Home   |   About   |   Terms   |   Book Rent   |   Contact    
A platform for writers

হলুদ বাগানে ভ্রমরের ভারত নাট্যম

বাংলা গল্প

-------- বিজ্ঞপ্তি ----------
◕ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা - সেপ্টেম্বর ২০২২, Details..
--------------------------



All Bengali Stories    154    155    156    157    (158)     159   

হলুদ বাগানে ভ্রমরের ভারত নাট্যম
লেখিকা - মাধুরী লোধ, বিলোনিয়া , দক্ষিণ ত্রিপুরা


## হলুদ বাগানে ভ্রমরের ভারত নাট্যম

লেখিকা - মাধুরী লোধ, বিলোনিয়া , দক্ষিণ ত্রিপুরা

#
টিলার ঢালে খাপ- খোপে হলুদ লাগায় বসন্ত দাদু। মাটি কোপায় আর ঠাট্টা করে নাতনি অন্তরাকে, " গায়ে-হলুদের মূল জিনিষটা আজ পুঁতলাম দিদিভাই-এর জন্য।"

মুখ ভেংচে দাদুকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ধাঁ করে, সাঁ করে সরে আশে সোনাল গাছে বেঁধে রাখা দড়ির দোলনায়। মনের সুখে দোলে আর খায় তেঁতুলের আচার। দাদু ততক্ষণে হলুদ লাগানো শেষ করে গামছায় মুখ মুছে জিরোতে বসে মুকুল আসা আমগাছের নীচে। তখনই একটা কোকিল মিঠে স্বরে গলা সাধে - কুহু কুঁ কুঁ - কুঁহু। অন্তরা কোকিলের সাথে পাল্লা দিয়ে চেঁচায় উহু উহু - উঁহু উঁ উঁ হু হু । হো হো হো-

বসন্ত দাদু ঠা-ঠা করে হেসে বলেন, " এখন চৈত্র মাস, বিয়ের তারিখ নেই। অন্য দেশ যা।"

অন্তরা ক্ষেপে যায়, "পাখিটা তোমার কি ক্ষতি করেছে?"

"কোকিল ডাকলে তোর ঠাকুর্মার কথা মনে পড়ে..."

"মন খারাপ করো না, তোমার জন্য আরেকটা ঠাকুর্মা নিয়ে আসবো।"

"দুর পাগলী!! বুড়ো কালে আমার মুখে চুনকালি মাখাবি? জানিস তোর ঠাম্মা ভাল রাঁধতেন?"

অন্তরা বলে, "বাবা বলেছে। পাচন রাঁধতেন, যেন অমৃত!"

"পাড়া মাতিয়ে মনসার গান গাইতেন।"

"মায়ের মুখে শুনেছি, ঠাম্মা গাইতেন, তুমি ঢোল বাজাতে, পিসীরা সুর ধরতো।"

"বাড়ীতে অতিথি আসলে ভারী খুশি হতো। সহজে যেতে দিতো না। হৈ-চৈ লেগেই থাকতো..."

"ঠাম্মাকে বাঁচাতে পারলে না কেন? কেন আমি ঠাম্মাকে দেখতে পেলাম না?"

বসন্ত দাদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,"ধনুষ্টঙ্কারে মারা গেল বেচারি। রাত দিন কাজ করতো। কোন সময় যে পায়ে মরচে ধরা পেরেক ফুটেছে বুঝতে পারে নি। ব্যথা, জ্বর নিয়েও কাজ করেছে। একদিন সব শেষ, আমাকে পথে বসিয়ে তোর ঠাকুর্মা গেছে ..."

"তুমি কি ঠাকুর্মার সাথে প্রেম করতে?"

"আমরা দু'জন চোখের আড়াল হই নি কোনোদিন। আমৃত্যু একসাথে বাঁচতাম। নিয়তির হিংসেয় আমরা আলাদা হয়েছি। একদিনের জন্যও ভুলি নি তোর ঠাকুর্মাকে।"

জ্ঞান হওয়া অবধি অন্তরা দেখে বসন্ত দাদু ঠাম্মার সমাধিস্থল ধোয়ে দেয়। কাঠগোলাপ, বারোমাসে-ফুল ছিটিয়ে দেয় চাতালে। সন্ধ্যায় জ্বালে ধূপদীপ। সাতবার প্রদক্ষিণ করে। বিড়-বিড় করে বলে, "কিছুদিনের মধ্য আমি আসবো। আমার বিছানাটা পেতে রেখো..."

