Home   |   About   |   Terms   |   Book Rent   |   Contact    
A platform for writers

বর্ণময় স্পর্শ

Bangla Article

-------- বিজ্ঞপ্তি ----------
◕ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা - সেপ্টেম্বর ২০২২, Details..
--------------------------

All Bangla Articles    4    5    6    7    8    9    10    11    ( 12 )     13    14    15   

বর্ণময় স্পর্শ
লেখক - দিগন্ত পাল, মায়ের নাম- অনামিকা পাল, বাবা – অচিন্ত্য কুমার পাল, দানেশ শেখ লেন, হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ
( অক্টোবর, ২০২১, সেরা প্রবন্ধ )


## বর্ণময় স্পর্শ
লেখক - দিগন্ত পাল, মায়ের নাম- অনামিকা পাল, বাবা – অচিন্ত্য কুমার পাল, দানেশ শেখ লেন, হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ

lipstick
একটা প্রশ্ন করি! দেখুন তো উত্তরটা জানা আছে কিনা! কি সেই প্রসাধনী যার ব্যবহার নারীই বেশী করে থাকে, কিন্তু তবু তা স্থান পায় পুরুষের পাকস্থলীতে?

উত্তরটা জানেন? না জানলেও আন্দাজ করতে পারছেন বোধহয়, আমি কোন্ প্রসাধনীর কথা বলছি – হ্যাঁ, 'লিপস্টিক'। নারীর ওষ্ঠ-যুগল শুধু পুরুষের কাছে নয় বরং নারীর চোখেও আরও সুন্দর হয়ে ওঠে এই লিপস্টিক-এর ছোঁয়ায়। তবে ঐ দুই প্রকার সৌন্দৰ্য্যবোধে পার্থক্য আছে বই কি। প্রথম প্রকার সৌন্দৰ্য্যবোধে রাজত্ব করে 'আকর্ষণ' আর দ্বিতীয় প্রকার বোধে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে 'তুলনা' | মানুষের ভাবনায় আর পাঁচটা প্রসাধনদ্রব্য ও রম্য পোশাক-পরিচ্ছদের মত 'লিপস্টিক'-এরও গুরুত্ব এই দুই ভিতের উপর দাঁড়িয়ে - 'আকর্ষণ' ও 'তুলনা'। তবে এই ভিৎ এখনকার মত সর্বদা সুদৃঢ় ছিল না। কালস্রোতে এই ভিৎ বহুবার দুর্বল হয়েছে। মানব-সভ্যতার ইতিহাসে রয়ে গেছে তার ছাপ। এই সকল ছাপ ব্যক্ত করে জন্মলগ্ন থেকে লিপস্টিক-র উত্থান-পতনের জলছবি।

৩৫০০ খ্রীষ্ট-পূর্বাব্দে সর্বপ্রথম লিপস্টিক-র ব্যবহার হয়েছিল বলে জানা গেছে। শোনা যায় যে, প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতায় এক রাণী সাদা সীসা ও লাল পাথর গুঁড়ো করে সর্বপ্রথম নিজের ঠোঁট রঙ করেছিলেন। এরপর সুমেরীয় সভ্যতার সাধারণ মেয়ে ও মহিলারাও মূল্যবান পাথর ও বিভিন্ন খনিজ পদার্থের সমন্বয়ে একধরনের রঞ্জক তৈরি করেছিলেন যা গুঁড়ো করে তারা নিজেদের ঠোঁটকে রাঙিয়ে তুলতেন, চকচকে করতেন। তারপর সিন্ধু নদের উপত্যকায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে এই ওষ্ঠ-রঞ্জকের ব্যবহার ধীরে-ধীরে ছড়িয়ে পড়ে।

