Home   |   About   |   Terms   |   Contact    
Read & Learn
 

Bangla Story

( বাংলা গল্প )

All Pages   ◍    4    5    6    7    (8)     9    10    11    ...


নীল আকাশের পাখী

- হরপ্রসাদ সরকার


An offer to make a Website for you.

hostgator




পারুলের বাবা সরকারি চাকরি করেন। তিনি সদ্য বদলি হয়ে শহর থেকে একটু দূরে এক গ্রামে সপরিবারে এসেছেন। পারুলকে গ্রামের স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেওয়া হল। নতুন স্কুল, নতুন শিক্ষক, নতুন বান্ধবী, নতুন পরিবেশ। পারুল প্রথম দিন ক্লাসে গিয়ে চুপচাপ সবার শেষের বেঞ্চেই বসল। তার সাথে বসল আরেকটি মেয়ে, নাম লোপা। দুজনের মধ্যে প্রথম দিনেই ভাল বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। প্রতিদিন ঐ বেঞ্চটাই হল দুজনের বসার জায়গা। পারুল বুঝতে পারল লোপা খুব ভাল মেয়ে। কম কথা বলে, সব সময় একটু উদাসীন, একটু নিজের খেয়ালেই থাকে।

যেহেতু পারুল খুব মেধাবী এবং বুদ্ধিমান ছিল তাই কয়েক দিনের মধ্যেই সে শিক্ষকদের নজরে পড়ল। ক্রমে তার নতুন অনেক বান্ধবীও জুটল। সে শেষের বেঞ্চ থেকে প্রথম বেঞ্চে চলে এল। কিন্তু সে লক্ষ্য করল তার প্রথম বান্ধবী লোপা তেমনি শেষের বেঞ্চেই আছে। কেউ তার সাথে ঠিক ভাবে কথা বলে না। শিক্ষকরা ও কিছু কিছু তাকে এড়িয়ে চলে।
পারুল অন্য বান্ধবীদের সাথে কথা বলে জানল যে লোপা পড়াশুনাতে ভাল নয়, বেশ কয়েকবার ফেল করেছে। এবার ও ফেল করেছে। তাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া ও হয়েছিল। কিন্তু তার বাবা প্রধান শিক্ষকের অনেক হাত-পা ধরল, ফলে শেষ বারের মত তাকে স্কুলে থাকতে দেওয়া হয়। তাই কেউ তার সাথে মেলামেশা করতে চায় না। এ সব কথা শুনে পারুলের মনে হল কোথায় যেন একটা খটকা লাগছে। কারণ যতদিন সে লোপার সাথে বসেছিল, তার সাথে কথা বলেছিল তাতে পারুল খুব ভাল বুঝতে পেরেছিল যে লোপা বুদ্ধিমান এবং ভাল মেধাবী। তবে কেন সে বছর বছর ফেল করছে? পরদিন থেকে সে প্রথম বেঞ্চ ছেড়ে, শেষের বেঞ্চে লোপার সাথেই বসতে লাগল। সে ভাল করে লোপার উপর নজর রাখল। সে দেখল যে লোপা প্রায় সদাই জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে আর আপন মনেই মৃদু মৃদু হাসে। টিফিনের সময়ও সে স্কুলের এক কোনে এক বকুল গাছের তলে একা একা বসে থাকে আর দিগন্তের দিকে উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে।

এক রবিবার সকালে সে সোজা লোপার বাড়িতে গিয়ে হাজির। এক গরিব কৃষকের বাড়ি। লোপা তার নিজের ছোট্ট ফুল বাগানে একা একা বসেছিল। হঠাৎ সামনে পারুলকে দেখে সে যেন বেশ চমকে উঠল। তাড়াতাড়ি সে উঠে এসে তার একমাত্র আদরের বান্ধবীকে অনেক সমাদর করে ঘরে নিয়ে গেল। বাবা , মার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। দুই বান্ধবী তারপর নিজেদের গল্পে মশগুল হয়ে গেল। অনেক হাসাহাসির পর পারুল তার আসল উদ্দেশ্যে পা রাখল। সে লোপাকে বলল “তোমাকে একটা প্রশ্ন করতেই আজ আমি তোমার বাড়িতে এসেছি। ঠিক ঠিক জবাব দেবে সই?”
লোপা একটু অবাক চোখে বলল “হ্যাঁ বল।”
পারুলঃ আমি অনেক দিন লক্ষ্য করেছি যে তুমি হঠাৎ হঠাৎ কি যেন মনে মনে ভাব আর নিজে নিজেই হাসো। স্কুলেও একা একা শেষ বেঞ্চে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাক আর মৃদু মৃদু হাসো। আবার কখনো বকুল গাছে তলে বসে দিগন্তে তাকিয়ে থাক। কেন বলত?
লোপা যেন একটু লজ্জা পেয়ে গেল। সে বলল “আমি এই প্রশ্নের জবাব দিলে তুমি তো আমাকে পাগল ভাববে।”
পারুল একটু ধমক দিয়ে বলল “আমি যদি তোমাকে পাগল ভাবতাম আর তোমাকে ভাল না বাসতাম তবে কি আজ আর তোমার কাছে এসেছি? তুমি মন খুলে তোমার কথা বলতে পার।”
লোপা একটু ভেবে বলল “চল তবে আমরা দুই বান্ধবী আমার ছোট বাগানটাতেই গিয়ে বসি।”

