Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
Read & Learn
 

Bangla Story

( বাংলা গল্প )

All Pages   ◍    3    4    5    (6)     7    8    9    10    ...

দুই বীজের গল্প

- হরপ্রসাদ সরকার







এক মহাকায় বৃক্ষের দুটি বীজ ছিল। একটি বীজের ভীতরে মূল আর বিটপের মধ্যে ঝগড়া চলছিল।

মূল বলছিল আমার গুরুত্ব বেশী , আমি বেশী বড় , আমি বেশী দামি। কারণ আমি যদি জল আর অন্য উপাদান সংগ্রহ না করি তবে হে বিটপ তোমার কোন দাম নাই। আমি যদি মাটি আঁকড়ে না পড়ে থাকি তবে তুমি মাটিয়ে এমনিই লুটিয়ে পড়বে। হে বিটপ তোমার তো কত সুখ ! পশু পাখী দেখ, আলো বাতাসে দিন রাত খেলা কর। চাঁদ দেখ, সূর্য দেখ। আমি এত কষ্ট করি আর সব সুখ তুমি ভোগ কর।

বিটপ ও তেমন চড়া সুরেই বলল। কষ্ট তুমি কর না আমি করি। তুমি তো মাটির ভীতরে আরামে ঘুমাও। আর আমি দিনের পর দিন তপ্ত রোদ মাথায় নিয়ে থাকি, দিনের পর দিন ঝড়-বৃষ্টি আমার মাথার উপর দিয়ে যায়। পশু, পাখীর কত অত্যাচার আমাকে সহ্য করতে হয়। আর আমি যদি সূর্যের আলো না নিতাম তবে তুমি কি আর বেঁচে থাকতে ! তাই তুমি যত কথাই বল আমিই বড়, আমারই গুরুত্ব বেশী , আমারই দাম বেশী।

তাদের প্রায়ই এ নিয়ে ঝগড়া হত। তাদের ঝগড়া দেখে পাশের বীজের ভিতরের মূল আর বিটপ নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল। দেখ ভাই , আমারা দুজন চিরদিন আপন ভাই হয়েই থাকব। কে বড়? কে ছোট ? এ নিয়ে আমরা কোনদিন ঝগড়া করব না। আমি তো মূল আমি মাটির নীচে চলে যাব আর তুমি তো বিটপ তুমি মাটির উপরে চলে যাবে। তবে দিনের শেষে আমারা দুজনেই সারাদিনের ঘটনা সব নিয়ে গল্প করব।
বিটপ মূলের গলা জড়িয়ে ধরে বলল , তেমনি হবে ভাই। আমি তো কোনদিন তোমাকে আর দেখতে পাব না শুধু কথাই শুনব। যতদিন বেঁচে থাকি আমাদের মধ্যে যেন কখনো কথা বন্ধ না হয়।



যথা সময়ে দুটি বীজ মাটি পড়ল, আর তারা গাছ হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে তারা বড় হতে লাগল। যে বীজের ভীতর ঝগড়া চলছিল সেই ঝগড়া ধীরে ধীরে যুদ্ধের রূপ নিলো। একে অপরকে শিক্ষা দিতে শিকড় তার কাজ বন্ধ করল। বিটপ ও শিকড়কে শিক্ষা দিতে নিজের কাজ বন্ধ করল। কিছুদিনের মধ্যেই এত বড়, এত সুন্দর একটা তরুণ-তাজা, যৌবন গাছ শুকিয়ে যেতে লাগল। নিজের মরণ দেখেও তারা অভিমান, আত্ম-অহংকার ছাড়ল না। শেষে একদিন হাল্কা বাতাসে শিকড় সহ গাছটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল , আর উঠল না।

আর অন্য গাছটা ? সেই প্রথম দিন থেকেই মূল আর বিটপ একে অপরকে নিজেদের গল্প , নিজেদের অভিজ্ঞতা খুলে বলতে লাগল। আজ কে কি করল ? কি কি মজার ঘটনা ঘটল। দুজন হাসতে-খেলতে বড় হতে হতে এক বিশাল বৃক্ষের রূপ নিলো। আজ নিজেদের আনন্দে , খুশিতে , হাসিতে তারা চারিদিক ভরে রেখেছে। রং-বিরংগী পাখীরা দূর দূর থেকে উড়ে এসে তার ডালে বসে, গান করে, খেলা করে। প্রজাপতিরা আঁকা বাঁকা পথে কত কথা লিখে যায়। পথিকরা তার ছায়ায় বসে বিশ্রাম করে। কয়েক যুগ পেরিয়ে গেল, আজো তারা তেমনি আছে। তাদের সবুজ পাতায় হাওয়ারা এসে খেলা করে। রাতে চাঁদের আলো পাতায় পাতায় রুপালি রং ছড়িয়ে দেয়। ভোরের হাল্কা সোনালী আভায় পাতারা যেন আবার নতুন রূপ ধারণ করে , সূচনা হয় এক নতুন দিনের , এক নতুন আশার , এক নতুন আনন্দের।
Top of the page

