Home   |   About   |   Terms   |   Book Rent   |   Contact    
A platform for writers

শিক্ষাসংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : অনন্য এক মহীরুহ

Bangla Article

------ বিজ্ঞপ্তি ----------
# 'নগেন্দ্র সাহিত্য পুরস্কার' স্বরচিত গল্প লেখার প্রতিযোগিতা, মে -২০২২ Details..
# গপ প্রতিযোগিতা, জুন ২০২২ ( হাসির নতুন দিগন্ত ) Details..
--------------------------

All Bangla Articles    1    2    3    ( 4 )     5    6    7   

শিক্ষাসংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : অনন্য এক মহীরুহ
প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা, সেপ্টেম্বর, ২০২১-এর একটি নির্বাচিত প্রবন্ধ
লেখক - সৈকত সাহা, বাবা - শ্রী শ্যাম সুন্দর সাহা, দেয়ারা পাড়া রোড, নবদ্বীপ, নদীয়া


## শিক্ষাসংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর : অনন্য এক মহীরুহ
লেখক - সৈকত সাহা, বাবা - শ্রী শ্যাম সুন্দর সাহা, দেয়ারা পাড়া রোড, নবদ্বীপ, নদীয়া

"শুধু পড়ালেখা নয়, মানুষের অন্তর্নিহিত পরিপূর্ণ বিকাশই হল শিক্ষা" - -স্বামী বিবেকানন্দ

এ কথাটির মর্মার্থ যেন বহু আগেই বুঝতে পেরেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়। শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানলাভ করলেই যে শিক্ষা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় না, অন্তর আত্মার জাগরণ আর বিকাশের মধ্যেই দিয়েই যে প্রকৃত শিক্ষার দ্বার খুলে যায় তা তো তিনিই আমাদের বুঝিয়েছিলেন। আর এই শিক্ষাই তো তিনি বাংলা তথা সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। জ্ঞানের মানস-চক্ষু যে কত বড়ো হতে পারে তার প্রকৃত উদাহরণ তো তিনিই।

সময়টা উনিশ শতক, বাংলায় তখন 'নবজাগরণ' শুরু হয়েছে। ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার, অশিক্ষা-কুশিক্ষা থেকে সমাজকে উদ্ধার করতে, বরং বলা ভালো নতুন পথ দেখাতে অক্লান্ত চেষ্টা করে চলেছেন একদল মনীষী। এনাদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন 'ভারত-পথিক' রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ডিরোজিও প্রমুখ। বাংলার সমাজ তখন কুসংস্কারে ডুবে আছে। চারিদিকে শুধু ধর্মীয় গোঁড়ামি আর অশিক্ষার বেড়াজাল। এই বেড়াজাল ভেদ করার কাণ্ডারি হয়ে এলেন বিদ্যাসাগর। সমাজে তখন প্রচলিত ছিল জাতিভেদ, বর্ণভেদ প্রথা, উঁচু-নিচু ভেদাভেদ। বাংলার হিন্দুসমাজে তখন ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের আধিপত্য। তাদের বিপক্ষে গিয়ে কেউ কথা বলবেন, রুখে দাঁড়াবেন এমন মানুষ কোথায়! তাই তাদের দেওয়া বিধান অনুসারে সমস্ত অত্যাচার নীরবেই সহ্য করতে হত তথাকথিত নীচুতলার মানুষদের। সেইসমস্ত পণ্ডিতদের তোষামোদ করেই দিন চালাতে হতো মানুষকে, আর কেউ যদি এর বিরুদ্ধাচরণ করতো, সে হয়ে যেত একঘরে। সমাজ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হতো। ব্রিটিশ শাসকরাও প্রথমদিকে এ বিষয়ে তেমন মাথা ঘামাতে চাননি, কারণ তারা বুঝেছিলেন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজকে চটিয়ে দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