দুই বান্ধবী লোপার ছোট্ট বাগানে গিয়ে বসল। লোপা বলল “ছোট বেলা থেকেই আমার মনে হত এই ফুল, পাখী, গাছ-পাতা, চাঁদ-তারা, আকাশ-মেঘ সবাই যেন আমার সাথে কথা বলতে চায়। তারা যেন আমাকে আদর করে কাছে ডাকে, আমার সাথে খেলা করতে চায়। আমার মনে হয় যেন, আমি তাদের মনের কথা বুঝি, তাদের সুখ-দুঃখ বুঝতে পারি। আমি স্কুলের জানালা দিয়ে নীল আকাশে পাখীদের উড়ে যাওয়া দেখি। মেঘের বুকে তাদের খেলা দেখি। তারা নিজেদের মধ্যে কত মজার মজার কথা বলে, কত মজার মজার গল্প বলে তা শুনি আর মনে মনে খুব হাসি।”

পারুল লোপার মুখে এমন কথা আশাই করেনি। লোপার কথা শুনে সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। পারুল হা করে শুধু লোপার কথা শুনতে লাগল। লোপা বলতে থাকল “এই যেমন, এই গোলাপ ফুলটা এখন পাশের গোলাপ ফুলটাকে বলছে গতকাল রাতে নাকি সে বেশ ভাল একটা স্বপ্ন দেখেছে। এক খুব সুন্দর রাজকুমারী এই বাগানে এসেছিল। চাঁদের মত ছিল তার রূপ, মাথায় চাঁদের মুকুট, পায়ে চাঁদের নূপুর। সে তার রুপালী আঁচল দিয়ে গোলাপটাকে ঢেকে দিতেই গোলাপটার ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ মেলতেই সে দেখল তার সামনে তেমনি এক রুপালী সুন্দর প্রজাপতি উড়ে উড়ে যাচ্ছে।”
পারুল লোপার কথাগুলি যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগল। সে কখনো এমন কথা শুনেনি। সে অপলকে ভেবলার মত লোপার দিকেই তাকিয়ে রইল।

লোপা অনেক সুন্দর সুন্দর কথা, সুন্দর সুন্দর গল্প শুনাতে লাগল পারুলকে। ফুলের কথা, পাখীদের কথা, প্রজাপতিদের কথা, হাওয়ার কথা শুনতে পারুলের বেশ লাগছিল। সে ভাবতে লাগল এই কথা গুলিকে যদি গল্পের মত, কবিতার মত সাজিয়ে লেখা যায় তবে তা কতই না সুন্দর হবে। সে মুগ্ধ শ্রোতার মত লোপার কথা গুলি শুনেই যেতে লাগল। আর জীবনের প্রথম এমন একাগ্র শ্রোতা পেয়ে লোপাও মন খুলে ফুল-পাখী , আকাশ-বাদলের কথা বলতে লাগল।

হঠাৎ পারুলের মনে হল সত্যিই কি ফুল পাখীরা লোপার সাথে কথা বলে? সে লোপাকে কথাটা জিজ্ঞাস করল। লোপা হাসতে হাসতে বলল “না সই, সত্যি বলতে তারা আমার সাথে কথা বলে না। আমি জানি ওগুলি আমার কল্পনা, আমার খেয়াল। তবে আমি ওগুলি নিয়েই থাকতে খুব ভালবাসি, ওগুলিই আমার খুব ভাললাগে।”