এক মেষ পালকের কথা

- হরপ্রসাদ সরকার

সুদূর এক গ্রামে এক মেষ পালক ছিল। তার অনেক গুলি মেষ ছিল। সে সেই গুলিকে নিয়ে রোজ বনে যেত আবার গোধূলিতে ফিরে আসত। এমনি করে তার দিন কাটছিল।

তবে তার মেষ গুলি তার কথা শুনত না। একটা এদিকে পালাত তো আরেকটা ওদিকে পালাত। সে মনে মনে ভাবত আমি এই কয়েটা মেষকে সামলাতে এত হিমশিম খাই , আর আমাদের যে সামলায় সেই মালিককে না জানি কত কষ্ট হয় আমাদের সামলাতে। তাই সে মনে মনে ভাবত, সেই মালিককে যেন আমার জন্য কষ্ট না করতে হয়। সে নিজের স্বভাবকে ধীরে ধীরে তেমনি তৈরী করতে লাগল। আর একে একে তার মধ্যে অনেক পরিবর্তন ও এসে গেল। সে বনে বসে গান গাইতে লাগল। এখন আর তার মেষগুলি বনে হারিয়ে যায় না , তাদের খুঁজতে ও হয় না। তার গানের আওয়াজ লক্ষ্য করে মেষগুলি আপনিই পথ খুঁজে নেয়।

ধীরে ধীরে তার মনে জাগল “ হে মালিক আমি যদি তোমার কুলে একটু মাথা রেখে ঘুমাতে পারতাম , তবে না কত আরাম হত !” যখনি সে ঘুমাত ভাবত তার মালিকের কুলেই ঘুমিয়ে আছে। সে আবার ভাবত “ হে মালিক, তুমি যদি একদিন আমার ঘরে বিশ্রাম নিতে আসতে তবে আমি তোমার দুটি পা টিপে দিতাম , তোমাকে শীতল তালপাতার পাখার বাতাস করতাম। আমার তখন কত আনন্দ হত। ” সে দিন রাত তেমনে স্বপ্ন দেখত, তেমনি ভাবত আর তেমনি গান গাইত।

একদিন সেই বনের পথে এক সন্ত তার শিষ্যদের নিয়ে যাচ্ছিলেন। গভীর বনে মেষ পালকের এমন মিষ্টি গান শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। গানের যেমন ছিল সুর তেমনি ছিল কথা। শব্দে শব্দে মালিকের গুণগান। সেই সন্ত মেষ পালকের সাথে দেখা করতে চাইলেন। অমনি কয়েকজন শিষ্য ছুটি গিয়ে মেষ পালককে নিয়ে এলো।



সন্ত বললেন “ এমনি কি শুধু গান গেয়ে-গেয়ে ঈশ্বর পাওয়া যায়। তার জন্য সাধনা করতে হয়। কঠোর তপ করতে হয়।” এই বলে তিনি তাকে সাধনার বিধি-বিধান বলতে লাগলেন। তার কথার মধ্যেই সেই মেষ পালক তাকে থামিয়ে বলল “ আপনি তো জ্ঞানী। আমি একজন সাধারণ মেষ পালক। আমার এই সামান্য কিছু মেষ আর ছাগল আছে। তাদের সামলাতেই আমি হিমশিম খাই। আপনি কি কখনো ভেবেছেন যে আমার আর আপনার মত না জানি আরো কত এমন ছাগল-ভেড়াকে সামলাতে ভগবানের কত কষ্ট হয় ? আপনি কি কখনো তার কষ্ট কম করতে চেষ্টা করেছেন ?"