আসলে বাংলায় সে সময় তিন ধরনের শ্রেণিকে লক্ষ্য করা যায়। এদের মধ্যে একদল হল সনাতন হিন্দু সমাজ। যারা হিন্দু ধর্মের পৌত্তলিকতা রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পাশ্চাত্য প্রভাব যেন কোনোভাবে ভারতীয় সমাজে না পড়ে। আর একদল ছিলেন খুব শিক্ষিত ও পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুসরণকারী। এনারা এই সব কুপ্রথার ভীষণ বিরোধী থাকলেও, তেমন কোনও প্রভাব গড়ে তুলতে পারেননি। আর এরপর যাদের কথা আসে, তারা হলেন প্রকৃতপক্ষে উদার ও মুক্তমনা মানুষ। যারা প্রগতিশীলতায় বিশ্বাসী ছিলেন। এনারাও পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন। কিন্তু এনারা দেশীয় সমাজকে অবজ্ঞা করতে চাননি। তারা চেয়েছিলেন শুধুমাত্র সমাজের কুপ্রথা ও অশিক্ষাকে দূরে সরিয়ে আলো ছড়িয়ে দিতে মানুষের মধ্য। আর এই আলো যার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল সেই সূর্য ছিলেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বিখ্যাত 'ধর্মমোহ' কবিতায় বলেছিলেন,
"ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো
এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো।"
এই কাজই শুরু করেছিলেন বিদ্যাসাগর। তিনি যে শুধু সমাজ সংস্কারক ছিলেন তা নয়, একাধারে শিক্ষা সংস্কারকও ছিলেন। অজ্ঞানতা ও অশিক্ষাকে দূর করার একমাত্র মাধ্যম যে শিক্ষা, তারই প্রসার তিনি চেয়েছিলেন। আর তাঁর এই শিক্ষাবিস্তারের পথের সূচনা হয় ১৮৪১ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রধান পণ্ডিত পদে যোগদানের মাধ্যমে। তবে শিক্ষাকে কখনই তিনি জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হিসাবে তিনি দেখেন নি। তার কাছে শিক্ষা ছিল মানবসত্তার বিকাশ ও উত্থানের সোপান বিশেষ। এখানে তিনি পাঁচবছর শিক্ষকতা করেছিলেন। এরপর ১৮৪৬ সালে তিনি সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদকের পদে নিযুক্ত হন। ১৮৪৭ সালের প্রকাশিত হয় হিন্দি 'বেতাল পচ্চিসী' অবলম্বনে রচিত তার প্রথম গ্রন্থ 'বেতাল পঞ্চবিংশতি'। বিরাম চিহ্নের সফল ব্যবহারও এই গ্রন্থেই প্রথম হয়। তিনি সম্পাদনা করেছিলেন 'অন্নদামঙ্গল' কাব্যের, যেটি ছিল সংস্কৃত প্রেসের প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ।

১৮৪৭ সালে তিনি সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদকের পদ থেকে ইস্তফা দেন। এরপর ১৮৫০ (মতান্তরে ১৮৫১) সালে তিনি ওই সংস্কৃত কলেজেরই সাহিত্যের অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন। মাঝে অবশ্য তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের হেডরাইটার ও কোষাধ্যক্ষের পদ সামলে ছিলেন। তিনি এই কলেজে অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হয়ে দেখেছিলেন সেখানে শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ ও বৈদ্যরাই পড়ার সুযোগ পেত। এরপর তিনি যখন এই কলেজের অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হলেন তখন তিনি এই কলেজের দ্বার সব বর্ণের ছাত্রদের জন্য খুলে দিলেন। তিনি বুঝেছিলেন ধর্মীয় গোঁড়ামি কখনও শিক্ষার অন্তরায় হতে পারে না।