লিপস্টিক-র পূর্বসূরি এই ওষ্ঠ-রঞ্জকের জনপ্রিয়তার সাথে-সাথে তার প্রস্তুত-প্রণালীতেও বিবর্তন আসে। ব্যবহার হতে থাকে বিবিধ ফলের রস আর উদ্ভিদের নির্যাস। পরবর্তীকালে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় তৈরি লিপস্টিক ঠিক যে বৈশিষ্ট্যগুলো পরিগ্রহ করেছিল তার সাথে এখনকার অনেক লিপস্টিক-র বেশ কিছু সাদৃশ্য আছে। যেমন – উজ্জ্বল লালচে রঙ, সাথে পিচ্ছিল ভাব। তবে তখন মিশরে নর-নারী নির্বিশেষে কেবল রাজবংশীয় ব্যক্তিগণ ও উচ্চপদস্থ ধর্মযাজকেরাই সামাজিক মর্যাদার চিহ্ন স্বরূপ লিপস্টিক ব্যবহার করতেন। মিশরে লিপস্টিক তৈরি শুরু হওয়ার পর থেকে তা গ্রীক ও রোমান অভিনেত্রীদের খুব প্রিয় হয়ে ওঠে এবং লিপস্টিক-র জনপ্রিয়তায় এক জোয়ার আসে। কিন্তু মধ্যযুগে খ্রীষ্টধর্ম বিস্তারের হাত ধরে এই জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়তে শুরু করে কারণ খ্রীষ্টধর্মযাজকেরা ঠোঁটে লাল রঙ ব্যবহার করাকে 'শয়তানের উপাসনা' বলে সমালোচনা করতেন। এই সমালোচনা বিশ্বাসের রূপ নিয়ে ধর্মভীরু মানুষের মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল, ফলস্বরূপ ক্রমে মানুষ লিপস্টিক-র সাহচর্য্য ত্যাগ করল।

কিন্তু লিপস্টিক-র এত সহজে মানুষের সঙ্গ ছেড়ে দেওয়ার কথা ছিল না। সৌন্দৰ্য্যানুসন্ধিৎসু নারীর মনে নিজেকে সবার মাঝে বিশেষভাবে উপস্থাপন করার অভিলাষ শাশ্বত। সেই অভিলাষ চরিতার্থ করার জন্যই এক রাণী লিপস্টিক-র জন্ম দিয়েছিলেন। পুনরায় আরেক রাণীর হাত ধরেই হল সেই লিপস্টিক-র পুনর্জন্ম। ষোড়শ শতাব্দীতে রাণী প্রথম এলিজাবেথ কোচিনিয়াল, ডিমের সাদা অংশ, আরবি আঠা, এবং দুধ মিশিয়ে তৈরি করা এক বিশেষ মিশ্রণকে লিপস্টিক হিসাবে ব্যবহার করলেন যা মানুষের সাজ-গোজ সংক্রান্ত ভাবনায় বিপ্লব এনেছিল আর মূলত সম্ভ্রান্ত ও ধনী পরিবারের মেয়ে ও মহিলাদের সাজ-সরঞ্জামের তালিকায় লিপস্টিক-কে একাধিপত্য দিয়েছিল। সাজ-গোজের নতুন চল হল – গোটা মুখমণ্ডলে কোন প্রসাধনীর চিহু মাত্র থাকবে না, তবে ঠোঁট-দুটি হবে লাল লিপস্টিক-এ রাঙা! কিন্তু এরপর সম্ভ্রান্ত পরিবারের ললনাদের মধ্যে লিপস্টিক-র এই আধিপত্য একসময় পুনরায় ফিকে হতে শুরু করল আর ক্রমে লিপস্টিক হয়ে উঠল সমাজের দরিদ্র ও নীচু সম্প্রদায় এবং পতিতাদের সৌন্দর্য্যের শিলমোহর। পতিতারা এবং নীচু সম্প্রদায়ের ললনারা প্রায় এক শতক ধরে মাথায় করে রাখলেও এরপর তাঁদের কাছেও লিপস্টিক-র অবহেলা জুটল। সমাজের সর্ব স্তরেই লিপস্টিক-র গুরুত্ব খর্ব হতে-হতে একসময় তা বিস্মৃত হল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর কাছাকাছি লিপস্টিক-র পুনরায় অদৃষ্ট ফিরল, তবে এবার এক প্রতিবাদী মহিলার হাত ধরে - মিলিসেন্ট ফসেট । সালটা ১৮৯৭। ইংরেজ লেখিকা মিলিসেন্ট ফসেট প্রতিষ্ঠা করলেন 'ন্যাশানাল ইউনিয়ন অফ উইমেন্স সাফ্রেজ' এবং সেটাই হয়েছিল ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ইংল্যান্ডের সকল নারীর মনে জ্বলতে থাকা অসন্তোষের আগুনে ঘৃতাহুতি| আন্দোলনের প্রধান অস্ত্র – মুখের অকাট্য যুক্তি, আর সেই অস্ত্রে শান দিল ঠোঁটের লিপস্টিক। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে লিপস্টিক যেন হয়ে উঠল নারী-আন্দোলনের প্রতীক। এরপর লিপস্টিক-কে আর পিছন ফিরে দেখতে হয়নি।