অন্তরা ধমকেছে দাদুকে এমন অলক্ষুণে কথা বলার জন্য। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে নাতনির সামনে কান ধরেছে, জিভ কেটেছে; ক-দিন পর 'যে কপাল, সে মাথা'।

"ভুল শুধরোবে না। মা বলেছে, 'দাদুকে নিজের মত থাকতে দে।'"

অন্তরা ভেবে পায় না স্বর্গবাসী স্ত্রীর প্রতি কিসের এত টান। এর ব্যাখ্যা বসন্ত দাদু করে দিয়েছিলেন, "এ যে সাত জন্মের বাঁধন। আমরা দু'জনে সাতবার জন্মাবো, সাতবার একসাথে থাকবো।"

অন্তরা বিশ্বাস করে নি। ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিল আত্মভোলা দাদুর অন্ধবিশ্বাস। দাদু তখন দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন, "আমার বাবা আমাকে কোনও বিষয়-আসয় দিয়ে যেতে পারেন নি। তোর ঠাম্মার বুদ্ধিতে আমাদের বাড়িঘর-জমিজমা হয়েছে। এই টিলাটা তোর ঠাম্মাকে দিয়েছিলেন যৌতুকে। রাত-দিন পরিশ্রম করেছে গাছ-গাছালি টিকাবার জন্য। আয় দিয়ে কিনেছে জমিজমা।"

অন্তরা দাদুর কথা অর্ধেকটা মেনে নেয়। বাবা, মা, পিসীরা একই কথা বলেছেন। বসন্ত দাদ আরও বললেন, "এই জমিজমা, বাড়িঘরে এখনো লেগে আছে তোর ঠাম্মার ঘাম। এখনো আছে রক্তের দাগ দাঁ, কাঁচি-কোদালে, বাড়িঘরে, সব জিনিষপত্রে, চতুর্দ্দিকে। দূর থেকে আমাদের দেখছেন।"

দাদুর এই অন্ধবিশ্বাসে আঘাত করতে চায় নি অন্তরা। যত মত তত পথ। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দাদুকে বলে, "তুমি মরবার কথা কেন বলো?"

"ঐখানে তোর ঠাম্মা যে একা। আমি না গেলে তার যে ভারী কষ্ট।"

অন্তরা ধমকের স্বরে বলে, "হোক কষ্ট। তুমি যেতে চাইলেও আমরা তোমায় ছাড়বো না। আমাদেরও অভিভাবক প্রয়োজন। তুমি আমাদের সংসারে বটগাছের মতো।"

বসন্ত দাদু বলেন, "বটের চারা তোর বাবা। আমি তো বুড়ো..."

অন্তরা বলে, "আমি পড়তে চলে গেলে বাবা-মা একা হয়ে যাবে, কে দেবে বুদ্ধি-পরামর্শ? কে আমার খোঁজ রাখবে শুনি?"

"তোমার মায়াতেই তো পড়ে আছি দিদি। তুমি বড়ো হলে নাতজামাইয়ের হাতে দিলেই তো আমার ছুটি। ঠিক আছে আরও ক'বছর অপেক্ষা করবো।"

#
বসন্ত রায়ের চোখে অতীত বর্ণময় কিছু চালচিত্র। সৈবতী ছিল পাশের বাড়ীর মেয়ে। বাবা ঠাকুর্দার পছন্দের বিয়ে। জাঁকজমকহীন লালচেলী পড়িয়ে কন্যা-সম্প্রদান। গ্রামের আলপথে হেঁটে বিয়ে করতে যাওয়া। সৈবতীর চোদ্দ বছর, বসন্তের উনিশ। চেহারায় চাকচিক্য না থাকলেও ছিল গ্রামীণ সারল্য। টিলা বাড়ীতে মাটির দেওয়াল, সারাবছর ক্ষেত-জমিতে গৃহস্থী কাজ। বসন্তকালে গাছের নীচে পড়তো শুকনো পাতা। শাশুড়ি বৌ বয়ে আনতো চুলায় জ্বালাতে। মরা-ডালা, ঝোপঝাড় কেটে বর্ষার জন্য লাকড়ি সংগ্রহ, ঘুটে দেওয়া, ধান সিদ্ধ, ঝাড়াই মাড়াই শিখলো সৈবতী। যখন ধান ক্ষেতে কাজ থাকতো না যুবক বসন্ত টিলার চারপাশে লাগাতো আদা, হলুদ, বার্লি, আনারস, বর্ষার শাক-সবজি; বছরান্তে বেচতো বাজারে। ঘোমটার ফাঁকে দেখতো সৈবতী ঘর্মাক্ত স্বামীকে। কোদালে সারি বানাতো বসন্ত, সৈবতী গুঁজে দিত আদা হলুদের কাণ্ড।