প্রাচীনকাল থেকেই এদেশে চলে আসছে ধর্মীয় অনুশাসন। প্রাচীনকালে আমরা যেমন দেখেছি সমাজ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রীয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। কালক্রমে তা চলেই আসছিল, ব্রাহ্মণ বাদে বাকী সবাই সবরকম সুবিধা ভোগ করতে পারতো না। বিদ্যাসাগর এই নিয়ম মানতে চাননি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন শিক্ষা সবার। জ্ঞানের আলোকে সবাইকে আসতে হবে। তিনি হিন্দু পঞ্জিকা নির্দেশিত তিথি-নক্ষত্র দেখে ছুটি দেওয়ার রীতি বাতিল করে পরিবর্তে রবিবারকে ছুটির দিন হিসাবে ধার্য করেন। তিনি যে ধর্মান্ধ ছিলেন না বরং আধুনিক মনোভাবাপন্ন ছিলেন, এটা তার অন্যতম উদাহরণ। নিয়মানুবর্তিতার ব্যাপারেও তিনি ছিলেন কঠোর। কলেজে শিক্ষকদের ইচ্ছামতো যাওয়া - আসা বন্ধ করে তিনি নতুন নিয়ম বলবৎ করেছিলেন।

শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব যে অপরিসীম তা তিনি অনুধাবন করেছিলেন। তাই তো লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৮৪৪ সালে ১০০ টি বাংলা বিদ্যালয় স্থাপনের কথা ভাবলে বিদ্যাসাগর মহাশয় তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৮৫৩ সালে তিনি তার জন্মভূমি বীরসিংহ গ্রামে অবৈতনিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও বড়োলাট লর্ড ডালহৌসি ও ছোটলাট হ্যালিডের অনুমোদন স্বরূপ তিনি হুগলী, মেদিনীপুর, বর্ধমান ও নদীয়া জেলায় ৫ টি করে মোট ২০ টি বাংলা স্কুল স্থাপন করেন। এবং তারই তত্ত্বাবধানে ৫ টি মডেল স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার একটি নর্মাল স্কুল গড়ে তোলেন। তিনি মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন (বর্তমানে বিদ্যাসাগর কলেজ) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তার শিক্ষাবিস্তারের আর একটি সবথেকে বড়ো দিক হল নারীশিক্ষা বিস্তার। তিনি সত্যিকারের একজন নারী-হিতৈষী ছিলেন। এ প্রসঙ্গেই বলাই যায়, তিনি ভারতবর্ষের নবজাগরণের পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায়ের প্রকৃত উত্তরসূরী ছিলেন। রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রদ করেছিলেন আর বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ চালু করেছিলেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার 'নারী' কবিতায় বলেছিলেন,
"এ বিশ্বের যা কিছু মহান চির কল্যাণকর
অর্ধেক করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।" বিদ্যাসাগর সত্যিই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন তাই তো তিনি এই অমোঘ সত্যি আগেই অনুভব করে নারীশিক্ষার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। শুধুমাত্র প্রকৃত শিক্ষার অভাবে নারীজাতি পিছিয়ে থাকবে তা হতে পারে না, এই ভেবে তিনি নারীশিক্ষার আর এক পথিকৃৎ জন এলিয়ট ড্রিঙ্ক ওয়াটার বেথুনের সাহায্যে তিনি বাংলার বিভিন্ন জেলায় মোট ৩৫ টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ১৩০০ ছাত্রছাত্রী এই বিদ্যালয়গুলিতে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিল। তিনি কলকাতায় হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন, যা পরে বেথুন স্কুলে রূপান্তরিত হয়। তিনি নারীদের শিক্ষার অগ্রগতির জন্য একটি অর্থায়নের ব্যবস্থা করেন, যা নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠা-ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল। এখান থেকে মেয়েদের শিক্ষার জন্য অর্থ সরবরাহ করা হতো। তিনি মায়ের স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে তার নিজ গ্রামে বীরসিংহ ভগবতী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যাসাগরের এই কর্মকাণ্ডের পর আরও নারী-বান্ধব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ১৮৬৪ সালের মধ্যে বাংলায় ২৮৮ টি বালিকা বিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল। নারীকে তিনি প্রকৃত সম্মান দিতে চেয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন নারী যেখানে সম্মান পায়, সেখানেই ভগবান বাস করে।

