যকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। তারপর তুমি তোমার অর্ধেক ভাগ্যকে শুধু ফিরিয়ে আনতে পারবে।

তপানন্দঃ কিভাবে গুরুদেব?

গুরুদেবঃ ঐ ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায়, তোমার মঙ্গল কামনায় তোমাকে আবার এই লাঠি দিয়ে আঘাত করে, তবেই তুমি তোমার অর্ধেক ভাগ্য ফিরে পাবে। আর এই ২৪ বছরের মধ্যে যদি সে মরে যায় বা অন্য দেশে চলে যায় তবে আর কোন উপায় নাই। তাই পুত্র এই লাঠি থেকে সাবধান।

যথা সময়ে গুরুদেব হিমালয়ে চলে গেলেন। এর কিছুদিন পরে তপানন্দ তার সেই লাঠি নিয়ে নগর ভ্রমণে বের হলেন। বিকাল বেলায় তিনি এক সুন্দর মাঠের পাশে বসে বিশ্রাম করছিলেন। সে মাঠে কিছু কিশোর খেলা করছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিল সেই নগরের এক অতি ধনী শেঠ এর সন্তান, লালচান। আর এক দিন মজুরের ছেলে হরিদাস। লালচানের খুব পয়সার অহংকার ছিল। সে ভাবত পয়সা দিয়ে সে সব কাজ করতে পারবে। আর এই পৃথিবী তার পদতলে থাকবে। ছেলেরা খেলা করতে করতে হঠাৎ ঝগড়া শুরু করে দিল। আর ঝগড়া শুরু হতেই লালচান, হরিদাসকে গালি দিতে দিতে দৌড়ে তপানন্দর কাছে এলো। তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে তার হাতের লাঠি ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়ে গিয়ে হরিদাসের পিঠে ভীষণ জোরে এক আঘাত করল। হরিদাস যন্ত্রণায় মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগল আর লালচান পাশে দাঁড়িয়ে হা-হা করে হাসতে লাগল।

তপানন্দ হায় হায় করে লালচানের পিছু ছুটে গিয়েও তাকে আটকাতে পারলেন না। শেষে তিনি লালচানের পিছু পিছু তাদের বাড়ীতে গিয়ে উঠলেন। তার বাবার কাছে গোপনে সব কথা খুলে বললেন। কিন্তু সেই শেঠ তপানন্দর কথা কিছুই বিশ্বাস করল না। তপানন্দ নিজের মতই আশ্রমে ফিরে এলেন। সেই রাতে সেই শেঠের গুদাম ঘরে ভীষণ আগুন লাগল। এক কানা কড়িও বাঁচানো গেল না। শেঠের অর্ধেক সম্পত্তিই সেই আগুনে ছাই হয়ে গেল। পরের দিন রাতে আরের গুদাম ঘরে আগুন। এভাবে কয়েকদিন যেতে না যেতেই সেই শেঠের সম্পত্তি দশ ভাগের এক ভাগের ও কম থেকে গেল। তখন শেঠের মনে পড়ল তপানন্দর কথা। শেঠ তপানন্দকে খুব খোঁজে বেড়ালেন। কিন্তু উনাকে কোথাও পাওয়া গেল না। শেষে নিজের বাকি সম্পত্তিকে বাঁচাতে সেই শেঠ এক উপায় করলেন। তিনি তার বাকি সব সম্পত্তি বেঁচে দিলেন। আর যা পেলেন তার কিছু অংশ নিজের কাছে রাখলেন আর বাকি টাকা নিয়ে তিনি হরিদাসের কাছে গিয়ে উঠলেন। তিনি হরিদাসকে সেই টাকা দিয়ে সব কথা খুলে বললেন। আরো বললেন, হরিদাস যেন এই টাকাতে ব্যবসা করে অনেক উন্নতি করে। তিনি তাকে অনুরোধ করলেন সে যেন লালচানের দুর্দিনে তাকে একটু সাহায্য করে।