এদিকে সৈবতীর রূপ খোলে না। শাশুড়ির আফসোস, বৌকে রূপসী বানাতে শুরু হলো হলুদ আর চন্দন বেটে মুখে লাগাবার প্রক্রিয়া। সৈবতী কাঁচা হলুদের গন্ধ সহ্য করতে পারে না, মুখে ব্রণ দেখা দিতেই যোগ হল নিমপাতা। বসন্ত দেখলো ধীরে-ধীরে খুলছে সৈবতীর রূপ। শ্যামলা গড়নে ফরসা ছোপ। এবার শাশুড়ি-মা এক টুকরা হলুদের সাথে একদলা গুঁড় চিবিয়ে খেতে নির্দেশ দিলেন। হলুদের গন্ধ নাকে এলেই বমি পায়। তবু খেতে হয় বাটা হলুদ, পোড়া মরিচ, পেঁয়াজ আর সরিষার তেল মেখে। অষ্টাদশী সৈবতীর চেহারায় রূপ খোলে। সন্তান সম্ভবা সৈবতীর চেহারায় যেন আস্ত সরিষা বাগানের ছোপ।

মা বেশীদিন বাঁচেন নি। অন্ধকার দেখে বসন্ত রায়। শিশু সন্তান আর স্ত্রীর দেখাশোনার দায়িত্ব কাঁধে নিতে বাধ্য হয় সে। মা-শিশুর যত্নের সাথে গৃহস্থালি, গাছ গাছালির পরিচর্যা, কুয়ো থেকে জল তুলে গাছের গোড়ায় দেওয়া, খাবার জলের কলসিতে ফিটকিরি রাখা, মা-শিশুর পথ্য ও গমর জল; সব।

#
তিনটি সন্তানের জন্ম দেয় সৈবতী। ছেলেমেয়েরা বড় হলে তাদের ইস্কুলে পাঠিয়ে স্বামীর সাথে হাত মিলিয়ে কাজ করতো সে।

আদা, হলুদের বাগানে এলেই উন্মনা হয় সৈবতী। শাশুড়ি-মা স্বাস্থ্য পরিচর্যায় হলুদ ব্যবহার করতেন, তেমনি সৈবতীও গুড় দিয়ে হলুদ খাওয়ানো, বিভিন্ন রোগ সারাতে নিমপাতা, কাঁচা হলুদ সরিষার তেলে সিদ্ধ করে মাখতো বাচ্চাদের শরীরে। বসন্ত রায় আরও দেখতো, হাঁস মুরগীকে বেজি বা শিয়ালে আহত করে গেলে, ক্ষতস্থানে সৈবতী লাগাতো হলুদ আর বিষকচু পাতার রস; সুস্থ হতো পশুপাখিগুলো।

বর্ষা এলেই সারি-সারি হলুদ গাছে বের হতো তোড়ার মতো হলুদ ফুল। সৈবতী সে ফুল তুলে পিটুলি বেটে বানাতো বড়া, গরম ভাত দিয়ে খাবার জন্য। হলুদ-ফুলের গুচ্ছ দিয়ে সাজাতো শীতলা পূজার নৌকা, বেহুলার ভাসান, বাচ্চাদের খেলাঘর। কচি হলুদের ডিগ ছিঁড়ে দিত গুড়া-মাছে, কখনো বা হলুদ পাতায় মুড়ে রাঁধতো ইলিশ বা চিংড়ি মাছের পাতুড়ি। দু বছর অন্তর তোলা হতো হলুদের কাণ্ড। বসন্ত মাটি কোপাতেন, হলুদ বাছতেন সৈবতী। সরস আর কচি কাণ্ড দু ভাগ হতো। বেছে ধুয়ে বড় ডেকচিতে সিদ্ধ হতো হলুদ, শুকনো হলুদ গুড়া হতো ঢেঁকিতে, যা সারাবছর ব্যবহৃত হতো তরকারীতে। বাছা-বাছা হলুদ গুচ্ছ বস্তা করে রাখা হতো, ব্যাপারী এলে ওজন দরে টাকা দিয়ে কিনে নিত। সে টাকায় অন্য সামগ্রী আসত রায়দের ভাঁড়ারে।
Next Part


Next Bangla Story

All Bengali Stories    154    155    156    157    (158)     159   


## Disclaimer: RiyaButu.com is not responsible for any wrong facts presented in the Stories / Poems / Essay / Articles / Audios by the Writers. The opinion, facts, issues etc are fully personal to the respective Writers. RiyaButu.com is not responsibe for that. We are strongly against copyright violation. Also we do not support any kind of superstition / child marriage / violence / animal torture or any kind of addiction like smoking, alcohol etc. ##


◕ RiyaButu.com, এই Website টি সম্পর্কে আপনার কোনও মতামত কিংবা পরামর্শ, কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। যোগাযোগ:
E-mail: riyabutu.com@gmail.com / riyabutu5@gmail.com
Phone No: +91 8974870845
Whatsapp No: +91 6009890717