পারুলের মনে হল লোপার মনে এক খুব বড় লেখক, এক খুব বড় কবি লুকিয়ে আছে। যেন একটা ঝড়কে মনে বেঁধে নিয়ে বসে আছে লোপা। আর সেই ঝড়ের, সেই লেখকের অমূল্য সব গল্প, কবিতা ছন্নছাড়া হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তারা দিশা খুঁজে পাচ্ছে না। সেই ঝড়কে একটি দিশা দিলে গল্প-কবিতা আর সুন্দর রচনার বন্যা বয়ে যাবে। আর সে তাই করল। সে লোপার কাছ থেকে খাতা কলম চেয়ে এক এক করে লোপার কথা গুলি গল্পের মত লিখতে লাগল। লোপাও এতে বেশ মজা পেল। সেও প্রাণ ভরে প্রাণের কথা বলে যেতে লাগল। দেখতে দেখতে সেই খাতা ভরে যেতে লাগল সুন্দর সব গল্পে, সুন্দর সব কবিতায়।

ক্লাসে পারুল এখন সব সময়ই লোপার সাথে বসে। সে প্রায়ই লোপাকে জিজ্ঞাস করে, দেখতো স্যারের বইটা কি বলছে? ব্ল্যাক-বোর্ডেটা কি বলছে? এমন করতে করতে ধীরে ধীরে লোপার মন ক্লাসের পড়াশুনার দিকে ফিরতে লাগল। মেধাবী সে বরাবরই ছিল, শুধু কোথায় যেন একটা বাধন তাকে এগিয়ে যেতে বাধা দিচ্ছিল। ক্রমে সেটা দূর হতেই তাকে আর পিছন ফিরে দেখতে হয় নি।

কিছুদিন পরে স্কুলে গল্প লেখার, কবিতা লেখার প্রতিযোগিতা শুরু হল। গল্প আর কবিতা লেখায় পারুলই প্রথম হল। তার গল্প, কবিতা এতই সুন্দর হল যে সবাই তার খুব প্রশংসা করতে লাগল। পুরস্কার বিতরণীর অনুষ্ঠানে স্কুলের মাঠে গ্রামের অনেক লোক জমা হল। শহর থেকে নামি-দামী লেখক, কবি এবং অন্য গণ্যমান্য লোককে ও নিমন্ত্রণ করে আনা হল।

পারুলকে যখন তার পুরস্কার দেওয়া হল তখন প্রধান শিক্ষক মহাশয় পারুলকে অনুরোধ করলেন কয়েকটা স্বরচিত কবিতা শুনানোর জন্য। পারুল পুরস্কার হাতে নিয়ে একে একে অনেকগুলি কবিতা শুনাল। এমন সুন্দর কবিতা শুনে উপস্থিত লেখক, কবিরা চমকে উঠলেন। এমন লেখা তারা আগে কখনো শোনেননি। সবাই বাঃ বাঃ করতে লাগল।

পারুল হাসি মুখে সবাইকে অবাক করে বলতে লাগল “আমি আপনাদের সবাইকে একটা সত্যি কথা বলতে চাই। এই লেখা গুলি আমার নয়। এই লেখা গুলি আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী লোপার লেখা। আমার অনেক অনুরোধেও সে প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করতে চায়নি। তাই তার রচনা গুলিকে সামনে আনার জন্য, গোপনে প্রতিযোগিতাতে এই লেখা পাঠাই। লেখা গুলির মধ্যে কোন লেখক বা কবির নাম ছিল না। কিন্তু যেহেতু লেখা গুলিকে আমিই পাঠিয়েছিলাম তাই সবাই ভাবল এগুলি আমারই লেখা। আসলে এই গুলি লোপার আর এই পুরস্কার তারই প্রাপ্য।” এই বলে সে তার বান্ধবীর সব ইতিহাস খুলে বলল।