সে দিন রাতেই সে শেঠ মারা গেলেন। তবে তিনি মরার আগে লালচানকে বললেন, “হে পুত্র, আমার সময় শেষ। আর আমার চলে যাবার সাথে সাথেই তুমি এক কঠিন সময়ে পড়বে। তোমার না থাকবে মান, না থাকবে ধন। খুব কষ্টের মধ্য দিয়ে তুমি চলবে। তবে তুমি সততা আর পরিশ্রমকে ছাড়বে না। আমি তোমার জন্য একটি চিঠি লিখে রেখেছি। এই নাও সেই চিঠি। এটি এখনই খুলবে না। ঐ কাঠের ছোট বাক্সটাতে রেখে দাও। আজ থেকে ঠিক ২৪বছর পরে যদি কোন এক সাধু এক লাঠি নিয়ে এসে আমাকে বা তোমাকে খোঁজ করে তখনই তার সামনে এই চিঠি খোলো। নচেৎ নয়। তখন সেই সাধু যা যা বলবে সেই মত কাজ করবে। তাহলে তোমার দুঃখ কিছু লাঘব হবে। আর যদি সেই সাধু না আসে তবে জানবে যে এভাবেই তোমার সারা জীবন চলবে।” এই বলে শেঠ চোখ বুঝলেন। কয়েকদিনের মধ্যেই তার সব কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলতে লাগল আর লালচান পড়ল অথৈ সাগরে। দেখতে দেখতে তার অহংকার দরিদ্রতায় বদলে গেল।

আজ লালচানের না রইল খাবার সংস্থান, না রইল পড়ার সংস্থান। সে দিনমজুরি করতে লাগল। কিন্তু কোন কাজই তো সে আগে শিখেনি, কোন কাজই তো সে জানে না, আবার বেশী পরিশ্রম ও করতে পারে না। তাই মানুষ তাকে দিয়ে কাজ ও করাতো না। তবু দয়া করে যারাই তাকে দিয়ে কিছু কিছু কাজ করাত, তারাও বলে-কয়ে কম পয়সা দিত। এ ভাবেই লালচানের দিন-আনে-দিন-খায় অবস্থা। তবে সে তার বাবার শেষ কথামত স্বভিমান ছাড়েনি, সততা ছাড়েনি, পরিশ্রমকেও ভয় পায়নি। সে বিনা কাজ করে কারো থেকে টাকা পয়সা নিত না।

ওদিকে হরিদাসের ব্যবসা দিনে দিনে আকাশ ছোঁয়া হয়ে গেল। বস্তায় বস্তায় তার কাছে টাকা আসতে লাগল। সে লালচানের বাবার অনুরোধকে ভুলল না। বহুবার সে লালচানকে সাহায্য করতে চেয়েছিল। কিন্তু লালচান বিনা মজুরিতে সাহায্য নেয়নি। ফলে কম বেশী সে হরিদাসের বাড়ীতেই চাকরের কাজ করত আর তাইই দিয়ে তার সংসার চলত। প্রায়ই সে রাতের বেলায় বাবার সেই চিঠির কথা ভাবত, সেই সাধুর কথা ভাবত। কিন্তু বাবার আদেশকে সে অমান্য করেনি। এমনি করে একে একে দুঃখের মধ্য দিয়ে ২৪টা বছর কেটে গেল।

শেষে একদিন সত্যিই এক সাধু লাঠি নিয়ে এসে হাজির হল। তার চেহারায় যেন এক দিব্য আভামন্ডল ছড়িয়ে আছে। তিনি লালচানের সেই ভাঙ্গা কুটিরে এসে লালচানের খোঁজ করলেন, তার বাবার খোঁজ করলেন। ২৪টা বছর পরেও লালচান, ছেলেবেলার সেই সাধুটিকে চিনিতে ভুল করল না। বাবা এই সাধুর কথাই বলেছিলেন। সে দৌড়ে এসে কাঁদতে কাঁদতে সাধুর পায়ে লুটিয়ে পড়ল। লালচানকে এই অবস্থায় দেখে তপানন্দের ভারী দুঃখ হল, দয়াও হল। তিনি মনে মনে তাকে অনেক আশীর্বাদ দিলেন, তার মঙ্গল কামনা করলেন।