মেষ পালকের সেই কথা শুনে সেই সন্ত যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি ভাবতেই পারেননি এমন কথা , এমন জায়গায় , এমন একজনের মুখ থেকে শুনতে পাবেন। যেন তার চোখ খুলে গেল। তিনি নতুন এক শিক্ষা লাভ করলেন। কারণ সত্যি তিনি কখন তেমন কিছুই করেন নি। সেই সন্ত ও জ্ঞানী ছিলেন। তিনি মানুষ চিনতে আর ভুল করলেন না। তিনি তুরন্ত সেই মেষ পালকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন আর সেখানেই শিষ্যদের নিয়ে সেই মেষ পালকের কাছে অনেক দিন পর্যন্ত ঈশ্বর কথা শুনে জীবনের এক নতুন রাস্তা খুঁজে পেলেন।
Top of the page

দুই বন্ধুর গল্প

- হরপ্রসাদ সরকার

শান্তি আর সুনীল দুই বন্ধু। পাশাপাশি বাড়ি। শান্তি আর সুনীলের ছেলে একই সঙ্গে একই স্কুলে পড়ে। দুজনের ছেলেই পড়াশুনাতে খুব ভাল , হুঁশিয়ার। কিন্তু ধীরে ধীরে ছেলেরা যত বড় হতে লাগল সুনীলের ছেলে পিছিয়ে যেতে লাগল। আর শান্তির ছেলে এগিয়ে যেতে লাগল।

অনেক চেষ্টা করেও সুনীল ছেলেকে ঠিক করতে পারল না। সে কাজ কর্ম ছেড়ে ছেলের পিছনেই লেগে রইল প্রায় সারাক্ষণ। এমন যেন সম্ভব হলে সে সারাদিনই ছেলেকে বই পত্রের সামনে পড়তে বসিয়ে রাখে। ছেলে খেলতে মাঠে গেলে তার পিছন পিছন মাঠে গিয়ে নজর রাখে। ছেলে খেতে বসলে কোনটা খাবে, কোনটা খাবে না তার উপর নজর। এতে ধীরে ধীরে তার ছেলে চরম অবাধ্য আর উৎশৃংখল হয়ে উঠল। এই কৈশোরেই সে নেশা খেতে শুরু করে দিল। তাকে আর সামলানো গেল না।

অন্য দিকে শান্তির ছেলের দক্ষতা একের পর এক সব বিষয়েই বাড়তে লাগল। কি পড়াশুনাতে , কি খেলাধুলায় , কি চাল-চলনে সব বিষয়েই সে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে গেল।

সুনীল নিজের ছেলেকে নিয়ে কি করবে ভেবে পেল না। শেষে সে তার আরেক বন্ধুর কাছে তার মনের জ্বালার কথা খুলে বলল , শান্তির ছেলের কথা ও বলল। সেই বন্ধুটি তাকে পরামর্শ দিল শান্তিকে অনুসরণ করতে। শান্তি তার ছেলের সাথে কি রকম ব্যবহার করছে , পড়াশুনা নিয়ে কি ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এই প্রস্তাবটি সুনীলের ভাল লাগল। সুনীলের তৎপরতায় সুনীলের পরিবার আর শান্তির পরিবার এক সাথে সুনীলের গ্রামের বাড়ীতে গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে গেল। গ্রামের বিশাল বাড়ি। চারি দিকে সবুজ আর সবুজ। বড় বড় খেলার মাঠ।

বাড়িতে ঢুকে একটু বিশ্রামের পরেই শান্তি তার ছেলেকে বলল “ যাও ঘুরে এস। দেখ কত সুন্দর সব সবুজ মাঠ। শহরে এর কিছুই দেখতে পাবে না। যাও দুই বন্ধুতে মিলে মস্ত মজা করে ঘুরে আস।”
এমন কথা সুনীল আজ পর্যন্ত নিজের ছেলেকে কখনো বলেনি। সে বারণ করতে গিয়েও নিজেকে আটকাল। শান্তির কথা শুনে দুই বন্ধু হৈ-হৈ করে হাত ধরে বেড়িয়ে গেল। এর কিছুক্ষণ পর-পরেই সুনীল বাইরে দেখতে লাগল ছেলেরা এসেছে কিনা। অনেক্ষন পর্যন্ত যখন ছেলেরা এলো না তখন সে শান্তিকে জিজ্ঞাস করল “ শান্তি , ছেলেরা তো এখনো ফেরেনি ?”
শান্তি হেসে বলল “ আরে খামাখা চিন্তা করিস না সুনীল। নতুন জায়গা , হয়তো অনেক দূর চলেগেছে। নয়তো কোথাও ছেলেদের সাথে খেলায় মেতেছে। এসে পড়বে একটু পরে। চল আমারা স্নান সেরে ভাত খেয়ে ফেলি। খুব খিদে পেয়েছে ভাই।” শান্তির মুখে এমন কথা সুনীল ভাবতে ও পারেনি। যাক তবু সে হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলালো। কারণ সে শান্তিকে অনুসরণ করতে এসেছে। যখন তাদের ভাত খাওয়া আধা হল তেমনি সময় ছেলেরা এসে উপস্থিত। সারা গায়ে কাদা আর কাদা। ছেলের এই অবস্থা দেখে সুনীল রাগে ছেলেকে চড় মারতে যাচ্ছিল কি শান্তি হা-হা করে অট্টহাসি হেসে উঠল। বলল “ কি রে , তোদের দেখে তো মনে হচ্ছে খেতে হাল চাষ করে এলি। ”
শান্তির ছেলে তেমনি হেসে বলল “ ঠিক বলেছ বাবা , আমারা দুজনে মিলে একজন কৃষককে বন্ধু বানালাম তারপর তার সাথে জমিতে চাষ করতে নেমে গেলাম। খুব মজা হল।”
শান্তিঃ তা কি কি শিখলি ?
দুই বন্ধুই বলতে শুরু করল “ কিভাবে হাল চালাতে হয় , বলদকে কিভাবে ডানে-বায়ে বলতে হয় , কিভাবে হাল সোজা রাখতে হয়। আরো কত কি। বেশ অভিজ্ঞতা হল। ”