তিনি মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি কখনই পাশ্চাত্য শিক্ষার গুরুত্বকে অস্বীকার করেন নি। দেশীয় ও পাশ্চাত্য শিক্ষার মেলবন্ধনে তৈরি এক সম্বন্বয়ী শিক্ষার প্রচলন তিনি করেছিলেন। সংস্কৃতে পড়াশোনা করার মধ্যে তিনি কিছু পরিবর্তন আনেন। বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজে অধ্যক্ষ হওয়ার আগে কলেজের নিয়ম ছিল চার-পাঁচবছর সংস্কৃত ব্যাকরণ 'মুগ্ধবোধ' পড়ার পর কলেজে পড়াশোনা করা যাবে। বিদ্যাসাগর মহাশয় সংস্কৃতকে বাংলায় রূপান্তরিত করেন ও পাঠ্য হিসাবে যুক্ত করেন। তিনি সংস্কৃত কলেজে ইংরেজি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেন। সাংখ্য ও বেদান্তকে ভ্রান্ত দর্শন বলে পাঠ্যক্রম থেকে তা বাদ দেন ও তর্কশাস্ত্রকে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং পাশ্চাত্য গণিতশাস্ত্র চর্চার সূচনা করেন। এছাড়াও পাঠ্যক্রমে। নীতিবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, শারীরবিজ্ঞান সংযুক্ত করেন। তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাসিক পরীক্ষার সূচনাও করেছিলেন। বর্তমান সময়ে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সার্বক্ষণিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা দেখা যায় তার সূচনা বিদ্যাসাগরের হাতেই। তিনি বুঝেছিলেন, বছরে একটিমাত্র পরীক্ষা না দিয়ে যদি সারাবছরই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়া যায় তবে তারা পড়ার মধ্যেই থাকবে। একজন মানুষের কতটা দূরদর্শিতা থাকলে আর আধুনিক হলে এমন চিন্তা করতে পারেন তার একমাত্র উদাহরণ পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি চেয়েছিলেন এসবের মাধ্যমে এক উন্নত, আধুনিক, উদারমনস্ক এক সমাজ গড়ে তুলতে যারা পরবর্তী সমাজকে আরও অগ্রগতির পথে নিয়ে যাবে। গড়ে উঠবে এক সুন্দর, সুস্থ ও মানব-হিতকর সামাজিক পরিমণ্ডল।

তিনি যে কেবল বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন আর পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন এনেছিলেন তা নয়, পাঠ্যপুস্তক রচনার দায়িত্বও নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি তো ছিলেন একজন প্রকৃত শিক্ষক, তাই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে শিক্ষার্থীদের জন্য সঠিক পাঠ্যপুস্তকের অভাব রয়েছে। তাই তিনি রচনা করলেন 'কথামালা', 'বর্ণমালা', 'বোধোদয়'। তার রচিত বাংলা শিশুপাঠ্য বর্ণমালা শিক্ষাগ্রন্থ 'বর্ণপরিচয়' বইটি তো শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন দিগন্তরে সূচনা করে। তিনি সংস্কৃত শিক্ষার সুবিধার জন্য সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা ও 'ব্যাকরণ কৌমুদী' রচনা করেন। এছাড়াও 'আখ্যান মঞ্জরি', 'শব্দ মঞ্জরি', 'শ্লোক মঞ্জরি', ' ব্রজবিলাস' রচনা করেন। যতি চিহ্নের যথোপযুক্ত ব্যবহার ও বড়ো বাক্যকে কয়েকটি ছোটো বাক্যে ভেঙে ব্যবহারের রীতি তিনিই প্রথম দেখান। পরবর্তীকালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেকেই এ-পন্থা অনুসরণ করেছিলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের মতে, "বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী।"