এখনকার অধিকাংশ লিপস্টিক ব্র্যান্ড যে 'সুইভেল টিউব' ব্যবহার করে থাকে তা আবিষ্কৃত হয় ১৯২৩ সালে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে লিপস্টিক অন্যতম প্রধান ব্যবসায়িক প্রসাধন দ্রব্য হিসাবে আত্মপ্রকাশ করল। দাম সাধ্যের মধ্যে হওয়ায় লিপস্টিক-র বিভিন্ন প্রকার ও রঙ সাধারণের কাছে সহজলভ্য হল। ফলে মানুষের জীবনে লিপস্টিক যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল। সত্তরের দশকে মানুষের কাছে যৌন ও সামাজিক বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে ওঠে উজ্জ্বল রঙের লিপস্টিক। আশির দশকে লিপস্টিক-র লাল রঙ প্রাধান্য পেলেও নব্বইয়ের দশকে প্রধানত ন্যাচারাল কালার মানুষের মন জয় করে নেয়। ২০০০ সাল শুরু হওয়ার আগেই প্রসাধনদ্রব্য ব্যবসায় লিপস্টিক-র মোট মূল্য ৯৪০ কোটি ডলার ছুঁয়ে যায়!

কালপ্রবাহে মানব-সভ্যতার কাছ থেকে লিপস্টিক কখনও আদর পেয়েছে তো কখনও পেয়েছে অবহেলা। লিপস্টিক-র অলৌকিক ক্ষমতা – অসুস্থতা এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত রুখতে পারে – এমন ভিত্তিহীন প্রশংসা যেমন জুটেছে তেমনই জুটেছে 'শয়তানের উপাসনার উপকরণ'-র মত অমূলক সমালোচনা। তবে যখনই লিপস্টিক সময়ের বক্ষে মুখ থুবড়ে পড়েছে, কোন-না কোন নারী তার দিকে সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছে; আর করবে নাই বা কেন, নারীর সৌন্দর্য্যের সাথে লিপস্টিক –র সম্পর্ক যে অতীব নিবিড়।