লালচান তার সাধ্যমত সাধুকে আদর আপ্যায়ন করল। সে তার জীবনের সব ঘটনা সাধুর কাছে খুলে বলল। সে তার বাবার শেষ সময়ের সেই চিঠির কথাও বলল। সে সাধুকে সেই চিঠি এনে দিল। তাতে লালচানের দুঃখের কারণ বিস্তারিত ভাবে লেখা ছিল। লালচানের জন্য কিছু টাকা তিনি যে হরিদাসের কাছে জমা রেখে গেছেন, এই কথা ও লেখা ছিল। এবার লালচান বুঝতে পারল কেন হরিদাস সব সময় তাকে এত কাছে ডাকে? কেন তাকে এত সাহায্য করেতে চায়? সব কিছু তার কাছে দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে গেল।

সে সাধুকে জিজ্ঞাস করল এখন তার কি করনীয়। তপানন্দ বলল, “ হে বৎস, তুমি হরিদাসের কাছে টাকা চাইতে যেও না। টাকা আজ আছে তো কাল নেই। এটা তোমার চেয়ে ভাল কে বুঝতে পেরেছে! বরং তুমি হরিদাসের কাছ থেকে তোমার অর্ধেক ভাগ্যকে ফিরিয়ে নিয়ে আস। তাহলেই তোমার টাকা তোমার পিছু পিছু আসবে।”

-কিভাবে গুরুদেব?

- যে লাঠি দিয়ে তুমি হরিদাসকে আঘাত করেছিলে, সেই লাঠি দিয়েই হরিদাসকে তোমার মঙ্গল কামনা করে তোমাকে সজোরে সেই আঘাত ফিরিয়ে দিতে বল। এতে হরিদাসের কিছুই ক্ষতি হবে না তবে তোমার অনেক কিছু ঠিক হয়ে যাবে। যাও পুত্র এখুনি তুমি হরিদাসের কাছে যাও। আমি এখানেই তোমার অপেক্ষা করব।

লালচান তার বাবার সেই আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে, সাধুর কথা মতই কাজ করল। সে হরিদাসের কাছে গিয়ে সব খুলে বলল, বাবার চিঠিটি দেখাল। সে সজল নয়নে, করজোড়ে সেই লাঠির আঘাত বন্ধুর কাছে ভিক্ষা চাইল। হরিদাস তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। তক্ষুনি দুই বন্ধু লালচানের বাড়িতে চলে এলো। সাধুর কথা মত হরিদাস সজোরে সেই লাঠি দিয়ে লালচানের পিঠে আঘাত করল। এক আঘাতেই লালচান যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে ধুলায় লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু মনে বড় শান্তি পেল সে। মনে তার বড় আনন্দ ও ছিল। হরিদাস দৌড়ে গিয়ে ধূলার মাঝে পড়ে থাকা বন্ধুকে জড়িয়ে ধরল।

তপানন্দ লালচানকে বললেন, “হে পুত্র, আজ তোমার এক নতুন জন্ম হল। আবার তুমি তোমার জীবন নতুন করে শুরু কর। তুমি আবার তোমার ব্যবসা শুরু কর। আর এই নাও আমার আশীর্বাদ স্বরূপ কিছু পলাশ ফুল। এ দিয়েই তুমি তোমার নতুন ব্যবসা শুরু কর। কাল সরস্বতীর পূজা। বাজারে এই পলাশ ফুল গুলি বিক্রি করে তুমি ভাল পয়সা পাবে। সে পয়সাকে কাজে লাগিয়ে জীবনে তুমি এগিয়ে যাও, এই আশীর্বাদ করছি। তবে এই পলাশ ফুল তোমারি পলাশ ফুল। ২৪ বছর আগে আমি তোমাদের বাড়ী থেকে চলে যাবার সময় একটি পলাশ ফুলের চাড়া সাথে নিয়ে গিয়ে ছিলাম। আমি জানতাম আমি ২৪ বছর পর আবার এখানে আসবো আর তোমাকে এই হীন-দীন অবস্থায় দেখব। সে দিনের সেই গাছ আজ তোমাকে আবার নতুন পথ দেখাল।” চোর, পুলিশ আর বাড়ী মালিক সবাই সাধু বাবার কাছে মনের মনের কথা বলল।
Top of the page