তিনি ছিলেন বাংলার আধুনিক গদ্যসাহিত্যের জনক। তিনি সর্বপ্রথম বাংলা সাধুগদ্যের একটি মান ধ্রুবক নির্দেশনা করেন। শুধু তাই নয় তার সাথেও চলিত ভাষার গতিশীলতাকেও যুক্ত করেছিলেন। তার সৃষ্ট গদ্যভাষা ছিল সরস, সুমধুর, ছন্দোময় ও গতিশীল। অনুবাদ সাহিত্যেও ছিল তার অবাধ বিচরণ। অত্যন্ত নিপুণহাতে তিনি অনেক গ্রন্থের অনুবাদ করেছিলেন। তিনি শেক্সপিয়রের 'কমেডি অফ এররস্' এর অবলম্বনে রচনা করেন 'ভ্রান্তিবিলাস'। তিনি কালিদাস রচিত 'অভিজ্ঞান শকুন্তলম' এর অবলম্বনে 'শকুন্তলা' রচনা করেন। এছাড়াও ভবভূতির 'উত্তর রামচরিত' অবলম্বনে 'সীতার বনবাস' ও মার্শম্যানের ' History of Bengal' গ্রন্থটির অনুবাদ হিসাবে 'বাংলার ইতিহাস' রচনা করেন। তাই আমরা বলতে পারি তিনি শুধু শিক্ষার পথই সুগম করেন নি, বাংলা সাহিত্যকেও নতুন দিগন্ত দেখিয়েছিল।

বিদ্যাসাগরের কথা ও কাজের মধ্যে কোনও তফাৎ ছিল না। তিনি যা একবার মনস্থির করতেন তা তিনি কাজে করে দেখাতেন। এবং অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি তার সকল দায়িত্ব পালন করতেন। শিক্ষাক্ষেত্রের প্রতিটি জায়গায় তিনি তার ছাপ রেখে গিয়েছেন। শিক্ষাগ্রহণ করে তিনি শুধুমাত্র বিদ্যাসাগর হতে চান নি, তিনি চেয়েছেন প্রতি মানুষকে সুশিক্ষায় স্বশিক্ষিত করতে। জ্ঞানলাভে নয়, জ্ঞানদানেই যে প্রকৃত শিক্ষার স্ফুরণ ঘটে তা তিনি বুঝেছিলেন। তিনিই তো চেয়েছিলেন নারীরা নিজেদেরকে পুরুষের সমতুল্য করে তুলুক। তিনি নিজে হিন্দুশাস্ত্রে সুপণ্ডিত হয়েও শিক্ষাঙ্গন থেকে ধর্মকে সরিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি। ভাববাদী দর্শনকে বাদ দিয়ে বিজ্ঞান-দর্শনকে তিনি প্রকৃত শিক্ষা বলে বুঝেছিলেন। ভাষার সাথে ভাষার মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে যে ভাষার পুষ্টি বিধান হয় তা তিনি দেখিয়েছিলেন। মানবজীবনের একটি দিক হল লড়া আর অপরদিক হল গড়া। এই লড়া ও গড়ার দুটি কাজই তিনি করেছিলেন। বর্তমানে সমাজ আগের তুলনায় অনেক বেশী প্রগতিশীল, বিভিন্ন সুশিক্ষিত কমিটিও রয়েছে যারা মানুষের জন্য জনহিতকর কাজ করে চলেছে, অসামাজিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদও করছে কিন্তু তদান্তীতন সমাজে বিদ্যাসাগর এসকল কাজের দায়িত্ব নিজে নিয়েছিলেন, যে কাজ সেসময় অত্যন্ত কঠিন ছিল। রক্ষণশীল সমাজ মানতে চায় নি এধরনের কর্মকাণ্ড। তবুও তিনি এগিয়ে গিয়েছেন প্রবল বিক্রমে আর সচেষ্টও হয়েছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতে, বিদ্যাসাগর হলেন 'প্রথম আধুনিক মানুষ'।