কিন্তু এখন প্রশ্ন হল যে, লিপস্টিক কিভাবে নারীকে সুন্দর হয়ে উঠতে সাহায্য করে। তা বুঝতে গেলে প্রথমে বুঝতে হবে যে, এই সৌন্দৰ্য্য' আসলে কি? যে কোন ভাষায় ব্যক্ত কোন বক্তব্যের সবটুকু বুঝতে গেলে সেই ভাষাটি শিখে নেওয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই, কারণ অনূদিত বক্তব্যে মূল আবেগের ঘাটতি চির সত্য। একটি যন্ত্রগণক মনুষ্য-ভাষার কোন তোয়াক্কা করে না, নিজের মত করে বা নিজ মাপকাঠিতে গণনা করার জন্য মানুষের দেওয়া সকল নির্দেশই সে নিজের ভাষায় অনুবাদ করে নেয়। ঠিক এই কারণেই বহু ক্ষেত্রে সে নিজেকে মানুষ অপেক্ষা অনেক বেশী দক্ষ প্রমাণ করলেও চিরকাল মানুষের কাছে সে 'নির্বোধ' তকমা পেয়ে থাকে। আমাদের মস্তিষ্কেরও বাহ্যিক সৌন্দৰ্য্য বিচার করার নিজস্ব মাপকাঠি আছে যা যৌক্তিকতার আতস কাঁচে অনেক ক্ষেত্রেই অমূলক ঠেকে কারণ মস্তিষ্কের যে অঞ্চলটি মানুষের বাহ্যিক সৌন্দৰ্য্য পরিমাপ করে থাকে, সেই অঞ্চলটি যুক্তি নয়, বরং আমাদের মস্তিষ্কের কল্পনাশক্তি ও স্বজ্ঞার প্রধান উৎস। মনুষ্য-মস্তিষ্কের সুপিরিয়র টেম্পোরাল সালকাস', 'অ্যাসোসিয়েটিভ অডিটারি কর্টেক্স', 'ভিসুয়াল কর্টেক্স', এবং অচেতন স্মৃতি সঞ্চিত থাকে যে অংশগুলিতে অর্থাৎ 'সেরিবেলাম','পুটামেন','কডেট নিউক্লিয়াস', ও মোটর কর্টেক্স' অংশগুলি নিয়ে গঠিত এই অঞ্চলটি 'স্বজ্ঞাত অঞ্চল' নামে পরিচিত যা মানুষের মুখমণ্ডলের ত্বকের রঙ ও ঠোঁটের রঙের পার্থক্যে একজন নারীকে খুঁজে পায়। আসলে আমাদের পূর্বপুরুষদের ও আদিম পূর্বপুরুষদের সমাজ, সংস্কৃতি, জীবনযাপনের পদ্ধতি, ও মানুষের বাহ্যিক রূপ পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তাঁদের জিনগত তথ্যে বিবিধ প্রভাব ফেলেছিল। বংশপরম্পরায় সেই সকল পরিবর্তিত জিনগত তথ্যের অনেকগুলি আমরাও বহন করছি যা আমাদের মস্তিষ্কের 'সিম্যান্টিক মেমোরি'-তে উপস্থিত স্নায়ুকোষগুলোর গঠন ও কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে। এছাড়াও আমাদের বর্তমান সমাজ, সংস্কৃতি, জীবনযাপন, এবং মানুষের বাহ্যিক রূপ পর্যবেক্ষণের অনেক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আমাদের মস্তিষ্কের 'সিম্যান্টিক মেমোরি'-র বেশ কিছু স্নায়ুকোষের জিনে (নিউরাল জিন) পরিবর্তন ঘটিয়ে চলেছে। এসবের সম্মিলিত প্রভাবে মস্তিষ্কের 'সিম্যান্টিক মেমোরি'-তে মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য্য বিষয়ক অনেক ধারণা সঞ্চিত হতে থাকে। মস্তিষ্কের স্বজ্ঞাত অঞ্চলটি সময়ের সাথে-সাথে এই ধারণাগুলিকে সংগ্রহ করে এই সকল ধারণার সাধারণীকরণ (জেনারেলাইজেশন) ঘটায়। সেই সাধারণীকরণ-র ভিত্তিতেই মানুষের বাহ্যিক সৌন্দৰ্য্য বিবেচনা করার মাপকাঠিগুলি নির্ধারিত হয়। আমাদের মস্তিষ্কের স্বজ্ঞাত অঞ্চল সিম্যান্টিক মেমোরি-র ভিত্তিতে বিশ্বাস করে যে, নারীর ঠোঁটের রঙ স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মুখমণ্ডলের ত্বকের রঙ অপেক্ষা বেশী গাঢ় হয়। চওড়া, সুমসৃণ, ও পরিপুষ্ট দুটি ঠোঁট স্বজ্ঞাত অঞ্চলের কাছে সন্তান প্রতিপালনে সক্ষমতার স্বাক্ষর। শুধু তাই নয়; মস্তিষ্কের স্বজ্ঞাত অঞ্চল মনে করে যে; সময়, পরিস্থিতি, ও বেশভূষার ভিত্তিতে ঠোঁটের রঙ নির্বাচন এক শৈল্পিক নৈপুণ্যের বহিঃপ্রকাশ। অর্থাৎ নারীত্ব, মাতৃত্ব, আর শিল্পী-সত্ত্বা – এই তিন মাপকাঠির ভিত্তিতে দর্শকের মস্তিষ্কের স্বজ্ঞাত অঞ্চলে যে উপলব্ধি জন্ম নেয় তাই হল নারীর সৌন্দর্য্য' যা বর্ধিত হয় লিপস্টিক-র সুদক্ষ বর্ণময় স্পর্শে।
( সমাপ্ত)


13   

All Bangla Articles    4    5    6    7    8    9    10    11    ( 12 )     13    14    15   


## Disclaimer: RiyaButu.com is not responsible for any wrong facts presented in the Stories / Poems / Essay / Articles / Audios by the Writers. The opinion, facts, issues etc are fully personal to the respective Writers. RiyaButu.com is not responsibe for that. We are strongly against copyright violation. Also we do not support any kind of superstition / child marriage / violence / animal torture or any kind of addiction like smoking, alcohol etc. ##


◕ RiyaButu.com, এই Website টি সম্পর্কে আপনার কোনও মতামত কিংবা পরামর্শ, কিংবা প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় আমাদের বলুন। যোগাযোগ:
E-mail: riyabutu.com@gmail.com / riyabutu5@gmail.com
Phone No: +91 8974870845
Whatsapp No: +91 6009890717