ঈশ্বর রাজা

-হরপ্রসাদ সরকার

এক দশে এক রাজা ছিলেন। তিনি নিজেকে সর্বশক্তিমান ভাবতেন। তিনি ভাবতেন, ঈশ্বরই উনাকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন রাজত্ব করতে। তাই তিনিই ঈশ্বর। তিনি যা আদেশ দেবেন তা স্বয়ং ঈশ্বরেরই আদেশ। রাজা কখনো ভুল করতে পারেন না। রাজার ইচ্ছাই ঈশ্বরের ইচ্ছা।

কিন্তু কথায় বলে প্রদীপের তলাতেই অন্ধকার থাকে। তেমনি অনিচ্ছা স্বত্বে সারা প্রজা রাজার ভুল আদেশ মেনে নিলেও, রাজগুরু কখনোই রাজার ভুল আদেশকে মানতেন না। রাজগুরু ছিলেন মহাপন্ডিত আর সত্যিকারের সাধক। এত রাজ ঐশ্বর্যের মধ্যে থেকেও তিনি ফকিরের মতই থাকতেন। সব সময় তার মুখমন্ডল থেকে যেন এক দিব্য জ্যোতি নির্গত হত।

শেষে আর থাকতে না পেরে রাজা একদিন সভার মধ্যে রাজগুরুকে দুই চার কথা বলেই দিলেন। তিনি রাজগুরুকে জিজ্ঞাসা করলেন “হে গুরুদেব, আমার ইচ্ছাই ঈশ্বরের ইচ্ছা, আমার সিদ্ধান্তই ঈশ্বরের সিদ্ধান্ত। এই কথাটা যদি আপনি না মেনে নেন তাহলে আজি, এখনি আমি আপনাকে মৃত্যুদণ্ড দেব।”

রাজগুরু কোন কথাই বললেন না শুধু মুচকি, মুচকি হাসতে লাগলেন। রাজা চীৎকার করে উঠলেন। রাজসভা কেঁপে উঠল। রাজগুরু মুচকি হেসে নির্বাক ভাবে শুধু বললেন, “হে রাজন, আপনি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে আপনার ইচ্ছাই ঈশ্বরের ইচ্ছা, তবে আমি জানব আমার সব জ্ঞান, তপ মিথ্যা ছিল। আমার এত দিনের সাধনা সব মিথ্যা। ফলে ঐ ক্ষণেই আমি নিজেই আমার প্রাণ দিয়ে দেব।”

রাজা বললেন, “বেশ তবে তাই হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আগামীকাল আমি কোন মিষ্টি এবং অন্ন গ্রহণ করব না। দেখি কে আমাকে খাওয়াতে পারে! মনে রাখবে রাজার সিদ্ধান্তই ঈশ্বরের সিদ্ধান্ত। হে গুরুদেব, আপনার হাতে শুধু একদিন সময় আছে। কাল সারাদিন আপনিও আমার সাথে থাকবেন। সাক্ষী রূপে আরো দুই-চারজন মন্ত্রী সাথে থাকবে।” রাজগুরু মনে মনে খুব হাসলেন।

পরদিন রাজা সকাল বেলাতেই ফলাদি আহার করে সভাসদ নিয়ে সোজা জঙ্গলে চলে গেলেন শিকার করতে। তিনি চলতে চলতে গভীর বনে চলে গেলেন। সৈন্য সিপাহী সব পিছে রয়ে গেল। রাজা, রাজগুরু আর কয়েকজন সভাসদ এই গভীর বনে পথ হারিয়ে অনেক অনেক দূর চলে গেলেন। তাদের সাথে আর তখন কেউ রইল না।

সে ছিল এক সুগভীর বন। চারিদিকে উঁচু উঁচু গাছ যেত তীরের ফলার মত মাটিতে গেঁথে আছে। হিংস্র জন্তুরা চারিদিকে গর্জন করছে। রাজা আগে কোন দিন এমন পরিস্থিতিতে পড়েননি। মুখে তার সাহসের কথা থাকলেও হাত পা ভয়ে থরথরে কাঁপছে। বাকীদের ও একই অবস্থা। শুধু রাজগুরু নির্বাক, নির্ভীক ভাবে ফিরে আসার পথ খোঁজে চলছেন।