সুনীলের যেন অবাক হওয়া শেষ হচ্ছে না। সে তার ছেলেকে এত খুশী আগে আর কখনো দেখেনি। সে একবার শান্তির দিকে তাকাতে লাগল , একবার ছেলেদের দিকে তাকাতে লাগল। বিকাল বেলায় শান্তি ছেলেদের বলল “ সেই দুপুরের জমিটা দেখাতে আমাদের কি নিয়ে যাবে তোরা ? দেখি তোরা কেমন চাষ করলি ? ” এই বলে সে ছেলেদের কাজে যুক্ত হতে চাইল। মহা আনন্দে ছেলেরা রাজি হয়ে গেল। চারজন একসাথে বেড়িয়ে পড়ল। আকাশে তখন মেঘ গর-গর করছে। এমন হলে সুনীল ছেলেকে কখনো ঘর থেকে বের হতে দিত না। তাই সে শান্তিকে বলল “ আকাশে মেঘ আছে। এখন যাওয়া কি ঠিক হবে ?”
শান্তি বলল “ আরে চল কিছু হবে না। ছেলেরা এত কষ্ট করে জমি চাষ করল আর আমরা এই মেঘকে ভয় পাব ? চল চল , কিছু হবে না।”
চারজন বেড়িয়ে পরল। মহা-আনন্দে উৎসাহে ছেলেরা তাদের চাষ করা জমি দেখাল। একজন এই অংশ চাষ করেছে আরেকজন ঐ অংশটা চাষ করেছে। সুনীলের দুচোখ যেন ছানাভরা হয়ে আছে। সে ভাবতেই পারছে না তার ছেলে এত সুন্দর কাজ করেছে। এমনি সময় মুষলধারে নেমে এলো বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির সাথে মিশে গেল সুনীলের চোখের ধারা। সেই ধারা কেউ দেখল না। সুনীল যেন বুঝতে পারল এত দিন সে কোন পথে ছিল আর কি হারিয়েছে। নিজের ছেলের কথা ভেবে তার আরো কান্না পেতে লাগল। সে মনে মনে ধন্যবাদ জানাল শান্তিকে আর সেই বন্ধুটিকে যে তাকে এখান আসার পরামর্শ দিয়েছিল। এখানে না এলে সে জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরুই করতে পারত না। সুনীল আরো কি ভাবছিল কি শান্তির ধাক্কায় তার খেয়াল ভাঙ্গল।

শান্তি হাসতে হাসতে বলল “ দেখ সুনীল, এমন সবুজ মাঠের পাশে, এমন বৃষ্টি ভেজার আনন্দটাই আলাদা। আমি কতদিন এমন বৃষ্টিতে ভিজিনি ভাই। তোর কথাতে, তোর সাথে এই গ্রামে আসাতেই এমন আনন্দটা পেলাম। তাই তোকে অনেক ধন্যবাদ।” সুনীল শান্তির দুই হাত ধরে শুধু তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যি সে এমন সুখের বৃষ্টিতে এর আগে কখনো ভিজেনি।


Top of the page



All Pages     3    4    5    (6)     7    8    9    10    ...