নতুন একটা গল্পের মতই সবাই তার কথা অবাক হয়ে শুনল। লোপাকে মঞ্চে ডাকা হল। কাছে আসতেই পারুল লোপাকে আদরে, আবেগে জড়িয়ে ধরল।
শেষে প্রধান শিক্ষক মহাশয় দুজনকেই পুরস্কার দিলেন। তিনি বললেন “আজ আমি নিজেকে খুব গর্বিত অনুভব করছি যে আমার স্কুলে পারুল আর লোপার মত এমন গুণী ছাত্রীরা আছে। পারুলের সততা, বুদ্ধিমত্তা এবং নিষ্ঠা একটা উদাহরণ হয়ে থাকবে আমার কাছে। জানতাম যে জীবনে মাত্র একজন বন্ধুর মত বন্ধু হলেই জীবনের রং পাল্টে যায় আর আজ এত বছর পর চোখে দেখলাম। তাদের দুজনকেই আমার অনেক অনেক আশীর্বাদ আর শুভ কামনা জানাই।” চারিদিক দর্শকদের হাততালির শব্দে মুখরিত হতে লাগল।
Top of the page

দাদাগিরী

- হরপ্রসাদ সরকার

এক রাজ দরবারে এক অপরাধীকে একদিন হাজির করা হল। নাম বিধু। সে জন্ম থেকেই বোবা, কথা বলতে পারে না। তার বিরুদ্ধে কয়েক শত অভিযোগ। কিন্তু সব এক ধরনের অভিযোগ। বিধু নাকি যখন-তখন, যাকে-তাকে ধরে চড়-লাথি মারে, যার-তার সাথে মারামারি করে।

বিধুকে যখন রাজদরবারে হাজির করা হল তখন সবাই দেখল বিধুর চেহারায় যেন কোন ভয়ের ভাব নেই, কোন অপরাধ বোধ নেই। সে যেন বেশ মনের আনন্দে আছে, উল্টা তার মুকে একটা তৃপ্তির হাসি-হাসি ভাব লেগে আছে। রাজা, মহামন্ত্রী আর বাকী সবাই তা দেখে বেশ অবাক হলেন। মহামন্ত্রী মনে মনে ভাবলেন কোন অপরাধী রাজার সামনে এসে এত নিডর আর ভয় মুক্ত থাকতে পারে না। অবশ্যই এর মধ্যে কিছু কিন্তু আছে। তিনি রাজার কানে কানে কি যেন বললেন। আর তক্ষুনি রাজার আদেশে বিধুকে ছেড়ে দেওয়া হল। বিধু তেমনি হাসি মুখে রাজ দরবার থেকে বেড়িয়ে গেল। তবে তার পিছু পিছু চলল এক গুপ্তচর। এ খবর রাজা আর মহামন্ত্রী ছাড়া কেউ জানল না।

রাজদরবার ছেড়ে পথে নেমে একটু গিয়েই গুপ্তচর দেখল এক সাধু তার আসন পেতে বসে, মালা হাতে নাম জপ করেছে। ছোট্ট একটা শিশু গুটি গুটি পায়ে একা একা হাটতে হাটতে এসে সেই সাধুর সামনেই মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ে গেল। মাটিতে পড়ে সে কাঁদতে লাগল। তার কান্না শুনে সাধুবাবা চোখ খুললেন কিন্তু নিজের আসন ছেড়ে, মালা ছেড়ে উঠলেন না। কিন্তু হি-হি হাসতে লাগলেন। শিশুটির পিছন-পিছনই একটু দূরে ছিল বিধু। সে দৌড়ে গিয়ে শিশুটিকে মাটি থেকে তুলল, আর তার পরই সাধুবাবার গালে, ঘারে-গর্দানে ধাম-ধাম চড়, কিল। সাধুবাবা ঝড়ের মত চড়-কিল খেতে খেতে কোন মতে তার মালা হাতে দৌড়ে পালাল। বিধু শিশুর গালে দুটি চুমু দিয়ে তার পথে পা বাড়াল।

কিছু দূর যাবার পর আরেক কাণ্ড। এক অতি বৃদ্ধ ভিখারি এক ব্যবসায়ীর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একটু খাবারের জন্য বেশ কাকুতি-মিনতি করছিল, হঠাৎ সেই ব্যবসায়ী বাইরে এসে সেই বৃদ্ধ ভিখারিকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। দূর থেকে তা দেখে বিধু দৌড়ে গিয়ে সেই ব্যবসায়ীর উপর বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল। এমন চড়-লাথি শুরু হল যে সেই ব্যবসায়ী “বাঁচাও বাঁচাও” চীৎকার করতে লাগল। আসে পাশের সিপাহীরা দৌড়ে এল। বিধুকে বন্দী করে আবার রাজদরবারে নিয়ে যাওয়া হল। পিছন পিছন সেই গুপ্তচর ও গেল।