এমন সময় এক বিশাল বাঘ আকাশ ফাটা গর্জন করে সামনে এসে দাঁড়াল। চোখের পলকে হাওয়ার মত সব মন্ত্রীরা উঁচু উঁচু গাছে চড়ে বসল। রাজগুরু শুধু রাজার পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। রাজা এক হাত তুলে, দুই হাত তুলে বাঘকে অনেক ঈশ্বরের আদেশ দিলেন। অনেক ঈশ্বরের ইচ্ছার কথা শুনালেন। কিন্তু কোন কাজ হল না। দুষ্ট বাঘ, মূর্খ বাঘ ঈশ্বরের কোন কথাই কানে তুলল না। সে সর্ব শক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল রাজার উপর। কিন্তু রাজগুরুর তীক্ষ্ণ, প্রখর বুদ্ধি, ক্ষিপ্ততা আর সাহসিকতার জন্য রাজা বেঁচে গেলেন। বাকীদের মত তারাও দুইটি উঁচু গাছে চড়ে বসলেন। বাঘটি অনেক্ষন গাছের নীচে বসে থেকে, শেষে তার নিজের পথে জঙ্গলে চলে গেল।

কিছুক্ষণ পরেই সেই পথে একটি গরীব প্রজাকে আসতে দেখা গেল। তার মাথায় বিশাল একটি ঝুড়ি। হয়তো সে এখানে পথ হারিয়ে গেছে অথবা এই পথ দিয়ে আরের গ্রামে যাচ্ছে। সে রাজার গাছের নীচেই বসে বিশ্রাম করতে লাগল। সবাই ভাবল হয়তো সে এদিকের পথ ঘাট সব চিনে। তাকে বললে এই বন থেকে বের হবার রাস্তা হয়তো পাওয়া যাবে। এই ভেবে একে একে সবাই গাছ থেকে নামার মতলব করছিল, কি আচানক কয়েকশ ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনা গেল। সাথে “ হা রে রে রে ” শব্দে আকাশ যেন ফেটে যেতে লাগল।

কারোর বুঝতে বাকি রইল না যে বিশাল এক ডাকাতের দল আসছে। গাছের তলার সেই প্রজাটি চড়াই পাখির মতই ফুড়ুত করে উড়ে পালাল। তার সেই ঝুড়ি রাজার গাছের নীচেই রয়ে গেল। প্রাণ বাঁচাতে রাজা সহ সবাই যার যার গাছের আরো উঁচুতে উঠে একেবারে মগ ডালে গিয়ে বসল।

“হা রে রে রে” চীৎকার করতে করতে বিশাল এক ডাকাত দল সেখান এসে দাঁড়াল। এই গভীর বনে গাছের নীচে এমন সুমিষ্ট খাবারের গন্ধ পেয়ে ডাকাত সর্দার ঘোড়া থেকে নীচে নেমে এলেন। সাথে সাথে বাকী ডাকাতরা ঘোড়া থেকে নেমে এলো। ডাকাত সর্দার সেই ঝুড়ি খুলে দেখলেন তাতে অনেক রকমের মন লোভানো মিষ্টি। সাথে অন্ন, পায়েস, সব্জি, ডাল আরো কত কি খাবার জিনিস। তাদের থেকে দেশী ঘীয়ের গন্ধ ভেসে আসছে। চারিদিক খাবারের গন্ধে ম-ম করছে।