বিদ্যাসাগর ছিলেন বটবৃক্ষের মতো। যার ছায়াতলে আমরা আজও আশ্রয় নিতে চাই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ প্রসঙ্গে বলেছেন, "আমাদের অপেক্ষা বিদ্যাসাগরের একটা জীবন অধিক ছিল। তিনি কেবল দ্বিজ ছিলেন না, তিনি দ্বিগুণজীবিত ছিলেন"। (সূত্র:'বিদ্যাসাগর চরিত' প্রবন্ধ)
তাই তো বাংলার ঊনবিংশ শতকের ইতিহাস বিদ্যাসাগর ছাড়া সম্পূর্ণই হয় না। আমরা আজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীশক্তির উদাহরণ তুলে ধরি। তবুও দেখা যায় আজও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা অবহেলিত। আজও নানাভাবে বঞ্চনার শিকার হতে হয় তাদের। বিদ্যাসাগরের নারীশক্তির উন্মেষের জন্য লড়াইটা তাই আজও মনের গহনে এসে ধাক্কা দিয়ে যায়। শুভশক্তি যেন বলে দিতে চায় এগিয়ে যেতেই হবে।

বিদ্যাসাগর নিয়ে বিভিন্ন গবেষক নিরন্তর গবেষণা করে চলেছেন। তার মধ্যে অন্যতম হলেন বিনয় ঘোষ। তিনি বলেছেন, " বিদ্যাসাগর নিঃসন্দেহে আমাদের দেশের একজন আদর্শ পুরুষ...সততা নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার দিক থেকে তার ব্যক্তিগত চরিত্র যেমন দুর্ভেদ্য, সামাজিক কর্মজীবনের লক্ষ্যের প্রতি একাগ্রতার দিক থেকেও তেমনি তিনি অদ্বিতীয়।" (সূত্র : 'বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ')
ব্যক্তিত্বে উদীয়মান, সময়ের চেয়ে কয়েকশো শতক এগিয়ে থাকা মানুষ ছিলেন বিদ্যাসাগর। তিনি যেন শিক্ষাক্ষেত্রের এক আদিম ধ্রুবতারা যিনি আমাদের শিক্ষা তথা সামাজিক দিক নির্ণয়ে আজও অবিরত সাহায্য করে চলেছেন। উদ্যমতা, সাহসিকতা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও সর্বোপরি সততার এক প্রতিভূ হলেন তিনি। আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো ভাবের দুনিয়ায় বসবাস করে কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে কাটিয়ে দিতে পারতেন জীবনটা কিন্তু তিনি তো অনন্য, এখানেই তো তার ব্যতিক্রমী চিন্তার বোধোদয়। যেখানেই অসহায়তা সেখানেই সহায় তিনি। সময়ের চাকা ঘুরছেই, কালের নিয়মে আমরাও আজ একবিংশ শতাব্দীতে পা রেখেছি, মানুষ থেকে যন্ত্র-মানবেও পরিণত হয়েছি;তবুও আজও আমরা তার দানেই এগিয়ে চলেছি। তিনি তো চিরকাল দাতা হয়েই রয়ে গেলেন আর আমরা শুধু তার দান গ্রহণ করে গ্রহীতা হয়ে থাকলাম। বিনিময়ে কী সত্যিই কিছু দিতে পেরেছি তাকে, নাকি নয়, এ প্রশ্ন তো থেকেই যায়। আমরা হয়তো বলবো তিনি মহাপুরুষ; একথা হয়তো সত্যিই ও। কিন্তু আমরা এটা ভুলে যাই তিনি আগে মানুষ পরে মহাপুরুষ। তিনি কোনও ভিনগ্রহের প্রাণী নন, যিনি এলেন, দেখলেন আর জয় করলেন। নানাবিধ লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে তিনিও গিয়েছেন, পার করেছেন দুর্ভেদ্যের প্রাচীর, সমুদ্রের বিশালতা। তিনি তো চাননি বিখ্যাত হতে, তার কাজ তাকে বিখ্যাত