গুপ্ত ঘরে সে মহামন্ত্রীকে সব খুলে বলল। মহামন্ত্রী এবার রাজদরবারে হাজির হয়ে সবার সামনে সব ঘটনা খুলে বললেন। আসল ঘটনা বুঝতে আর কারোর বাকী রইল না। রাজা আর মহামন্ত্রী বুঝলেন কেন বিধু এত নিডর আর ভয় মুক্ত থাকে? কেন এত মারামারি করেও তার মনে কোন অপরাধ বোধ নেই? কেন তার মুখে তৃপ্তির হাসি লেগেই থাকে? রাজার আদেশে তক্ষুনি বিধুকে নগর-শৃঙ্খলার দায়িত্ব দেওয়া হল। সে মনে-প্রাণে তার দায়িত্ব পালন করতে লাগল।
Top of the page

গভীর বন্ধুত্ব

- হরপ্রসাদ সরকার

সে অনেক আগের কথা। এক গুরুদেবের গুরু-আশ্রমে অনেক শিষ্য শিক্ষা গ্রহণ করত। তাদের মধ্যে একজন ছিল রাধামাধব আরেক জন ছিল গোপেশ। তাদের মধ্যে খুব গভীর বন্ধুত্ব। তারা সদাই এক সাথে থাকত, এক সাথে গুরুদেবের কাছে বসে শিক্ষা গ্রহণ করত, আবার এক সাথেই বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত। গুরু-আশ্রমের সবাই তাদের বন্ধুত্বের কথা জানত।

তাদের মধ্যে শুধু প্রেম ভালবাসা ছিল তাইই নয়। তাদের মধ্যে ঝগড়া ও হত বিস্তর। সময় সময় তাদের মধ্যে কোনো কোনো বিষয় নিয়ে এমন তুমুল ঝগড়া হত যে সবাই ভাবত এই বুঝি তাদের বন্ধুত্ব শেষ হয়ে গেছে। আর কেউ কাউর সাথে কোনদিন কথা বলবে না। চিরদিনের জন্য তারা আলাদা হয়ে গেল। কিন্তু একটু পরেই আবার দুই বন্ধু যেই কি সেই, দুজনেই একে অপরের গলা জড়িয়ে ধরে হাসাহাসিতে লুটু-পুটি খায়। গুরুদেব তা দেখে মিটি-মিটি হাসতেন।

দিন আসে দিন যায়, কিন্তু কোন দিন তাদের বন্ধুত্বের মধ্যে কোন হতাশা বা নিরাশা আসে নি। এক দিন যখন দুই বন্ধু বনে গেল গরু চড়াতে তখন এক শিষ্য গুরুদেবকে জিজ্ঞাস করল, কিভাবে দুই বন্ধু এত তুমুল ঝগড়া করেও আবার এত গভীর বন্ধু হয়ে থাকে?

গুরুদেব সব শিষ্যকে ডেকে কাছে আনলেন, আর তার পর বলতে শুরু করলেন “রাধামাধব আর গোপেশ জ্ঞানী আর বুদ্ধিমান। দুজনেই এমন ভাল বন্ধু কারণ তারা দুজনেই দুজনের কাছে মুক্ত। যেখানেই স্বাধীনতা সেখানেই সুখ, সেখানেই সমৃদ্ধি। তারা তাদের মনের কথা স্বাধীন ভাবে খুলে বলে, তাই তাদের দুজনের মধ্যে ভিন্ন মত নিয়ে এত তুমুল ঝগড়া হয়। আবার তারা দুজনেই অহং মুক্ত, তাই তাদের মন জলের মত। এই জলের উপর তাদের ঝগড়া কলহ কোন দাগই কাটতে পারে না। তাই সব ঝগড়া কলহ চোখের পলকেই মিলিয়ে যায়। দুই বন্ধু আবার গলাগলি করে ঘুরে বেড়ায়। যত দিন তাদের মধ্যে এই দুই গুন বজায় থাকবে ততদিন তাদের বন্ধুত্ব ও অটুট থাকবে।” সকল শিষ্যরাই রাধামাধব আর গোপেশের বন্ধুত্বের কারণ জেনে খুব খুশি হল। এই দুই বন্ধুর প্রতি সকলের ভালবাসা আরো বেড়ে গেল।



Top of the page
All Pages     4    5    6    7    (8)     9    10    11    ...

Amazon & Flipkart Special Products

   


Top of the page