সর্দার আদেশ দিলেন, সবাই মিলে ভাগ করে খেয়ে নাও। ঠিক তক্ষুনি একজন সামনে এগিয়ে এসে বলল, “ সর্দার, আমি একটি খারাপ অভিসন্ধির গন্ধ পাচ্ছি। একবার ভেবে দেখুন, গহীন ঘন জঙ্গল, এখানে কোথাও কোন জন-মানব নাই। আসে পাশে দশ ক্রোশের মধ্যে কোন গ্রাম-হাট নাই। তবে কে এই খাবার রাখল? এটা নিশ্চয়ই আমাদের মারার জন্য রাখা হয়েছে। হতে পারে এতে বিষ মিশানো আছে। আমার মনে হয়, যে মানুষটি এখান এই খাবার রেখেছে, সে নিশ্চয়ই আসে পাশে কোথাও লুকিয়ে আছে। আমাদের খুঁজে দেখতে হবে।”

ঠিক তক্ষুনি ডাকাত সর্দারের নজর গিয়ে পড়ল মগডালে বসে থাকা রাজার উপর। রাগে সর্দার হৈ – হৈ করে উঠল। চার-পাঁচ জন ডাকাত গাছে চড়ে গেল রাজাকে নামিয়ে আনতে। নীচে নামলে রাজাকে যে মিষ্টি আর অন্ন খেতে হবে রাজা ঠিক বুঝতে পারলেন। তিনি কোন ভাবেই নিচে নামবেন না। ফলে ডাকাত দলের সন্দেহ আরো গভীর হল যে, এই ব্যাটাই এই খাবার রেখেছে আর তাতে নিশ্চয়ই বিষ মিশানো আছে। ফলে ডাকাতরা কিল, চড়, লাথি ঘুষি মেরে মেরে রাজাকে গাছ থেকে নীচে নামাল।

রাজা হাউ-মাউ করে কেঁদে কেঁদে যতই নিজের পরিচয় দিতে লাগলেন, এই খাবারের সত্যি ঘটনাটা বলতে লাগলেন, ততই আরো বেশী কিল-চড়-লাথি খেতে লাগলেন। ফলে রাজা একদম মুখ বন্ধ করে রাখলেন।

ডাকাত সর্দার তাকে আদেশ দিলেন এই খাবার খাওয়ার জন্য। এতে প্রমাণ হবে এতে বিষ মিশানো নাই। কিন্তু রাজা জানেন রাজগুরু সহ সবাই অন্য গাছের আগায় বসে তাকে দেখছেন। রাজা কিছুতেই এই মিষ্টি আর অন্ন খেতে চাইলেন না। কিন্তু নির্দয় ডাকাত সর্দার সে কথা শুনবেন কেন? খুব মার মারা হল রাজাকে। তারপর দু-জন ধরল রাজার দুই হাতে, দুই জন রাজার দুই পায়ে আর ডাকাত সর্দার স্বয়ং রাজার মুখ টিপে ধরল। মুখ টিপে ধরে সে রাজার মুখের ভীতর মিষ্টি আর অন্ন ঢুকিয়ে দিল। কাঁদতে কাঁদতে রাজা মিষ্টি আর অন্ন খেতে লাগলেন আর করুন চোখে বাকি গাছ গুলির দিকে দেখতে লাগলেন। সর্দার আরো কিছু খাবার ঠুসে দিল রাজার মুখে। রাজার মরতে মরতে সে খাবার ও খেতে লাগলেন।

রাজাকে খাবার ঠুসে, একেবারে নিশ্চিত হয়ে, ডাকাতরা সবাই মিলে মহানন্দে সেই খাবার খেল। তারপর শক্ত দড়ি দিয়ে রাজাকে বেঁধে তারা তাদের পথে পালিয়ে গেল।

বিপদ কেটে গেছে দেখে একে একে বাকিরা সবাই গাছ থেকে নেমে এসে রাজাকে মুক্ত করলেন। লজ্জায়, সরমে রাজা মাথা তুলতে পারছিলেন না। জীবনের এক চরম অভিজ্ঞতা হল। ঈশ্বর রাজার ঈশ্বরত্ব আজ ছুটে গেল। উপস্থিত সবাই মিটিমিটি হাসছিল, কিন্তু রাজগুরুর মনে শুধু শান্তি ছিল না। রাজার অপমান নিজের অপমান। রাজার এই অপমান তিনি সত্যি চান নি।


Top of the page
All Pages     16    17    18    19    20    (21)     22    23   

Amazon & Flipkart Special Products

   


Top of the page