করেছে, খ্যাতির সর্বোচ্চ সীমায় থেকেও তিনি ছিলেন বিনয়ী, মাটির কাছাকাছি আর এখানেই তো লুকিয়ে আছে সার্থকতার বীজ। যে বীজ তিনি তার কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে বপন করেছিলেন, আজ তা মহীরুহতে পরিণত হয়েছে। তিনি তো শিখিয়েছিলেন মুক্তমনা, উদারচেতা হতে, তবুও আজ আমরা শুনতে পাই দলিতের নিপীড়নের কথা। তিনি তো ভেবেছিলেন, তার পরবর্তী সমাজ আরও এগিয়ে যাবে, শান্তিকামী হবে সবাই, হবে জাতপাত ভেদাভেদহীন এক সমাজ। যেখানে কথা বলবে মনুষ্যত্ব। আমরা হয়তো স্বশিক্ষিত হয়েছি, তবু তার মতো সুশিক্ষিত হতে পারিনি। তার 'বোধোদয়' পড়েও সঠিক বোধোদয় হয়েছে কী সমাজের? তার 'বর্ণপরিচয়' আর 'বর্ণমালা' পড়ে আমরা অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন হয়তো হয়েছি কিন্তু বিবেকের জ্ঞান তা বোধহয় আজও সম্পূর্ণ হয়নি। আজ যে আমাদের তার থেকে অনেক কিছু শেখা বাকি। শেখার তো শেষ হয়না, তাই আমরা শিখেই চলেছি হয়তো। আর আধুনিকতা, সে কথা না হয় বাদই দিলাম, তিনি যে কতটা আধুনিক ছিলেন তা তিনি প্রতি মুহূর্তে প্রমাণ করেছেন। আমরাও আধুনিক হয়েছি অবশ্য, চিঠি-টেলিগ্রামের যুগ পার করে ইমেলের যুগে এসেছি, আঙ্গুলের অঙ্গুলিহেলনে মোবাইল ফোনে এক সার্চের মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে হাতের মুঠোয় আনতে শিখেছি ইন্টারনেটের দৌলতে। শুধু আজও সবাই হতে পারিনি আধুনিক মননশীলতার অধিকারী। তাই আজও ফ্ল্যাশব্যাকে তিনি ফিরে আসেন প্রতিমুহূর্তেই, আসতে তো তাকে হবেই যতদিন না আমরা তার মতো আধুনিক হয়ে উঠবো। উঠবো একজন মান আর হুঁশ সম্পন্ন সঠিক মানুষ হয়ে। তাই পরিশেষে এটা আমরা বলতেই পারি, আমাদের জীবনে তার গুরুত্ব অপরিসীম, তিনি ছিলেন, তিনি আছেন, তিনি আজীবন থাকবেন আমাদের হৃদয়ে।
( সমাপ্ত )
# তথ্যসূত্র :
১)গুগল
২)'বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ


Next Bangla Article

All Bangla Articles    1    2    3    ( 4 )     5    6    7   


## Disclaimer: RiyaButu.com is not responsible for any wrong facts presented in the Stories / Poems / Essay / Articles / Audios by the Writers. The opinion, facts, issues etc are fully personal to the respective Writers. RiyaButu.com is not responsibe for that. We are strongly against copyright violation. Also we do not support any kind of superstition / child marriage / violence / animal torture or any kind of addiction like smoking, alcohol etc. ##


◕ RiyaButu.com, এই Website টি সম্পর্কে আপনার কোনও মতামত কিংবা পরামর্শ, কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। যোগাযোগ:
E-mail: riyabutu.com@gmail.com / riyabutu5@gmail.com
Phone No: +91 8974870845
Whatsapp No: +91 7005246126